অ্যানিমেশনের জগতে সত্য ভ্রমণ!

সিনেমা দেখা যেন ঘরে বসেই বিশ্ব ভ্রমণ। এই ভ্রমণের সঙ্গী হিসেবে আপনি যে কাউকেই বেছে নিতে পারেন। সঙ্গী হতে পারে আপনার পরিবার, পাশের বন্ধুটি কিংবা বিশেষ কেউ। তাদের সঙ্গে কিংবা একাকী সিনেমার রঙিন পথে ধরে চলে যেতে পারেন দেশ থেকে দেশান্তরে। ইচ্ছে করলেই চড়ে বসতে পারেন আইফেল টাওয়ারে, পারেন সাগরের অতলে সামুদ্রিক কচ্ছপের সঙ্গে ডুব দিতে কিংবা তুলতুলে পাণ্ডার পাশে বসে নুডলস খেতে। আজ কিছু অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্রের বাস্তব স্থান সম্পর্কে জানাবো যা হয়ে উঠতে পারে আপনার ভ্রমণের গন্তব্য।

রাজকন্যা মোয়ানার দ্বীপে

দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে ছোট্ট দ্বীপ মতুনুই। দ্বীপে একবার মাউই নামের এক উপদেবতার অপকর্মে দুর্যোগ নেমে আসে। সেই দ্বীপের রাজকন্যা মোয়ানা দ্বীপবাসীদের রক্ষা করে তাঁর পরিবারের জন্য সম্মান অর্জন করতে এগিয়ে আসেন। চলচ্চিত্র পরিচালক রন ক্লিমেন্টস ও জন মুস্কারের বিখ্যাত অ্যানিমেটেড সিনেমা মোয়ানার গল্প এভাবেই এগিয়েছে।
চলচ্চিত্রটির লোকেশন নির্ধারণ করতে পরিচালকেরা বেশ ঘটা করে এক ভ্রমণ অভিযানে বেড়িয়েছিলেন। ফিজি, সামোয়া, তাহিতি, বোরা বোরা এমনকি নিউজিল্যান্ডেও তাঁরা লোকেশন রেকি করেছেন। অবশেষে কল্পকাহিনীটির সেট নির্মাণ করতে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের ছোট্ট দ্বীপ মতুনুইকে তাঁরা আদর্শ বলে বিবেচনা করেন।
মতুনুইয়ের নীল অগভীর হ্রদ সকলকেই বিস্মিত করে। এছাড়া বোরা বোরা দ্বীপের মাউন্ট ওতেমানু মোয়ানা কল্পকাহিনীটির স্মৃতি স্মারক হয়ে আছে। দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় আতিথেয়তা পেতে পরিবার, প্রিয়জন কিংবা একাকী ভ্রমণের জন্য ফিজি ও মতুনুই চমৎকার স্থান। আর এখনো ওয়াহুর হাওয়াই দ্বীপের ডিজনি রিসোর্টে রাজকুমারী মোয়ানা গল্প শোনাতে রয়েছে আপনারই অপেক্ষায়। 

