ইথিওপিয়ায় লুসির সাথে সাক্ষাৎ

আদ্দিস আবাবায় নামার পর সবচেয়ে বেশি যেটা শুনেছি সেটা হচ্ছে তাদের জাদুঘরের কথা। ইথিওপিয়ার রাজধানী এ শহরটি বিভিন্ন কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। ভাবতে পারেন, ১৩০টা দেশের দূতাবাস আছে এ দেশটিতে। আছে আফ্রিকার জাতিসংঘ “আফ্রিকান ইউনিটি” এর সদর দপ্তরও এখানে। কিন্তু সব কিছুকে ছাড়িয়ে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু লুসি।

আমি আদ্দিসে এসেছি একটি প্রশিক্ষণে অংশ নিতে। সবমিলে ৩০ জন আমরা, যার বেশির ভাগই আফ্রিকার। ইথিওপিয়া, ঘানা, নাইজেরিয়া, কেনিয়া, জার্মানি, কানাডা ছাড়া বাংলাদেশের আমরা আছি দুজন। ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে আড্ডায় সবাই মনে করিয়ে দিলো, লুসিকে যাতে দেখে আসি। আগে থেকে একটু একটু জানতাম লুসির ব্যাপারটা।

আদ্দিস আবাবার টেক্সিক্যাব ছবি লেখক

বিজ্ঞানীরা লুসিকে আদি মাতা বলে থাকেন। মানুষের বিবর্তনের সময়কার যে সমস্ত জীবাশ্ম পাওয়া গেছে তার মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন নিদর্শন লুসির কঙ্কাল। ধারণা করা হয়, প্রায় ৩২ লক্ষ বছর আগে মারা গেছেন লুসি। তাঁর হাড়ের প্রায় ৪০ ভাগ পাওয়া যায় ইথিওপিয়ার আফার অঞ্চলে। যে কারণে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন মানুষের আবির্ভাব হয়েছে ইথিওপিয়াতেই।

আমাদের প্রশিক্ষণ চলে সপ্তাহে পাঁচ দিন। শনি ও রবিবার ছুটি থাকবে। আলোচনা করে সবাই মিলে ঠিক করলাম শনিবারেই ঘুরে আসবো জাদুঘর। সঙ্গে আদ্দিস আবাবার সর্বোচ্চ পর্বত মাউন্ট এনটোটোতের ঘুরে আসা যাবে। আমাদের ট্রেনিংয়ের কোঅর্ডিনেটর এংগেদা লেমাকে পরিকল্পনা বলতেই সে জানালো চিন্তা করো না তোমরা, আমি গাড়ী ঠিক করে রাখবো, তবে তোমাদেরকে এখানে এসেই গাড়ীতে উঠতে হবে।

সুন্দর শহর আদ্দিস আবাবা ছবি লেখক

শনিবার ঘুম থেকে উঠে তাড়াতাড়ি ব্রেকফাস্ট শেষ করে রওনা দিলাম আমাদের প্রশিক্ষণের জায়গায়। পৌঁছে দেখি মোটামুটি বিদেশিরা সবাই আছে। ইথিওপিয়ার কেউ নেই, ওরা মনে হয় একই জায়গায় যেতে যেতে হয়রান। আমাদের গাড়ী রওনা দিলো জাদুঘরের উদ্দেশ্যে। সবসময় ইথিওপিয়া শুনলেই আমাদের যেটা মনে আসতো আদ্দিস আবাবা কিন্তু মোটেই সেরকম কোনো শহর না।

ট্র‌াফিক জ্যাম নেই বললেই চলে, রাস্তাঘাটও বেশ প্রশস্ত। মেট্রোরেলও আছে আফ্রিকার উদীয়মান এ দেশটির রাজধানীতে। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা জাদুঘরে পৌঁছে গেলাম। খেয়াল করলাম জাদুঘরের বাইরের রেস্তোরাঁর নামও “লুসি”। শনিবার সকালে ভালোই ভিড় দেখলাম জাদুঘরের গেটে। মূলত বিদেশিরাই এখানে এসেছেন।

মানুষের আবির্ভাবের ইতিহাসই এ যাদুঘরের মূল উপজীব্য ছবি লেখক

মিউজিয়ামের প্রবেশ মূল্য আমাদের ১০০ টাকার মতো। টিকেট কেটে সবাই সদলবলে ঢুকে পড়লাম। গাইড পাওয়া যায় ওখানে, যে পুরো বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করে বুঝাতে পারে। আমাদের সাথে ইথিওপিয়ান একজন বন্ধু থাকায় সে-ই সব কিছু আমাদের বুঝানোর দায়িত্ব নিলো। পুরো জাদুঘরটি দু’তলা, মূলত নৃ-তাত্ত্বিক জাদুঘর। বিভিন্ন সময়ে ইথিওপিয়ার বিভিন্ন জায়গায় প্রাপ্ত মানুষ ও বিভিন্ন জীব জন্তুর হাড় এখানে রাখা হয়েছে।

মানুষের ইতিহাসটাই এ জাদুঘরের মূল প্রদর্শনীর বিষয়বস্তু। বিবর্তনের যে তত্ত্ব বিভিন্ন সময়ে বিজ্ঞানীরা আলোচনা করেন তার চিত্রায়ন ঘটেছে এ জাদুঘরে। এছাড়াও আফ্রিকার যাযাবর সমাজের গল্প, জীবন যাত্রা, ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিসপত্র রয়েছে এখানে। দেয়ালজুড়ে লেখা ইতিহাসের পাশাপাশি ভিডিও চিত্রও রাখা হয়েছে এক জায়গায়।

