রসের খোঁজে অনাবৃষ্টির জনপদ লালপুরে

প্রচণ্ড শীতে যখন সারাদেশ কাঁপছে, গত একশ বছরের রেকর্ড ভেঙে ২.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় নেমে এসেছে, সেই সময়টায় মাত্র একজনকে সাথী করে বেরিয়ে পড়লাম নাটোরের উদ্দেশ্যে।

খুব ভোরে রেডি হয়ে বেরিয়ে গেলাম বাইরে। কুয়াশার জন্য দুই হাত দূরের জিনিসও দেখা যায় না। তবুও আমরা বেরিয়েছি, কারণ একটাই। লালপুরে যাব, রস খেতে।রাতে যাত্রাপথে কিছু খাওয়া হয়নি। খিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে।

যেহেতু খুব ভোরে লালপুরে না গেলে রস পাওয়া যাবে না, চটজলদি একটা টংমতোন দোকানে ঢুকে গরম গরম খিচুড়ি খেয়ে নিলাম ডিমভাজি দিয়ে। দুজনের ভরপেট খাবারের দাম পড়লো মাত্র ৬০ টাকা।

গাঢ় কুয়াশা। সোর্স: লেখিকা

দেরি করলাম না একদমই। খেয়েই বেরিয়ে পড়লাম। কয়েক পা হাঁটতেই পিছন থেকে বাস এলো। একদম পিচ্চি একটা ছেলে গলা ফাটিয়ে ডাকছে, লালপুর লালপুর! খুশিমনে বাসে উঠে পড়লাম। ডিরেক্ট লালপুরের বাস পাওয়া গেছে, এতেই খুব খুশি।

বাসের জানালা দিয়েই নাটোর শহরটাকে দেখে নিচ্ছি। ছোট্ট মফস্বল শহর নাটোর, কিন্তু বর্ণময়। রাস্তার দুপাশ দিয়ে কিছুক্ষণ পর পরই বড় বড় আমগাছ। কোথাও কোথাও রাস্তা থেকেই গেরস্তের বাড়ি দেখা যাচ্ছে। বাড়ির এক চিলতে উঠোনে খড়ের গাদা। সারিবাঁধা গোবর লাঠি। এই এলাকায় এখনো গোবর শুকিয়ে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

কিছুক্ষণ পর একটা ব্রিজ পেরুলাম। ঘাড় বের করে দেখতে চাইলাম, নদীটার নাম কোথাও লেখা আছে কি না। অবাক হয়ে দেখি, এক জায়গায় এক পিলারে ঠিক এভাবে লেখা –

“নদীর নাম নারোদ”

রাস্তার দুই ধারে সার বাঁধা খেজুর গাছ। সোর্স: বিডি নিউজ ২৪. কম

২০-২৫ মিনিটের মধ্যেই বনপাড়া পৌঁছে গেলাম। রাতে আসার সময়ই দেখেছিলাম, বনপাড়ার চৌরাস্তার ঠিক মাঝখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি স্মৃতিস্তম্ভ। ওটার একপাশে সাদা প্লেটে গোটা গোটা কালো অক্ষরে লেখা – “তুমিই বাংলাদেশ”

ডিরেক্ট বাস পেয়ে খুশি হয়ে পড়েছিলাম এই জন্য যে লালপুরে জলদি পৌঁছুতে পারবো। কিন্তু সেই খুশিতে পানি ঢেলে দিলো বাসটা। বনপাড়া আসতেই বাস থেকে একে একে সব যাত্রী নেমে গেল। এরপর থেকে বাস দাঁড়িয়ে আছে তো আছেই। অনেকক্ষণ পর পর একটা বাস আসে। তাই বাস ভর্তি যাত্রী না নিয়ে বাস ছাড়বে না।

