লাওস ভ্রমণ: খুঁজে-ফিরে দেখা ‘প্লেইন অফ জারস’

লাওসের অবস্থান এশিয়ার দক্ষিণ-পূর্বে এবং এই অঞ্চলের একমাত্র সমুদ্র সৈকতবিহীন একটি দেশ। মায়ানমার, চীন, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া এবং থাইল্যান্ড দিয়ে ঘেরা দেশটি ইন্দো-চাইনিজ অঞ্চলের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাসে লাওসেই সবচেয়ে বেশী পরিমাণে বোমা বর্ষণ করা হয়েছে কিন্তু এই দেশটিই বর্তমানে শান্তিপূর্ণ দেশের উদাহরণ।

১৯৬৪ থেকে ১৯৭৩ সালের মধ্যে ইউএস মিলিটারি প্রতি ৮ মিনিটে একবার বোমা বর্ষণ করে লাওসে। ধারণা করা হয়, প্রায় দুই মিলিয়ন টন বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছে লাওসের বুক-জুড়ে। আর এই পুরো বোমাবর্ষণটাই করা হয় ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়ে। মজার ব্যাপার হলো, এত ভয়াবহতার পরও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সেই যুদ্ধে জয়লাভ করা সম্ভব হয়নি।

যে পরিমাণ বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছিল তার শতকরা ৩০ ভাগ বিস্ফোরিত হয়নি। শুনে মনে হতে পারে বেশ ভালো সংবাদ, কিন্তু সেই অবিস্ফোরিত বোমাগুলো থেকে মাত্র শতকরা এক ভাগ সরিয়ে ফেলা সম্ভব হয়েছিল। বাকি সব বোমা অবিস্ফোরিত অবস্থায় পড়ে আছে লাওসের নানা জায়গায়।

তবে এখানেও আশার কথা হলো, লাওসে ভারী বৃষ্টিপাতে এবং প্রাকৃতিকভাবে বাঁশ উৎপাদন হওয়ায় এসব অবিস্ফোরিত বোমার অনেকখানিই এতদিনে দূরে কোথাও সরে গিয়েছে কিংবা একেবারেই নষ্ট হয়ে গিয়েছে। তবে সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো যখন একসাথে অনেকগুলো বোমা অবিস্ফোরিত অবস্থায় থেকে যায়। প্রতি বছর নানা কারণে সে ধরণের অবিস্ফোরিত বোমাগুলোর হঠাৎ বিস্ফোরণে অনেক লাওসিস্ট মারা যান।

এতসব ভয়ানক ব্যাপার নিয়ে কথা বলার পর এবার আসি এখানকার সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জায়গাটি নিয়ে। প্রায় ২০০০ বছর পুরনো লাওসের একটি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এতসব বোমাবর্ষণের পরও এখনো টিকে আছে। জায়গাটির আরেকটি আকর্ষণীয় দিক হলো, এখানে দর্শনার্থীদের ভিড় বলতে গেলে নেই!

 ২০০০ বছর পুরনো লাওসের এই প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এখনো টিকে আছে ছবিসূত্র: smithsonianmag.com

লাওসের জিয়েঙ খুয়াঙ প্রদেশে প্রায় ২০০০ বছর ধরে শত শত বিশাল পাথরের পাত্র/জার এলোমেলোভাবে অবস্থান করছে। জায়গাটিকে এজন্যই বলা হয়, ‘প্লেইন অফ জারস’ হিসেবে। এগুলো কারা, কেন নির্মাণ করেছিল সে সম্পর্কে খুব অল্পই জানা যায়। তবে মানুষের মুখে মুখে নানা রকম গাল-গল্প, উপকথা রয়েছে এই জায়গাটিকে নিয়ে।