আগের দিনের সম্রাটদের ব্যবহার করা বিভিন্ন জিনিসপত্রও দেখলাম আমরা। কিন্তু লুসিকে দেখছিলাম না। নিচতলায় এসে দেখলাম এক জায়গায় সব ভিড়, দূর থেকেই বুঝতে পারলাম এ ভিড় লুসির কাছেই। অবশেষে ইথিওপিয়ার বিস্ময়খ্যাত লুসির সামনে এসে দাঁড়ালাম। মাত্র ৪ ফুট উচ্চতার লুসির কঙ্কালের ৪০ ভাগ আসল। বাকি ৬০ শতাংশ কৃত্রিমভাবে বানিয়ে যোগ করে পুরো কঙ্কাল হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে।

লুসি যার ৪০ শতাংশ আবিস্কার করা হয়েছিলো আর কৃত্রিমভাবে জুড়ে দেয়া হয়েছে বাকি ৬০ শতাংশ ছবি লেখক

খুলির হাড়টা মানুষের মতো নয়, কিছুটা সামনের দিকে চলে এসেছে যেটা বানরের সাথেই বেশি মিলে। মুখের হাড়ে পাওয়া আক্কেল দাঁত দেখে অনুমান করা হয় মৃত্যুকালে লুসির বয়স ছিল মাত্র বিশ বছর। তার পায়ের গঠন দেখে বোঝা যাচ্ছিলো লুসি চার পায়ে নয়, দুপায়ে ভর দিয়েই হাঁটতো। তবে সে সময় পাওয়া অন্য সব কিছু সাক্ষ্য দেয় লুসিও কিছুদিন গাছেই বসবাস করতো।

ধারণা করা হয়, লুসির মৃত্যুও হয়েছিলো গাছ থেকে পড়ে। বিজ্ঞানীদের ধারণা লুসির কঙ্কাল লেকে ডুবে যেয়ে জীবাশ্মতে পরিবর্তন হতে শুরু করলেও প্রাকৃতিক কোনো কারণে পুরোপুরি অবিকৃতই থেকে গেছে। বিজ্ঞানী জোহানসন আর তার দল চষে বেড়াচ্ছিলেন পুরো ইথিওপিয়া। এর আগেও দুবার অভিযান চালিয়েছেন তারা, উদ্ধার করেছিলেন অনেক জন্তুর হাড়গোড় সহ প্রাচীন অনেক নিদর্শন।

কিন্তু ১৯৭৪ সালের এ অভিযানে আরও বেশি কিছু প্রত্যাশা করছিলেন তারা। কিছুতেই কিছু হচ্ছিল না, এমনি এক চমৎকার রৌদ্র‌জ্জ্বল সকালে আফার অঞ্চলের হাডারে ২৪ নভেম্বর খুঁজে পেলেন একটি হাড়। দেখেই বোঝা যাচ্ছিল এ হাড় মানুষের হাতের হাড়। খুশিতে লাফিয়ে উঠলো পুরো দল। একে একে খুঁজে পেলেন একটি সম্পূর্ণ কঙ্কালের প্রায় ৪০ শতাংশ।

লুসির মস্তিস্ক দেখতে কিছুটা ভিন্ন রকম, চোয়ালের হাড় সামনের দিকে বর্ধিত ছবি insightsunspoken

পরবর্তীতে গবেষণায় পাওয়া যায় এ সব হাড় একই ব্যক্তির। সেদিন রাতে জমকালো এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিলো ক্যাম্পে। বিশাল সেই ভোজের এক সময় বাজছিলো “লুসি ইন দি স্কাই উইথ ডায়মন্ড”। সে সময় একজন হঠাৎ করে প্রাপ্ত কঙ্কালকে লুসি বলে সম্বোধন করলো। এর পর সবাই একই নামে ডাকা শুরু করলো কঙ্কালটিকে, এভাবেই লুসি নামটি প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেল।

আধুনিক মানুষ হোমো সেপিয়েন্সের সাথে ও এপের মধ্যবর্তী বিবর্তনের অংশ বলে মনে করা হয় যাকে অস্ট্রালোপিথেকাস আফারেনেসিস বলা হয়। লুসির আবিস্কারের সাথে সাথে কয়েকটি খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উন্মোচিত হয়। যার একটি হচ্ছে লুসির মগজের আকৃতি। বানরের তিনগুন আকৃতির ছোট্ট মগজ শিরদাঁড়ার সাথে যুক্ত দেখে বোঝা যাচ্ছে মানুষের বর্তমান আকারের মগজে পৌঁছানোর অনেক আগে থেকেই দু’পায়ে হাঁটার মতো অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছিল।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও লুসিকে দেখতে আসেন ২০১৫ সালে ছবি রয়টার্স

এর আগে বিজ্ঞানীরা কখনোই ধারণা করতে পারেননি যে এত ছোট মগজ নিয়ে কোনো প্রাণী হাঁটতে পারে। লুসিকে মানুষের সবচেয়ে প্রাচীন উত্তরসূরী ধারণা করে নিয়ে তাকে মানব প্রজাতির দাদী বলে আখ্যায়িত করা হয়। সারা বিশ্বেই তখন সাড়া পড়ে যায়, এমনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও লুসিকে দেখতে আসেন। যাক শেষ পর্যন্ত এভাবে নিজ চোখে আমার লুসিকে দেখার সৌভাগ্য হলো।

ফিচার ছবি লেখক

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

টাইগার হিল থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার শ্বাসরুদ্ধকর রূপ

সুখের শহর শিমলা…