কাপ্তাই লেকের বুকে গিটারের সুরে সুরে জ্যোৎস্না বিলাস

Milky Way star in night skies, full moon and old tree - Retro style artwork with vintage color tone (Elements of this moon image furnished by NASA)

পৃথিবীর যে পাশে সূর্য অবস্থিত তার ঠিক উল্টো পাশে চাঁদ অবস্থান করলে দৃশ্যমান চাঁদটি সূর্য দ্বারা পূর্ণভাবে আলোকিত হয়। যার ফলে চাঁদটি পূর্ণ গোলাকার চাকতির আকার ধারণ করে। প্রকৃতির এই অতিপ্রাকৃত দৃশ্যকেই আমরা পূর্ণিমা বা ফুল মুন বলে থাকি। এ সময়টায় চাঁদের রূপালি আলোতে চারদিক ছেয়ে গিয়ে এক অদ্ভুত মনোরম পরিবেশের সৃষ্টি করে।

একবার ভাবুন তো, সেই ভরা পূর্ণিমার রাতে বিশাল কাপ্তাই লেকের পানি যখন চিকচিক করছে তার মাঝে ট্রলারের ছাদে বসে আপনি আপনার প্রিয়জনদের সাথে ভেসে বেড়াচ্ছেন! স্নিগ্ধময় পরিবেশে গিটারের মৃদু টুংটাং ধ্বনির তালে তাল মেলাচ্ছেন সবাই।
কি, লোভ হচ্ছে নিশ্চয়?

কল্পনাপ্রিয় মানুষ আমরা, তাই আশায় বুক বাঁধি, কল্পনা একদিন সত্যি হয়ে ধরা দেবে বলে।

অপরূপা কাপ্তাই লেক; সোর্সঃ লেখক

এই তো কদিন আগে না চাইতেই আমাদের কাছে ধরা দিয়েছিল এমন একটি রূপালি রাত্রি। কাপ্তাই থেকে ধুপপানি ঝর্ণায় যাওয়ার পথে বিলাইছড়ি উপজেলায় আমাদের রাতে থাকতে হয়েছিল। বিলাইছড়িতে মুপ্পোছড়া আর ন’কাটা ঝর্ণা দেখে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়ে যায়। তখনি পুব আকাশে দেখা মেলে ভরাট গোলাকার চাঁদের।

মুপ্পোছড়া আর ন’কাটা ঝর্ণার দুর্গম পথ পার করে এসে সবাই আমরা বেশ ক্লান্ত। তবে অবিশ্রান্ত শরীর নিমেষেই আবার তাজা হয়ে যায় প্রকৃতির এই ভয়াবহ রূপ দেখে। যদিও রাতে আমাদের ঘুম ছাড়া আর কোনো প্ল্যান ছিল না। তবুও চাঁদের আলোয় কাপ্তাই লেকের রূপ সৌন্দর্য ভোগ করার লোভ আমরা সামলাতে পারিনি। মাঝির সাথে কথা বলে ঠিক করে রাখি। রাতে খাবার পরে ঘাট থেকে একটু দূরে ট্রলার নিয়ে ভেসে যাব। ছাদে বসে প্রকৃতির এই অদ্বিতীয় দৃশ্য উপভোগ করব কাপ্তাই লেকের ঠিক মাঝখানটায়।
দুইদিনের জন্য ট্রলার ভাড়া করা থাকায় মাঝিও কোনো আপত্তি করেনি।

মধ্যরাত্রিতে আকাশের বুকে পূর্ণ রূপালি চাঁদ; সোর্সঃ শুভ সূত্রধর

যেই কথা সেই কাজ, দ্রুত সবাই ফ্রেশ হয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে চলে যাই দিগন্ত পাহাড়ি হোটেলে। সেখানে দুপুরে খাওয়ার সময় রাতের খাবার অর্ডার করে গিয়েছিলাম। আদিবাসী চাচীর অসাধারণ রান্নায় ভরপেট খেয়ে তৈরি হয়ে যাই পরবর্তী কয়েক ঘণ্টার অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতার জন্য।

রাত ৯টার মধ্যে খাওয়া দাওয়ার পর্ব শেষ করে উঠে বসি ট্রলারের ছাদে। আঠারো জনের বিশাল গ্রুপ হওয়া সত্ত্বেও ছাদেই জায়গা হয়ে যায় সবার। ঘটঘট শব্দ করে মাঝি ট্রলারের ইঞ্জিন স্টার্ট দিল। বিলাইছড়ি ঘাট থেকে ৫-৭ মিনিট দূরে গিয়ে মাঝি ইঞ্জিন বন্ধ করে দেয়। থেমে যায় সকল কোলাহল। কাপ্তাই লেকের মৃদু স্রোতে ভেসে যেতে থাকে আমাদের ট্রলার। মাঝি দক্ষ হাতে হাল ধরে নৌকার দিক ঠিক রাখছিল।

মেঘেরদের মাঝে এক টুকরো চাঁদ; সোর্সঃ www.rd.com

সময়টা এখানে থামিয়ে দিতে পারলে মন্দ হতো না। প্রকৃতি যেন আঠারোটা ছেলের সময় থামিয়েই দিয়েছিল। চারদিকে লেকের পানিতে পড়া চাঁদের প্রতিবিম্ব। চিকচিক করতে থাকা লেকের পানি। লেকের মাঝে মাঝে টিলাগুলো দেখে মনে হচ্ছিল বড় বড় জলদানবেরা মাথা উঁচু করে পানিতে ভাসছে।

