নো ম্যান্স ল্যান্ডের মেঘ-পাহাড়ে ভালোবাসা

অরণ্য-অধরা আর মাধবী মিরিক লেক পায়ের তলায় রেখে যখন পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে চাইছিল, অধরার বড় ইচ্ছে হয়েছিল লেকের শান্ত-নীরব-স্বচ্ছ জলের কাছে, সবুজ গালিচায় আর কিছুক্ষণ বসে থাকে, হাতে হাত রেখে অরণ্যর। একটু বসে পাথরের বেঞ্চিতে, হিজলের ছায়ায়, চুপচাপ কান পেতে শুনুক একটু পাখিদের একান্ত গান। মিহি বাতাসে একটু জুড়াক প্রাণ।

কিন্তু অরণ্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লো পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার, মেঘ ছুঁয়ে দেখার, নীল আকাশে ডানা মেলার, কুয়াশায় ভিজে যাবার, মাতাল বাতাসে উড়ে যাবার, গহীন অরণ্য মাড়িয়ে মিরিকের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়ে নতুন একটা স্বপ্ন বোনার। অধরা চুপ করে রইলো অরণ্যর এই পাগলামি দেখে। সাথি হলো ওর। কিন্তু কথা দিতে হলো অরন্যকে। এরপর যখন আবার আসবে, তখন এত ছোটাছুটি করতে পারবে না, চুপচাপ হাত ধরে বসে থাকবে অধরার, ক্লান্ত লাগলে কাঁধে মাথা রেখে, হারাবে অধরার রেশমি কোমল চুলের আঁধারে, আর বসতে যদি নাও চায়, তবে ছুঁয়ে ছুঁয়ে ওরা হেটে বেড়াবে কোনো এক অরণ্যে অরণ্যে আচ্ছাদিত নিরালায়। সেবার আর পাহাড় নয় কোনো কিছুতেই। কারণ পাহাড়কে কাছে পেলে আর চোখে দেখলে অরণ্যকে আর স্থির রাখা যায় না! পাহাড়ের কাছে গেলে অরণ্য হয়ে ওঠে অবাধ্য, অশান্ত, উন্মাদ!

মেঘে পাহাড়ে মিতালী। ছবিঃ লেখক 

কথা দিল অরণ্য, ছুঁয়ে অধরার কপোল।

তবে কোথায় যাবে সেবার? অরণ্যর জিজ্ঞাসা অধরার কাছে?

অধরা ভাবছে কোথায় যাবে এরপর অরণ্য এলে? ভাবছিল অরণ্যও, সমাধান দিল এতক্ষণ অরণ্য আর অধরার কথা চুপচাপ শুনে যাওয়া মাধবী!

কেন এরপর এলে ডুয়ার্স যাবে? অরণ্য আর অধরার দিকে তাকিয়ে। আর তাছাড়া অরণ্য তুমি নিজেই তো এবার যেতে চেয়েছিলে ডুয়ার্সে? সময় কম ছিল বলে তোমাকে এখানে নিয়ে এলাম। এরপর নিশ্চয়ই এত কম সময়ের জন্য আসবে না? কী বলো?

ও হ্যাঁ, তাই তো! অধরার জিজ্ঞাসা, তাকিয়ে অরণ্যর দিকে।

হ্যাঁ ঠিক তাই, এবার এলে কোনো কথা না বলে, চুপচাপ তোমার হাত ধরে পা বাড়াবো ডুয়ার্সের গহীন অরণ্যে, জমকালো জঙ্গলে।

তবে এই কথাই রইলো কিন্তু, এরপর এলে আর পাহাড় নিয়ে পাগলামি করলে চলবে না। ধীরে ধীরে, হেঁটে হেঁটে আমরা দেখবো ডুয়ার্সের জঙ্গল, উপভোগ করবো ওই বিশাল জঙ্গলের রূপ-রস-গন্ধ আর হারিয়ে যাবো যেদিকে দুচোখ যায়! কী বলো অরণ্য? অধরা জানতে চায়।

হুম… তবে আর কোনো কথা নয়, চল এবার পাহাড়ে চুড়ায় উঠি?

আমাকে কি সাথে নিবি তোদের? ডুয়ার্সের জঙ্গলে? জানতে চায় মাধবী। নাকি শুধুই দুজন দুজনের হয়ে ডুয়ার্সে হারাবি?

