দুই দিন এক রাতের ছোট ট্রিপে ঘুরে আসুন হাওরের রানী অষ্টগ্রামে

এক লাখ সাতচল্লিশ হাজার পাঁচ শত সত্তর বর্গকিলোমিটারের ছোট্ট এই দেশটায় মাকড়সার জালের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে জলাধার যাদের মধ্যে অন্যতম হলো হাওর। বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যানুসারে দেশে মোট ৪১৪টি হাওর রয়েছে, তবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের হিসাবানুসারে হাওরের সংখ্যা ৪২৩টি।

অষ্টগ্রাম হাওর; সোর্সঃ adarbepari.com

বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকেই মূলত হাওরাঞ্চল বলা হলেও মধ্যাঞ্চলে কিশোরগঞ্জ জেলার বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে রয়েছে অনেক হাওর। কিশোরগঞ্জের ১৩টি উপজেলার মধ্যে নিকলী, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও ইটনা বন্যাপ্রবন হাওর অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। তবে এগুলোর মধ্যে অধিক রূপ সৌন্দর্যের অধিকারী অষ্টগ্রামকে হাওরের রানী বলা হয়। আজ এই অষ্টগ্রাম হাওর ভ্রমণের আদ্যোপান্ত বর্ণনা করব।

হাওরের বুকে এক টুকরো বাড়ি; সোর্সঃ লেখক

অষ্টগ্রাম হাওর

হাকালুকি ও টাঙ্গুয়ারের পাশেই অবস্থিত অষ্টগ্রাম হাওর। কিশোরগঞ্জ জেলার অষ্টগ্রাম উপজেলা প্রায় সারা বছরই বিশাল হাওর দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকে। যেখানে দ্বীপের মতো দেখা যায় ছোট ছোট কয়েকটি গ্রাম। অষ্টগ্রাম হাওর নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ এবং সুনামগঞ্জ জেলার হাওরগুলোর সাথে সংযুক্ত হয়েছে। অষ্টগ্রাম হাওর ভ্রমণের সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হলো বর্ষাকাল। এই সময়ে আপনি বিনা বাধাতেই এক হাওর থেকে অন্য হাওরে চলে যেতে পারবেন ট্রলার কিংবা লঞ্চ দিয়ে।

যেভাবে যাবেন

বাসে যেতে চাইলে ঢাকার গুলিস্তান ফুলবাড়িয়া কাউন্টার থেকে বিআরটিসি বাসে করে কুলিয়ারচর নামতে হবে। ভাড়া ২০০ টাকা। কুলিয়াrচর নেমে ৫ টাকা অটো ভাড়া দিয়ে লঞ্চঘাট যেতে হবে।

শুকনো মৌসুমে চাইলে সড়ক পথে কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর হয়ে অষ্টগ্রাম যেতে পারেন। বেশ ঝামেলাপূর্ণ হওয়ায় এই র‍্যুটে না যাওয়াই ভালো।

অষ্টগ্রাম উপজেলা; সোর্সঃ poriborton.com

তবে সবচেয়ে ভালো হয় ট্রেনে যেতে পারলে। ঢাকা থেকে প্রতিদিন এগারো সিন্দুর প্রভাতী ৭:১৫ মিনিটে (বুধবার বন্ধ) কিশোরগঞ্জের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। তবে আপনাকে কিশোরগঞ্জের আগেই কুলিয়াচর স্টেশনে নেমে যেতে হবে। ভাড়া ১১০ টাকা। সেখান থেকে রিকশা বা অটোতে করে লঞ্চ ঘাট যেতে ৫ মিনিট লাগে।

কুলিয়াচর লঞ্চঘাট থেকে সকাল ৬টা থেকে ঘণ্টায় ঘণ্টায় অষ্টগ্রামের উদ্দেশ্যে লঞ্চ ছেড়ে যায়। ভাড়া ৯০ টাকা। সময় লাগবে তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা। কিছুদিন পূর্বে এই র‍্যুটে স্পীড বোট চালু হয়েছে, এতে খুব দ্রুত অষ্টগ্রাম পৌঁছানো যায়। ভাড়া ২০০ টাকা।
তবে দল বেঁধে গেলে ট্রলার ভাড়া করে যাওয়াটাই সবচেয়ে ভালো হবে। এতে নিজেদের মতো করে চারদিকের রূপ সৌন্দর্য দেখে যেতে পারবেন।

হাওর পাড়ে গড়ে ওঠা অষ্টগ্রাম; সোর্সঃ poriborton.com

অষ্টগ্রাম উপজেলা

কিশোরগঞ্জ সদর থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হাওর বেষ্টিত অষ্টগ্রাম উপজেলা নিজ সৌন্দর্যের প্রাচুর্য নিয়ে ভেসে আছে স্বমহিমায়। হাওরে নৌকায় ঘুরে বেড়ানোর সময় আশেপাশের দ্বীপ সদৃশ ছোট ছোট গ্রামগুলোর চোখ জুড়ানো দৃশ্য মনেপ্রাণে এক অন্য ধরনের শান্তির অনুভূতি সৃষ্টি করে। ছবির মতো সুন্দর এসব প্রাকৃতিক দৃশ্য যতই দেখবেন অবাক হতে থাকবেন। হাওরের কিছু কিছু জায়গা এতটাই বিস্তৃত যে অপর পার দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যায়। এলোমেলো হিমশীতল বাতাস আর হাওরের স্বচ্ছ পানি, এক কথায় এখানটায় প্রকৃতিদেবী সবটা রূপ ঢেলে দিয়েছেন যেন।

