ভারতে নেপালি ও কলকাতার মানুষের জীবন

আমরা ৯০ দশকের জেনারেশন কিন্তু ভাগ্যবান। বুঝতে শেখার সঙ্গে সঙ্গে নতুন শতক পেয়েছি। শতক থেকে শতকের পরিবর্তনগুলো দেখেছি। আমি এই পরিবর্তনগুলো দেখেছি ভারতে। নির্দিষ্ট করে বললে কার্শিয়ংয়ে। তখন ওখানে একটা বোর্ডিং স্কুলে আমার পাঠ চলছিল। সেই স্কুলের পাঠ্যসূচী থেকে আদতে কী শিখেছি তা আজ পর্যন্ত ঠাওর করতে পারিনি।

তবে কোমল শিশু হৃদয়ে গেঁথে যাওয়া সেই বোর্ডিং স্কুল আর ভিনদেশে পাহাড়ি জীবনধারা আমাকে আজো সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। কার্শিয়ং ছাড়াও দার্জিলিং, শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়ি, কলকাতাসহ ভারতের আরো অনেক জায়গাতেই বিভিন্ন কাজে যাওয়া হয়েছে বার বার।

ভারতে পাঁচ থেকে ছয় মিলিয়ন নেপালি মানুষ আছে। এর বড় একটা অংশ থাকে শিলিগুড়ি – দার্জিলিং জেলাতে। এই নেপালিদের আমার কাছে সুপারম্যানের উত্তরাধিকারী মনে হয়। কারণ এদের পরিশ্রম করার আশ্চর্য ক্ষমতা। তারা সূর্য ওঠার আগেই ঘুম থেকে ওঠে। শিশু থেকে বৃদ্ধ সকলেই সকাল বেলা ব্যায়াম করে। ভোরে চা বাগানের পাশ দিয়ে হাঁটলে দেখা যায় সব স্কুল পড়ুয়া ছেলে মেয়ে থেকে শুরু করে বয়স্করা সকলেই ব্যায়াম করছে। আর স্কুলের শিক্ষার্থিরা নিজেদের বিশেষ ট্র্যাক স্যুট পরে জগিং করছে। এই ট্র্যাক স্যুট তাদের স্কুলের পরিচয় বহন করে।

সকালে ভারতীয় নেপালিদের শরীরচর্চা, ছবিঃ curvetube

ভারতীয় নেপালিরা কিন্তু শুধু শারীরিকভাবেই নয়, মানসিক দিক থেকেও খুব শক্তিশালী। এই অঞ্চলের নেপালিদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সেনা বাহিনীতে বিশেষ গোর্খা রেজিমেন্ট রয়েছে। আমাদের দেশের প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত জিমন্যাস্টরা যে সকল কসরত দেখিয়ে সকলকে অবাক করেন, সেখানে ঘরে ঘরে ছেলে মেয়েদের কাছে তা বাঁ হাতের খেল।

বাংলাদেশি পুরুষ মজুরেরা যেখানে মাথায় এক দফায় সর্বোচ্চ ৮-১০টা ইট বহন করতে পারে, সেখানে নেপালি নারী মজুরেরা কমপক্ষে ২০ থেকে ২৫টা ইট বিশেষ কায়দায় মাথার সঙ্গে বেঁধে পিঠে বহন করে। তবে প্রযুক্তির কল্যাণে মাথায় ইট বহন করার দৃশ্য এখন দুর্লভ।

পরিশ্রমী ভারতীয় নেপালি নারী, ছবিঃ The Himalayan Times 

আমি খেয়াল করেছি ভারতীয়রা টাকার মূল্য বাংলাদেশিদের থেকে ঢের বেশি বোঝে। আমরা যেখানে ভাংতি না থাকলে পুরো টাকা দিয়ে দেই, সেখানে ভারতীয়রা পয়সার হিসেবে লেনদেন করে। কেউ কাউকে এক পয়সা ছাড় দেবে না আবার বেশিও নেবে না। তারা উপার্জনের উৎসকে লালন করতে জানে।

আপনি সেখানে যাবেন, তারা যদি বোঝে আপনি তাদের সেবা গ্রহীতা তবে ধৈর্য ধরে আপনার সকল প্রশ্নের উত্তর দেবে। একবারের জন্য বিরক্তির ছাপটুকুও তাদের চেহারায় দেখবেন না।