আরে বলে কি, তোকে তো অবশ্যই নেব, আমাদের সাথে থাকতেই হবে! সে তুই না চাইলেও, তুই হবি আমাদের পাহারাদার, আমাদের প্রেমের পাহারাদার! অরণ্য আর অধরার বাঁধভাঙা ভালোবাসার পাহারাদার! অধরার উত্তর।

মিরিকের পাহাড়ে। ছবিঃ লেখক 

তবে চল এবার আর দেরি না করে অরণ্যর পাহাড় চূড়ায় যাওয়া যাক……

সবার আগে মাধবী, মাঝে অরণ্য আর অরণ্যর হাতে হাত রেখে অধরা, হেঁটে চলেছে ওরা তিনজন। সারা সকাল ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে পিচ্ছিল হয়ে থাকা মিরিক লেকের কোল ঘেঁষে, ধীরে ধীরে। বামে মিরিক লেক, ডানের পাহাড়ের বুক জুড়ে পাইনের অরণ্য, আর ঘন বনভূমি পাহাড়ের পা জুড়ে! পাখিদের গান, রঙিন পাখিদের ওড়াউড়ি, কাঠ বিড়ালির ছোটাছুটি, বুনো ফুলের সৌরভ, বানরের বাঁদরামি, এই সবের মাঝে চলছে এক হাতে ক্লিক ক্লিক ক্লিক। লেকের একেবারে শেষ সীমানায় এসে থামলো ওরা। লেকের সমতলের রাস্তা শেষ। এবার পাহাড়ের গা বেয়ে উঠতে হবে, কিন্তু কোন পথে যাবে? সামনে পথ দেখা যাচ্ছে তিনটি। একটি একটু উঠে বামে চলে গেছে, একটি সোজা উপরের দিকে, আর একটি উঠে ডান দিকে। তিনটি রাস্তাই একই জায়গা থেকে তিন ভাগে ভাগ হয়ে তিন দিকে চলে গেছে।

সমাধান মাধবী-ই দিল সবার আগে। আচ্ছা আগে ওই তিন পথের মাঝে যাই, তারপর কাউকে নাহয় জিজ্ঞাসা করা যাবে যে কোন পথে গেলে সুইস কটেজ আর পাহাড়ের চূড়ার হেলিপ্যাডে পৌঁছানো যাবে। কি বল?

মিরিকের মায়াবী পথ। ছবিঃ লেখক 

হ্যাঁ তাই, অরণ্যর উত্তর অধরার চোখে চোখ রেখে। অধরার সম্মতি। এগিয়ে চলল ওরা… পাহাড়ের মাঝে রাস্তার কাছে। পাহাড়ে উঠতে উঠতেই ওরা পেয়ে গেল স্থানীয় একজনকে। তার কাছ থেকে অরণ্য জেনে নিল চুড়ায় ওঠার রাস্তাটা। উপরে উঠে যে রাস্তাটা ডানে চলে গেছে, ওটাই একটু এগিয়ে আবার বামে উপরের দিকে উঠে গেছে। পুরো রাস্তায় ওঠার জন্য পাথর বিছিয়ে সরু রাস্তা করা হয়েছে। সেই রাস্তা ধরে এগোলেই ওরা পৌঁঁছে যাবে, মিরিকের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়ের চূড়ায়। সুইস কটেজ আর হেলিপ্যাডে।

ওরা এবার উঠতে লাগলো সেই দেখানো পথ বেয়ে, পাহাড়ের গায়ে গায়ে বিছিয়ে দেয়া পাথরের ছোট্ট, মিহি আর নান্দনিক রাস্তা ধরে। দুই পাশে ঘন জঙ্গল, লতায়-পাতায় জড়িয়ে রাখা পাথুরে রাস্তা, সকালের বৃষ্টি জমে থাকা গাছে গাছে, লতায়-পাতায় ঝরে পড়ছে ওদের গায়ে, ভিজিয়ে দিচ্ছে ওদের কারণে অকারণে পেয়ে বয়ে যাওয়া বাতাসের ছোঁয়া। সামনে মাধবী, মাঝে অরণ্য আর অরণ্যর হাত ধরে অধরা পাহাড়ে উঠে চলেছে।

বেশ কিছুটা উঠে ওরা থামলো একটু, হাঁপিয়ে গেছে ওরা তিনজনই। একটু থেমে জিরিয়ে নেবে তাই। একটু ফাঁকা জায়গা দেখে বসলো ওরা তিনজন। যেখান থেকে দূরে দেখা যাচ্ছে নিরীহ-নিশ্চুপ আর নির্মল মিরিক লেককে। লেকের মাঝে পিঁপড়ার মতো বয়ে চলেছে ছোট ছোট বোট। ঠিক যেন, পুকুরে কাগজের নৌকার বাতাসে হেলেদুলে চলা। বেশ কিছুক্ষণ বসে ওরা আবার উঠতে শুরু করলো পাহাড়ের চূড়ায়।

সুইস কটেজ মিরিক। ছবিঃ লেখক 

প্রায় ৩০ মিনিট পাহাড় চড়ার পরে ওরা দেখতে পেল, পাহাড়ের পিঠেই কে বা কারা যেন বিশাল দেয়াল দিয়ে আটকে রেখেছে কোনো কিছু। অবাক হলো খুব। এই পাহাড় চুড়ায় আবার দেয়াল কিসের? এবার পাহাড়ের দেয়ালে ঘেঁষে, মাটির ক্ষীণ পথ ধরে ওরা সামনের দিকে যাচ্ছে। মাঝে অরণ্য, মাধবী আর অধরা দুইজনই তাদের দুই হাত দিয়ে দিয়েছে অরণ্যর কিছুটা শক্ত আর নির্ভর দুই হাতের কাছে। হেঁটে চলেছে তিনজন।

