খঞ্জনদীঘির পাড়ে খানিয়াদীঘি রাজবিবি মসজিদ

চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমরা কোন কোন জায়গায় ঘুরবো, তা বলে দিয়েছিলাম আমাদের রিজার্ভ করা হায়েস চালককে। তিনি আমাদের প্রথমেই নিয়ে গেলেন খানিয়াদিঘী রাজবিবি মসজিদে। এই মসজিদটিকে চামচিকা মসজিদও বলা হয়। চামচিকা মসজিদের নামকরণের কারণ হিসেবে ধারণা করা হয়, বর্তমান ভারতে অবস্থিত বড় চামচিকা মসজিদের আদলেই এটি তৈরি । মসজিদে এসে দেখি অনেক লোকসমাগম।

এত ভিড় আশা করিনি বেলা এগারোটায়। মসজিদটি ছোট হলেও অসম্ভব সুন্দর। উপরে বড় একটা গম্বুজ। বড় গম্বুজের চারপাশে তিনটা করে ছোট গম্বুজ ঘিরে রেখেছে। ইটা লালচে রঙের মসজিদটির চারটি দেয়ালেই টেরাকোটা করা। এছাড়াও দেয়ালের উপরের লাইনিংয়ের কারুকাজেও রয়েছে টেরাকোটা।

মসজিদে মেয়েরাও সালাত আদায় করতে পারে। ভেতরটা দেখতেও যেতে পারে চাইলে। তবে ভেতরে যেতে হলে অবশ্যই পর্দা করে যেতে হবে। মসজিদ কর্তৃপক্ষ থেকে লিখিত একটি সাইনবোর্ডে এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া আছে।

বিশালাকার থাম। Source : তাসমি

মসজিদের ভেতরটাও খুব সুন্দর। বাইরে থেকে মূল গম্বুজটি দেখে তো ভালো লেগেছেই, ভেতরে ঢুকেও চমকে গেছি। কারণ উপরের বড় গম্বুজটি মোটেও নিরেট নয়।। ফাঁপা। ভেতরে ঢুকে তাই দেখলাম, মসজিদের ছাদ অনেক উপরে। গম্বুজটির নিচের ইমারত বর্গাকারে তৈরি করা হয়েছে। এই বর্গের প্রত্যেক বাহুর দৈর্ঘ্য ২৮ ফুট। আমি যে গম্বুজ নিয়ে কথা বলছি, সেটি মসজিদের ছাদের ঠিক মধ্যখানে অবস্থিত।

আবছা আলো আধারির সৃষ্টি হয়েছে ভেতরটায়। বাইরের তীব্র রোদ যেন স্পর্শ করতে পারছে না মসজিদটিকে। বেশ ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা একটা অনুভূতি পাওয়া যায়। বিশালাকার গম্বুজটির কারণেই হয়তো। এছাড়াও মসজিদের দেয়ালের পরিধি এত মোটা যে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কুকুর মরা গরমেও ঠাণ্ডা পরিবেশ থাকে।

গম্বুজওয়ালা ছাদ। Source : রিসাত

নির্মাণকাজ সম্পন্ন হবার পর চামচিকা মসজিদের ক্ষেত্রফল ছিল ৬,২৪২ ফুট। মসজিদে মোট দুটো কক্ষ। প্রথমেই ছোট কক্ষটি। আসলে বড় কক্ষটির পূর্ব দিকে একটি টানা বারান্দা মতোন আছে। এটিকেই কক্ষ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ওখানে কিছু মহিলাকে নামাজ পড়তে দেখলাম। নামাজের সময় হয়নি তখনো। হয়তো নফল নামাজ পড়ছে।

ইভা আমাকে জিজ্ঞেস করলো, ‘নামাজ পড়বি?’

আমি বললাম, ‘আজানই তো দেয়নি, কী নামাজ পড়বো?’ তাছাড়া এখানে যে মহিলারা নামাজ পড়ছে, কোনো পর্দার ব্যবস্থা নেই। তাই ঠিক নফল নামাজ পড়ার জন্য ইচ্ছে জাগলো না।

বেরিয়ে পড়লাম কিছুক্ষণ পরই। এরকম কোনো ধর্মীয় উপাসনালয়ে এলে যেমন শান্তির অনুভূতি হয়, তেমনি কেমন যেন একটা ভয় ভয়ও লাগে।

অভ্যন্তরীণ কারুকাজ। Source : রিসাত

বাইরে বেরিয়ে পোড়ামাটির ইটের তৈরি মসজিদটি ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম। টেরাকোটাগুলো হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখতে দেখতে ভাবছিলাম, বাঘা মসজিদের টেরাকোটা এত বিখ্যাত, অথচ এই মসজিদের টেরাকোটার কথা তো শুনিনি! খানিয়াদীঘির মসজিদ কখন নির্মিত হয়েছিল এবং কে নির্মাণ করেছিলেন সে সম্পর্কে কিছুই জানা যায় না। তবে এই টেরাকোটা, পোড়ামাটির ইট আর গম্বুজ তৈরির নমুনা দেখে পণ্ডিতেরা অনুমান করেন, এটি পনেরো শতকে নির্মাণ করা হয়েছিল।

এই মসজিদটির অনেক নাম। খানিয়াদীঘি রাজবিবি মসজিদ, চামচিকা মসজিদ নাম ছাড়াও মসজিদটিকে খঞ্জনদীঘি আর রাজবিবি মসজিদও ডাকা হয়। কারণ এই মসজিদের পূর্বদিকে ৬০ বিঘা আয়তনের খঞ্জনদীঘি নামে একটি বড় দীঘি রয়েছে।

