খৈয়াছড়ায় র‌্যাপলিং অ্যাডভেঞ্চার

বাংলাদেশে যে সব ঝর্ণা আছে তার মধ্যে অন্যতম সুন্দর ঝর্ণা হচ্ছে খৈয়াছড়া। লোকালয়ের খুব কাছে এ ঝর্ণাটি দীর্ঘদিন লোকচক্ষুর আড়ালে ছিল। আসলে স্থানীয়রা আগে থেকেই চিনত, যেত। কিন্তু সারাদেশে জনপ্রিয়তা পায় ফেসবুকের সুবাদে, আজ থেকে ৪-৫ বছর আগে।

চট্টগ্রামের উপজেলা মিরসরাইয়ে এ ঝর্ণার অবস্থান। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক বড়তাকিয়া বাজারের কাছে নেমে সেখান থেকে সিএনজিতে আরও এক কি.মি. ভেতরে যাওয়া যায়। তারপর বাকি ৩ কিলোমিটারের মতো ট্রেক করে যেতে হয়। খৈয়াছড়া ট্রেকিং বেশ সহজ, তাই নতুনরাও অহরহ এখানে আসে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ছবি লেখক

ঝর্ণাটির মূল ধাপ নয়টি। এছাড়া অপ্রধান আরও অনেকগুলো ধাপ আছে। প্রধান ধাপটিতেই সবচেয়ে বেশি লোকজন আসে এবং এখান থেকেই ফিরে যায়। বাকি ধাপগুলোতে যাওয়া কিন্তু সহজ নয়। উপরের দিকে শেষ ধাপ পর্যন্ত যেতে হলো ভালোই কাঠখড় পোড়াতে হয়।

আমি বেশ কয়েকবার এ ঝর্ণায় গিয়েছি। কিন্তু সব সময় শেষ ধাপেই যাওয়া হয়েছে। উপরের ধাপগুলোতে ওঠার মতো সময় পাইনি। তাই মাহি ভাই যখন প্রস্তাব দিলো খৈয়াছড়াতে র‌্যাপলিং করতে যেতে, সাথে সাথে রাজি হয়ে গেলাম। কারণ র‌্যাপলিং করতে হবে উপরের কোনো একটি ধাপ থেকে যেটি ৪০ ফিটের মতো হবে।

ঝর্ণার এ অংশটায় বেশি সুন্দর লাগে ছবি লেখক

র‌্যাপলিং সম্পর্কে কিছু বলা দরকার। পর্বতের পাথুরে অংশে ওঠানামার জন্য অনেক সময় পর্বতারোহিদের জুমারিং ও র‌্যাপলিং করে নামতে ও উঠতে হয়। র‌্যাপলিং করার জন্য আধুনিক রোপ, হার্নেস, ডিসেন্ডার ডিভাইস ব্যবহার করা হয়। এগুলো দিয়ে ওই রশি ধরেই নিয়ন্ত্রিতভাবে খুব খাড়া জায়গা থেকে নামা যায়।

চট্টগ্রাম থেকে সকালে রওনা দিয়ে আমরা বড়তাকিয়া পৌঁছে গেলাম মাত্র দেড় ঘণ্টায়। গাড়িতেই রাস্তা থেকে ছড়া পর্যন্ত যাওয়া গেল। এরপর আমরা র‌্যাপলিংয়ের সব জিনিসপত্র নিয়ে নিয়ে নেমে পড়লাম। বাকি পথ এগুলো বহন করে নিয়ে যেতে হবে। অবশ্য দলে বেশ ভারী আমরা। আজকের র‌্যাপলিং প্রশিক্ষণে অংশ নেবে এ জাতীয় উদ্যানের সব গাইড। সংখ্যায় ২০ জনের মতো।

এরকম পথ ধরে সহজেই চলে যেতে পারবেন ঝর্ণায় ছবি লেখক

খৈয়াছড়ার তিন কিলোমিটার ট্রেইল শেষ করে আমরা মূল ধাপে পৌঁছালাম। এবার আসল পরীক্ষা। উপরে উঠে সুবিধামতো একটা জায়গা খুঁজে বের করতে হবে যেটা থেকে র‌্যাপলিং করে নামা যাবে। উপর ওঠার রাস্তায় কেউ দড়ি বেঁধে রেখেছে আগে থেকে। সুতরাং এ ধাপ দড়ি ধরে সহজেই পার হয়ে যেতে পারলাম।

