লাক্কাতুরা চা বাগান ও সাত রঙের চায়ের খোঁজে

৩৬০ আউলিয়ার দেশ সিলেট একদিকে যেমন চায়ের রাজধানী তেমনি অন্যদিকে পর্যটন অঞ্চল। চায়ের জন্য বিখ্যাত জেলা সিলেটকে দুটি পাতা একটি কুঁড়ির দেশও বলা হয়। সিলেটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয় আগত পর্যটকরা।

প্রকৃতি তার অপার সৌন্দর্য ঢেলে দিয়েছে সিলেটের বুকে যার ফলে সিলেটে প্রকৃতির অঢেল সৌন্দর্যে বিমোহিত না হয়ে পারে না দর্শনার্থীরা। সিলেটে অনেক পর্যটন স্থান রয়েছে যেমন- মালনীছড়া চা বাগান, ডিবির হাওর, লাক্কাতুরা চা বাগান, হযরত শাহজালাল (রাঃ) এর মাজার, রাতারগুল, জাফলং, লালাখাল, জাকারিয়া সিটি, শ্রী চৈতন্য দেব, লোভাছড়া, বিছানাকান্দি ইত্যাদি।

সিলেটের প্রতিটি স্থান অসাধারণ ও মনোমুগ্ধকর। কারণ প্রতিটি স্থান তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল। আজ আলোচনা করব লাক্কাতুরা চা বাগান ও নীলকণ্ঠী কেবিনের সাত রঙের চা নিয়ে। আসুন জেনে নিই বিস্তারিত।

লাক্কাতুরা চা বাগান

ছবিসূত্রঃ bdplace64

চায়ের জন্য বিখ্যাত জেলা সিলেট। লাক্কাতুরা চা বাগান বাংলাদেশের প্রাচীন চা বাগানগুলোর মধ্যে একটি। লাক্কাতুরা চা বাগান সিলেট জেলার চৌকিঢেকী উপজেলায় অবস্থিত। ন্যাশনাল টি বোর্ডের অধীনে থাকা এই চা বাগানটি ওসমানী বিমান বন্দরের কাছাকাছি অবস্থিত।

এটির অবস্থান সিলেট শহরের উত্তরে। চারদিকে সবুজের সমারোহ নিয়ে গড়ে উঠেছে এই চা বাগান। অসংখ্য চা গাছ, উঁচু নিচু পাহাড়, চারদিকের অবারিত সবুজ পুরো বাগানকে অনন্য মাধুর্য দান করেছে।

ছবিসূত্রঃ hiveminer.com

সেখানে গেলে আপনার চায়ের রাজ্যে হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করবে। এই চা বাগানের অবস্থান ৩২,০০০ একর জায়গা জুড়ে। এটি বাংলাদেশের বৃহত্তম চা বাগানগুলোর মধ্যে একটি। প্রতিবছর লাক্কাতুরা চা বাগান থেকে ৫ লাখ কেজি চায়ের উৎপাদন হয়। দেশীয় চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করা হয় লাক্কাতুরা চা বাগানের চা।

ছবিসূত্রঃ আনিস মাহমুদ

লাক্কাতুরা চা বাগানের কাছে রয়েছে রাবার ফ্যাক্টরি ও চা ফ্যাক্টরি। ওসমানি বিমানবন্দর থেকে ডানদিকে গেলে চা বাগানের মুল প্রবেশপথ পাওয়া যাবে। প্রবেশপথ দিয়ে ঢুকে সামনে আগালে দেখতে পাবেন রাবার ফ্যাক্টরি ও চা ফ্যাক্টরি। তারপর আরেকটু সামনে গেলে দেখতে পাবেন কিছু বাংলো।

উঁচু-নিচু টিলার উপর আঁকাবাঁকা রাস্তায় এই বাংলো গুলোর অবস্থান। বাগানের ব্যবস্থাপক ও সহকারী ব্যবস্থাপকরা বাংলোয় বসবাস করেন। চা বাগানে চায়ের প্রাধান্য থাকলেও রাবার বাগানও রয়েছে। চা বাগানে যে কেউ চাইলেই ঢুকতে পারে। তবে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে।

অনুমতি ছাড়া চা বাগানে প্রবেশ নিষেধ। লাক্কাতুরা চা বাগানের পাশেই বিখ্যাত মালনীছড়া চা বাগান অবস্থিত। লাক্কাতুরা চা বাগানে অসংখ্য চা গাছ, উঁচু-নিচু টিলা, বাংলো, রাবার বাগান, চা শ্রমিকদের চা সংগ্রহ ইত্যাদি সব কিছু উপভোগ করতে পারবেন।

যাওয়ার উপায়

ছবিসূত্রঃ আনিস মাহমুদ

লাক্কাতুরা চা বাগান সিলেটে অবস্থিত। তাই দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে লাক্কাতুরা চা বাগানে যেতে হলে প্রথমে সিলেটে যেতে হবে। ঢাকা থেকে বাস, ট্রেন কিংবা বিমানে করে সিলেটে যেতে পারবেন। ঢাকা থেকে বাসে সিলেট গেলে গ্রীণ লাইন, এস আলম পরিবহন, সৌদিয়া, এনা পরিবহন ইত্যাদিতে করে যেতে পারবেন।

