কেরালা: এক ভিন্ন ভারতের গল্প

এখন পর্যন্ত ভারতের নানা প্রদেশের বিশেষ বিশেষ দর্শনীয় জায়গায় ঘোরা হয়েছে। এসব প্রদেশের উল্ল্যেখযোগ্য জায়গাগুলোর মধ্যে রয়েছে কাশ্মীর, লাদাখ, শিমলা, মানালি, দিল্লী, আগ্রা, গোয়া, কলকাতা, দার্জিলিং, রিশপ, লাভা ও সান্দাকফু, মুর্শিদাবাদ ছাড়াও আরও বেশ কিছু স্থান।
এই ভিন্ন ভিন্ন প্রদেশের নানা রকম জায়গায়, পরিবেশ, আবহাওয়া আর বৈচিত্র্যের নানা রকম ভিন্নতা থাকলেও কিছু কিছু জায়গায় কিছু কিছু বিষয় কমন ছিল। এর মধ্যে রয়েছে মানুষ, খাদ্য, ভাষা আর সংস্কৃতি আর শিক্ষাগত মেলবন্ধন। কিছু পার্থক্য অবশ্য সব প্রদেশেই ছিল, কম বা বেশি। কিন্তু বড় রকম পার্থক্য তেমন কোথাও চোখে পড়েনি।
কিন্তু এবার কেরালায় কয়েকদিন বাড়িয়ে এসে দেখে এলাম একদমই ভিন্নরকম এক ভারত। যে ভারতের সাথে ভারতের অন্যান্য প্রদেশের তেমন কেন, কোনো রকম মিলই নেই! মানুষ থেকে শুরু করে, তাদের ভাষা, শিক্ষা, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস আর পুরো পরিবেশগত পার্থক্য। যা অন্যান্য ভারত থেকে এই ভারতকে পুরোপুরি আলাদা করে ফেলেছে। অবাক চোখে দেখেছি, থেকেছি, খেয়েছি, ঘুরেছি আর ভেবে গিয়েছি, এ কোন ভারত? এক অন্য জগৎ? এ কোন পরিবেশ? এখানে শুধু দু’দিন কেরালা আর কোচিন ঘুরে যেসব পার্থক্য চোখে পড়েছে সেগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

কোচিন। ছবিঃ সংগ্রহ

কেরালা স্টেশনে নেমেই একরাশ মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন হয়েছি, ঝকঝকে স্টেশন, স্টেশনে যাত্রীদের জন্য অল্প খরচে দারুণ আরামদায়ক এসি বিশ্রাম কক্ষ আর পরিচ্ছন্ন বাথরুমের ব্যবস্থা দেখে, সাথে আরাম করে নিশ্চিন্তে গোসলের সুব্যবস্থা। টিকেট থাকা সাপেক্ষে প্রতি ঘণ্টায় মাত্র ২৫ রুপির বিনিময়ে।
দ্বিতীয়ত অবাক করার মতো ছিল খাবারের ব্যাপার। যখন কেরালা যাবার কথা হয়েছে, তখন থেকেই সবাইকে বারবার বলে আর বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে যে ওদিকে গিয়ে কেউ যেন ভুলেও মাংস খেতে না চায়। মাংসের নামই যেন না নেয় মুখে, বিফের কথা যেন ভুলেও উচ্চারণই না করে! শুধু সবজি, ডিম আর খুব বেশি হলে মাঝে মাঝে মাছ খুঁজে দেখা যেতে পারে। কিন্তু গিয়ে দেখি একদম ভাবনার উল্টো সব ব্যাপার স্যাপার। হোটেলগুলোতে প্রায় সব রকম খাবার পাওয়া যায়, সবজি আর মাছ থেকে শুরু করে সব রকম মাংস, এমনকি গরুর মাংস পর্যন্ত আছে! রান্না বা কাবাব। আর সব খাবারের দামও সাধ্যের চেয়েও তুলনামূলক কম!
প্রাচীন কেরালা, ছবিঃ সংগ্রহ

তৃতীয় অবাক করার মতো আর সবচেয়ে মুশকিলের ব্যাপার ছিল ওদের ভাষা। হ্যাঁ ভাষাই, ওরা ভারতীয় হলে কী হবে? না জানে হিন্দি, না তেমন ইংরেজি। ওরা শুধু ওদের মালয়ালাম ভাষা ছাড়া তেমন কিছুই জানে না। অধিকাংশই এমন। যে কারণে একদিন সকালে নাস্তা খেতে হোটেলে গিয়ে ডিম পোঁচ না ভাজি খাবো সেটা বোঝাতে ৪০ মিনিট অপেক্ষা করার পরে দূরের এক দোকান থেকে হিন্দি বোঝে এমন একজনকে খুঁজে নিয়ে আসার পরে তাদের বোঝাতে হয়েছে।
চতুর্থ পার্থক্য ধর্ম। ভারতের অন্যান্য প্রদেশে মুসলিমরা কিছুটা অনাহূতের মতো বেঁচে থাকলেও কেরালাতে নিজেদের সম্মান নিয়েই আছে। এখানে অনেক অনেক মসজিদ, নিয়মিত সুমধুর আযানের ধ্বনি, নামাজ আর পরহেজগার নারী পুরুষের অবাধ বিচরণ বেশ অবাক করেছে।
পঞ্চমত, কেরালা প্রদেশের মূল যে শহরটি, সেটির নাম ইরনাকুলাম। আর কেরালার এই মূল শহরটিকে পরিস্কার দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। ইরনাকুলাম যেটা আধুনিক কেরালা। একদম ঝকঝকে, তকতকে, আধুনিক, আর ব্যস্ততম এক শহর। যে শহরের রাত আর দিনকে আলাদা করা মুশকিল। যে শহরের কিছু কিছু জায়গা তো এমন যে, গাড়ির শোরুম, শপিং মল, রেস্তোরাঁ, ব্যস্ততা আর অতি আধুনিক ছেলে মেয়েদের দেখা বোঝার কোনো উপায় নেই যে এটা ভারত নাকি পশ্চিমা কোনো দেশ!
নির্জন কেরালার রূপ! ছবিঃ সংগ্রহ

