ঘুরে আসুন কাপ্তাইয়ের বেরাইন্যা লেক থেকে

মনের খোরাক মেটাতে মানুষ কত কিছুই না করে। এবার না হয় আপনি সেই খোরাক মেটাতে একদিনের জন্য গেলেন কাপ্তাই বেরাইন্যা লেকে।

কাপ্তাই বাস স্টেশন থেকে সিএনজিতে পাহাড়ের উঁচু নিচু রাস্তা দিয়ে বেরাইন্যা লেক যেতে যেতে মনে হবে যেন উড়ে উড়ে আকাশ থেকে লেক দেখছেন। যার বিশালতা ছুঁয়ে যাবে আপনাকে। একপাশে পাহাড় আরেক পাশে লেক, যার মাঝখানে দিয়ে যখন অগ্রসর হতে থাকবেন তখন আপনার মনে শিহরণ জাগবে নিশ্চিত।

চলতি পথে কাপ্তাই লেক দর্শন।  ছবি সূত্র : রিয়াদ 

সরু রাস্তায় যানবাহন বলতে দেখা যায় সিএনজি ও বেশ কিছু ব্যক্তিগত গাড়ি। আর উচুঁ পাহাড়ি রাস্তা বিধায় তেমন বেশি জনবসতি গড়ে ওঠেনি এখানে। তারপরও অল্প সংখ্যক আদিবাসীর দেখা মেলে যেতে যেতে। যারা মূলত কৃষি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে।

রাস্তা দিয়ে কিছুক্ষণ পরপর চোখে পড়বে ছোট্ট ছোট্ট কিছু বাজার। যেখানে কলা, পেঁপে, পেয়ারা, জাম্বুরা সহ নানা রকম ফলমূল নিয়ে ক্রেতার অপেক্ষা করছে আদিবাসীরা। কেউ যদি অল্পমূল্যে টাটকা ফল কিনতে চান তাহলে এর চেয়ে ভালো সুযোগ আর নাও আসতে পারে।

বেরাইন্য যাওয়ার পথেই পাবেন এমন সব মন ভুলানো দৃশ্য।  ছবি সূত্র : রিয়াদ 

ঘন জঙ্গলের বুক চিরে বেরাইন্যা যেতে মনে একটু ভয়ও জাগতে পারে। এই বুঝি কিছু একটা বেরিয়ে পথ আটকালো আপনার! পুরো পথ জুড়েই এমন শিহরণ থাকবে। যা আপনাকে সামনের অজানা পথকে জানার আগ্রহ আরও বাড়িয়ে তুলবে।

লেকের পাড়ে বসে, প্রকৃতির সাথে একাকার হয়ে অনায়াসে মেতে উঠতে পারেন বন্ধুদের সাথে গান আর আড্ডায়। পাড়েও গাছের শান্ত ছায়ায় সময় কাটানোর জন্য দোলনা সহ করা কয়েছে নানা রকম আয়োজন। অনেকেই দোলনায় চড়ে চড়ে খুঁজে বেড়াচ্ছেন নিজের হারিয়ে যাওয়া শিশুকালকে। অনেকেই হয়তো এই সুযোগে শুনিয়ে দিচ্ছেন ছেলেবেলার মজার মজার গল্পগুলো। আর দুষ্ট বন্ধুটি ভিডিও করে জমিয়ে রাখছে সেই গল্পগুলো।

আপন মনে লেক দর্শন।  ছবি সূত্র : রিয়াদ 

এবার আসা যাক বেরাইন্যা লেকের আসল আকর্ষণ কায়াকিংয়ে। প্রায় সকলের এ লেকে আসার মূল কারণ থাকে কায়াকিং করা। যে বেরাইন্যাতে এসে কায়াকিং করবে না তার বেরাইন্যা ভ্রমণ অপূর্ণ থেকে যাবে। তাই বেরাইন্যা এসে লেকের স্বচ্ছ পানিতে আপন মনে ভেসে বেড়ানোর সুযোগ মিস করবেন না।

কায়াকিংয়ে আপনার প্রতিটি মুহূর্ত হয়ে উঠবে উপভোগ্য। একবার ভেবে দেখুন আপনি পানিতে ভাসছেন আর আপনার মোবাইল ফোনে বাজছে প্রিয় গানটি, আর এমন সময় দুর থেকে যাওয়া কোনো ইঞ্জিনচালিত নৌকার ঢেউ বা তীব্র বাতাসের কারণে দুলছে আপনার ছোট্ট নৌকাটি। এমন পরিবেশ ও অবস্থা শুধু অনুভব করা যায়।