এখানে এরকম এলোমেলো বড় পাথর পাত্র পড়ে থাকা এলাকাগুলোকে সাইট ১, সাইট ২ এভাবে নামকরণ করা হয়েছে। সাইট ১ এ একটি পুরনো গুহাও রয়েছে, যেখানে মানুষের হাড় মাংসের পুড়িয়ে ফেলা ছাই পাওয়া গিয়েছে। একই রকম ছাই, সাথে কয়লাও পাওয়া গিয়েছে সেখানকার বড় জারগুলোর ভেতরের ফাঁকা জায়গাগুলোতেও। এ থেকে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা ধারণা করেন, এইসব জারগুলো সম্ভবত শবাধার হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

আবার কেউবা বলে থাকেন, এসব জারের ভেতরে পড়ে থাকা হাড়ের খণ্ড কিংবা মানুষের পুড়িয়ে ফেলা শরীরের ছাই এসব দিয়ে করা হতো দেবতার উপাসনা। সেই সূত্রে এসব জারগুলো উপাসনার জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল।

এরকম গুহার ভেতরে পাওয়া গেছে ভস্মদেহের ছাই; ছবিসূত্র: fusia.ca

স্থানীয় লোকজনের উপকথায় বলা হয়, পুরনো দিনের লাওসের অধিবাসীরা যুদ্ধে জয় লাভ করলে মদ খেয়ে ফুর্তি করতো আর এই জারগুলো ব্যবহৃত হতো ভাত থেকে উৎপন্ন সেই স্থানীয় মদ, লাও লাও উৎপাদন করতে।

এছাড়াও স্থানীয় উপকথা অনুসারে, বিশাল জারগুলো ওসব কিছুই না। কেবল প্রাচীন দৈত্যদের ডিম খাওয়ার পাত্র হিসেবেই ব্যবহৃত হতো!

প্রাচীন দৈত্যদের ডিম খাওয়ার পাত্র !ছবিসূত্র: thethreewisemonkeys.com

সাইট ১ এ সব মিলিয়ে ৩৩০টি ‘পাথরের পাত্র’/জার আছে। এর প্রায় ৬০ ভাগই বোমাবর্ষণের ফলে ভেঙে গেছে কিংবা একেবারে মিশে গেছে মাটির সাথে। কিন্তু যেগুলো এখনো টিকে আছে সেগুলোর দিক থেকেও সহজে চোখ ফেরানো যায় না। এদের বেশীরভাগই স্যান্ডস্টোন দ্বারা নির্মিত।

সবচেয়ে বড় পাথরের তৈরি পাত্র/জারের ওজন আনুমানিক ৬ টন! জারগুলোর বেশীর ভাগই একপাশ কাত হয়ে পড়েছে। কোনো কোনোটা এখনো ঠাঁই দাঁড়িয়ে, আবার কিছু জার মহাকর্ষ-সূত্রকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বেশ অদ্ভুতভাবে দাঁড়িয়ে আছে!

এতোসব বোমাবর্ষণের পরও মুছে যায়নি এই নিদর্শন, সাইট-১; ছবিসূত্র: amusingplanet.com

লৌহ-যুগের যে মেগালিথিক সংস্কৃতির লোকজন এই জারগুলো নির্মাণ করেছিলেন তাদের সম্পর্কে খুব কমই জানা যায়। তবে এটুকু জানা যায় যে, এই অঞ্চল একসময় বাণিজ্যিক চলাচলের জন্য প্রধান রাস্তা হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সেই বাণিজ্যিক চলাচলের রাস্তাটি চীনের দক্ষিণাঞ্চল থেকে থাইল্যান্ডের কোরাত অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

সাইট ২ এর অবস্থান পাশাপাশি দুইটি টিলার মাঝে। এখানে গাছের গুঁড়ি এবং শেকড় জারগুলোকে একরকম জড়িয়ে রেখেছে। হাঁটতে গেলেই পায়ের নিচে লোহার টুকরো, যা ছিল বোমাগুলোর অংশবিশেষ, সেগুলো ধাতব মড়মড় করে উঠছে। এজন্যেই রাস্তার পাশেই আবার লাল রঙে বড় করে সাবধান বাণী ঝুলিয়ে রাখা আছে, যার অনুবাদ করলে দাঁড়ায়, ‘বিপজ্জনক! রাস্তা ছেড়ে নামবেন না’।

