সুন্দরবন ভ্রমণের শেষদিনে হিরণ পয়েন্ট ও করমজলে

সুন্দরবন ভ্রমণের তৃতীয় দিনের সকালে লঞ্চ থেকে নাস্তা সেরে আমরা রওনা দিলাম হিরণ পয়েন্টের উদ্দেশ্যে। গত রাতের আবহাওয়া ছিল স্নিগ্ধ, কিছুটা হিম হিম হাওয়া আর বৃষ্টির গন্ধে রাতে ঘুমটা বেশ হয়েছিল, তাই শরীরও বেশ ফুরফুরে লাগছিলো।

হিরন পয়েন্টের প্রকৃত নাম নীলকমল। এই জায়গাটি মূলত নৌবাহিনীর অধীনে। শুরুতেই একটি রিসোর্ট রয়েছে। একটি পাড় বাঁধানো মিঠা পানির পুকুর আর রয়েছে বন বিভাগের সুন্দর অফিস। পুকুর পাড়ের পাশেই ওয়াচ টাওয়ার।

হিরণ পয়েন্টের সীমানা প্রাচীর; source: Fahmida

হিরণ পয়েন্টের যত ভেতরে হাঁটবেন ততই যেন চোখে পড়বে সুন্দরবনের জানা–অজানা অনেক ইতিহাস। এখানের বন বিভাগের অফিসটি ঘুরে ফিরে দেখার জন্য বেশ ভালো। ঘুরে দেখা যাবে সুন্দরবনের ভেতরটি যেখানে আছে কেওড়া, সুন্দরী, গরান গাছের সারি।

এই সময় আপনার সঙ্গে অবশ্যই থাকতে হবে ট্যুর গাইড কিংবা বন্দুকধারী বনরক্ষী। পথটি কাদামাটি যুক্ত পিচ্ছিল, তাই সবাইকে দল বেঁধে চলতে হয়। তা না হলে পথ হারিয়ে যাওয়ারও সম্ভবনা থেকে যায়। বলা যায় সুন্দরবনের ট্যুর গাইড বা বনরক্ষীরা হচ্ছেন তথ্যের ভাণ্ডার। আপনি চাইলে তাদের কাছ থেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জেনে নিতে পারেন সুন্দরবনের ভেতরের জগত সম্পর্কে নানা বিস্ময়কর তথ্য।  

চারপাশে নারিকেল গাছে ঘেরা মিঠাপানির পুকুর; source: লেখিকা

হিরণ পয়েন্ট থেকে ফিরে লঞ্চের ছাদে উঠে বসলাম সবাই। পুরো ভ্রমণ নিয়ে সবাই কথা বলছিলাম। কেউ কেউ গান শুনছিলো। তার ফাঁকে লটারিও হলো। কেউ কেউ আবার সেই লটারির কল্যাণে পাচ্ছিল গিফট। আমিও বেলুন খেলা দিয়ে একটি গিফট পেয়েছিলাম। দারুণ আনন্দে কাটছিল তখন সময়টা।

দুপুরের খাবার শেষে আমরা গেলাম করমজলে। করমজল না গেলে বানরের বাঁদরামি কী জিনিস আমরা বুঝতে পারতাম না হয়তো। অনেক বেশি বানর ছিল সেখানে। বানরকে ভয় দেখাতে গিয়ে আমাদের এক বন্ধু নিজেই ভয়ে দৌড়! এক আপু তো ভয়ে কান্নাই শুরু করে দিয়েছিল ওদের নিজেদের মধ্যে লম্ফঝম্প দেখে।

