কর্ণফুলীর বুকে প্রশান্তি রিসোর্টে কায়াকিং!

ধুপপানি থেকে ফিরে রাত ৮.৩০টার বাসে কাপ্তাই থেকে ঢাকায় ফেরার পরিকল্পনা ছিল সবার। কিন্তু বৃষ্টির জন্য ট্রেকিং সেরে বিলাইছড়ি পৌঁছাতেই বেজে গেল রাত ১০টা। কাপ্তাইয়ে ফিরে যাওয়াও এখন সম্ভব না। এই রাতটা বিলাইছড়িতে থেকে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই আমাদের।
ভাতঘরের পরিবর্তে এবার আমরা উঠে পড়লাম সৈকত ভাইয়ের স্বপ্নবিলাস বোর্ডিংয়ে। হাসপাতাল ঘাট থেকে একটু ভেতরের দিকে এই বোর্ডিংটা। বিলাইছড়ির অন্যান্য বোর্ডিংগুলোর তুলনায় স্বপ্নবিলাসের মান বেশ ভালো।

কায়াকিংয়ের জন্য তিনি প্রস্তুত! ছবিঃ লেখক

ক্লান্ত শরীরে রাতের ঘুমটা হলো অসাধারণ। সকালে উঠে একদম ঝরঝরে লাগছিল। নাস্তা করে বেলা ১১টা নাগাদ বোটে উঠে গেলাম সবাই। দেড় ঘণ্টার মাঝেই পৌঁছে গেলাম কাপ্তাই ঘাটে। ঘাট থেকে সামনে পাঁচ মিনিট হেঁটে গেলেই বাসস্ট্যান্ড। বোট থেকে নেমেই বাসের টিকেট করে ফেললাম। রাত ৮.৩০টার বাস। আমাদের হাতে সময় আছে প্রায় ৭ ঘণ্টা।
কাউন্টারে থাকা সুপারভাইজারের কাছে আশেপাশে থাকা রিসোর্টগুলো সম্পর্কে জানতে চাইলাম। তিনিই আমাদের প্রশান্তি রিসোর্টের খোঁজ দিলেন। জানালেন সেখানে কায়াকিংয়ের ব্যবস্থাও আছে! আমরা তো খুবই খুশি! মেঘ না চাইতেই তিতলি!
তিনিও প্রস্তুত! ছবিঃ লেখক

চারটা অটোতে আমাদের ১৮ জনের জায়গা হয়ে গেল। পনেরো মিনিটের মাঝেই আমরা পৌঁছে গেলাম প্রশান্তি রিসোর্টে। বাসস্ট্যান্ড থেকে রিসোর্টে আসার রাস্তাটা অসাধারণ সুন্দর! পাহাড়, টিলা আর কর্ণফুলী নদী দেখতে দেখতে হঠাৎ কখন পৌঁছে গেলাম টেরই পেলাম না!
প্রশান্তি রিসোর্টে ঢুকেই মন ভালো হয়ে গেল। নিঃসন্দেহে চমৎকার একটা জায়গা! বেশ বড় একটা জায়গা নিয়েই গড়ে তোলা হয়েছে রিসোর্টটা। যথেষ্ট খোলামেলা চারপাশ। আছে গাছের সারি, বসার জায়গা আর কয়েকটা দোলনা। টিনের চাল দেয়া একতলা পাকা ঘরগুলো তৈরি করা হয়েছে বাংলো বাড়ির ধাঁচে। একটা থেকে আরেকটা একটু দূরে দূরে। এগুলোর একটাতেই আমরা কিছুক্ষণের মধ্যেই উঠে পড়বো।
স্টার্টিং পয়েন্ট, ছবিঃ লেখক

তবে এই রিসোর্টের মূল আকর্ষণের কথাটা বলিনি এখনো। বলছি!
রিসোর্টের ভেতরেই কর্ণফুলী নদীর একটা ধারা প্রবেশ করেছে। অর্থাৎ বলা যেতে পারে পুরো রিসোর্টটাই কর্ণফুলীর পাড় ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। নদীর ওপাশে আছে টিলা আর ঘন সবুজ বন।
সেখানে আবার বিশাল বিশাল সব পাহাড়ি হাতিরও দেখা পাওয়া যায়। আর আছে বানর! সবকিছু মিলে প্রশান্তি রিসোর্ট আসলেই আপনার মনকে দেবে বিশুদ্ধ প্রশান্তি! রিসোর্টের নামকরণের সার্থকতা স্বীকার করে নেয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই!
চলছে কায়াকিং, ছবিঃ লেখক

রুমে ব্যাগ রেখে ফ্রেশ হয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম। এবার কর্ণফুলীতে কায়াকিংয়ের পালা। রিসোর্টে কায়াক বোট আছে তিনটি। প্রতিটায় দুজনের বসার জায়গা আছে। তিন বোটে আমরা ছয়জন করে কায়াকিং সেরে ফেলছিলাম। ১৮ জনের বিশাল দল হওয়ায় সবার শেষে আমি আর ছোট ভাই শুভ যখন বোটে উঠেছি, তখন সূর্য ডুবে যায় যায় অবস্থা!
ঘন বন আর টিলা, ছবিঃ লেখক