কী আর করা! নেমে চা খেলাম। স্থানীয় এক ধরনের কুড়কুড়ে পিঠা খেলাম। প্রায় ঘণ্টাখানেক সময় নষ্ট করে বাস ছাড়লো। বনপাড়াতেই নয়টা বেজে গেছে। ভাবছি লালপুর গিয়ে আদৌ রস পাবো? পাই আর না পাই, শেষ পর্যন্ত না যাওয়া পর্যন্ত ইস্তফা দেব না।

এভাবেই গাছ কাটে গাছিরা। সোর্স: bdprojonmo71.com

সরু রাস্তা। ঠিক বাস চলার উপযোগী নয়। কিন্তু অদ্ভুত মনোরম সৌন্দর্য আছে রাস্তাটায়। রাস্তার দুই পাশে বিস্তৃত জমি। কিছুদূর পর পর আটপৌরে চৌচালা বাড়িঘর। পাকা দালানগুলোও টিনশেড। বাড়ির উঠোনে, জমির আইলে, আর দুই রাস্তার ধারে সারবাঁধা খেজুর গাছ। এসব গাছ থেকে রস সংগ্রহ করা হয়। খেজুর গাছ দেখেই আমি খুশি হয়ে পড়লাম।

খেজুর গাছ ৫-৬ বছরের হলেই গাছ থেকে রস সংগ্রহ শুরু করা যায়। দোআঁশ ও পলি মাটিতে জন্মানো গাছে বেশি রস হয়। কার্তিক মাস থেকে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত রস আহরণ করা যায়। তবে যত শীত বেশি পড়ে তত রস বেশি হয়।

সদ্য গাছ থেকে নামানো খেজুরের মিষ্টি রস। সোর্স: লেখিকা

খেজুর গাছের কাণ্ডের উপরিভাগে, ঠিক যেখান থেকে পাতার ডাল বেরোনো শুরু করে, সেখানকার কাণ্ড বেশ নরম থাকে। সেই নরম অংশ কেটে কেটে খাঁজকাটা খাঁজকাটার মতো করা হয়েছে। সেখানটায় বসিয়ে দেয়া হয়েছে বাঁশের তৈরি নালা।

আবার পাখিরা যাতে রস না খেতে পারে কিংবা কোনো জীবাণু না ছড়াতে পারে, সেজন্য আবার জাল বিছিয়ে দিয়েছে। গাছের খাঁজকাটা অংশ থেকে চুইয়ে-চুইয়ে রস এনে নল দিয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় জমা হয় ঠিলেতে।

একবার গাছ কাটার পর ২-৩ দিন রস পাওয়া যায়। রসের জন্য গাছ একবার কাটার পর ৫-৬ দিন বিশ্রাম দেয়া হয়। রোদে কাটা অংশ শুকিয়ে গেলে আবার ওই অংশ চেছে রস সংগ্রহ করা হয়। আর এ কারণেই সাধারণত খেজুর গাছ পূর্ব ও পশ্চিম দিকে কাটা হয়, যাতে সূর্যের আলো সরাসরি ওই কাটা অংশে পড়ে। গাছ থেকে রস সংগ্রহের সময় মৌমাছির কামড় খেতে হয় গাছিকে।

আমাদের দেশে আগে প্রচুর পতিত জমি ছিল। সেখানে অবহেলা অযত্নে খেজুর গাছ জন্মাতো। গ্রামীণ রাস্তার পাশেও সারিবদ্ধভাবে খেজুরগাছ দেখা যেত। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতো সেসব খেজুর গাছ। এসব গাছ এখন ইটভাটা খেয়ে ফেলেছে।

খেজুর রসের পায়েস। সোর্স: লেখিকা

সাধারণত কাকডাকা ভোরেই রস সংগ্রহ করা হয়। তবে এখন সকাল সাড়ে ৯টা বাজলেও একজন গাছিকে দেখলাম, রস আহরণ করছে। কিছুদূর পর আরেকজনকে দেখলাম, হাতে দা ও কোমরে দড়ি বেঁধে খেজুর গাছে উঠে নিপুণ হাতে গাছ চাছা-ছেলা করছে। সাড়ে নয়টা বেজে গেলেও রোদ ওঠার কোনো লক্ষণ নেই প্রকৃতিতে।

