সুনাখারি রিসোর্ট থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দর্শন

আলো আঁধারির মধ্যে দিয়ে সুনাখারি রিসোর্টে ঢুকি। প্রথমে তো ড্রাইভারও বুঝতে পারছিল যে এই রিসোর্ট কোন দিকে। স্থানীয়দের সাথে কথা বলে তারপর আসি সুনাখারি রিসোর্টে। তখনই মাথায় ঘুরছিল এত রিসোর্ট রেখে সুনাখারি রিসোর্টে কেন উঠেছি। কোনোভাবে মেলাতে পারছিলাম না। বিপু’দাকে প্রশ্ন করতেই বলছিল এর উত্তর নাকি আমি সকালেই পাবো।

বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে এই রিসোর্টের।

আগের দিন রাতে গল্প গুজব করে ঘুমাতে মাঝ রাত হয়ে যায়। আর নিরিবিলি জায়গায় রাত ১২/১টা মানে অনেক রাত। আগের রাতে ঠিক করেছিলাম, সকালে উঠে আমরা টিফিন দাড়া যাবো। মানে এখান থেকে সূর্যোদয় দেখতে চেয়েছিলাম। সেই মতে এলার্ম দিয়ে রাখি। ঘুম থেকে উঠে কুয়াশায় আচ্ছন্ন দেখে কেউ আর যেতে রাজি হয়নি।

এমনকি কেউ কেউ তো বিছানা ছাড়তেই চাইছে না। কিন্তু এরই মধ্যে দুইজন মানে বিপু’দা আর জয়’দা ‘আমি হবো সকাল বেলার পাখি’ এই প্রতিপাদ্য সামনে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে পড়ে। সকালে আর টিফিন দাড়া যাওয়া হয়নি। তাতে কী? দিনের আলোয় সুনাখারি রিসোর্ট তারা ঘুরে দেখে। সকালের প্রথম আলো গায়ে মেখে ঘুরে বেড়াচ্ছে তারা।

এরাই হচ্ছে সকাল বেলার পাখি।

রাতের আলোয় সুনাখারি রিসোর্ট তথা রিশপের গুরুত্ব না বুঝলেও সকালে আমি ঠিক বুঝে ফেলি। কুয়াশা কেটে গেলে রুমের দরজা খুলে বেরতেই আমি অবাক। পরিষ্কার সফেদ সাদা চাদরে মোড়া কাঞ্চনজঙ্ঘা। রুমের বারান্দা দিয়ে দেখা যাচ্ছে হিমকন্যাকে। এই রিসোর্টের বিশেষ বৈশিষ্ট্য বোধহয় এটাই যে প্রত্যেকটা রুম থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়। এমনকি কাঞ্চনজঙ্ঘার কাছের ভিউ ভালো দেখা যায় যেকয়টি জায়গা থেকে, তার মধ্যে রিশপ অন্যতম।

রুমের বারান্দা থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা; ছবি- বিপু বিধান

পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে নানা রকম ফুলে সাজানো গোছানো গ্রাম রিশপ। আর পাহাড়ের ঢাল বেয়ে করা হয়েছে জুমের চাষ। এটি লাভা থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে এবং কালিম্পং থেকে ২৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। রিশপকে ঘিরে আছে কাঞ্চনজঙ্ঘা সহ নানান পর্বত শৃঙ্গ। রিশপের সর্বত্র অদ্ভুত নিস্তব্ধতা বিরাজ করে।

জয়’দা যখন ফেলু মিত্রির; ছবি- সাইমুন ইসলাম

বেলা বাড়ার সাথে সাথে সূর্যের আলোর সাথে একটু একটু করে পাল্লা দিয়ে রূপ বদল করছে কাঞ্চনজঙ্ঘা। উঠানে চেয়ার পেতে বসেই দেখছিলাম এই রূপ বদল। সাথে ধোয়া ওঠা গরম চা যেন দেখার আনন্দ আরও খানিকটা বাড়িয়ে দিল। এরই মাঝে মাঝে একে একে ঘুম থেকে উঠে পড়েছে বাকিরা। ডান দিকের দু’তলা বিল্ডিঙের উপরে উঠে বিভিন্ন দৃশ্য ক্যামেরা বন্দি করছেন বিপু’দা। অন্যদিকে, জয়’দা ফেলু মিত্তিরের মতো লুক দিয়ে বেশ কিছু ছবি তুলে নিল। বলে রাখি, বিভিন্ন ঢংয়ে ছবি তোলার জন্য তার খ্যাতি আছে।