সাইট-২; ছবিসূত্র: nomadasaurus.com

সাইট ৩ এ যেতে হলে একটা নড়বড়ে ব্রিজ পেরিয়ে যেতে হয়। এখানকার জারগুলোকে ঘিরে আছে ধান গাছ, মাছ চাষ করা পুকুর কিংবা গবাদি পশু! ঠিক যেন আমাদের দেশের বগুড়ার মহাস্থানগড়ের মতো অবস্থা! হঠাৎ করে দেখলে ভ্রম হয় এই ভেবে যে এইসব গরু-ছাগলও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন নয়তো!

সাইট-৩, ছবিসূত্র: archaeology.org

যাই হোক, সাইট ৩-কেই এখানকার সবচেয়ে দর্শনীয় স্থান বলা হয়। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সাথে ১৫০ জার সমৃদ্ধ জায়গাটা মিশে গেছে একেবারে। এখানকার বড় আকারের জারগুলো সেই হাজার বছর ধরে অপরিবর্তিতভাবে পড়ে আছে এখানেই। কিন্তু ছোট জারগুলোকে স্থানীয় লোকজন বহু বছর আগেই ভেঙে স্থানীয় ঘরবাড়ির ভিত হিসেবে ব্যবহার করে ফেলেছে।

পুরো জায়গাটিতে বলতে গেলে কোনো পর্যটক দেখাই যায় না! যারা ভিড় মুক্ত দর্শনীয় স্থানসমূহে ঘুরে বেড়াতে ইচ্ছুক, তাদের জন্য এটি হতে পারে একটি আদর্শ জায়গা। যেতে যেতে কানে এসে লাগবে গবাদি পশুগুলোর গলায় ঝোলানো ঘণ্টার মৃদু শব্দ, যা কিনা এখানে নিক্ষেপ করা বোমাগুলোরই অংশবিশেষ! পুরো ব্যাপারটি চোখের সামনে দেখলে মনে হবে যুদ্ধকেও প্রকৃতি কীভাবে নমনীয়, উর্বর করে তুলতে পারে তার একটি বড় উদাহরণ।

যেভাবে যাবেন:

প্লেইন অফ জারসের অবস্থান জিয়েঙ খুয়াঙ প্রদেশের ফোনসাভান অঞ্চলে। সেখানে যাওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো, ফোনসাভান অঞ্চলের কোনো ট্র্যাভেল এজেন্টের সাথে যোগাযোগ করা। এছাড়া আলাদাভাবে যেতে চাইলে স্থানীয় মালবাহী থ্রি হুইলার মোটরবাইকে চড়ে সাইট ১ এ যেতে পারবেন, খরচ পড়বে মাত্র ৪০,০০০ কিপ (৫ ডলার)।

এছাড়া আপনি যদি গ্রুপে আসেন তাহলে মিনি-ভ্যান ভাড়া করে নিতে পারবেন, দিনপ্রতি ভাড়া নেবে কমবেশি ৬০ ডলার (ভাড়ার পরিমাণটা মৌসুম এবং চাহিদার উপর নির্ভর করে)।

এছাড়া সবচেয়ে তাড়াতাড়ি এবং নিরাপদে যেতে পারেন বিমানে করে। লাওস এয়ারলাইন্সের বিমানে চড়ে রাজধানী ভিয়েনতিয়েন থেকে জিয়েঙ খুঙ যেতে পারেন। সময় লাগবে মাত্র ৩০ মিনিট। ভাড়া পড়বে ১০০ ডলার।

প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ৮:৩০ পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে এই জায়গাটি। প্রবেশ মূল্যও মাথাপিছু মাত্র ২ থেকে ৩ ডলারের মধ্যেই থাকে।

ফিচার ইমেজ:  wikitravel.org

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সকালপর্বে চট্টগ্রামের আনাচে কানাচে পদব্রজের গল্পকথা

ভরা জ্যোৎস্নায় আমিয়াখুম ভ্রমণ(২৭ সেপ্টেম্বর)