ধৈর্যশীল অতিথিপরায়ন ভারতীয়, ছবিঃ trip advisor

ভারত আর বাংলাদেশের রাস্তার সংস্কৃতিতে দৃশ্যত মিল রয়েছে। সেই যানজট, কোলাহল, বাসে ঝুলে ঝুলে যাওয়া, অটো ওয়ালা, রিকশাওয়ালাদের মন মর্জি মতো চলা, ইচ্ছা মতো রিক্সা ভাড়া দাবী করা ইত্যাদি। তবে পার্থক্যও রয়েছে অনেক। বাসের কন্ডাকটরেরা আপনার কাছে এক পয়সা ভাড়াও বেশি নেবে না। হয়তো বেশি ভাড়ার জন্য গন্তব্যের কয়েক স্টপ পরে নামিয়ে দিতে পারে!

আমাদের দেশের মতো বাস, রিক্সা, অটোর ড্রাইভার – হেল্পারদের বকাবকি করতে পারবেন না। সেখানে এদের ইউনিয়ন খুবই শক্তিশালী। কথায় কথায় এরা ‘বন্ধ’ ডাকতে পারে। বন্ধ মানে হরতাল।

ভারতের যানজট, ছবিঃ টাইমস অব ইন্ডিয়া

কলকাতা, শিলিগুড়িতে হরতালের সময় একটা বিশেষ দৃশ্য দেখা যায়। ওই সময় নিজেদের ইচ্ছা মতোন যানবাহন চালানো যায় না। তখন সকল পাবলিক-প্রাইভেট লটের কোটা পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। কেননা নিরাপত্তার জন্য লটে লটে পুলিশি পাহারায় গাড়ি চলে। মানে এক লট গাড়ির সামনে ও পেছনে পুলিশের গাড়ি থাকে। পুলিশ আপনাকে নির্দিষ্ট দূরত্ব পর্যন্ত এগিয়ে দেবে, সেখান থেকে ওই এলাকার পুলিশের গাড়ি আপনার জন্য পথের নিরাপত্তার সঙ্গী হবে।

এছাড়া বাংলাদেশ আর ভারতের রিক্সাতে মজার একটা পার্থক্য রয়েছে। আমাদের দেশে যেখানে বেল ব্যবহার করা হয় ভারতে সেখানে বিশেষ কালো রঙের বাঁশি ব্যবহার করা হয়। এটা চাপলে প্যাঁ পোঁ শব্দ করে। এছাড়া কলকাতা শিলিগুড়িতে মানুষ এখনো ঠেলাতে চড়ে। এই ঠেলা কিন্তু আমাদের দেশের বাঁশের ঠেলাগাড়ি নয়। রিক্সার বসার অংশের সঙ্গে সংযুক্ত বাঁশ বা রড দিয়ে সামনে থেকে ঠেলাওয়ালা এই ঠেলা ঠেলে।

ভারতের রাস্তায় ঠেলাঃ passportsymphony

ধৈর্য যদি শিখতে হয় তবে ভারত বেশ। সেখানে সব রকম জনসেবার জন্য সবাই লাইনে দাঁড়ায়। বাসের টিকিট, ট্রেনের টিকিট, মুভির টিকিট, ব্যাংকের কাজ এহেন কোনো কাজ নেই যার জন্য লাইনে দাঁড়াতে হয় না। ট্রেনের টিকিটের জন্য যদি ৬০-৭০ জনের পেছনেও দাঁড়ান তাহলে আপনি মনে করতে পারেন ১০-১৫ মিনিটের মধ্যেই টিকিট পেয়ে যাবেন। আমার অভিজ্ঞতায় সেখানে কেউই লাইন ভেঙে সামনে যাওয়ার চেষ্টা করেনি। আমাদের দেশেও এই রীতিটি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