বেরাইন্যাতে কায়াকিং।  ছবি সূত্র : রিয়াদ 

কায়াকিং করতে নামার আগে আকাশের অবস্থাটুকু একবার দেখে নেওয়া জরুরী। যখন তখন নেমে পড়লে তা আপনার জন্য বরং বিরক্তি ও কষ্টসাধ্য হয়ে পড়বে। যেহেতু শক্তিরও ব্যাপার আছে তাই দুজনের নৌকার চেয়ে তিনজনের নৌকা বেশ উপভোগ্য। যেদিকে ইচ্ছে, যেমন করে ঘুরতে মন চায় তেমনভাবেই ঘোরা যায় তিনজনের নৌকায়। দুজনের নৌকাতে ঘণ্টা প্রতি ভাড়া- ৩০০ টাকা, আর তিনজনের নৌকায় ঘণ্টা প্রতি ভাড়া- ৪০০ টাকা।

আবার বেরাইন্যার ভিন্নধর্মী সব খাবারদাবারও অনেককে এখানে আসার জন্য টানে। যে খাবারে পাওয়া যায় এক অন্যরকম তৃপ্তি। বেরাইন্যা লেক শোর ক্যাফেই পর্যটকদের জন্য করে রেখেছে এমন সব ব্যবস্থা। এই ক্যাফেটি ছাড়া এখানে দুপুরের খাবাবের বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নেই। স্বাভাবিক দামেই আপনি এখানে খেতে পারবেন তৃপ্তি করে।

তবে আপনি যে এখানকার মেহমান সেটাও খেয়াল রাখতে হবে। কোথাও মেহমান হিসেবে গেলে একদিন আগে থেকে জানিয়ে রাখলে যেমন ভালো খাবারদাবারের ব্যবস্থা করা হয় এখানেও ঠিক তেমনই। আপনি একদিন আগে তাদের সাথে যোগাযোগ করে পছন্দের সব আইটেম অর্ডার করে রাখলে আপনি যাওয়ার সাথে সাথেই তারা তা পরিবেশন করে দেবে। যেদিন যাবেন সেদিন বা গিয়েও অর্ডার করতে পারেন তবে পর্যটক বেশি থাকলে আপনার অর্ডারটি না নেওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তাই একদিন আগেই অর্ডার করা ভালো।

এখানে বলা যায় হিল্লোল চাকমা ও তার তিন বন্ধু মিলেই ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে এ ক্যাফেটি চালু করেছিলেন। তখন থেকে সেবার মান ধরে রেখেই বর্তমান পর্যন্ত তারা ভালোভাবে টিকে আছে।

রিভারভিউ পার্ক থেকে কাপ্তাই লেক।  ছবি সূত্র : রিয়াদ 

বিকাল হতে হতেই আপনাকে ফিরে আসতে হবে। পাহাড়ি রাস্তা বিধায় সন্ধ্যার আগেই এই স্থান ত্যাগ করা ভালো। এরপর সন্ধ্যার আগে সময় থাকলে রাঙামাটি বা কাপ্তাইয়ের আশপাশের জায়গাগুলো দেখে নেওয়াও সম্ভব। আমরা কাপ্তাই রিভারভিউ পার্কে গিয়েছিলাম। ওখানকার বেঞ্চে বসে অনেক উপর থেকে কাপ্তাই লেক দেখার সুযোগ রয়েছে। কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে লেকের বিশালতাকে উপভোগ করেই কাটাতে পারেন দিনের শেষ সময়টুকু।

কীভাবে যাবেন:

দুইভাবে বেরাইন্যা লেকে যাওয়া যায়। রাঙামাটি বা কাপ্তাই হয়ে।

রাঙামাটি হয়ে : ঢাকা থেকে সরাসরি বাস রয়েছে রাঙামাটির। অথবা চট্টগ্রাম হয়ে গেলে অক্সিজেন থেকে রাঙামাটির জন্য পাহাড়িকা বাস রয়েছে। জনপ্রতি ভাড়া- ১২০ টাকা। রাঙামাটি থেকে রিজার্ভ সিএনজিতে সরাসরি বেরাইন্যা লেক। ভাড়া- ৬০০-৮০০ টাকা।

কাপ্তাই হয়ে : দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে আগে আপনার চট্টগ্রামের বদ্দারহাট বাস টার্মিনাল আসতে হবে। এখানে থেকে কিছুক্ষণ পরপর কাপ্তাইয়ের বাস ছাড়ে। ভাড়া জনপ্রতি -৬৫ টাকা। কাপ্তাই বাস স্টেশন থেকে সিএনজিতে বেরাইন্যা লেক। ভাড়া ৩০০ (শুধু যাওয়া)। চাইলে সিএনজি রিজার্ভ রেখে দিতে পারেন। এতে ড্রাইভারের সাথে কথা বলে নিতে হবে। তবে বেরাইন্যাতে সিএনজি থাকে। গাড়ি পেতে তেমন কষ্ট হবে না।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

প্রসঙ্গ, ট্রেকিং বুট ও প্রকারভেদ বিষয়ক

গভীর অরণ্য, দুটি কুকুর ও বন্ধুত্বের গল্প!