এম. ভি. পারিজাতের অনাবিল যাত্রা

মেঘনা পাড়ের চর আলেকজান্ডার। জোয়ার ভাটা আলো ছায়ার এক মায়াবী রূপে, ভ্রমণ পিপাসুদের মনকে সিক্ত করে। চারদিকে নীল পানির রাশি, ছোট ছোট ঢেউ এসে ধাক্কা দিচ্ছে পাড়ে। মেঘনা নদীর এই অপরূপ রূপ বিমোহিত করেছিল আমায়। কোস্টাল এরিয়ার এখান থেকে সাগর খুব কাছে। আমাদের স্বপ্নযাত্রা শুরু হয়েছিল সেই বরিশাল ঘাট থেকে। কখনও ভাবিনি চর আলেকজান্ডার যাব। যাবার কথা ছিল বাগেরহাট৷ এই বাগেরহাট প্রতি ট্রিপের একটা অভিশাপ।

এম.ভি মধুমতি জাহাজে উঠে সিদ্ধান্তহীনতার এক চরম মুর্হূতে জুয়েল রানা ভাই কহিলেন, আশিক ভাই চলেন কুয়াকাটা যাই৷ তখনও আমাদের পার্টনার ওয়াফি আহমেদ বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে সাম্যের গান গাইছে। জুয়েল ভাইয়ের ভাতিজা আল-আমিন আসলো একটু পরে। জাহাজ ছাড়বে ৬.৩০ এ। জাহাজ ছাড়ার ২ মিনিট আগে হাজির সদা চঞ্চল ওয়াফি আহমেদ৷ যথারীতি আমাদের প্ল্যান ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে কুয়াকাটার দিকে চলে গেল।

সে রাতে ঝড়ের প্রকোপে এম.ভি মধুমতি চাঁদপুরের মোহনায় অনেকক্ষণ আটকিয়ে ছিল। বরিশাল ঘাটে খুব ভোরে পৌঁছানোর কথা থাকলেও ঘাটে ভিড়লো সকাল সাড়ে সাতটায়। ঘাটে ঢোকার আগ মুর্হুতে একটা সি-ট্রাককে ক্রস করতে দেখলাম। ইলিশা, মজু চৌধুরী হাট লেখাটি চুম্বকের মতো আর্কষিত করলো। এই তো সেই চর আলেকজান্ডারের হাতছানি। সাথে দুই ট্রাবল মেকার থাকলে শয়তানও এসে ক্ষণে ক্ষণে বুদ্ধি দিতে থাকে।

পারিজাতে লেখক। ছবি – জুয়েল রানা।

কুয়াকাটা থেকে বাসে যখন বরিশাল এসে পৌঁছালাম তখন সন্ধ্যা পার হয়ে হাতছানি দিচ্ছে একটি মিষ্টি রাতের। কুয়াকাটা সফর শেষে বরিশাল এসে ভাতিজা আল-আমিন বিয়োগ হয়ে গেল। উঠিয়ে দিলাম মাওয়াগামী বাসে। ছোট বোনের কৃপায় রাতটা বি.এম কলেজের হলে পরম প্রতাপশালী মশার গীত শুনতে শুনতে কেটে গেল৷ খুব ভোরে উঠেই সেই বরিশাল ঘাট আর এম.ভি পারিজাত৷ শুরু হলো তিন ট্রাবল মেকারের স্বপ্নযাত্রা। পারিজাত নামটা বেশ দৃষ্টি নন্দন। হিন্দু পুরান মতে, পারিজাত স্বর্গের বিশেষ ফুল। তাই কি রবি ঠাকুরের কবিতায় পাওয়া যায় পারিজাতের কথা-

ফাগুন হাওয়ায় রঙে রঙে
পাগল ঝোরা লুকিয়ে ঝরে
গোলাপ জবা পারুল পলাশ
পারিজাতের বুকের পরে।