হাল্কা রোদে পিঠ পেতে বসে আছি

হাল্কা রোদে পিঠ পেতে উঠানে বসেই সকালের নাস্তা করি রুটি আলুর দম দিয়ে। কথা প্রসঙ্গে উঠল এবার আমরা কী করবো। রিশপে কি আরেকদিন থাকবো নাকি কালিম্পংয়ে থাকবো আর এক রাত নাকি সোজা লাভা হয়ে শিলিগুড়ি যাবো। রিশপ জায়গাটা এত সুন্দর যে এখানে আরেকদিন থাকলে মন্দ হয় না। দুই একজন মত দিল রিশপে থাকার ব্যাপারে। কিন্তু খরচ এবং সময় দুটোই অপ্রতুল এই মুহূর্তে। তাই অগত্যা ফিরে যেতে হবে শিলিগুড়ি।

হরেক রকম ফুলে সাজানো গোছানো সুনাখারি রিসোর্ট ; ছবি- বিপু বিধান

সিদ্ধান্ত হলো হোটেল চেক আউট করে টিফিন দাড়া দেখে সেখান থেকে ট্রেকিং করে লাভা যাবো। তারপর লাভা থেকে জীপে করে শিলিগুড়ি যাবো। যেই কথা সেই কাজ। সবাই বের হবার প্রস্তুতি নিতে শুরু করি। কিন্তু গোসল করতে গিয়ে হলো যত ঝামেলা। এই ঠাণ্ডা পানি দিয়ে গোসল করা রীতিমতো চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় সকলের জন্য। রিশপের হোটেলগুলোতে এখনও গিজারের ব্যবস্থা হয়নি। তাই গোসল করতে হলে হয় ঠাণ্ডা পানি দিয়ে করতে হবে না হলে দিদিকে বলে গরম পানির ব্যবস্থা করতে হবে।

উপায়ন্তর না দেখে ঐ হিম শীতল পানি দিয়ে গোসল সেরে নেই। এরপর কাঁপতে কাঁপতে আধ ঘণ্টা ঠায় দাঁড়িয়ে থাকি রোদের মধ্যে। বরাবরের মতো এখনও সাইমুনের গোসল নিয়ে যত ঝামেলা। সে কোনোভাবেই গোসল করবে না এই ঠাণ্ডায়। কিন্তু কিছু করার নাই তার। সবার চাপে তার দাবী ধোপে টেকেনি।

রুমের সামনে এক চিলতে উঠান।

মাসুদ ভাই আর বিপু’দা গেল হোটেলের বিল পরিশোধ করতে। গিয়ে শুনল আমাদের জন্য যে রুম বরাদ্দ ছিল সেটায় আমরা উঠিনি। আমাদেরকে অন্য রুমে দেওয়া হয়েছে। হোটেল কর্তৃপক্ষের ভুলে এই ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি। তাই খরচ খানিকটা বেড়ে গিয়েছে এখানে। মাসুদ ভাই তার হিন্দির তুবড়ি ছুটিয়ে সকলের জন্য সেই খরচ খানিকটা সহনীয় মাত্রায় নিয়ে এসেছে। এবং তারা ভেবেছে আমরা বোম্বে থেকে এসেছি। একথা বুঝতে আমাদের আর কারও বাকি রইল না যে মাসুদ ভাইয়ের কারণেই তারা এমনটা ভেবেছে। বিদায়ের আগে হোটেল মালিকের কাছ থেকে শুনে নিলাম টিফিন দাড়া আর লাভা যাওয়ার পথ।

সবাই যখন একসাথে।

রিসোর্টে সবাই মিলে গ্রুপ ছবি তুলি। এরপর দিদির সাথে ছবি তুলে বিদায় নেই। আমরা যে রুমগুলোতে ছিলাম তার পাশ দিয়ে গিয়েছে টিফিন দাড়ার রাস্তা। দিদি বলেন, এই পথ ধরে ৩০/৪৫ মিনিট এগিয়ে গেলেই দেখা মেলবে টিফিন দাড়ার।

টিফিন দাড়ার পথে; ছবি- সাইমুন ইসলাম

ভেবেছিলাম, বিদেশে রিলাক্স ট্যুরে গিয়েও ট্রেকিং করবো না। নবাবজাদির মতো গাড়ি করে ঘুরে দেখবো। কিন্তু তা আর হলো কই? ঢেঁকি নাকি স্বর্গে গেলও ধান ভাঙে। আর আমরা রিলাক্স ট্যুরে গিয়েও ট্রেকিং করি।

*** ফিচার ইমেজ- সাইমুন ইসলাম

(চলবে)

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চাঁদপুর-বেলগাঁও চা বাগানের গল্প

টাইম ম্যাগাজিন অনুসারে ২০১৮ সালের বিশ্বের সেরা ১০টি ট্যুরিস্ট স্পট