শরতের কাশফুল দেখতে ঘুরে আসতে পারেন আমুলিয়া মডেল টাউন

যানজট, কালো ধোঁয়া, কার্বন ডাই অক্সাইড আর অশুদ্ধ বাতাসের এক আঁতুড়ঘর আমাদের প্রাণের শহর ঢাকা। কিছুদিন আগেই লন্ডনভিত্তিক ম্যাগাজিন দ্য ইকোনমিস্টের ইন্টেলিজেন্স ইউনিট বা ইআইইউ বসবাসের জন্যে সবচেয়ে ভালো এবং সবচেয়ে খারাপ শহরের তালিকা প্রকাশ করেছে। যার মধ্যে বসবাসের অযোগ্য শহর হিসেবে ঢাকার স্থান দ্বিতীয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের পরই ঢাকার অবস্থান। যার জন্য দায়ী অবশ্যই আমাদের অসচেতনতা এবং অপরিকল্পিত নগরায়ন।

আমুলিয়া মডেল টাউনের মেইন গেট; Source: লেখক

তবে ঢাকার মধ্যে যে ক’টি স্থানে গিয়ে প্রাণ ভরে ফুসফুসে অক্সিজেন নেয়া যায়, তার মধ্যে অন্যতম হলো আমুলিয়া মডেল টাউন। আফতাবনগর, দিয়াবাড়ির পর ঢাকার বুকে এতটা বিস্তীর্ণ খালি জায়গা দেখা যায় না আর কোথাও। যানজট, কোলাহল মুক্ত আর ধুলোবালিবিহীন বিশুদ্ধ বাতাসের লোভে কিছুদিন আগেই ঘুরে আসলাম আমুলিয়া মডেল টাউনে। আজ তার রূপ লাবণ্যময়তা নিয়েই লিখবো।

এখানে বলে রাখি সারা বছরই আমুলিয়া মডেল টাউন তার নিজ রূপে সজ্জিত থাকলেও শরতে সে সৌন্দর্য বেড়ে যায় হাজার গুণে। কারণ তখন সবুজ প্রকৃতি যেন সাদা চাদর গায়ে দিয়ে নতুন রূপে আবির্ভাব হয়। শত শত একর জায়গা জুড়ে দেখা মেলে সাদা কাশফুলের। আমুলিয়া মডেল টাউনসহ এর আশপাশে অনেকটা জায়গা জুড়ে ফোঁটে কাশফুল। প্রকৃতি ললনা যেন সাদা শাড়ি পরে সবুজ আর সাদার এক অদ্ভুত সুন্দর সংমিশ্রণে নিজেকে প্রকাশ করে এই সময়টায়। 

পথের দুইপাশে বিস্তীর্ণ কাশবন; Source: লেখক

তবে ব্যক্তিগতভাবে বর্ষা মৌসুমে আমুলিয়ার রূপটাও আমাকে ভীষণ টানে। মৃদু ঠাণ্ডা বাতাস আর ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে খালি পায়ে প্রিয়জনের হাত ধরে সেখানে ভেজার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। সেই অনুভূতি সত্যিই আকাশছোঁয়া। বলে বা লিখে প্রকাশ করা যাবে না সেই অনুভূতি। 

যেভাবে যাবেন

আমুলিয়া মডেল টাউনে কয়েকটি উপায়ে যাওয়া যায়। ঢাকার গুলিস্তান থেকে রূপসী বা তারাবো গামী যে কোনো বাসে করে যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভার হয়ে স্টাফ কোয়ার্টার নামতে হবে। ভাড়া ২৫ টাকা। স্টাফ কোয়ার্টার থেকে রিকশা অথবা বাসে করে আমুলিয়া মডেল টাউন নামতে হবে। রিকশা ভাড়া ৩০ টাকা। বাস ভাড়া জনপ্রতি ১০ টাকা।

অথবা ঢাকার রামপুরা ব্রীজ হতে স্টাফ কোয়ার্টারের বাসে উঠে আমুলিয়া মডেল টাউন নেমে যেতে হবে। আসমানী, আছিম, স্বাধীন, রাজধানী, রমজান ইত্যাদি বাস শহরের বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে রামপুরা হয়ে স্টাফ কোয়ার্টার ছেড়ে যায়। ভাড়া জনপ্রতি ২০ টাকা। 

যারা নারায়ণগঞ্জ, গাউছিয়া অথবা সাইনবোর্ড এলাকা থেকে আসতে চান তাদের জন্য সুবিধা হলো তারাবো বিশ্বরোড হয়ে স্টাফ কোয়ার্টার, সেখান থেকে আমুলিয়া মডেল টাউন। 

বিকেলের স্নিগ্ধ আলোয় আমুলিয়া মডেল টাউন; Source: লেখক

এই মৌসুমে আমুলিয়া মডেল টাউনে গেলে গেট দিয়ে ঢুকে কিছুদূর হাঁটতেই চোখে পড়বে রাস্তার দুইধারে বিস্তীর্ণ সমভূমি জুড়ে কাশবন। কিছু কিছু জায়গা দেয়াল দিয়ে ঘিরে রাখা হলেও বেশিরভাগ এলাকাটাই খোলা।

