গোমুখ অভিযান: শেষ দেড় কিলোমিটার অথবা জীবন!

সামনে আর কোনো ফুট স্টেপ চোখে পড়ছে না। তবুও একটি পাথর ধরে, বাম পাটা আগের জায়গায় রেখেই ডান পা সামনে বাড়ালাম, তবে মাটি ছিল না সেটা! ছিল ঝুরো পাথরের স্তুপ! যে কারণে সাথে সাথে ডান পা হড়কে গেল! কয়েকশ ফুট নিচে প্রমত্তা গঙ্গার ছুটে চলা, বিশাল বিশাল পাথরের উপর আর নিচ দিয়ে। নিচে তাকিয়েই রক্ত হিম হয়ে গেল নিমেষেই!

যে পাথরটি ধরেছিলাম সেটাও নড়বড় করছে মনে হলো যেন! কোনো রকমে সেই পাথরটি ধরে ডান পাটা অন্য একটি জায়গায় রেখে অন্য পাথর ধরে দাঁড়াতেই যে পাথরটি এতক্ষণ ধরেছিলাম সেটি খসে পড়লো পাহাড় থেকে! কেন যেন তাকিয়েই ছিলাম সেই পাথরের পড়ে যাওয়ার দিকে। দেখলাম পাথরটি নদীর উপরে একটি বড় পাথরের উপরে পড়ে চৌচির হয়ে গেল কিছু বুঝে ওঠার আগেই!

যে পথের পরে আর পথ খুঁজে পাইনি। ছবিঃ লেখক

কী করবো এখন? গোমুখ আর মাত্র দেড় কিলোমিটার দূরে হবে খুব বেশি হলে। সামনের বাঁকটা পার হলেই। দেখতে পাচ্ছি আমি। কিন্তু সামনে যে কোনো পথ নেই। এই পাহাড় চড়াই করে যেতে হবে, যেতে চাইলে।

ঠিক সেই মুহূর্তে দু’চোখে দুজনের মুখ ভেসে উঠলো। এক চোখে প্রাণপ্রিয় ছেলে আর এক চোখে তার মা। আমার সাথে আর কেউ নেই। একা একদম একা। আশেপাশে কোথাও কেউ নেউ। কোনো প্রাণীর বা প্রাণের অস্তিত্বই নেই। এই পাহাড় থেকে পড়ে গেলে রেসকিউ করার, খবর পাবার বা দেবার কেউ নেই। নদীর স্রোত কোথায় গিয়ে ফেলে দেবে কেউ জানবে না। আমার উপর নির্ভরশীল মানুষগুলো পুরোপুরি অসহায় হয়ে যাবে।

কী করবো এখন তবে? পিছিয়ে যাবো, ফেরার পথ ধরবো নাকি দেড় কিলোমিটার, মাত্র দেড় কিলোমিটার, যা আমার চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছি সেদিকে এগিয়ে যাবো?

সামনে শুধু বিশাল পর্বত চূড়া। ছবিঃ লেখক

নিজেকে নিজেই জিজ্ঞাসা করলাম। ঠিক সেই সময়ে আমার সেই কৈশোর থেকে সব সময়ের সবচেয়ে প্রিয় গানের লাইনগুলো মনে পড়লো,

“সামনে চলার অনেক পথ,

সঠিক পথটি চিনতে হয়,

এগিয়ে চলার সাহস রেখো,

থেমে থাকার নেই সময়”  

আমি জানি না এই গানের শিল্পী কে, কে লিখেছিলেন। শুধু এইটুকু মনে আছে খুব সম্ভবত “সে, আমি আর মা” নামক একটি প্যাকেজ নাটকে আমি এই গানটি শুনেছিলাম, তখন ক্লাস সেভেন বা এইটে পড়ি। সেই থেকে আমার জীবন চলার পথে এই গানই আমার সব সময়ের নীরব অনুপ্রেরণা। এই গান ভেতরে বেজে ওঠার পরেই বুঝে গেলাম আমাকে কী করতে হবে আর কেন করতে হবে।  

বীভৎস সেই ফেরার পথে। ছবিঃ লেখক

আর সেই সাথে আমার মনও আর সায় দিলো না আর সামনে এগোতে। মনের উত্তর পেয়ে আর দেরি না করে পাহাড়, পাথর, ঝুরো মাটি ধরে, ঘষে, হেঁচড়ে, শুয়ে, গড়িয়ে নিচে নেমে এলাম। কিন্তু তবুও পথ খুঁজে পাচ্ছিলাম না! বার বার পথ হারিয়ে বহু দূরে গিয়ে, আবার পথের দেখা পেয়ে পুরনো পথে ফিরে আসছিলাম। আর পিছন ফিরে ফিরে শেষ দেড় কিলোমিটারের দিকে দেখছিলাম।

অনেক, অনেক আর অনেক কষ্টে ভুজবাসা ফিরে এসে নিজেকে নিজেই জিজ্ঞাসা করছিলাম, আমি কি অসুখি? আমার কি মন খারাপ? নিজেকে কি ব্যর্থ মনে হচ্ছে? আমি কি কষ্ট পাচ্ছি মনের অজান্তেই, খুব গোপনে?