আশ্বিনের এই রৌদ্রকরোজ্জ্বল সকালে ফাগুনের হাওয়া খোঁজা বড্ড অন্যায়। তবে পারিজাতের বুকে জায়গা না পেয়ে ঈশ্বরের কাছে বলতে ইচ্ছা করছিল, এ কেমন বিচার? পারিজাতের উপর নিচ সব জায়গায় কানায় কানায় ভর্তি যাত্রী। কোয়ান্টাম সদস্যদের চাপে কোথাও নেই বসার জায়গা। সর্বোপরি বরিশাল থেকে মজু চৌধুরী হাট যাবার ভাড়া শুনে ওয়াফি’র মেজাজ সপ্তম স্বর্গে। ৩০০টি টাকা গুনে গুনে দিতে হবে। হালের তিনতলা চারতলা বিশাল বিশাল লঞ্চের কাছে দ্বিতল বিশিষ্ট পারিজাতকে শিশুই বলা চলে।

ওয়াফি আক্রোশের চোটে বলে বসলো, এই বাচ্চা লঞ্চে কেন ৩০০ টাকা দিমু। শালা বাটপার। তখনও যদি বুঝতে পারতো কোস্টাল এরিয়ার বড় বড় নদী পার করে যেতে হবে মজু চৌধুরীর হাট, তাহলে অধমের মাথা নিশ্চিত শ্রদ্ধায় নুয়ে যেত। ভাড়া নিয়ে বাহাস করতো না। কীর্তনখোলা, মাছকাটা, ইলিশা, মেঘনা নদীর বিশাল সৌন্দর্যে মালাইয়ের প্রলেপ লাগিয়েছে মোহনা আর বে অফ বেঙ্গল। অপেক্ষা করছে এক রোমাঞ্চকর যাত্রা।

পারিজাত থেকে নদীর দৃশ্য। ছবি – আশিক সারওয়ার

অনেক কাঠ কয়লা পুড়িয়ে তিনটা চেয়ার জোগাড় করতে পারলাম। আসন পাতলাম মাস্টার ব্রীজের কাছে। নদীর জল কেটে কেটে চলছে এম.ভি পারিজাত। প্রবাদ আছে “ধান-বিল-খাল, তিনে মিলে বরিশাল”৷ বরিশালের নদ-নদী যে কত সুন্দর তা বুঝতে কোনো কবি হওয়া লাগে না। সত্যিকারের প্রকৃতি প্রেমীর কাছে সে নিজ রূপেই ধরা দেয়৷ মাস্টার ব্রীজে বসে উপভোগ করতে লাগলাম নদীর ভয়াল সৌন্দর্য।

একে একে পার করলাম কীর্তনখোলা, মাছকাটা, ইলিশা, মেঘনা নদী। মেঘনার শাখা নদী এত বড় হতে পারে আগে ধারণা ছিল না। এই রুটে কোনোদিন সকালে আসা হয়নি। চারদিকে সবুজের সমাহার, ছোট ছোট গ্রামগুলো পাশ কাটিয়ে যাবার সময় অদ্ভুত সুন্দর লাগছে। এ যাত্রা যদি অন্তত কাল ধরে প্রবাহমান থাকে, কোনো বাধা নেই। যেন কোনো তাড়াহুড়ো নেই, নেই কোনো ক্লান্তি শুধু চারপাশে মন জুড়ানো প্রশান্তি। যেন জলে বাসা বেঁধেছে জলেশ্বরী। পাশ দিয়ে উড়ে যাচ্ছে গাংচিলের দল।