ছবি পাগল মানু্ষদের জন্য একেবারে মোক্ষম জায়গা এটি। ইদানীংকালে প্রচুর নাটক, চলচ্চিত্র, শর্ট ফিল্মের শ্যুট হচ্ছে এখানে। আর শখের ফটোগ্রাফারদের আনাগোনা তো এখানে লেগেই থাকে।

সাদা কাশফুলের চাদরে ঢাকা আমুলিয়া; Source: লেখক

প্রিয়জনের হাত ধরে কাশবনের মাঝে রাস্তা ধরে হেঁটে যেতে যেতে জীবনের সুন্দর গল্পগুলো সাজাতে পারেন, আরেকবার নিজেদের ঝালিয়ে নেয়ার একদম আদর্শ পরিবেশ সৃষ্টি করে রেখেছে এই আমুলিয়া। জন্মদিন, বিবাহ বার্ষিকীতে কিংবা যে কোনো উপলক্ষ্যে প্রিয়জনকে চমকে দেয়ার এত সুন্দর পরিবেশ ঢাকার দ্বিতীয় কোনো জায়গায় নেই। 

এলাকাটায় তেমন কোনো ভালো হোটেল না থাকায় বাসা থেকে খাবার রান্না করে নিয়ে যাওয়াটাই ভালো হবে। সাথে ছোটখাটো ফ্যামিলি পিকনিক অথবা বন্ধুদের সাথে গেট টুগেদারটাও হয়ে যাবে। তবে কিছুদূর পর পর টং দোকান চোখে পড়বে, যেখানে হালকা চা নাশতা খেতে পারেন। বিকেল বেলায় এখানে ফুচকা, চটপটি, ঝালমুড়িসহ বিভিন্ন ধরনের স্ট্রিট ফুড পাওয়া যায়।

সবুজে আর সাদায় মিলেমিশে একাকার; Source: লেখক

এখানে উল্লেখ্য যে, জায়গাটি খালি ও নির্জন বিধায় মাঝে মাঝেই এখানে চুরি, ছিনতাই থেকে শুরু করে নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটতো। তবে বর্তমানে কর্তৃপক্ষের কঠোর অবস্থানের কারণে সেসব অনৈতিক কর্মকাণ্ড একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে।

সারাক্ষণ সেখানে পুলিশ ও র‍্যাবের টহল বিরাজমান থাকে। তাই আপনি নিরাপদ ও সুস্থ পরিবেশেই আমুলিয়া মডেল টাউন ঘুরতে পারবেন। তবে সন্ধ্যার পর আর থাকতে দেয়া হয় না সেখানে।

আমুলিয়া মডেল টাউন; Source: লেখক

আমুলিয়া মডেল টাউন ঘোরা শেষে রিকশা নিয়ে চলে যান ‘শেখের জায়গা’ নামক স্থানে। ভাড়া ৫০ থেকে ৬০ টাকা। শেখের জায়গার পথে দেখার মতো অনেক কিছু পাবেন। সেখানে থেমে থেমে ছবি তোলার ও বিশ্রামের কাজটি সেরে নিতে পারেন।

সবচেয়ে ভালো হয় আমুলিয়া মডেল টাউন থেকে শেখের জায়গার রাস্তাটুকু যদি আপনি হেঁটে যেতে পারেন। তাহলে আশপাশের ছোট গ্রামগুলোয় ঢুঁ মেরে আসা যাবে। বর্ষা মৌসুমে গেলে হাইওয়ের দুই পাশে দেখতে পাবেন বিস্তৃত জলাভূমি। 

তবে আমুলিয়ায় যেভাবে নগরায়নের জোয়ার বইছে তাতে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই আমুলিয়ার এই সৌন্দর্য বিলীন হতে যাচ্ছে তা অনুমান করা যায়। ইতোমধ্যে এখানে প্লট বিক্রি শুরু হয়ে গেছে, বানানো হচ্ছে ঘর বাড়ি। নির্মাণ করা হয়েছে উন্নতমানের স্কুল ও কলেজ। একসময় হয়তো ইট সিমেন্টের শহরের নিচে চাপা পেবে এই সুবিশাল অনাবিল সৌন্দর্যমণ্ডিত সতেজ প্রকৃতি। 

মুক্ত বাতাসে প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস; Source: Taslima Bably

তাই আর দেরি কেন, আজই ঘুরে আসুন কাশবনের এই অদ্বিতীয় রাজত্ব আমুলিয়া মডেল টাউনে। তবে যে কথাটি আমি সব লেখাতেই বলি, অবশ্যই প্রকৃতিকে ভালোবাসুন। তাকে রক্ষা করুন।

কোনো ধরনের পচনশীল ও অপচনশীল ময়লা আবর্জনা ফেলে প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করবেন না। চিপ্সের প্যাকেট, পলিথিন, বোতল, বাদামের খোসা, টিস্যু পেপার ইত্যাদি নির্দিষ্ট স্থানে ফেলুন।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভরা জ্যোৎস্নায় সাজেক ভ্রমণ (২৭ সেপ্টেম্বর)

বগাকাইন: এক শান্তজলের হ্রদ