কলকাতা ও ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে ঘোরাঘুরি

কলকাতায় যাবার পর ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল ঘোরেনি এমন লোক খুব কমই আছে। যেসব স্থাপনা ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ইতিহাস বয়ে বেড়াচ্ছে তার মধ্যে কলকাতার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল অন্যতম একটি স্থাপনা। এটি ভারতের অমূল্য একটি ঐতিহ্য, যা দেশি-বিদেশি পর্যটককে আকর্ষণ করে আসছে বহু বছর ধরে।

আমি কলকাতা ভ্রমণে গেলে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল থেকে ঘুরে আসার চেষ্টা করি প্রতিবারই, কখনো এটি পুরনো মনে হয় না। বার বার দেখা সত্বেও ভালো লাগে শ্বেত পাথরে গড়া এই বিশাল ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে।

কলকাতার পথঘাট। ছবিঃ লেখক

প্রথমবারের মতো কলকাতা শহরে ঘোরাঘুরি করছি সেবার। তেমন কিছু চিনি না বললেই চলে। কাছে আবার কোনো স্মার্টফোন নেই বলে লোকেশন বা গুগল ম্যাপ দেখে ঠিক করতে পারছি না কোন দিকে যাব বা কী করব। তাই একা একা পুলিশ বা রাস্তার পথচারীদের কাছে শুনে শুনে এদিক-ওদিক এগোচ্ছিলাম হাঁটতে হাঁটতে। কোথায় চলে গিয়েছি জানি না, হঠাৎ মনে পড়লো সদ্দার স্ট্রিটে গ্রাফিতির ছবি দেখেছিলাম। গ্রাফিতির ছবি বরাবরই আমার বেশ ভালো লাগত।

সদ্দার স্ট্রিটের গ্রাফিতি। ছবিঃ লেখক

তাই আর দেরি না করে বাসে উঠে পড়লাম। কলকাতা শহরে ঢাকা শহরের মতো মাঝে মাঝে পড়তে হয় প্রচণ্ড জ্যামের মধ্যে। গাড়িতে ওঠার প্রায় ৪০ মিনিট পর আমাকে পার্ক স্ট্রিট মেট্রো স্টেশনের পাশে নামিয়ে দেওয়া হলো। বন্ধু অনির্বানের ফোন পেলাম নামার সাথে সাথেই। সে ওই এলাকাতে নাকি ঘোরাঘুরি করছে বলল। তাকে আসতে বলে দাঁড়িয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ। কলকাতার আলাদা জীবন-যাপন দেখতে খুব বেশি খারাপ লাগে না। তাই ২০ মিনিট দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক করার পর দেখলাম বন্ধু সামনের দিকে এগিয়ে আসছে।

ওকে নিয়ে প্রথমে চলে গেলাম সদ্দার স্ট্রিট। রাস্তার পাশে দেখলাম সবখানেই রঙবেরঙের তুলির আঁচড় কাটা বিভিন্ন সাংকেতিক ছবি। বেশ কিছু ধর্মীয় গ্রাফিতিও চোখে পড়লো। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই প্রচণ্ড বৃষ্টি শুরু হলো। কলকাতার বৃষ্টি দেখতে বরাবরই ভালো লাগে, কিন্তু ঘণ্টাখানেক আটকে থাকার পর দম বন্ধ লাগছিল। বৃষ্টি ছাড়ানোর পর আমরা হাঁটতে হাঁটতে রওনা হলাম ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের দিকে।

সদ্দার স্ট্রিটের গ্রাফিতি। ছবিঃ লেখক

এখান থেকে খুব বেশি দূরে ছিল না বলেই হেঁটে হেঁটে পৌঁছাতে সময় বেশ কমই লাগলো। কুইন্স ওয়েতে এসে পড়তেই দূর থেকে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের শ্বেত পাথরে গড়া বিশাল স্তম্ভটি চোখে পড়লো। প্রথমবার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে এসেছি, সাথে আমার বন্ধু অনির্বাণ। ও কলকাতাতেই থাকে কিন্তু সেও এই প্রথম কলকাতায় এসে আমার সাথে ঘোরাঘুরি করছে। তাই যা কিছু ম্যানেজ করার ওর ফোন দেখে দেখে আমাকে করতে হচ্ছিল। কারণ কলকাতা সম্পর্কে জ্ঞান নেই বললেই চলে।  

ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সামনে যখন দাঁড়ালাম তখন প্রথমেই শুনতে পেলাম আজ ভেতরের মিউজিয়ামটা বন্ধ। তখন মিউজিয়ামের সংস্কারের কাজ চলছিল এছাড়া কয়েকশো বছরের পুরনো এই দালানের অবকাঠামোগত মেরামতও চলছিল খেয়াল করলাম। বিদেশীদের জন্য এই পার্ক এবং মিউজিয়ামের ভেতর ঢোকার ফি ৩০০ রুপীর মতো। কাছে খুব বেশি টাকা পয়সা না থাকায় বেশ চিন্তিত হয়ে অনির্বাণকে বললাম যা তুই দেখ। কীভাবে জানি ও ২০ টাকা করে ৪০ টাকা দিয়ে দুটো টিকিট কেটে নিয়ে আসলো।

ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সামনে। ছবিঃ অনির্বান বিশ্বাস

টিকিট দিয়ে আমরা ঢুকে পড়লাম ভিক্টোরিয়া পার্কের ভেতর। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল এবং এর পার্কটি মূলত বর্তমান একটি স্মৃতিসৌধ হিসেবে রয়েছে। ইংল্যান্ডের রানী ভিক্টোরিয়া ভারতেশ্বরী খেতাব পাওয়ার পর ১৯০৬ সাল থেকে ১৯২১ সালের ভেতর এই ভবনটি নির্মাণ করেন। এর বাইরে রয়েছে বেশ বিশাল একটি প্রশস্ত বাগান যেখানে ঘাসের মাঠের ভেতরে বসে উপভোগ করা যায় এর অবকাঠামোগত নির্মাণ এবং বিকেলের প্রকৃতি। বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন এবং স্নিগ্ধ লাগছিল চারপাশটা। শত বছরের পুরনো এই বিশাল সাদা দালানটি দেখে ভালো লাগছিল মনের মধ্যে কারণ, প্রাচীন স্থাপনা দেখতেই বরাবরই আমার বেশ ভালো লাগে।

মেমোরিয়ালের সামনের পাথুরে ফলক। ছবিঃ লেখক

সাদা মার্বেল পাথরের পুরো দালানটির সামনে রয়েছে বিশাল একটি মূর্তি। এর পাশ দিয়ে যেতে হয় মূল ভবনটিতে। শোনা যায় ব্রিটিশ শাসনকালে রানী ভিক্টোরিয়া এখান থেকে শাসন করেছেন ভারতবর্ষ। তাই এই জায়গাটির গুরুত্ব ভারতীয়দের কাছে বেশ ইতিহাস-সমৃদ্ধ। পরবর্তীতে যখন ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের জাদুঘরে ঢুকেছি তখন দেখেছি প্রাচীন ভারতের শাসনামলে ব্যবহৃত রাজ রাজাদের ব্যবহৃত বিভিন্ন নথিপত্র, আসবাবপত্র, পোশাক-আশাক এবং তাদের প্রাচুর্যময় জীবনযাপনের বেশ কিছু চিত্র।

ভিক্টোরিয়া পার্ক। ছবিঃ অনির্বান বিশ্বাস

এর বাইরে বাগানটিও আলাদাভাবে নকশা করা। এই বাগানের মাঝখান দিয়ে হাঁটার জন্য রয়েছে অজস্র সরু পথ এবং বসে থাকার জন্য রয়েছে ঘাসের ছোট-বড় অনেকগুলো মাঠ। ভিক্টোরিয়া স্মৃতিসৌধের উত্তর দিকে অবস্থিত কুইন্স ওয়ে, ডান্সিং ফাউন্টেন, তারপর বিস্তীর্ণ ব্রিগেড প্যারেড ময়দান; দক্ষিণে আচার্য জগদীশচন্দ্র বোস রোড এবং তারপর সেঠ সুখলাল কারনানি ওরফে পিজি হাসপাতাল।

পূর্বের দিকে রয়েছে কলকাতার বিখ্যাত সেন্ট পলস্ ক্যাথিড্রাল গির্জা, বিড়লা তারামণ্ডল, অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টস এবং রবীন্দ্র সদন। আর পশ্চিমে কলকাতা রেসকোর্স ময়দান। স্মৃতিসোধ ভবনের উত্তর এবং দক্ষিণ দু-দিকেই বিশাল ফটক।

মেমোরিয়ালের প্রধান ভবন। ছবিঃ লেখক

উত্তর ফটক থেকে ভবন পর্যন্ত চওড়া রাস্তার দুদিকে দুই প্রকাণ্ড জলাধারগুলো একাধারে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে এবং সঙ্গে সঙ্গে স্থাপত্যশৈলির মনোরম শোভা বর্ধন করে। যে দৃশ্য চাক্ষুষ করে অথবা লেন্সবন্দি করে সব বয়সের প্রেমিক-প্রেমিকাই রীতিমতো নস্টালজিক হয়ে যায়!

প্রথম দিনে চারপাশটা ঘুরতে ঘুরতে প্রায় ঘণ্টা দুয়েকের মতো সময় লেগে গিয়েছিল। তাই আর বেশিক্ষণ থাকতে পারলাম না। তাছাড়া সন্ধ্যের আলো পড়ে আসছিল বলে আমাদেরও ফেরার তাড়া ছিল সেদিনের মতো। আমরা সেদিন বিকেলে প্রাচীন ভারতের অন্যতম ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে ঘরে ফিরে গেলাম।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সুন্দরবনে এক বিকেল: কটকা সী বীচ ও শুঁটকি পল্লীতে

তিন ঘণ্টার নাইকির গল্প!