প্রথমবারের মতো কায়াকিং করছি। অন্য সবাইকে দূর থেকে কায়াক বোটে ভাসতে দেখে মজাই লাগছিল। নিজে যখন বৈঠা বাইতে শুরু করলাম, তখন বোঝা গেল বেশ শ্রম সাধ্য কাজ এটা! দেখে যত সহজ মনে হয়, অতটা সহজ আসলে নয়! বৈঠা হাতে নিয়ে ডান দিকে বাইতে থাকলে কায়াকটা যাবে বাঁ দিকে, বাঁয়ে বাইতে থাকলে যাবে ডান দিকে। আর নদীতে হালকা স্রোত থাকলেও এই কাজে যথেষ্ট শক্তির প্রয়োগ ঘটাতে হবে!
অসাধারণ প্রকৃতি, ছবিঃ লেখক

কিছুক্ষণ বৈঠা বাইতেই ব্যাপারটা আয়ত্তে চলে আসবে আপনার। আর আগে যদি নৌকা চালানোর অভিজ্ঞতা থেকে থাকে, তাহলে আর নতুন করে আপনাকে কিছু বলার নেই!
কর্ণফুলীর পানি বেশ স্বচ্ছ। নিভু নিভু আলোতে চারপাশে একটা অদ্ভুত মায়া কাজ করছে। টিলা, দূরের পাহাড় আর মাথার ওপরে খোলা আকাশ, এর মাঝে পানির ওপর ছোট্ট একটা নৌকায় ভেসে চলেছি। অসাধারণ এক উদাসী অনুভূতির ঢেউ খেলে যাচ্ছে নিজের ভেতরে! সাথে থাকা ছোট ভাই তো কাব্য সাহিত্য নিয়েই আলোচনা শুরু করে দিল!
কায়াকিংয়ের মাঝে ঝটিকা সেলফি! ছবিঃ লেখক

কর্ণফুলীর যে অংশটায় আমরা কায়াকিং করছি, সেটা আসলেই অনেক অনেক সুন্দর। নদীর ঠিক মাঝামাঝি এসেই সামনে তাকালাম। মনে হচ্ছিল দুই ধারের ঘন সবুজ বন আর পাহাড়ের সারি দূর থেকে বহুদূরে গিয়ে দিগন্তরেখার সাথে মিশে গিয়েছে!
এভাবেই কায়াকে ভাসতে ভাসতে হঠাৎ করে নেমে এল সন্ধ্যা! আমরাও স্টার্টিং পয়েন্টে ফিরতে শুরু করলাম। ফেরার সময় নদীর পাড়ের বড়সড় গাছটায় কয়েকটা বানরকে ঝুলতে দেখলাম।
গন্তব্যে পৌঁছে গেলাম কিছুক্ষণের মধ্যেই। লাইফ জ্যাকেট খুলে কায়াকটা থেকে নামার সময় একটা ছোটখাটো (অথবা বিশাল বড়!) বিপত্তি বাঁধিয়ে ফেললাম! ধুপপানিতে খালি পায়ে ট্রেকিং করে পায়ের পাতা ছিলে ফেলেছি আগের দিন। কায়াক থেকে নামার সময় এর মাঝের শক্ত অংশটায় পা রেখে নামতে হয়। ওঠার সময়ও তাই। মাঝে পা না দিয়ে ডানে বা বাঁয়ে পা পড়লে কায়াকটার উল্টে যাওয়ার একটা সম্ভবনা তৈরি হয়।
আমি মাঝের শক্ত অংশটায় পা দিলাম এবং আমার ছিলে যাওয়া জায়গাটায় একটা ভোঁতা যন্ত্রণা অনুভব করলাম। এরপর আর তাল সামলাতে পারলাম না! খুবই হাস্যকরভাবে পুরো কায়াকটা নিয়ে ছোট ভাই শুভসহ উল্টে পানিতে পড়ে গেলাম!(পানিতে পড়লে আসলেই ঝপাং করে শব্দ হয়, পরীক্ষিত সত্য!)
বেচারা শুভকে অনেকগুলো ঘোলা পানি খেয়ে ফেলতে হলো। আমি শুধু ওর কাশির শব্দ শুনছি। ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। পরে পানি থেকে উঠে শুনেছি সে আমার পড়ে যাওয়া দেখে হাসতে হাসতে কাশছিল!
শেষ পর্যন্ত তীরে এসে তরী ডোবানোর অভিজ্ঞতাও নেয়া হয়ে গেল! সেটাই বা খারাপ কি?

যেভাবে যাবেন:

ঢাকা থেকে বাসে কাপ্তাই বাসস্ট্যান্ড। সেখান থেকে অটোতে করে প্রশান্তি রিসোর্ট।

খুঁটিনাটি:

অটো ভাড়া জনপ্রতি ১৫ টাকা। একসাথে পাঁচ জন বসতে পারবেন।
প্রশান্তি রিসোর্টে কটেজ ভাড়া সময় ভেদে ওঠানামা করে। সাধারণত দুই থেকে তিন হাজার টাকায় চার থেকে পাঁচ জন রাত কাটাতে পারবেন।
এক ঘণ্টা কায়াকিংয়ের জন্য খরচ পড়বে ২০০ টাকা।
পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখবেন। নদীতে ভুলেও আবর্জনা ফেলবেন না।
ফিচার ইমেজ- তানভীর কায়সার 

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

রোথাং পাসের দিনগুলো

পাবনার এক অক্ষত জমিদার বাড়ি তাড়াশ ভবনের খোঁজে