সুন্দরবনে এক বিকেল: কটকা সী বীচ ও শুঁটকি পল্লীতে

সুন্দরবন ভ্রমণের প্রথম দিনের দুপুরে যাত্রা করলাম কটকা সি বীচের উদ্দেশ্যে। বনের ভেতর দিয়ে প্রায় ৫০-৬০ মিনিটের মতো হেঁটে সমুদ্রের কাছাকাছি এসেই যখন গর্জন শুনতে পেলাম সমুদ্রের, বিশ্বাস করুন উত্তেজনায় আর দেরী সইতে পারছিলাম না।

সমুদ্রের গর্জন কার না ভালো লাগে! আর তা যদি হয় ভয়ংকর সুন্দরবনকে পিছনে রেখে তাহলে তো কথাই নেই। প্রকৃতির এক অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি সুন্দরবনের কটকা সমুদ্র সৈকত। এর অপর নাম জামতলা সী বীচ। পিছনে সুন্দরবন আর সামনে বিশাল এ সমুদ্র সৈকতটিই সুন্দরবনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।

এই বানরটিই চলছিলো পিছু পিছু; source: লেখিকা

পুরো সুন্দরবন ভ্রমণে এই জায়গাটির কথা আপনাকে বিশেষভাবে মাথায় রাখতে হবে। গাইড জানালো, এই জায়গায় হরিণ, বাঘের আনাগোনাও নাকি প্রবল। আমরা বাঘ না দেখতে পেলেও এখানে বাঘের পায়ের ছাপ দেখতে পেয়েছিলাম। পায়ের ছাপ নিয়ে আমাদের মধ্যে রীতিমতো হৈ চৈ পড়ে গেলো।

খুব উৎসুক হয়ে বাঘ মামার পদচিহ্ন দেখলাম আমরা। তারপর হাঁটাপথে জুটলো নতুন এক সঙ্গী, একটা বানর। সবাই রীতিমতো নিজেদের হাতের আপেল ছুঁড়ে খাওয়াতে লাগলো বানরটিকে। সেও মহা উল্লাসে আমাদের যাত্রাপথের প্রায় পুরোটাই সঙ্গ দিলো।

সৈকতের খোঁজে বনের ভেতর দিয়ে হেঁটে চলছি সবাই; source: লেখিকা

কটকা থেকে কাচিখাল (বাঘের জায়গা) পর্যন্ত প্রচুর ঘাস জন্মে বলে প্রচুর জীবজন্তুর আনাগোনা রয়েছে এখানে।

শেষমেশ সৈকতে যখন পৌঁছুলাম সেই শান্ত নিবিড় সমুদ্রের অতুলনীয় রূপ দেখে আমরা রীতিমতো স্তব্ধ। কেউ কেউ হাঁটতে লাগলাম বালু তীর ধরে, ছেলেরা খেললো ফুটবল, কেউ বা সমুদ্রে দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল। ঘণ্টাখানেক এই অসাধারণ পরিবেশে থেকে আবার ফিরে এলাম নৌকায়।

যদিও ছেলেরা তখনো বীচ থেকে ফিরে আসেনি। কটকাতে ৪০ ফুট উচ্চ একটি টাওয়ারও আছে যেটি মূলত পর্যবেক্ষণ টাওয়ার, যেখান থেকে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। ছেলেরা হেঁটে ফেরার সময় পর্যবেক্ষণ টাওয়ারে উঠে পুরো বীচের সৌন্দর্য উপভোগ করে এসেছিলো।

সৈকত তীরে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলো; Source: লেখিকা

ও হ্যাঁ, লঞ্চ থেকে নৌকা করেই আমরা সবগুলো দর্শনীয় জায়গায় গিয়েছিলাম, লঞ্চের সাথে বেঁধে রাখা নৌকাটিতে করে। লঞ্চে ফিরে কাচ্চি বিরিয়ানি খেলাম দুপুরের খাবার হিসেবে। আসলে আমাদের সুন্দরবন ট্যুরের দুইটি উপভোগ্য বিষয় ছিল প্রকৃতি আর খাবার। খাবার নিয়ে কোনো অসন্তুষ্টি ছিল না কারোর। সেই ক্ষেত্রে এজেন্সিটির প্রশংসা করতেই হয়।