জলের জীবন বেদের জীবন। ছবি – আশিক সারওয়ার

সি-ট্রাক, ট্রলারগুলো যেন পারিজাতের পাশ দিয়ে দূর থেকে দূরান্তে নীল দিগন্তে চলে যাচ্ছে। সকালের এই সোনা রোদে মহিষের পাল কাদায় গড়াগড়ি খাচ্ছে। কোন চরের পাশে যেন দল বেঁধে নৌকায় বাসা বেঁধেছে বেদেদের দল। কোনো বাধা নেই, কোনো কোলাহল নেই চারদিকে যেন এক ঘোর লাগা মায়াবী আভা। বাবলা গাছের ঝাঁকে সূর্যের ওই প্রথম কিরণ খেলা করে। বাংলার এই রূপ দেখেই কি জীবনানন্দ শঙ্খচিল শালিকের বেশে এই দেশে বার বার ফিরে আসতে চেয়েছিলেন? মেহেদীগঞ্জের পাতারহাট পেরিয়ে পারিজাত যাত্রা বিরতি দিল ভোলার ইলিশা ঘাটে।

এই বিরতিতে পরিচয় হলো এক ভারতীয় দম্পতির সাথে। শিল্প সাহিত্য ও ইতিহাস জ্ঞানে পারদর্শী এই দম্পতির সাথে মজু চৌধুরীর হাট পর্যন্ত বেশ ভাল সময় কেটেছিল। আংকেলের বয়স প্রায় ৬০ ছুঁই ছুঁই। বাংলার প্রথম রাজধানী নিয়ে তর্ক বিতর্ক করতে করতে সেটা গিয়ে থামলো দেশ ভাগ নিয়ে। তার নাড়িপোতা এই বরিশালের মাটিতে। তাই তো বাপ-দাদাদের ভিটা এক পলকের জন্য দেখতে এসেছেন সুদূর পশ্চিমবঙ্গ থেকে। নৌ ভ্রমণ পছন্দ করেন তাই তাদের এই উদ্দ্যেশ্যহীন ঘোরা।

আংকেল আমার এই বয়সে ব্যাকপ্যাকার। আমাদের জাহাজের ক্যাপ্টেন সাহেব এক কাঠি সরেস মানুষ৷ ইলিশা ঘাটে থামার পর থেকেই নিরলসভাবে ডেকে যাচ্ছেন, “যাত্রী ভাইদের দৃষ্টি আর্কষণ করে বলছি, যে সকল যাত্রীরা নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, মজু চৌধুরীর হাট, চট্টগ্রাম, ঢাকায় যাবেন এম.ভি পারিজাত জাহাজে চলে আসুন। পারিজাত আসছে কি আনন্দ লাগছে, যাত্রী ভাইরা এদিক সেদিক ঘোরাফেরা না করে পারিজাতে এসে পড়ুন।”

আমারে নিবা মাঝি, পারিজাতের ক্যাপ্টেন। ছবি – জুয়েল রানা।

ইলিশা ঘাট থেকে আবার যাত্রা শুরু হলো এম.ভি পারিজাতের। মেঘনার সুবিশাল চ্যানেলে ঢুকে আমরা বিস্মিত, হতভম্ব। দেখা যাচ্ছে না এপার ওপার। দেড় ঘণ্টার এই পথ, বে অফ বেঙ্গলের মৃদু গর্জন শুনেই কেটে গেল। সুবিশাল জলরাশির ভেতর ক্ষুদ্র পারিজাত। আর তার থেকেও অতি ক্ষুদ্র আমি। খাঁচার পাখি পিঞ্জর ভেঙে বের হতে চায়।

দিগন্ত বিস্তৃত অথৈ-অগাধ জলরাশির মাঝে সূর্যের আলো এক সোনালী আভা তৈরি করেছে। দূরপানের মেঘনার ওই ছোট ছোট চর দেখতে দেখতে ভাবি, ঈশ্বর তোমার কী অপার লীলা! এম.ভি পারিজাতের এই ঘোর লাগা মায়ার তরী এক সময় মোহিত বিমোহিতের জগৎ ভেদ করে মজু চৌধুরীর হাট ভিড়লো। এবার গন্তব্য মোদের লক্ষ্মীপুর।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

গুঠিয়ায় ২১টি পবিত্র জায়গার মাটি সম্বলিত বাইতুল আমান জামে মসজিদ

ঝালকাঠিতে বাংলার সুয়েজখাল গাবখান চ্যানেল ও গাবখান ব্রিজের কথকতা