নাহ একবারও তেমনটি মনে হয়নি, এতটুকু মন খারাপ হয়নি, নিজেকে অসফল মনে হয়নি। যতটুকু পেয়েছি, পেরেছি, গিয়েছি ততটুকুই আমার প্রাপ্তি, সফলতা আর ততটুকুই আমার আনন্দ। আমি যা পেয়েছি তাতেই আমি খুশি, আনন্দিত আর একটু অহংকারীও!

ঝুরো মাটির পথে। ছবিঃ লেখক

তবে একা একা এমন ট্রেকে, নিজের সাথে নিজের বোঝাপড়া আর সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারাটা সবচেয়ে জরুরী, সবচেয়ে দরকারী সবসময়।

বেঁচে থাকলে এমন, এরচেয়ে অনেক অনেক আনন্দ ঘন অনেক কিছুই পেতে পারি। আরো অনেক বড় সফলতা লুটিয়ে পড়তে পারে পায়ে। তাই সেদিন ভুজবাসায় ফিরে তাবুর ভিতরে বিছানায় শুয়ে রোদ পোহাতে পোহাতে অনুভব আর উপলব্ধি করেছিলাম যে, শুধু লক্ষ্যে পৌঁছানোই সফলতা বা শেষ কথা বা অভিযান শেষ হয়ে যাওয়া নয়, নিরাপদে নিজের আবাসে বা গন্ত্যব্যে ফিরে আসাটাও অভিযানের অংশ।  

হ্যাঁ এটাই সত্যি, যদিও অনেকের কাছে মনে হতে পারে যে, এসব বোধহয় নিজের কাছেই নিজের মিথ্যে আশ্বাস, সাময়িক সান্ত্বনা বা ব্যর্থতা ঢাকার জন্য কিছু অনুপ্রেরণাদায়ক কথা। কিন্তু না, যদি সত্যি আর একটু এগোতে গিয়ে পড়ে যেতাম পাহাড় থেকে, যদি আমি আর ফিরে আসতে না পারতাম চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছে গিয়ে লোক দেখানো বাহবা পেতে বা নিজের কাছেই নিজে জয়ী হতে? আর যদি ফিরতে না পারতাম পরিবার, প্রিয়জন, প্রাণের চেয়ে প্রিয় ছেলের কাছে? তবে কি থাকতো আমার লক্ষ্যে পৌঁছে যাওয়ার কোনো মূল্য? আমি কি পেতাম বিশাল কোনো অর্জনের আনন্দ বা আমার পরিবার কি পেত সারা জীবনের জন্য কোনো সান্ত্বনা?

পেছন ফেরা বার বার দেখা। ছবিঃ লেখক

নাহ পেত না, কেউ দিত না আর বাস্তবে সেটা সম্ভবও না। বাস্তবতা, সমাজ, সংসার আর পুরো পৃথিবী মূলত সফলতাকে মনে রাখে, সাধারণত ব্যর্থতাকে কেউ মনে রাখে না, স্মরণ করে না, কোনো উপাধিতে ভূষিত করে না। তাই কী দরকার জীবনের ঝুঁকি নেয়ার? কী দরকার আমি যাদের প্রিয়জন আর প্রয়োজন তাদেরকে দুঃখী করার, জেনে বুঝে কষ্ট দেয়ার আর সাময়িক সফলতার পিছনে ছুটতে গিয়ে নিজেকেই বিলীন করে দেয়ার?

কোনো দরকার নেই। আমি অসুখী নই, আমি কষ্ট পাইনি, আমার মন খারাপ হয়নি। আমি সফলতার জন্য, লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য, শেষ দেড় কিলোমিটারের জন্য, জীবনের চূড়ান্ত ঝুঁকি নেইনি।

পাথরের মাঝেই অবাক ফুল! ছবিঃ লেখক

রুমে ফিরে শরীর জুড়ে ব্যথা নিয়ে এই কথাগুলোই ভাবছিলাম-

“শেষ দেড় কিলোমিটার অথবা জীবন…!”

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চুড়ির শহর জয়পুর!

ইংল্যান্ডের রোমাঞ্চকর পাঁচটি রোডট্রিপ