জোৎস্নার আলো যে এতটা তীব্রতর হতে পারে, এই পরিস্থিতি সৃষ্টি না হলে কখনো অনুভব করতাম না। তীব্র চাঁদের আলোর সাথে আকাশে ছিল কোটি তারার মেলা। শহুরে অঞ্চলে থাকি বলে আকাশগঙ্গার এই কোটি তারাময় রূপ তেমন একটা দেখা দেয় না আমাদের জীবনে। চাঁদের প্রতিবিম্ব যেখানে তীব্রভাবে পড়ে সেখানে হঠাৎ দুই একটা নৌকা এসে পড়লে অদ্ভুত এক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। এক কথায় প্রকৃতি তার সবটা রূপ সৌন্দর্য ডালায় সাজিয়ে আমাদের উপহার দিয়েছিল সে রাতে।

পাতার ফাঁকে ফাঁকে পূর্ণিমার আলো; সোর্সঃ লেখক

এই যখন সুনসান নীরবতায় ছেয়ে ছিল চারপাশ, তখন শোভন তার দক্ষ হাতে গিটারে টুংটাং শব্দে সুর দেয়া শুরু করে। বাতাসের শাঁ শাঁ প্রতিধ্বনি পাশ কাটিয়ে সেই সুর একদম মনের গহীনে গিয়ে বাজতে শুরু করে। চারপাশের নীরবতা ভেঙে আঠারোটা ছেলে দরাজ কন্ঠে গেয়ে ওঠে,

“তোমরা কেউ কি দিতে পারো, প্রেমিকার ভালোবাসা…
দেবে কি কেউ জীবনে উষ্ণতার, সত্য আশা…..”

অনুভূতিগুলো এতটাই হৃদয় ছোঁয়া ছিল যে কোনো শব্দ দিয়ে আসলে তা প্রকাশ করা যাবে না। শোভনের গিটার জাদুতে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে একের পর এক গানে সুরে সুর মেলানোর চেষ্টা করি সবাই। গানে আর চাঁদের আলোতে মিলেমিশে কখন যে সময় পার হচ্ছিল তা বুঝতেই পারিনি। আড়াই ঘণ্টা ভেসে থাকার পর মাঝি আবারো ইঞ্জিন স্টার্ট দিল। প্রকৃতির এই সাজানো রূপে সে শব্দ খুবই বিরক্তিকর। তবু ফিরে আসতে হবে আমাদের। ধীরে ধীরে এগুতে থাকি ঘাটের দিকে। আর সাথে নিয়ে যাই আজীবন মনে রাখার মতো কিছু স্মৃতি।

লেকের পানিতে পড়া চাদের আলো; সোর্সঃ লেখক

এখানে বলে রাখি, কাপ্তাই লেক কখনো ঘুমায় না। আশেপাশের বিশাল এলাকার মানুষজনের জীবিকা নির্বাহের অন্যতম মাধ্যম এই কাপ্তাই লেক। তাই দিনের বেলায় বেশ ব্যস্ত নৌকা চলাচল থাকলেও রাতেও সমভাবে ব্যস্ত থাকে কাপ্তাই লেক। মূলত জেলেরা মাছ ধরতে রাতের সময়টাকেই বেছে নেয়। রাতে জাল ফেললে নাকি জালে বেশি মাছ ধরা দেয়। চাঁদের আলোয় ছোট বড় নৌকাগুলোকে দেখতে বেশ অদ্ভুত দেখায়।

রাতে নিজ নৌকার অবস্থান নিশ্চিত করতে সব নৌকাই নির্দিষ্ট সময় পর পর লাইট জ্বালিয়ে সংকেত দেয়। না হলে যেকোনো সময় অন্য নৌকার সাথে সংঘর্ষে দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। তাই রাতে নৌকা ভ্রমণের জন্য মাঝিকে অবশ্যই টর্চ সাথে নিতে বলবেন। যদিও কাপ্তাই লেকের মাঝিরা এ ব্যাপারে বেশ সচেষ্ট তবুও সাবধানতার বিকল্প কোনো পন্থা নেই।

স্নিগ্ধ চাঁদের আলো; সোর্সঃ ইসরাত তাসনিম মীম

বিঃদ্রঃ বিস্তীর্ণ কাপ্তাই লেকের বিশাল জলাধারের উপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল এখানকার রূপ বৈচিত্র্য। তাই কোনো ধরনের ময়লা আবর্জনা ফেলে প্রকৃতির অপূরণীয় ক্ষতি করবেন না। সর্বোপরি, প্রকৃতিকে ভালোবাসুন, ভালো রাখুন। হ্যাপী ট্রাভেলিং।

Feature Image: www.huffingtonpost.com

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

হর্নবিল ফেস্টিভ্যাল ও নাগাল্যান্ড প্রসঙ্গ

ট্রেক টু চন্দ্রখনি পাস ও প্রথম হিমালয় যাত্রা