পাহাড়ের দেয়াল ঘেঁষে কিছুদূর যেতেই চোখে পড়লো একটা লোহার গেট। বেশ পুরনো এবং বড় তালা লাগানো। গেটের ফাঁকে চোখ রেখে দেখা গেল সুন্দর সাজানো বাগান, নানা রঙের ফুটে থাকা ফুল, দারুণ কারুকাজের পাথরের সিঁড়ি, আর কিছু দূরে লাল-লাল কুটির। চমকে গেল ওরা তিনজনই, এই পাহাড়ের চূড়ায় এমন নান্দনিকতা দেখে। দ্রুত পা বাড়ালো ওরা এই চমৎকার জায়গাটা আরও কাছ থেকে দেখবে বলে।

আরও প্রায় ১০ মিনিট হাঁটার পরে ওরা পেল মিরিকের পাহাড়ের পরিচিত পীচ ঢালা রাস্তা। সেই রাস্তা ধরে একটু নেমে আবার একটু উঠেই ওরা পেয়ে গেল মিরিকের পাহাড় চুড়ায় অবস্থিত বহুকাল পুরনো, চমৎকার কারুকার্যতায় খচিত, অসম্ভব সুন্দর, মনোমুগ্ধকর এক কটেজের দেখা। উপরে স্বচ্ছ নীল আকাশ, সাদা মেঘের ভেলার সাজানো যে আকাশ, নিচে সবুজে সবুজে ছড়ানো প্রকৃতির হাতছানি, নানা রঙের পাহাড়ি ফুলে ফুলে রঙিন চারিদিক আর তার মাঝে টকটকে লাল রঙের কাপড় জড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সুইস কটেজ।

অরণ্যের পথে। ছবিঃ লেখক 

একদম পাহাড়ের চূড়ায়। অসম্ভব সুন্দর আর ছেড়ে আসতে মন চায়না এমন দারুণ মুগ্ধতা ছড়ানো একটি জায়গা। কটেজের বারান্দা, পাশের সবুজ লন আর লোহার বেঞ্চিতে বসে বসেই দেখা যায়, নিচের পাহাড়ের বুকে জল জমে তৈরি হওয়া মিরিক লেক। বসে ছিল ওরা বেশ কিছুক্ষণ। ছবি তুলল অনেক অনেক। এরপর হেলিপ্যাডে যাবার সময় হয়ে এলো। অধরাকে আবার ফিরতে হবে বিকেলের মধ্যেই। তাই তাড়া আছে কিছুটা।

এবার সুইস কটেজ হাতের ডানে রেখে, পাহাড়ের পীচ ঢালা মিহি পথ ধরে যেতে থাকলো পাহাড়ের চূড়ায়, হেলিপ্যাডের দিকে। এক দৌড়ে যেন উঠে গেল ওরা, পাহাড়ের একেবারে চূড়ায়। থমকে গেল তিনজনই, দেখে ওদের ঘিরে ধরা, স্বাগত জানাতে অপেক্ষায় থাকা আর পাহাড়ের চূড়ায় ওঠা সার্থক করতে সাদা সাদা মেঘেদের দলকে!

দূর পাহাড়ের গায়ে-গায়ে জড়িয়ে থাকা সাদা মেঘ, সবুজ পাহাড়ের গায়ে সাদা মেঘের মাঝে রোদের আলো পড়ে নীল হয়ে গেছে চোখের সামনে শুয়ে-বসে আর বিশ্রামে কাটানো সহস্র পাহাড়। মিরিকের চুড়ায় যেন নীল পাহাড়ের মেলা বসেছিল! ছোঁয়া যাবে না যে নীল পাহাড়কে, ধরা যাবে না যে নীলকে, কেনা যাবে না যে নীল পাহাড়কে, শুধু দেখা যাবে, ভাবা যাবে আর যাবে অনুভব করা, সাদা মেঘে-সবুজ চা বাগানে, সূর্যের আলো মিশিয়ে সাজানো শত-সহস্র নীল পাহাড়কে।

পাহাড়ের চূড়া থেকে বর্ণীল বাড়ি। ছবিঃ লেখক 

সেই সবুজে-সাদায়-নীলে-আর সূর্যের রঙধনু খেলায় হারিয়ে গিয়েছিল অরণ্য-অধরা আর মাধবীও। লোহার বেঞ্চে বসে গল্পে-কথায় ওরা অপেক্ষা করছিল, যদি মেঘ সরে গিয়ে দেখা দেয়, দুর্লভ কাঞ্চনজঙ্ঘা! যদি ভেসে ওঠে এক ফালি বরফে মোড়ানো বর্ণিল কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়া! সেই আশায়-প্রত্যাশায়, হারাতে আর ভেসে যেতে অন্যরকম এক ভালোবাসায় ওরা তিনজন অরণ্য-অধরা আর মাধবী একই সাথে গেয়ে উঠেছিল।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

হিম হিম শীতের হিমেল হাওয়ায় হিমাচল রিসোর্টে একদিন

ধ্বংসের অপেক্ষায় নকিপুর জমিদার বাড়ি