হিরণ পয়েন্টের এই পাশটায় রয়েছে বন বিভাগের অফিস; source: Fahmida

করমজলে একটা চিড়িয়াখানা আছে। চিড়িয়াখানাটাতে রয়েছে হরিণ, কুমির আর অসংখ্য বানর। এখানের প্রধান আকর্ষণ দুইটি কুমির। পুরুষ কুমিরটির নাম রোমিও আর স্ত্রীর নাম জুলিয়েট। বিশালদেহী কুমির দুইটি দেখে আমরা রীতিমতো থ যে এতবড়ও কুমির হয়! পুরুষ কুমিরটা নিশ্চল হয়ে হাঁ করে ছিল যখন ভুল করে বসেছি প্লাস্টিকের ভাস্কর্য ভেবে।

সেগুলো ঘুরেফিরে দেখে শেষ করে করমজলের বিশাল মাংকি ট্রেইল পার হয়ে আমরা গেলাম একটা ওয়াচ টাওয়ারে, যেখানে উঠে বলা যায় পুরো সুন্দরবনকটাকেই দেখে নিলাম এক নজরে।

সংক্ষেপে সুন্দরবন:

সুন্দরবনের নামটা নিয়ে একটু বলি। বাংলায় ‘সুন্দরবন’-এর আক্ষরিক অর্থ দাঁড় করালে পাওয়া যায় ‘সুন্দর জঙ্গল’ বা ‘সুন্দর বনভূমি’। যদিও বলা হয়ে থাকে এখানে প্রচুর পরিমাণে সুন্দরী গাছ জন্মায় বলেই সুন্দরবনের এরূপ নামকরণ। অন্যান্য সম্ভাব্য একটা ব্যাখ্যা এরকম হতে পারে যে, এর নামকরণ হয়তো হয়েছে ‘সমুদ্র বন’ (প্রাচীন আদিবাসী) থেকে।

আমাদের নৌকা ভিড়বে করমজলের এই ঘাটে; source: Fahmida

সরকারি জরিপ অনুসারে, এই বনে ২৪৫ শ্রেণি ও ৩৩৪ প্রজাতির বৃক্ষ রয়েছে। রয়েছে প্রচুর প্রাণী যার মধ্যে ১২০ প্রজাতির মাছ, ২৭০ প্রজাতির পাখি, ৪২ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৩৫ প্রজাতির সরীসৃপ এবং ৮ প্রজাতির উভচর। এক সময় প্রচুর পরিমাণে চিতাবাঘ থাকলেও এখন সুন্দরবনের প্রধান প্রাণী রয়েল বেঙ্গল টাইগার, যার পরেই হরিণের অবস্থান।

নানা ধরনের প্রাণীর নিবাস ৩৪,৫০০ হেক্টরের এই সুন্দরবন। সুন্দরবনে যাবেন কিন্তু বাঘ দেখতে চাইবেন না এমন মানুষ সংখ্যায় নেই বললেই চলে। তবুও সুন্দরবনের এই মূল আকর্ষণ বাঘ দেখেন আর না-ই দেখেন বাঘের পায়ের ছাপ অবশ্যই দেখবেন। পায়ের ছাপ দেখে মনে হবে যেন এই কিছুক্ষণ আগেই বাঘটি পাড়ি দিয়েছে এই পথ।

চিড়িয়াখানার পাশাপাশি মুক্তভাবেও বিচরণ করছে হরিণ; source: Fahmida

করমজলেই সূর্যাস্ত দেখে আমরা আবার ফিরে এলাম লঞ্চে। সুন্দরবন ভ্রমণ মূলত এখানেই শেষ। এবার আমাদের খুলনার দিকে ছুটে যাওয়ার পালা। আসার সময় যে পথ শেষই হচ্ছিলো না, ফেরার সময় মনে হলো সেই পথ খুব দ্রুতই শেষ হয়ে যাচ্ছিলো। সবার মন খারাপও লাগছিল খুব। ইচ্ছে করছিলো আর একটা রাত যদি থাকতে পারতাম। কিছুতেই ফিরে যেতে ইচ্ছে করছিলো না। তবুও কী আর করার। ফিরতে তো হবেই।