খাওয়া শেষে সবাই মিলে আড্ডা দিলাম, কেউ কেউ বিশ্রাম নিলো। ৪টার সময় আমরা আবার বের হলাম। এবার গন্তব্য ‘দুবলার চর’। বঙ্গোপসাগরের এ দ্বীপটি পরিচিত ‘শুটকি পল্লী’ হিসেবে। সমুদ্রের তীর ঘেঁষে তৈরি এই শুঁটকির বাজার। প্রতি বছরই বিভিন্ন স্থান থেকে জেলেরা মাছ ধরার মৌসুমে এ দ্বীপে অস্থায়ী ঘরবাড়ি তৈরি করে সাগর থেকে বিপুল পরিমাণ মাছ ধরে এবং তা থেকে শুঁটকি বানিয়ে বাজারে বিক্রি করে।

হরেক রকমের শুঁটকির সমাহার এখানে। দামেও অনেক সস্তা। এছাড়াও দুবলার চরে প্রতি বছরই কার্তিক মাসে রাসপূর্ণিমায় ‘রাসমেলা’ বসে। এ রাস মেলা হিন্দুদের পূণ্যস্নান উপলক্ষে বসে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস রাসমেলা হচ্ছে ‘রাধা-কৃষ্ণের মিলন উৎসব’।

কটকা বীচের সৌন্দর্য; source: লেখিকা

দুবলার চরে গেলে আপনি দেখতে পাবেন বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে কীভাবে টিকে আছে একটি অস্থায়ী জেলেপল্লী। হাজার হাজার জেলে ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গে লড়াই করে কীভাবে বেঁচে আছেন এই চরে। কিছু জেলে আর শুঁটকি বিক্রেতার সাথেও আমরা কথা বললাম।

জানতে চাইলাম তাদের জীবনধারা সম্পর্কে। শুঁটকি পল্লী থেকে আমরা অনেকেই শুঁটকি কিনলাম তারপর সময় নিয়ে হেঁটে বেড়ালাম তীরে। বিকেলের স্নিগ্ধ সেই সূর্যাস্ত যেন সবাইকে উদাসীন করে দিচ্ছিলো খুব। সবাই মিলে ছবিও তুললাম অনেক। সূর্যাস্ত দেখে আবার লঞ্চে ফিরে এলাম।

দুবলার চরে নামার পর; source: লেখিকা

সন্ধ্যায় সবাই মিলে একসাথে নাচ, গান, খেলা ইত্যাদি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সন্ধ্যাটা উপভোগ করে রাতের খাবারের জন্য যখন নিচে গেলাম, মন যেন ভালো হয়ে গেলো দ্বিগুণ। রাতের খাবারের জন্য গ্রিল আর পরোটা রয়েছে। নিজের পছন্দের খাবার দেখে আনন্দের আর সীমা রইলো না। তারপর বান্ধবীদের সাথে আড্ডা হলো জমিয়ে।

আমরা তখন লঞ্চের ডেকে বসে প্রকৃতির বাতাস উপভোগ করছি, আর ঝড় যেন আসবে আসবে করছিলো। আহা, সেই রাতটা! খুব বেশিই উপভোগ্য ছিল। সারাদিন দৌড়াদৌড়িতে সবাই কম বেশি ক্লান্ত থাকায় তাড়াতাড়িই ঘুমিয়ে গেলাম। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে লুচি, সবজি, ডিম দিয়ে নাস্তা খেয়ে বের হয়ে গেলাম ‘হিরণ পয়েন্ট’এর উদ্দেশ্য।

সুন্দরবনের দর্শনীয় স্থানসমূহ: 