অথচ মাত্র কয়েক কিলোমিটার পশ্চিমে গেলেই চোখে পড়বে পুরনো, নীরব, নির্জন, কোচিন শহরের অন্য এক কেরালা যেখানে আলো আছে কিন্তু ঝলমলে নয়, শপিংয়ের জায়গা আছে কিন্তু অতি আধুনিক নয়, রেস্তোরাঁ আছে কিন্তু অভিজাত নয়, মানুষ আছে কিন্তু ব্যস্ততা নেই, ছেলে মেয়েদের আড্ডা আছে, কিন্তু সাধারণ মানের। এখানে সবকিছু পুরনো, বনেদী, ধীর স্থির আর ঐতিহাসিক। কোচিন শহর তার সবটুকু পুরনো ঐতিহ্য যেন ধরে রেখেছে।
কোচিনের সরু রাস্তাঘাট, খোলা ময়দান, পুরনো ঘর বাড়ি, মসজিদ, মন্দির, গির্জা, দুর্গ, বিমান বন্দর, সমুদ্র তীর, খোলা প্রান্তর, সাগরের সাথে লাগোয়া গভীর নদী, পুরনো সেতু, জেটি, ডক ইয়ার্ড, নোঙ্গর, ফেরিঘাট, হোটেল ইত্যাদি সবকিছুই যেন ঐতিহ্য আর ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে তেমনি রয়ে গেছে বা রাখা হয়েছে। দারুণ লেগেছে এই কোচিনকে। কিন্তু আফসোস সেখানে থাকা হয়নি, সেই সময় মেলেনি ধীর স্থির, নীরব আর ঐতিহাসিক ঐতিহ্যকে ছুঁয়ে দেখে অনুভব করতে পারিনি বলে।
কেরালার একটি হোটেল। ছবিঃ সংগ্রহ

আর সর্বশেষ, কেরালায় পাওয়া যায় চেন্নাইয়ের ঐতিহ্যবাহী আর বিখ্যাত কাঞ্জিভরম এবং সিল্ক শাড়ি। এই শাড়ি এমনি এক শাড়ি যে নারী কেন, যে কোন পুরুষ মানুষই এই শাড়ির দোকানে ঢুকলে তার মাথা ঠিক রাখতে পারবেন না আমি নিশ্চিত! কী রঙের, কী ধরনের, কেমন দামের, কোন ডিজাইনের, কোন ধরনের মানুষের জন্য কেমন শাড়ি আপনি চান? সব আছে সব।
এইসব শাড়ির কোনো একটা দোকানে ঢুকে পড়লে আপনি কোনোভাবেই ভাগ্যের হাত থেকে বাঁচতে পারবেন না। পর্যাপ্ত টাকা না থাকলে পারবেন না পরিবারের চিরন্তন খোটা থেকে মুক্তি পেতে, আর টাকা থাকলে পারবেন না, সব কীভাবে কীভাবে নিঃশেষ হয়ে গেল সেই আফসোসে জ্বলে পুড়ে!
বর্ণীল কাঞ্জিভরম। ছবিঃ লেখক

মোট কথা এই শাড়ির দোকানে একবার ঢুকতে পারলে আপনি কোনোভাবেই ভাগ্যের কাছে জয়ী হয়ে খুশি মনে ফিরতে পারবেন না। ভাগ্য এখানে আপনাকে পরাজিত করবেই। সেটা যেভাবেই হোক!
আর কেরালার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর বৈচিত্র্যের কথা তো বলাই হলো না। কী চান আপনি? পাহাড়-সমতল সমুদ্র-অরণ্য-নদী-ঝর্ণা-চা বাগান নাকি জলপ্রপাত? সব আছে সবই পেতে পারেন দুই থেকে চার ঘণ্টার দূরত্বের মধ্যেই। একই সাথে এমন সব রকম প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য ভারতের আর কোনো প্রদেশের আছে বলে আমার জানা নেই।
এই হলো কেরালা, এক ভিন্ন ভারত।
ফিচার ইমেজ- wikipedia.org

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ভ্রমণের যত সংকট: পরিত্রাণের উপায়? পর্ব-১

অস্ট্রিয়ার পানির নিচের অদ্ভুত পার্ক