খঞ্জনদীঘি Source : রিসাত

বহুকাল ধরে মসজিদটি জঙ্গলের ভেতর অনাদরে পড়েছিল। অল্প কিছুদিন আগে লোকবসতি বাড়ার পর জঙ্গল কমে গেলে, মসজিদটি মানুষের চোখে পড়ে। কিন্তু দীর্ঘদিন অব্যবহৃত ও অযত্নে থাকায় মসজিদটি প্রায় শেষ অবস্থায় এসে পৌঁছেছিল। বর্তমানে প্রত্মতত্ত্ব বিভাগের হস্তক্ষেপে মসজিদটিকে ব্যবহার ও দর্শন উপযোগী করা হয়েছে।

প্রত্মতত্ত্ব বিভাগ যখন মসজিদটির দায়িত্ব নিয়েছিল, তখন একটি মাত্র গম্বুজ ও দেয়ালের কিছু কিছু অংশ কোনোরকমে টিকে ছিল। এগুলোর অবস্থাও ছিল খুব জীর্ণ। অথচ এখন পুরো মসজিদটিই অসম্ভব সুন্দর পুরাকীর্তিতে পরিণত হয়েছে।

কীভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে রাজশাহী হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের দূরত্ব ৩১৯.৪ কিলোমিটার। চাঁপাইনবাবগঞ্জ যাওয়ার দুটো পথ আছে। সড়কপথ আর রেলপথ। সড়কপথে যেতে হলে ঢাকার যেকোনো স্থান থেকে আপনাকে প্রথমে যেতে হবে- সায়েদাবাদ, গাবতলি কিংবা উত্তরা। এসব জায়গা থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ যেতে পারবেন এসি বা ননএসি বাসে।

নন এসি বাসগুলো হলো- হানিফ, শ্যামলী, দেশ ট্রাভেলস, একতা, গ্রামীণ ট্রাভেলস, সৌদিয়া, ন্যাশনাল, তুহিন, আকিব ইত্যাদি। ভাড়া পড়বে ৫৮০ টাকা। বাসে অন্তত সাড়ে সাত ঘণ্টা লাগবে। জ্যামে পড়লে, আরোও বেশি।

টেরাকোটা।  Source : ইভা

ট্রেনে যেতে হলে আগে থেকেই টিকিট কেটে রাখতে হবে। কমলাপুর কিংবা এয়ারপোর্ট থেকে ট্রেনে উঠতে পারবেন। ভাড়া ৩৮০ টাকা। ট্রেনের নাম পদ্মা। বেশ ভালো ট্রেন। কমবেশি সাত ঘণ্টায় পৌঁছে যাবেন।

তারপর চাঁপাইনবাবগঞ্জ টার্মিনাল থেকে সিএনজি কিংবা অটোয় শিবগঞ্জের খানিয়াদীঘি রাজবিবি মসজিদে চলে যেতে পারবেন। শহর থেকে শিবগঞ্জ লোকাল বাসেও যেতে পারবেন। বাসের মধ্যে আছে গৌড় সার্ভিস। এটায় গেলে ভাড়া পড়বে ২০ টাকা করে। লোকসংখ্যা বেশি হলে সারাদিন ঘোরার জন্য আমাদের মতো হায়েস ভাড়া করে নিতে পারেন। এসি হায়েস ২,৫০০ টাকা সারাদিন, নন এসি ২,০০০ করে পড়বে।

কোথায় থাকবেন

যদি একদিনের ট্যুর প্ল্যান করেন, তাহলে রাতের ট্রেন বা বাসে গিয়ে সারাদিন ঘুরে রাতেই ফিরতে পারবেন। তখন ওখানে থাকার চিন্তা না করলেও হবে। এরপরও যদি আপনি চাঁপাইনবাবগঞ্জে রাত্রিযাপন করতে চান সেক্ষেত্রে আপনার জন্য রয়েছে খুব ভালো একটা অপশন। বড় ইন্দারা মোড়ে পাবেন একটা তিন তারা আবাসিক হোটেল। নাম, স্কাই ভিউ ইন।

এছাড়াও আছে আল নাহিদ হোটেল, আল হেরা হোটেল, সোনা মসজিদ হোটেল, থ্রি স্টার হোটেল, লাল বোর্ডিং। তাছাড়া সরকারি ডাকবাংলো আর রেস্ট হাউস রয়েছে থাকার জন্য। সরকারি ডাকবাংলো শহরের সদর হাসপাতালের কাছেই। অন্যান্য হোটেলগুলো সব শহরের মধ্যেই।

খানিয়াদীঘি রাজবিবি মসজিদ। Source : ইভা

কেবল সোনা মসজিদ হোটেলটি সোনা মসজিদের কাছে। এসব হোটেলের ভাড়ার রেঞ্জ এসি ১,০০০ থেকে শুরু এবং নন এসি ৬০০ টাকা থেকে শুরু।

সতর্কতা

পুরাকীর্তি আমাদের সম্পদ। সেসব দেখতে গিয়ে আশেপাশে ময়লা ফেলে আসবেন না। দালানে নিজের নাম লিখে আসবেন না। নিজের দেশকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখুন। নিজে না শুধরালে, অন্যজনের কাছে তা আশা করা বোকামি। আপনি নিজেই যদি দর্শনীয় জায়গাগুলো পরিষ্কার না রাখেন, অন্যজন রাখবে তা কী করে প্রত্যাশা করেন?

Feature image – ইভা

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

দুই দিন এক রাতে বিলাইছড়ির ধুপপানি, মুপ্পোছড়া ও ন'কাটা ঝর্ণার বাজেট ট্রিপ

একটি জলজ মানচিত্রের গল্প!