ইন্দোনেশিয়ার একটি সক্রিয় আগ্নেয়গিরি: মাউন্ট আগুং

বালি দ্বীপের পূর্বাঞ্চলে সাগরপৃষ্ঠ থেকে প্রায় তিন হাজার মিটার উঁচুতে মাউন্ট আগুং অবস্থিত। বালির প্রধান পর্যটন এলাকা কুটা ও সেমিনায়ক থেকে পর্বতটি প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে। এটি ইন্দোনেশিয়ার প্রায় ১৩০টি সক্রিয় আগ্নেয়গিরির মধ্যে অন্যতম। এটি কিন্তামানিতে অবস্থিত। এখানে ভ্রমণ পিয়াসুরা মাউন্ট বাতুর নামক পাহাড়ে ট্রেকিং করে। মাউন্ট বাতুরের বিভিন্ন দিকে আগ্নেয়গিরির লাভা বের হয় মাঝে মধ্যেই। সেই সাথে অনেকগুলো ছোট-বড় গর্ত আছে যেগুলো দিয়ে আগ্নেয়গিরির উত্তাপ বের হয়। আগ্নেয়গিরির এই উত্তাপ খুব কাছ থেকে পরখ করে দেখা যায়। একেবারে চূড়ায় উঠতে আড়াই ঘণ্টার মতোন সময় লাগে। মোটামুটি খাড়াই বেয়ে উঠতে হয় টানা। তাই যারা অল্প হাঁটাহাটি করলেই হাঁপিয়ে যান, তাদের বেশ কষ্ট হয়ে যাবে চূড়ায় উঠতে।

জীবন্ত আগ্নেয়গিরি মাউন্ট বাতুর হাইকিং এর জন্য অন্যতম পরিচিত একটা নাম। সোর্স: Bamba Experience

বেশিরভাগ ট্রেকার রাত একটায় বেরিয়ে পড়ে। মধ্যরাতে বের হবার কারণ হলো, এতে ট্রেকিং করে বাতুরের চূড়ায় উঠে সূর্যোদয় দেখা যায়। আগ্নেয়গিরি পর্বতের সূর্যোদয়- সে এক চমৎকার দৃশ্য। শোনা যায়, ট্রেকাররা মাউন্টেনের কাছাকাছি গিয়ে বাতুর লেকের গরম পানিতে ডিম সেদ্ধ করে সকালের নাস্তা সেরে ফেলে।
বেশিরভাগ ট্রেকার মধ্যরাতে বেরিয়ে পড়ে পর্বতারোহণ করার জন্য। সোর্স: Noosa Bali Tour

জীবন্ত আগ্নেয়গিরি মাউন্ট বাতুর তাই হাইকিংয়ের জন্য অন্যতম পরিচিত একটা নাম। আবার অনেকের হাইকিং শুরু হয় রাত ১১টা থেকে। যদি আপনারা কোনো এজেন্সির সাথে ট্রেকিংয়ের ব্যাপারে ডিল করেন, তাহলে তারা প্রথমে আপনাকে হোটেল থেকে বেইস ক্যাম্পে নিয়ে যাবে। এরপর বেইস ক্যাম্প থেকে ঘুটঘুটে অন্ধকারে শুধুমাত্র টর্চলাইটের আলোতে শুরু হয় হাইকিং। ওই সময় তাপমাত্রা ১৪/১৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস থাকে। তাই সাথে করে গরম কাপড় নিয়ে যাওয়া উচিৎ। প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টার হাইকিং শেষে আপনি চলে যাবেন মাউন্ট বাতুরের শীর্ষে। ক্রেটার থেকে সবসময় হালকা ধোঁয়া বের হতে দেখা যায়। এরপর মেঘের ফাঁক দিয়ে সূর্যমামা অল্প অল্প করে উঁকি দেয়া শুরু করবে। সূর্যোদয় দেখার পর আড়াই ঘণ্টা  হাইকিংয়ের কষ্ট পুরোপুরি উবে যাবে। অসাধারণ দৃশ্য। জীবন কিছুক্ষণের জন্য হলেও স্বর্গীয় মনে হবে।
আগ্নেয়গিরি পর্বতের সূর্যোদয়ের আগমুহূর্ত – সে এক চমৎকার মোহনিয়া দৃশ্য। সোর্স: Intrepid Travel