আমাদের দেশে যেমন বাস ভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থা কলকাতায় সেই ব্যবস্থা ট্রেন ভিত্তিক। আমাদের দেশের লোকাল বাসের মতো সেখানে লোকাল ট্রেনের ব্যবস্থা রয়েছে। এই ট্রেনগুলোতে ভিড় ঢাকার লোকাল বাসের থেকে বেশি বৈ কম নয়। ট্রেনে-বাসে যতই ভিড় থাকুক না কেন কলকাতা গেলে অনুরোধ না করা পর্যন্ত নিজের আসন ছেড়ে কাউকে বসতে বলবেন না। সে নারীই হোন কিংবা যত বয়স্কই হোক। এতে তারা অপমানিত বোধ করবে। শুধু বোধ করবে না আপনাকেও সেই অপমানের ভাগীদার করার সুযোগ ছাড়বে না। সঙ্গে শুনতে হতে পারে, ‘দাদা নিশ্চয় বাংলাদেশ থেকে এসছেন।’

কলকাতায় ট্রেনের ভেতরে, ছবিঃ  montrealgazettte 

ভারতে এত ভিড়ের মধ্যেও ট্রেনে টিকিট চেকের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে কখনো লোকাল ট্রেনে কিংবা স্টেশনে টিকিট চেক করতে দেখিনি। তারপরও একটা মানুষও যে টিকিট ছাড়া ট্রেনে ভ্রমণ করে না তার প্রমাণ টিকিটের জন্য হাজারো মানুষের সুদীর্ঘ লাইন। এই দীর্ঘ লাইনের দৃশ্য রেল স্টেশনগুলোতে প্রতিদিনই সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সব সময় দেখা যায়।

ট্রেনের টিকিটের জন্য লাইন, ছবিঃ indiatoday

ভারতের মানুষের জন্মগতভাবেই ইঞ্জিনিয়ারিং প্রবণতা রয়েছে। তারা অদ্ভুত সব কায়দায় সুবিধামতো যন্ত্রপাতির মডিফিকেশন করে। এছাড়া কিছু নষ্ট হলেও মেকারের কাছে নিয়ে যাওয়া দূরে থাক সে চিন্তাই করতে চায় না। নিজেরাই অদ্ভুত সব কায়দায় ঠিক করে ফেলে। একে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় ‘জুগাড়’ বা জোগাড়।

ভারতীয়দের ইঞ্জিনিয়ারিং, ছবিঃ passportsymphony

ভারতে জীবন যাপন আর ভ্রমণে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। সেখানে নাগরিকদের সকল সুযোগ সুবিধার জন্য এখন বিভিন্ন রকম কার্ড ব্যবস্থা চালু করা রয়েছে। এছাড়া এক জায়গা থেকে অন্য জায়গাতে ভ্রমণে মোবাইলে উচ্চ অংকে রোমিং বিল কাটা হয়। তাই দূরে ভ্রমণের সময় ভারতীয়রা ফোন বন্ধ রাখে। ভারতের ভেতরেই রেল পথে ভ্রমণ সপ্তাহ ব্যাপী দীর্ঘ হতে পারে।

ভারতীয়রা কিন্তু খুব মিশুক আর ঐক্যবদ্ধ। ট্রেনে বাসে যাতায়াতে তারা এক অন্যের সঙ্গে কথা না বলে থাকতে পারে না। এই আলোচনা পরিবার, ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক রাজনীতি পর্যন্ত গড়াতেও যেমন সময় লাগে না, তেমনি আবার এই আলোচনা থেকে দ্রুত বন্ধু হয়ে ওঠা মানুষটিকে ভুলে যেতেও তারা সময় নেয় না।

ট্রেনে তাসের আসর, ছবিঃ dailymirror

ভারতে কিন্তু বর্ণ বৈষম্য প্রকট। তার পরেও এত এত ধর্ম, শত শত সংস্কৃতি আজো পাশাপাশি টিকে আছে। তাদের মধ্যে সংঘাত আছে। আছে রাজনীতি। তার পরও জাতীয় যে কোনো ইস্যুতেই তারা এক জোট। ক্রিকেটকে তারা এক রকম পূজা করে। আশি ঊর্ধ্ব নারীকে ভারতীয় ক্রিকেট টিমের খারাপ দিনে বলতে শুনেছি, ‘দেশ হেরে যাচ্ছে তোরা এখনো খেলা দেখছিস। তোদের দেশপ্রেম কবে হবে!’

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কক্সবাজারের বার্মিজ মার্কেটের কথকতা

ঈদ ভ্রমণ: গ্রাম্য প্রকৃতির টানে অচেনা পথে হারিয়ে যাওয়ার গল্প