মেঘালয়ে মেঘবিলাস: লাইতলুম ক্যানিয়নের মুগ্ধতা

উমক্রেম আর বপহিল ঝর্ণা দেখার পর হোটেলে গিয়ে এক সুখঘুম দিয়েছিলাম। পরদিন ভোরেই উঠেছি। আজকের সকাল শুধুই লাইতলুম ক্যানিয়নের (Laitlum Canyon) জন্য। জীবনে যত জায়গা দেখেছি তারমধ্যে এই ক্যানিয়ন সেরা পাঁচে থাকার মতো যোগ্য। হালকা কিছু খেয়ে নিয়েই লাইতলুমের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম।

যতই এগোচ্ছিলাম ততই মেঘ এসে আঁকড়ে ধরছিল। এমন একটা সময় আসলো যখন নিজের হাতকেই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না। এরপর শুধুই মেঘের ভেতর হারিয়ে যাওয়া। যে যার মতো নেমে যেদিকে ইচ্ছা সেদিকে হাঁটা দিল! মেঘের স্পর্শে চুল ভিজে যাওয়া, মেঘের সাথে হাঁটা, মেঘকে নিয়ে হাঁটা, মেঘবিলাসের আর কী কিছু বাকি ছিল!

লাইতলুম ক্যানিয়নকে বলা হয়ে থাকে ‘যেখানে পাহাড়ের শেষ’ (End of Hills)। আমার মতে পাহাড়ের শেষ না বলে পাহাড়ের প্রান্ত বলাটা বোধহয় বেশি ঠিক হবে। এখানে প্রকৃতি নিজেকে এত রূপে সাজিয়ে নিয়েছে যে স্থির হয়ে থাকাটা বড় রকমের দায় হয়ে যাচ্ছিল। কম ছুটোছুটি করিনি এই মেঘের মধ্যে। একবার উপরে, নিচে, আনাচে-কানাচে যেভাবে পেরেছি চোখ ভরে, বুক ভরে, হাত ভরে এই রূপ নিজের মধ্যে অনুভব করার চেষ্টা করেছি।

ক্যানিয়নের প্রান্তে ; ছবি কৃতজ্ঞতা : অনুপমা দেবনাথ

ক্যানিয়নের একদম শেষদিকে রয়েছে আঁকাবাঁকা পাহাড়ি সিঁড়ি। এই সিঁড়ি ধরেই নিচের গ্রামের মানুষজন যাওয়া আসা করে। খুঁজতে খুঁজতে এই মেঘের রাজ্যে ছোট্ট একটা চায়ের দোকান পেয়ে গেলাম। এই মেঘ কুয়াশার মধ্যে চায়ের দোকান পেয়ে সবাই তো মহাখুশি। এরপর মেঘের সাথে চলে চা-বিলাস। অনেকক্ষণ ধরে আমরা এই জায়গাটায় ছিলাম। যেতেই ইচ্ছে করছিল না, বারবার মনে হচ্ছিল আরেকটু থেকে যাই।

মেঘ টেলিভিশন ; ছবি কৃতজ্ঞতা : অনুপমা দেবনাথ 

ধীরে ধীরে মেঘ সরে যাচ্ছিল। এরপর শুরু হলো সবুজ দেখার পালা। যতদূর পর্যন্ত চোখ যায় শুধু সবুজ আর সবুজ। যেন সবুজের মেলা বসেছে। শুয়ে, বসে, দাঁড়িয়ে, দৌড়ে, হেঁটে সবুজ মন্থন চলছিল। এই ক্যানিয়নে এখনো ট্যুরিস্টদের থাকার কোনো ব্যবস্থা নেই। তাই প্রকৃতির রূপ এখানে আদি অকৃত্রিম রয়ে গেছে।

অপার মুগ্ধতা ; ছবি কৃতজ্ঞতা : নীল তোহা

এখানে এসে আমার মনে হয়েছিল মানুষ হয়ে জন্ম নেয়াটা কম সৌভাগ্যের ব্যাপার নয়! আর মেঘালয় এসে তো নিজেকে আরও বেশি সৌভাগ্যবান মনে হচ্ছিল। বিদায়ের পালা চলে এলো। মনটা রেখে এসেছি লাইতলুমের মেঘে। কখনো সময়-সুযোগ হলে আবার গিয়ে নিয়ে আসব।

ওয়াকাবা ঝর্ণা (Wakaba Falls):