উপরে উঠে যে ধাপটা সামনে পড়েছে  সেটাতেই সবচেয়ে বেশি বার র‌্যাপলিং করা হয়েছে। কেন যেন জায়গাটা পছন্দ হচ্ছিল না আমাদের। তাই আরও উপরে ওঠার সিদ্ধান্ত নিলাম। গত রাতেও প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে। ট্রেইলগুলো মারাত্মক পিচ্ছিল হয়ে আছে। প্রথম পরীক্ষাটা হচ্ছে ঝর্ণার পাশ দিয়ে ছোট্ট মাত্র এক ফিট মতো পাথরের ঢালের কার্ণিশ দিয়ে পার হয়ে আসতে হবে।

উপরের ধাপে পৌছাতে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে ছবি লেখক

মূল ঝর্ণা থেকে পানির স্রোত এদিক দিয়েও প্রবাহিত হচ্ছে (ভিডিও দ্রষ্টব্য)। এ জায়গা দিয়ে পার হতে একটু ভয়ই লাগছিল। তবে সফলভাবে পার হতে পারলাম। এর পরের ধাপে ওঠার জায়গায় মোটামুটি কষ্ট ছাড়াই ওঠা গেল। মাঝে মধ্যে গাছের শেকড়ের সাহায্য নিতে হলো অবশ্য। শেকড়গুলো ভালোই শক্ত, আমাদের ভার সহজেই বহন করতে পারলো।

শেষ যে ধাপটাই উঠতে ভালোই বেগ পেতে হলো। শেকড়ের উপরই পুরোপুরি ভরসা করে উঠতে হয়েছে। অনেক কষ্ট করে নির্ধারিত জায়গায় পৌঁছালাম। এ ধাপের পরে জায়গাটা পুরো সমতল। পেছনে ঝর্ণাটা পুকুরের মতো একটা ছোট্ট জায়গা থেকে বেয়ে আসছে। যেটা সবচেয়ে জরুরী দরকার, সেটা পাওয়া গেল। একটা শক্ত গাছ।

এই রোপের উপরেই ঝুলবে জীবন; ছবি- লেখক

মূল রোপ এখানে বাঁধা হবে। মাহি ভাই কাজে লেগে পড়লো বাকিদের নিয়ে। আমি আর ফাহিম একটু সামনে এগিয়ে পুকুরটার হাঁটু পানিতে কিছুক্ষণ ডোবাডোবি করে ফিরে আসলাম। এখানে এসে প্রথমেই নিচে ব্রিফিংয়ে বলে দেয়া হয়েছিল কোন ডিভাইসটা কীভাবে কাজ করবে এবং সেগুলো ব্যবহার করে আমরা নিচে নামবো।

অবশেষে প্রতীক্ষার পালা শেষ হলো। যেখান থেকে আমরা নামবো সেখানে মোট দুটো রোপ লাগানো হয়েছে। হার্নেস পরে নিলাম আমি। নিচে তাকিয়ে মোটামুটি ভয়ই পেয়ে গেলাম। মারাত্মক পিচ্ছিল ঝর্ণার ঢাল। একেবারে ৮৫ ডিগ্রী খাড়া। নিচে দলের দুজন দাঁড়িয়ে আছে, যারা আগে নেমেছে। বাকিদের সাহায্য করবে।

কি করতে হবে বুঝিয়ে দিচ্ছে প্রশিক্ষক মাহি ছবি লেখক

অন্তত ৪ তলার বেশি উঁচু মনে হচ্ছে। যখন আমাকে হেলমেট আর হার্নেস পরিয়ে ঢালের কাছে আনা হলো তখন ভালোই নার্ভাস লাগছিল। একটা কারণ হচ্ছে আমাকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে সামনের দিকে, ঢালের যে অংশ দিয়ে নামবো সেটা বেশ পিচ্ছিল। আমার আগে একজন নামতে গিয়ে আছাড় খেয়ে পড়েছে শুরুতেই, পরে আর নামেনি।