বালির সবচেয়ে উঁচু এই পর্বতে স্বাভাবিকভাবেই বোনাস হিসেবে পাওয়া যায় মেঘেদের অবাধ বিচরণ। পর্বতটি দেখতে কিছুটা জাপানের ফুজি মাউন্টেইনের মতো। মাউন্ট বাতুর এক ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি, ১৮০০ সাল থেকে ২৪ বার তার ঘুম ভেঙেছে, বার বার অগ্ন্যুৎপাতের ফলে সে হয়েছে অশান্ত। শেষ অগ্ন্যুৎপাত হয় ১৯৭০ সালে। পাহাড়ের কোল বেয়ে অনেকটা জায়গা জুড়ে জমে যাওয়া লাভা অবশ্যই দৃষ্টি আকর্ষণ করবে।
বালি দ্বীপের সবচেয়ে উঁচু পর্বত মাউন্ট আগুং। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সুপ্ত এই আগ্নেয়গিরির আশপাশের এলাকায় শতবার কম্পন অনুভূত হয়েছে। এছাড়া পর্বত পৃষ্ঠে লাভার নজির দেখা গিয়েছে। এই ধরনের অবস্থা দেখা দিলে পর্বতের চারপাশে বারো কিলোমিটার এলাকা জুড়ে মানুষের অবস্থান, প্রবেশ ও তৎপরতা নিষিদ্ধ করা হয়। যেকোনো সময় জেগে উঠতে পারে মাউন্ট আগুং, এই সম্ভাবনায় মাঝেমধ্যেই বালি ভ্রমণে চূড়ান্ত সতর্কতা জারি করা হয়। সক্রিয় ঐ আগ্নেয়গিরির কাছাকাছি এলাকার বাড়িগুলো থেকে তখন সরিয়ে নেয়া হয় বাসিন্দাদের। ১৯৬৩ সালে মাউন্ট আগুংয়ের লাভায় এক হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছিলেন।
এই সূর্যোদয় দেখার জন্যই বেশিরভাগ ট্রেকার রাত একটায় বেরিয়ে পড়ে আগ্নেয় পর্বতের উদ্দেশ্যে। সোর্স: bookmundi.com

মাউন্ট বাতুরের পাদদেশে লেক বাতুর বালির সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক হ্রদ। এর জলেই সিঞ্চিত হয় বালির বেশির ভাগ ধানখেত। রাইস টেরেসগুলো সেচ দেওয়া হয় এই হ্রদ থেকে। যেহেতু বৃষ্টি আপুর বাবা-মা আছেন সাথে, তাই তারা ট্রেকিংয়ের সাহস করেনি। গাড়ি যতই এগিয়ে যাচ্ছে, এক্সাইটমেন্ট বাড়ছে। জীবন্ত আগ্নেয়গিরি দেখতে যাচ্ছে! উত্তেজনা হওয়াই তো স্বাভাবিক।
গাড়ি ক্রমশ উপরে উঠছিল আর বৃষ্টি বাড়ছিল। মনে হচ্ছিল যেন মেঘের সমুদ্রে ঢুকে যাচ্ছে। একদম সামনে নিয়ে যেতে যেতে বৃষ্টি আপুর মুখ হা হয়ে যাচ্ছিল বিস্ময়ে। এত সুন্দর উঁচু-নিচু রাস্তা, মুভির সিনের মতোন।
মাউন্ট বাতুরের সামনে সত্যি সত্যিই মেঘ সমুদ্র ভেসে বেড়ায়। সোর্স: আনিকা তাবাসসুম বৃষ্টি

বৃষ্টি আপুর হাইট ফোবিয়া নেই, তবু রাস্তার পাশের ছোট্ট রেলিংয়ের ওপারে গহীন খাদ দেখে বুক কেঁপে উঠল। মাউন্ট বাতুরের সামনে যখন গাড়ি থামল, তখন ওরা সত্যিই মেঘের ভেতরে। এ এক অবর্ণনীয় স্বর্গীয় অনুভূতি।
লেক বাতুরের এরিয়াল ভিউ খুব সুন্দর। পাহাড় ও লেকের শোভা আরও ভালোভাবে আস্বাদনের জন্য এর টিলার মাথায় ছোট ছোট অনেক রেস্তোরাঁ রয়েছে। যেখানে বসে হ্রদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সহজেই উপভোগ করা যায়। এখানে আপুদের ভ্রমণ প্যাকেজের মধ্যে ব্যুফে লাঞ্চ ছিল। প্রতিজনে ৫ usd. এখানকার খাবার বেশ মজা। মেঘের ভেতর ডুবে আগ্নেয়গিরি দেখতে দেখতে খাওয়া।
রেস্টুরেন্টের সামনে চমৎকার একটি মূর্তি। সোর্স: আনিকা তাবাসসুম বৃষ্টি

এই আগ্নেয়গিরি, পর্বতের উপরের হ্রদ আপুর জীবনে দেখা সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যগুলোর মধ্যে অন্যতম। এমন অসহ্য সুন্দরের সামনে আসলেই বোধহয় মরে যেতে ইচ্ছে করে।
আগ্নেয়গিরি থেকে ফেরার পথে ওরা স্থানীয় বাজার থেকে ফল কিনেছিল। এখানে কলাও কেজিদরে বিক্রি হয়। এক কেজি কলা, এক কেজি আম, এক কেজি রামবুটান আর এক কেজি কমলা কেনা হলো। খরচ পড়লো ৬৫০ টাকার মতো। ইন্দোনেশিয়ার ফল খুবই টাটকা আর সুস্বাদু।
ফিচার ইমেজ: Intrepid Travel

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চকলেট-চা-কফি ও মশলার শহর মুন্নারে

যে জাদুঘরটি ব্যর্থ প্রেম স্মরণ করে