এরপর আমরা চেরাপুঞ্জির দিকে রওনা দেই। মেঘালয়ে রাস্তার পাশে একটু পর পর ভিউ পয়েন্ট রয়েছে। এর কারণ হচ্ছে ঝর্ণার আধিক্য। ছোটবড় অনেক ঝর্ণা এখানেওখানে ছড়িয়েছিটিয়ে রয়েছে। এরকম একটা ভিউ পয়েন্টে নেমে গরম গরম নুডলস আর ভুট্টা খেয়ে নিলাম। গাড়িতে উঠেই কিছুক্ষণের মধ্যে পৌঁছে গেলাম ওয়াকাবা ঝর্ণা। এই ঝর্ণাটি নিচে থেকে, মাঝে থেকে এবং উপর থেকেও দেখা যায়। আমরা হাঁটতে হাঁটতে একবারে ঝর্ণার উপরে চলে গেলাম যেখান থেকে পানি পড়ছে।

ওয়াকাবা ঝর্ণা ; ছবি কৃতজ্ঞতা : অনুপমা দেবনাথ

ঝর্ণাটি যে পাহাড়ের অন্তর্গত সেটা বলতে গেলে পুরোই লাল পাথরে গড়া। আমরা যখন চূড়ায় গেলাম তখন মনে হচ্ছিল উপর থেকে লাল পানি পড়ছে কিন্তু পানি একদমই টলটলে পরিষ্কার। এখানেও কিছুক্ষণ চলল ঝর্ণায় অবগাহন।

সেভেন সিস্টার্স ঝর্ণা (Seven Sisters Falls):

এখানে কাছাকাছি সাতটি পাহাড় থেকে সাতটি ঝর্ণাকে একসাথে দেখা যায়। অনেকে বলে উত্তরপূর্ব ভারতের সাতটি অঙ্গরাজ্যের (আসাম, অরুণাচল প্রদেশ, মণিপুর, নাগাল্যান্ড, ত্রিপুরা, মিজোরাম এবং মেঘালয়) নামে এই ঝর্ণার নামকরণ করা হয়েছে।

সেভেন সিস্টার্স ঝর্ণা ; ছবি কৃতজ্ঞতা : অনুপমা দেবনাথ

এই সাতটি ঝর্ণা একসাথে দেখতে হলে আপনাকে অনেক কষ্ট করে অপেক্ষা করতে হবে। প্রায়ই মেঘে ঢেকে থাকে এই ঝর্ণাগুলো। আমরা কিছুক্ষণ থাকার পরই দেখতে পেলাম এই ঝর্ণাগুলো। সৌভাগ্য তখন হয়তো আমাদের আশেপাশেই অপেক্ষা করেছিল!

নোহ্কালিকাই ঝর্ণা (Nohkalikai Falls) :

এই ঝর্ণাটি দেখলে মনে হবে অনেক উঁচু থেকে হঠাৎ করে একগুচ্ছ পানি নিচে ঝাঁপ দিচ্ছে। আসল ঘটনাও তাই। এভাবে পানি কোনো বাধা না পেয়ে সরাসরি নিচে পড়ে সেখানে একটি সবুজ লেকের মতো সৃষ্টি করেছে। এত যে সুন্দর লাগে দেখতে যে অপলক নয়নে শুধু দেখছিলামই। সরাসরি পানি নিচে পড়ার ক্ষেত্রে একে ভারতের সবচেয়ে উঁচু ঝর্ণা বলা হয়ে থাকে।

নোহ্কালিকাই ঝর্ণা ; ছবি কৃতজ্ঞতা : অনুপমা দেবনাথ

এই ঝর্ণাটিকে ঘিরে একটা উপকথা প্রচলিত রয়েছে। লিকাই নামে এক নারী তার ছোট্ট মেয়ে নিয়ে ঝর্ণার উপরের দিকে একটি গ্রামে বসবাস করত। খাসি অধিবাসীদের মধ্যে মেয়েদের ক্ষেত্রে নামের আগে ‘কা’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। তো কা-লিকাই এর প্রথম স্বামী মারা যাওয়ার পর দ্বিতীয় বিয়ে করলেন। কা-লিকাই সারাদিন বাইরে কাজ করতেন আর ঘরে এসে মেয়েকে সময় দিতেন। এতে তার দ্বিতীয় স্বামী হিংসার কারণে ছোট্ট মেয়েটিকে মেরে তার মাংস রেঁধে কা-লিকাইকে খেতে দেয়। কা-লিকাই পরে তা জানতে পারেন এবং রাগে-দুঃখে আর নিজের অক্ষমতায় ঝর্ণার উপর থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। তখন থেকেই ঝর্ণাটির নাম হয় নোহ্কালিকাই। এই ঘটনাটি ঝর্ণার পাশের সাইনবোর্ডে লেখা ছিল।

দিনশেষে কা-লিকাই এর দুঃখ আমাদেরকে বিষণ্ণ করে তুলেছিল। দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে ফিরে চললাম হোটেলের পানে।  

 (চলবে)

ফিচার ইমেজ- নীল তোহা

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

পরিবারের সবার সাথে ফ্যান্টাসি কিংডমে একদিন

৭টি পরিচিত স্থান যার গোপন তথ্য আপনি জানেন না