কাউকে কাউকে দেখলাম, হাড়িতেই মুখ দিয়ে রস খাচ্ছে। গাছ থেকে নামানো হাড়িতে মুখ দিয়ে রস পান করা উচিৎ নয়। কারণ খেজুরের হাড়িতে রাতে বাদুড় বসতে পারে। বাদুড়ের লালা কিংবা মল স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

রসের বৃত্তান্ত নিয়ে শিহানের সাথে আলাপ করছিলাম। সামনের সিট থেকে একজন ঘাড় ঘুরিয়ে বললো, ‘আপনারা কোত্থেকে এসেছেন? কই যাবেন।’ আমিই আগ বাড়িয়ে উত্তর দিলাম। উনি খুব আগ্রহী হয়ে বললেন, ‘লালপুরে রস পাবেন। সময় থাকলে আমি নিজেই আপনাদের নিয়ে যেতাম। সব খেজুর গাছের রস কিন্তু মিষ্টি হয় না। আমার পরিচিত এক বাড়িতে মিষ্টি রস পাওয়া যেত। কিন্তু আমি একটা জরুরী কাজে এসেছি।’

লোকটার আন্তরিকতা দেখে ভালো লাগলো। আগ্রহী গলায় আলাপ করতে শুরু করলাম। খুব বুঝতে পারছি, শিহান একটু একটু বিরক্ত হচ্ছে। পাত্তা দিলাম না। সে জানে না, নতুন জায়গায় এলে অবশ্যই স্থানীয়দের সাথে আলাপ জমানো উচিৎ।

কথায় কথায় উনি একসময় বললেন, ‘লালপুরের কাছেই তো বাঘা মসজিদ। বাঘা মসজিদেও ঘুরে আসেন। আজকে শুক্রবার, জুম্মাও পড়ে আসতে পারেন।’
অবাক হলাম। বাঘা মসজিদ নাটোরে? ওটা তো রাজশাহীতে হবার কথা!
সন্দেহের কথা জানাতেই উনি বললেন, ‘লালপুর থেকে সিএনজিতে করে ১০-১৫ টাকা লাগবে বাঘা যেতে।’

শিহানকে বললাম, ‘গুগল ম্যাপে সার্চ দিয়ে দেখো না একটু!’
সার্চ দিতে দিতে মৃদু গলায় সে বললো, ‘৫০ টাকার নোটে বাঘা মসজিদের ছবি দেওয়া আছে।’
কথাটা শুনেই সামনের সিটে বসা সেই লোকটা ৫০ টাকার নোট বের করে উল্টেপাল্টে দেখতে শুরু করলো। তা দেখে আমি মুখ টিপে হাসলাম। পরে জানতে পেরেছিলাম, ১০ টাকার ডাক টিকিটেও বাঘা মসজিদের ছবি শোভা পাচ্ছে।

ম্যাপ দেখে বর জানালো, আসলেই কাছে। ঠিক করলাম, বাঘাতেও ঘুরে যাব।

খড়ের গাদা। সোর্স: লেখিকা

লালপুরে সবচেয়ে কম বৃষ্টি হয়। সেজন্যই হয়তো শীতটা অতিমাত্রায় বেশি। সকাল দশটায় লালপুরে গিয়ে পৌঁছুলাম। বাস থেকে নামতেই কনকনে ঠাণ্ডা বাতাসের একটা ঝাপটা আমার ডাবল সোয়েটার এবং সোয়েটারের উপরের শাল ভেদ করে হাড় মাংস কাঁপিয়ে দিলো। কাঁপতে কাঁপতে বাজারের সামনে গিয়ে লোকজনকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘রস কই পাবো?’

তারা বললো, ‘রস নিয়ে আরোও সকালে আসে। এত বেলায় তো আর পাওয়া যাবে না। আবার আগামিকাল ভোরে পাবেন।’
বললাম, ‘আমরা তো অনেক দূর থেকে এসেছি। এখানে এমন কোনো বাড়ি আছে, যেখানে রস পাওয়া যেতে পারে?’