রাত ১০টা নাগাদ আমরা খুলনা লঞ্চ ঘাটে পৌঁছালাম। আমাদের বুকিং করা বাস আগে থেকেই অপেক্ষায় ছিল। রাতের খাবার লঞ্চ থেকেই দিয়েছিল সবার জন্য। খাবার নিয়ে আমরা বাসে উঠে পড়লাম কুমিল্লার জন্য। আবারো মাওয়া ঘাটের ফেরীর জন্য অপেক্ষা। পুরো ১৬ ঘণ্টা ঠাঁয় বাসে বসে থেকে তখন আমাদের অবস্থা খুবই খারাপ।

রোদ পোহানো পুরুষ কুমির রোমিও; source: লেখিকা

কিন্তু সন্ধ্যায় যখন মাওয়া ঘাটের গরম গরম ইলিশ ভাজা আর বেগুন ভাজার সাথে শুকনো পোড়া মরিচ দিয়ে গরম ভাত খেতে বসলাম… আহা! কোথায় গেল সেই ১৬ ঘণ্টা বাসে বসে থাকার ক্লান্তি, টেরই পেলাম না। খাওয়া শেষ করে বাসে আবারো উঠে পড়লাম সবাই। রাত তখন প্রায় ১১টা। কুমিল্লা পৌঁছে গেলাম আমরা।

সতর্কতা:

যদি কেউ সুন্দরবন যান, দয়া করে যেখানে সেখানে ময়লা ফেলবেন না। কটকা বীচ আর পানিতে অনেক প্লাস্টিকের বোতল, প্যাকেট দেখেছিলাম। সুন্দরবন আমাদের সম্পদ, এই সম্পদ রক্ষা করার দায়িত্বও আমাদের। আরেকটা অনুরোধ, দয়া করে কোথায় লেখালিখি করবেন না বাচ্চাদের মতো। সুন্দরবন ওয়াচ টাওয়ারের আঁকাআঁকিগুলো দেখে সবার সামনে নিজেই খুব লজ্জা পেয়েছিলাম।

বিশাল মাংকি ট্রেইল পার হচ্ছি ওয়াচ টাওয়ারের খোঁজে; source: লেখিকা

আসলে, সুন্দরবন নিয়ে বলতে গেলে বলবো ‘সুন্দরবন’ একটি নেশার নাম। এর কাছাকাছি গেলেই যেন একটা ঘোরে পড়ে যেতে হয়। আরো কয়েকবার সুন্দরবন গেলেও হয়তো এর রূপ প্রাণ ভরে দেখার স্বাদ আমার মিটবে না। সুন্দরবন তার রূপ আপনাকে প্রাণভরে দেখানোর পাশাপাশি আপনার অনুভবের দরজাটাও যেন উদার হস্তে খুলে দেয়, আর এটাই সুন্দরবনের বিশালতা।

সুন্দরবন থেকে ফিরে এসে আফসোস করারও কিছুই নেই কারণ ইতোমধ্যে হয়তো দেখবেন আপনার মনের আর হাতের ক্যামেরার মেমোরি কার্ড বোঝাই হয়ে আছে সুন্দরবনের বিশেষ মুহুর্তগুলোর ছবিতে।

ওয়াচ-টাওয়ারের উপর থেকে সুন্দরবনের সৌন্দর্য; source: লেখিকা

সুন্দরবনের অসামান্য সব মুহূর্তের গল্প গোটা জীবনেও বলে শেষ করতে পারবো না কিংবা সুন্দরবনে হয়তো বা আমার কোনো গল্পই নেই। শুধুমাত্র সুন্দরবনের ঐ আকাঙ্ক্ষিত মুহূর্তগুলোর মাঝেই তৃপ্ত হয়ে আমি বেঁচে ছিলাম কয়েকটা দিনের জন্য।

Featured image: লেখিকা

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

জোছনার আলোয় ঝাউ বনে ঘেরা সোনাদিয়া দ্বীপে ক্যাম্পিং

মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের বাড়িতে একদিন