অষ্টগ্রামের মানুষদের জীবিকা নির্বাহের অন্যতম মাধ্যম মাছ ধরা; সোর্সঃ ntvbd.com

তবে যতটা সুন্দর দেখায় এদের জীবনযাপন, আদতে ততটা সুন্দর নয়। এই অঞ্চল বছরের বেশিরভাগ সময় পানিতে নিমজ্জিত থাকায় ফসল উৎপাদন করা যায় কেবল একবার। তাই বেশির ভাগ পরিবার হাওরে মাছ ধরার উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে।

যা যা করবেন

হাওরে নৌকা দিয়ে ঘুরে বেড়ানো ছাড়াও এখানে আছে মুঘল আমলের স্থাপনা কুতুবশাহী মসজিদ। পাঁচ গম্বুজ বিশিষ্ট এই মসজিদটি প্রায় ৪০০ বছর পুরনো, যা অষ্টগ্রাম থানা সদরে অবস্থিত। মুঘল আমলের স্থাপনাশৈলীর এক অপরূপ নিদর্শন এই মসজিদটি ঘুরে দেখতে ভুলবেন না।

কুতুব শাহী মসজিদ; সোর্সঃ vromonguide.com

যেখানে থাকবেন

অষ্টগ্রামে থাকার জন্য তেমন ভালো কোনো আবাসিক হোটেলের ব্যবস্থা নেই। তবে জেলা পরিষদ ডাক বাংলোতে থাকতে পারেন নির্দ্বিধায়। ৩০০ টাকা থেকে শুরু করে ১,৫০০ টাকা পর্যন্ত রুমভেদে ভাড়া প্রযোজ্য এখানে। তবে আগে থেকে রুম বুকড করে যাওয়াটাই ভালো হবে।

ডাক বাংলো কেয়ারটেকারঃ 01914975389

এখানে আপনি চাইলে ক্যাম্প ফায়ার করে অন্যরকম পরিবেশে রাত্রিযাপন করতে পারেন। সদর থানার অনুমতি নিয়ে অষ্টগ্রাম বাজার কিংবা তার আশেপাশে এলাকায় স্থান নির্বাচন করে থাকতে পারেন। এক্ষেত্রে অবশ্যই মূল ভূখণ্ডের কাছাকাছি কোথাও ক্যাম্প ফায়ার করতে হবে। কারণ হাওর অঞ্চলের সাদাসিধে মানুষের আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে অনেক অপরাধপ্রবণ মানুষও। ক্যাম্পিং করার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ঢাকা থেকেই নিয়ে যেতে হবে।

হাওর জীবনকথা; সোর্সঃ poriborton.com

জোৎস্না রাতে হাওর বেষ্টিত এই অষ্টগ্রামে ক্যাম্প ফায়ারিং করে রাত্রিযাপন সত্যিই স্বর্গীয় অভিজ্ঞতা। চারপাশে বিশাল জলধারার মাঝে ভরা পূর্ণিমার আলো প্রতিফলিত হয়ে চারদিক এক অদ্ভুত আলো আঁধারিতে ছেঁয়ে যায়। অপার্থিব এই অভিজ্ঞতার স্বাদ পেতে হলে আপনাকে আগে থেকে পূর্ণিমা রাত্রির হিসেব কষে ট্যুর প্ল্যান করতে হবে।

যেখানে খাবেন

অষ্টগ্রাম গিয়ে বাবুলের হোটেলে দুপুরের খাবার খেয়ে নিতে পারেন। এক্ষেত্রে হাওরের টাটকা মাছ অবশ্যই খাবেন। সুস্বাদু ছোট বড় বাহারী রকমের মাছ পাওয়া যায় এখানে। তবে অষ্টগ্রাম পৌঁছে বাবুলের হোটেলে খাবার অর্ডার দিয়ে যাবেন। নাহলে খাবার না পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

যেখানেই তাকাই না কেন, শুধু পানি আর পানি; সোর্সঃ লেখক

রাতে ক্যাম্প ফায়ারে নিজেরাই স্থানীয় বাজার থেকে বাজার করে খাবার রান্না করতে পারেন। নতুবা বাবুলের দোকানেই রাতের খাবারের অর্ডার করে যেতে পারেন।
এখানে বলে রাখি অষ্টগ্রামের পনির বাংলাদেশের সেরা পনিরগুলোর একটি। তাই এখান থেকে পনির নিয়ে যেতে ভুলবেন না। সাথে বড় বড় মিষ্টি মুরোলি খেতে ভুলবেন না।

এখানে বলে রাখা ভালো, সন্ধ্যার পর হাওরে নৌকা নিয়ে না ঘোরাটাই ভালো। স্থানীয়দের থেকে জিজ্ঞেস করে বেশ কিছু ডাকাতির খবর শোনা যায় এখানে।

পরেরদিন সকালে নাস্তা করে লঞ্চে করে কুলিয়াচর চলে আসুন। সেখান থেকে ট্রেনে অথবা বাসে করে ঢাকা।

দ্বীপ সদৃশ অষ্টগ্রামের ছোট ছোট গ্রাম; সোর্সঃ ntvbd.com

বিঃদ্রঃ হাওর অঞ্চলের এই মানুষগুলো খুব সহজসরল জীবনযাপনে অভ্যস্থ। তাই তাদের সমস্যা হয় এমন কোনো কাজ করবেন না। যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলে প্রকৃতির অপূরণীয় ক্ষতিসাধন থেকে নিজে বিরত থাকুন ও অন্যকে বিরত থাকতে উৎসাহিত করুন। ক্যাম্প ফায়ার করলে সকালে নিজেরাই সব পরিষ্কার করে গুছিয়ে নিয়ে আসুন।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আল্পাইন পর্বতমালার দেশ অস্ট্রিয়ার দুর্দান্ত সব ভ্রমণস্থানের গল্প

শীতের হিমালয় ও ব্যাকপ্যাকিং চেকলিস্ট