বললো, ‘পদ্মার পাড়ের দিকের দুয়েকটা বাড়িতে পেলেও পেতে পারেন।’
পদ্মার পাড় যাওয়ার ইচ্ছে ছিল আগে থেকেই। ভাবলাম, হাঁটতে শুরু করি। খেজুর গাছওয়ালা বাড়ি দেখতে পেলেই গিয়ে ধর্না দেব। কিন্তু কয়েক পা এগিয়েই বুঝলাম, এই ঠাণ্ডায় হেঁটে গিয়ে পোষাবে না। এই এলাকায় লোকজন ভ্যানেও চলাফেরা করে।

হাত নেড়ে একটা ভ্যান থামিয়ে পিছনে উঠে পড়লাম। সাঁইসাঁই করে ভ্যান চলতে শুরু করতেই আক্ষরিক অর্থেই শীতটা হাড় কাঁপিয়ে দিচ্ছিল। ভ্যান গৌড়ীপুর নামিয়ে দিতেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত বস্তুটি পাওয়া গেল না। যাকেই জিজ্ঞেস করি, “রস কই পাব?” বলছে যে, পরদিন ছাড়া আর হবে না।

কী আর করা! ধীর পায়ে পদ্মার দিকে এগিয়ে গেলাম। পদ্মাপাড়ে যাওয়ার রাস্তাটা খুব স্নিগ্ধ। সরু রাস্তা। দুইপাশে ঘরবাড়ি। কয়েকটি উঠোনে ঘরের শেপে খড়ের গাদা। রাস্তার দুই ধারে, বাড়ির উঠানে খেজুর গাছ তো আছেই।

কুয়াশাচ্ছন্ন পদ্মানদী। সোর্স: লেখিকা

কিছুদূর যেতেই পদ্মা চোখে পড়লো। ঘন কুয়াশার চাদরে মুড়ে রয়েছে পদ্মা। পানির মধ্যে কোনো স্পন্দন দেখা যাচ্ছে না। ঢেউ, স্রোত কিচ্ছু নেই। স্থবির পানি। কিন্তু তাই কী হয়? নদী আবার স্থবির হয় কী করে? খুব ধীরলয়ে স্রোত বয়ে যাচ্ছে হয়ত। খালি চোখে দেখা যাচ্ছে না।
পদ্মার এই শান্ত বাচ্চার মতো নীরব রূপ আমার ভালো লাগলো না। অল্প কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ফেরার জন্য পা বাড়ালাম।
পদ্মাপারে বনায়ন করা হচ্ছে। দূর থেকেই সারিবাঁধা গাছ দেখতে পেলাম। কাছ থেকে গাছগুলো দেখতে চাইলেও শিহান যেতে দিলো না। ঠাণ্ডায় হু হু করে কাঁপছি, তাই।
পদ্মার পাড় থেকে ফেরার পথে এক বাড়ির খেজুর গাছ থেকে রস নামাতে দেখে কোনো কিছু চিন্তা না করেই সেদিকে পা বাড়ালাম। ওরা বিক্রি করবে নাকি নিজেরা খাবে, সেসব জানতে না চেয়ে বুভুক্ষের মতো বললাম, “আমরা অনেকদূর থেকে রসের খোঁজে এখানে এসেছি। আমাদের একটু রস খাওয়ানো যাবে?”
এমন করুণ চেহারা দেখে তাদের হয়তো মায়া লাগলো। দুজনকেই গ্লাস ভর্তি করে রস খেতে দিল ওরা। এই এক ছটাক রসের জন্য এতো কষ্ট করাতেই হয়তো মনে হলো, “এ তো অমৃতের মতো মিষ্টি!” 

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বাংলাদেশের মনোমুগ্ধকর কয়েকটি পাহাড় কথন

নজরুল স্মৃতিবিজড়িত ত্রিশালে একদিনের পদচারণ