মোয়ানার দ্বীপ মনুতুইতে, ছবি সূত্রঃ lonelyplanet.com

হ্যাপি ফিটের পেঙ্গুইনের সঙ্গে নাচতে

পেঙ্গুইন সাম্রাজ্যের শিশু অধিপতি তাঁর ভালোবাসাকে খুঁজে পেতে বরফাচ্ছন্ন এন্টার্কটিকাতে বেড়িয়ে পড়লেন। চলচ্চিত্র হ্যাপি ফিটের কাহিনী এভাবেই এগিয়ে চলে। শিশুদের জন্য পরিবেশ বিশেষত এন্টার্কটিকা ও সেখানকার জীববৈচিত্র রক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে হ্যাপি ফ্লিট। চলচ্চিত্রটি নির্মাণের পূর্বে এক গবেষক দল এন্টার্কটিকার রস আইল্যান্ড, পোর্ট লকরয়, পিটার ম্যান আইল্যান্ডে গিয়েছিলেন। গবেষণার এক পর্যায়ে তাঁরা শুধু মাত্র একটি পেঙ্গুইনদের দ্বীপ খুঁজে পেয়েছিলেন, যেন এক পেঙ্গুইন সাম্রাজ্য!
‘হ্যাপি ফিট’ চলচ্চিত্রটি পেঙ্গুইনদের এক বিশেষ ধরনের নাচ ‘ট্যাপ ড্যান্সের’ জন্য বিখ্যাত। পেঙ্গুইনদের সঙ্গে নাচে পা মেলাতে এন্টার্কটিকা ঘুরে আসতে পারেন। দুঃসাহসিক অভিযাত্রীদের জন্য এন্টার্কটিকা সব সময়ই আদর্শ গন্তব্য।

পেঙ্গুইনের সাম্রাজ্য এন্টার্কটিকাতে, ছবি সূত্রঃ lonelyplanet.com

মুভ ইট টু মাদাগাস্কার

দক্ষিণ-পূর্ব আফ্রিকার সুবিশাল দ্বীপরাষ্ট্র মাদাগাস্কার। এখানে রয়েছে হাজারো প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণীকুল। মাদাগাস্কার নামের একটি জনপ্রিয় অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রও রয়েছে। চলচ্চিত্রটির কাস্টিং বেশ মজার। মাদাগাস্কারের প্রধান চরিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে এলেক্স নামের একটি সিংহ, জেব্রা মার্টি, জিরাফ মেলম্যান এবং গ্লোরিয়া নামের একটি জলহস্তী। যেন নিউ ইয়র্কের কেন্দ্রীয় চিড়িয়াখানার প্রাণীদের আফ্রিকা অভিযানে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে।

মাদাগাস্কারে রয়েছে একশ’র বেশি প্রজাতির লেমুর। এই লেমুরদের উপর নির্ভর করে নির্মিত হয়েছিল চলচ্চিত্র ‘অল হেইল কিং জ্যুলিয়ান’। মাদাগাস্কারের প্রায় ৮০টি প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী এবং এমন অনেক বন্য জীববৈচিত্র রয়েছে যা পৃথিবীর আর কোথাও নেই। এখানকার লেমুরগুলোর সঙ্গে আপনি সাক্ষাৎ করতে পারবেন। তারা মানুষের সান্নিধ্যে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে। সেই সঙ্গে এখানকার বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র সংরক্ষণের গভীর শিক্ষা শিশুসহ সকল বয়সের মানুষকেই আলোকিত করে। তাই মাদাগাস্কার শিশুদের জন্য চমৎকার শিক্ষণীয় স্থান।

মাদাগাস্কারের জীব বৈচিত্র, ছবি সূত্রঃ lonelyplanet.com

চলুন নিমোর সন্ধানে

অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ। এখানে ফাইন্ডিং নিমো চলচ্চিত্রের তারকারা সাগরের অতলে থাকেন। চাইলে আপনিও তাঁদের সঙ্গে সাঁতার কাটতে পারেন। খুঁজতে পারেন নিমোকে। নিমোকে খুঁজতে অভিযান শুরু করতে পারেন হ্যামিল্টন আইল্যান্ড কিংবা লেডি ইলিয়ট আইল্যান্ড থেকে। এখানে শিশুরা ফাইন্ডিং নিমোর চরিত্রদের বাস্তবে সনাক্ত করতে পারবে। কোরাল সাগরটিতে ক্লাউন ফিস সহ রয়েছে সি হর্স, লম্বা নাকওয়ালা বাটারফ্লাই ফিস, স্পটেড ইগল রেইস, বৃহৎ ধবল শার্ক, তিমি এবং জেলিফিসের আবাস। এখানে আপনি বিখ্যাত সামুদ্রিক কচ্ছপেরও দেখা পাবেন।

জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি চাইলে ঘুরে আসতে পারেন দক্ষিণ সিডনিতে। নিমোকে এখানেই দাঁতের চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সিডনির হার্বার ব্রিজে হেঁটে বেড়াতে পারেন, পারেন পরিবার পরিজনদের নিয়ে সিডনি অপেরা হাউজের কোনো শো দেখতে। সিডনির বিস্তীর্ণ পোতাশ্রয় উপভোগ করতে ফেরিতে করেও ঘুরে বেড়াতে পারেন।

নিমোর সন্ধানে, ছবি সূত্রঃ lonelyplanet.com 

মাস্টার পো’র দেশে

বৃহদাকার পাণ্ডার সন্ধানে পাড়ি জমাতে হবে চীন দেশে। কুংফু পাণ্ডা চলচ্চিত্রটিও চীনের কাহিনী নির্ভর। ঘুরে আসতে পারেন সেংডু রিসার্চ বেইস অব জায়ান্ট পাণ্ডা ব্রিডিং সেন্টারে। এখানে অনেক হৃষ্টপুষ্ট ও তুলতুলে বড় আকৃতির পাণ্ডাদের দেখা মিলবে। এদের দেখেই উৎসাহিতে হয়ে ‘মাস্টার পো’ চরিত্রটি নির্মাণ করা হয়েছিল। মাস্টার পো খুবই অলস একজন পাণ্ডা। ছোটবেলায় তিনি হারিয়ে গিয়েছিলেন। এক রাঁধুনি হাসের কাছে তিনি বেড়ে ওঠেন। অপ্রত্যাশিতভাবে পো কুংফু ট্রেনিং এর মাধ্যমে মাস্টার পো হয়ে ওঠেন এবং প্রাচীন ভবিষ্যতবাণী পূর্ণ করেন।

কুংফু পাণ্ডা চলচ্চিত্রের পাণ্ডাদের গ্রাম দেখতে হলে যেতে হবে কুইংসেং পর্বতের কাছের একটি বাঁশের বনে। এখানকার সবুজ ল্যান্ডস্কেপে আপনি সিনেমার পাণ্ডাদের গ্রামটি খুঁজে পাবেন। তবে এখানে কোনো পাণ্ডার দেখা পাবেন না। এখানে স্থানীয় ড্যাংড্যাং নুডলস, টফু এবং গরম চা এর স্বাদ নিতে ভুলবেন না।

চীনের বৃহদাকার পান্ডা, ছবি সূত্রঃ lonelyplanet.com

পারলৌকিক চিত্রপটে

অ্যানিমেটররা ডিজনির কোকো চলচ্চিত্রটি নির্মাণের আগে বেশ কয়েক দফায় মেক্সিকো ভ্রমণে গিয়েছেন। সেখানে তাঁরা পরিবার ও ব্যক্তির স্বপ্ন অনুসরণের গুরুত্ব উপলব্ধি করার বিষয়ে গবেষণা করেছেন। ছবির মতো উপনিবেশিক শহর মিকোয়াকান অঞ্চলের সান্তা ফী লা লাগুনা ছিলো রিভেরা পরিবারের আদি বাসস্থান।

প্যালাসিও দে কররেস ডি মেক্সিকো, ছবি সূত্রঃ lonelyplanet.com

কোকো চলচ্চিত্রে বর্ণিত মৃতদের শহরের ল্যান্ডস্কেপ প্রত্যক্ষ করতে যেতে হবে মেক্সিকোর কেন্দ্রে। চলচ্চিত্রে প্রদর্শিত প্যালাসিও দে কররেস ডি মেক্সিকো ১৯০৭ সালে দেশটির প্রধান পোস্ট অফিস হিসেবে খোলা হয়েছিল। এখানকার দালানকোঠা অ্যানিমেটরদের কাজে কতটা প্রভাব ফেলেছে, তা প্রথম দর্শনেই বুঝতে পারবেন দর্শনার্থীরা

ফিচার ইমেজ- aliexpress.com 

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ইথিওপিয়া-কাঁচা মাংস যেখানে সবচেয়ে জনপ্রিয় খাবার

শিমলা-মানালির স্বপ্নিল পথে পথে