করমজল : এখানে কুমির, চিত্রা হরিণ, বানর এবং নানা ধরনের প্রাণী দেখার ব্যবস্থা করে রাখা হয়েছে। কাঠের তৈরি একটা বিশাল পুল পেরিয়ে দেখা পাবেন একটি ওয়াচ টাওয়ারের।

থরে থরে সাজিয়ে রাখা শুঁটকির সারি; source: লেখিকা

কটকা অভয়ারণ্য : এখানে দেখা মিলবে হরিণের। সবুজ ছায়ায় আচ্ছাদিত এই স্থানটি দেখার মতো বিস্তৃত।

জামতলা সী-বিচ : অপর নাম কটকা সী বীচ। বিস্তৃত এই বালু তীরে দাঁড়িয়ে দেখতে পাবেন বঙ্গোপসাগরের অপরূপ সৌন্দর্য।

দুবলার চর : অপর নাম শুঁটকি পল্লী। সাগর তীরের মানুষ কেমন সংগ্রাম করে টিকে থাকে তা দেখা যায় এই দুবলার চরে। এখানে বিকালের সূর্যাস্তটা ভোলার মতো নয়।

হিরণ পয়েন্ট : এই জায়গাটাও ভীষণ সুন্দর। এখানে কিছু বাংলো আছে। দেখা মিলবে প্রচুর শ্বাসমূলের। বাঘ, হরিণের জন্য এটি একটি সংরক্ষিত এলাকা।

শুঁটকি পল্লীর নয়নাভিরাম সৌন্দর্য; source: লেখিকা

এছাড়াও সুন্দরবনে রয়েছে আরো অনেক দৃষ্টিনন্দন স্থান। কটকা ওয়াচ টাওয়ার, বাদামতলা, তিন কোনা দ্বীপ, কোকিল মনি, কচিখালী, আলোর কোল, হাড়বাড়িয়া এই স্থানগুলোও অন্যতম উল্লেখযোগ্য।

ভ্রমণের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র :

একজন মানুষ কেমন ধরনের ভ্রমণপ্রিয় তার অন্যতম নিদর্শন, ভ্রমণের জন্য গোছানো তার ব্যাকপ্যাক। সুন্দরবনে কয়েকদিনের ট্যুরে আপনি সাথে করে যা নিতে পারেন :-
ছোট সাইজের ট্রাভেল ব্যাগ, শীতের কাপড়, তোয়ালে বা গামছা, স্যান্ডেল, কেডস, মশার কয়েল, ক্যামেরা, মেমোরী কার্ড, ব্যাটারী ও চার্জার, টর্চ লাইট ও অতিরিক্ত ব্যাটারী, ওডোমস ক্রিম, সানক্রিম ও লোশন, সানগ্লাস ও সানক্যাপ বা হ্যাট, টুথপেস্ট, ব্রাশ, সাবান, টিস্যু, পানির বোতল, ব্যক্তিগত ঔষধপত্র। লঞ্চে বসে খেলার জন্য নিতে পারেন দাবা, লুডু বা কার্ড, বীচে খেলার জন্য ফুটবল।

জেলেদের অস্থায়ী নিবাস; source: লেখিকা

বিশেষ কিছু সতর্কতা :

  • নিজের টিমের কারো নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয় এমন কিছু কোনোভাবেই করা যাবে না
  • কোনো রকম মাদকদ্রব্য বহন, ব্যবহার অথবা কোনোভাবে সম্পৃক্ত থাকার চিন্তা মাথায় আনবেন না।
  • সমালোচনা বা মজা করতে গিয়ে ভ্রমণ গাইড বা এজেন্সির কাউকে ব্যক্তিগত আক্রমন বা অসম্মান করবেন না।
  • পরিবেশ নষ্ট হয় এমন কোনো কাজ করবেন না।
  • ভ্রমণকালীন যে কোনো সমস্যা নিজেরা আলোচনা করে সমাধান করতে হবে।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

নো ম্যান্স ল্যান্ডে অরণ্য-অধরা

কলকাতা ও ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে ঘোরাঘুরি