ট্রেনে গেলে উপবন, জয়ন্তিকা, পারাবত, কালনী এক্সপ্রেসে করে যেতে পারবেন।
সিলেটে নেমে লাক্কাতুরা চা বাগানে যেতে পারবেন অটোরিকশা, রিকশা কিংবা সিএনজিতে করে। এছাড়া সিলেটের আম্বরখানা পয়েন্ট থেকে মাত্র ১০-১৫ মিনিটে চলে যেতে পারবেন লাক্কাতুরায়।

যেথায় থাকবেন

সিলেটে থাকার মতো অনেক স্থান রয়েছে। সিলেটের আবাসিক হোটেলগুলোতে যেমন হোটেল হিল টাউন, সুরমা কায়কোবাদ, দরগা গেইট, গুলশানে আপনি রাত্রি যাপন করতে পারবেন। লালা বাজার এলাকায় অনেক রেস্ট হাউজ আছে। এসব রেস্ট হাউজ ও হোটেলে থাকতে আপনার ব্যয় হবে ৪০০- ৪,০০০ টাকা। মানের উপর দামের তারতম্য নির্ভর করে।

নীলকণ্ঠী কেবিনের রঙধনু অর্থাৎ সাতরঙের চা

ছবিসূত্রঃ Bangladeshtourismguide

চায়ের রাজধানী সিলেট। আর সিলেটে আকর্ষণীয় চা পাওয়া যাবে না তাই কি হয়? সিলেটের সাত রঙের চায়ের কথা আমরা অনেকেই শুনেছি। এই চায়ের সুনাম দেশে ও বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছে অনেক আগে থেকে। একই গ্লাসে চায়ের সাতটি স্তর থাকে। খেতেও দারুণ।

এখানে সাত স্তরের চা ছাড়াও পাওয়া যায় ছয় স্তর, পাঁচ স্তর, চার স্তরের চা। রমেশ গৌড় নামের একজন ৪২ বছর বয়সী লোক ১২-১৩ বছর ধরে সাত রঙের চা বানাচ্ছেন। রমেশ গৌড়ের নীলকণ্ঠী টি-কেবিন নামের দুটো দোকান রয়েছে। একটি শ্রীমঙ্গলের রামনগরে এবং অন্যটি কালিঘাট রোডের ১৪ রাইফেল ব্যাটালিয়ন ক্যান্টিনে।

ছবিসূত্রঃ You tube

রমেশ গৌড় নিজেই এই সাত রঙের চায়ের উদ্ভাবক। ২০০২ সালে প্রথম তিনি একই গ্লাসে দ্বি-স্তরী চায়ের আবিষ্কার করেন। তার কিছু দিনের মধ্যেই সাড়া পড়ে যায় শহরজুড়ে। তারপর তার চায়ের ব্যবসা রমরমাভাবে চলতে থাকে।

ধীরে ধীরে তিনি একই গ্লাসে তিন স্তর, চার স্তর দিয়ে চা বানানো শুরু করেন। এভাবে সাত স্তর বিশিষ্ট চায়ের প্রচলন শুরু হয়। ১২-১৩ বছর ধরে সুনামের সাথে ব্যবসা করে যাচ্ছেন তিনি। নীলকণ্ঠী চা কেবিনে স্তরবিশিষ্ট চা ছাড়াও আরো অনেক ধরনের চা পাওয়া যায়। মশলা চা, ক্লোন চা, দুধ চা, গ্রিণ টি, আদার চা ইত্যাদি। গ্রীণ টি, আদার চা, লাল চায়ের দাম ৫ টাকা।

দুধ চা ১০ টাকা এবং হাই স্পেশাল চা ২০ টাকা। সাত স্তর বিশিষ্ট চায়ের দাম ৭০ টাকা, ছয় স্তর বিশিষ্ট চায়ের দাম ৬০ টাকা, পাঁচ স্তর বিশিষ্ট চায়ের দাম ৫০ টাকা, চার স্তর বিশিষ্ট চায়ের দাম ৪০ টাকা, তিন স্তর বিশিষ্ট চায়ের দাম ৩০ টাকা এবং দুই স্তর বিশিষ্ট চায়ের দাম ২০ টাকা।

যাওয়ার উপায়

সিলেটের শ্রীমঙ্গল থেকে রিকশা নিয়ে কালিঘাট রোডে গেলে দেখতে পাবেন বড় সাইনবোর্ডে ‘নীলকন্ঠ’ লেখা। এই কেবিনটিতে নিরাপদে চা পান করতে পারবেন কারণ এটি ১৪ রাইফেল ব্যাটালিয়নের কেন্টিনে। রামনগরে আরেকটি চায়ের দোকান আছে। কালিঘাট রোড ধরে রিকশা নিয়ে সামনে গেলেই পেয়ে যাবেন ‘নীলকণ্ঠী’ কেবিনের চায়ের দোকান। ভাড়া নেবে মাত্র ২৫-৩০ টাকা।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

পৃথিবীর সবচেয়ে সৌন্দর্যমণ্ডিত কিছু দ্বীপপুঞ্জ

কপোতাক্ষের তীরে: মাইকেলের বাড়ি সাগরদাঁড়িতে