যাই হোক শুরু হলো নামা। কোমরের কাছে রোপটা পেঁচিয়ে বিলে ডিভাইসের সাথে লাগানো ছিল। সেটাকেই সাবধানে একটু একটু করে ছেড়ে দিয়ে আরেক হাতে রোপটা ধরে রেখে নামতে শুরু করলাম। সাফল্যের সাথেই মারাত্মক পিচ্ছিল অংশটা পাড়ি দিয়ে আরেকটু নিচে নামলাম। কী মনে করে নিচের দিকেই তাকিয়েই মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠলো। জীবন ঝুলছে এ রোপের উপরই।

এভাবেই ঝর্ণার পানি আর পিচ্ছি পাথরের খাড়া ঢাল বেয়ে নামতে হয় ছবি লেখক

এদিকে ঝর্ণার পানির তোড়ে চোখ খুলে রাখতে পারছি না। এমনভাবে পানি আসছে যেন ভাসিয়ে নিয়ে যাবে আমাকে। তারপর ঘটল ভয়াবহ ঘটনাটা, এতক্ষণে প্রায় দশফিট নেমে এসেছিলাম। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ঝর্ণার পাথুরে দেয়ালে গিয়ে বাড়ি খেলাম। আতংকের স্রোত বয়ে গেল আমার ঘাড় বেয়ে। দঁড়িতে পেন্ডুলামের মতো ঘুরে আমি পাশের ঝোপঝাড়ে বাড়ি খেয়ে আবার  আগের জায়গায় ফিরে আসলাম।

খৈয়াছড়া র‌্যাপেলিংয়ের পুরো ভিডিও সোর্স লেখক

এরপর আর কোনো সমস্যা হলো না, তরতর করে বাকিটুকু জায়গা নেমে আসলাম। আসলে বাড়ি খাওয়ার পর যখন বুঝলাম রোপে ঠিকভাবেই ঝুলে আছি তাতে সাহস বেড়ে গিয়েছিল, তাই নামতে আর কোনো সমস্যা হয়নি। কৌশলটাও এর ভেতরে ভালোমতো বুঝে ফেলেছি। কতটুকু দড়ি ছাড়তে হবে আর কতটুকু জোরে পা দিয়ে দেয়ালে ধাক্কা দিতে হবে, সেটার ভারসম্য ঠিক থাকলে বাকিটা সহজই।

এইটা বেয়ে নেমেছি ভাবতেই অবাক লগাছিলো, উপরে দেখা যাচ্ছে পরের ক্লাইম্বারদের ছবি লেখক

আমি নেমে নিজেকে মুক্ত করতে পারছিলাম না, পানির তোড়ে প্রায় কিছুই দেখা যায় না। তৎক্ষণাৎ নিচে যারা ছিল তারা এগিয়ে এসে আমাকে হার্নেসমুক্ত করে সেগুলো আবার অন্য দড়িতে বেঁধে উপরে পাঠিয়ে দিল। উপরে যারা আছে তারা এবার একে একে নামা শুরু করলো, আর আমরা নিচে বসে বসে দেখতে লাগলাম।

সবার শেষে নামলেন প্রশিক্ষক মাহি ছবি লেখক

খৈয়াছড়ায় র‌্যাপলিং অ্যাডভেঞ্চার নিয়মিত হয় না। তবে এখন অনেকগুলো গ্রুপ প্রতিবছরই আয়োজন করে যাচ্ছে। চট্টগ্রাম ভিত্তিক ভার্টিকাল ড্রিমারস প্রতি বছর বেশ কয়েকবার আয়োজন করে প্রশিক্ষণ সহ র‌্যাপেলিং-জুমারিংয়ের। এছাড়া কিছু ফেসবুক ভিত্তিক ভ্রমণ দল মাস্টার ট্রাভেলার, বৃত্ত ট্যুরিজম, ট্যুর গ্রুপ বাংলাদেশে আয়োজন করে থাকে এ অ্যাডভেঞ্চার।

ফিচার ইমেজ- লেখক

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

প্রকৃতির রহস্যময় সৃষ্টি 'আলুটিলা গুহা'

দুই দিন এক রাতে বিলাইছড়ির ধুপপানি, মুপ্পোছড়া ও ন'কাটা ঝর্ণার বাজেট ট্রিপ