কালিম্পং হয়ে রিশপের পথে

দার্জেলিংয়ের অপরূপ সৌন্দর্য অবলোকন করে এবার যাত্রা শুরু করি রিশপের উদ্দেশ্যে। পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথ ধরে এগিয়ে যাই। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে জুম চাষ দেখতে অপূর্ব লাগে সবুজের চাদর জড়িয়ে আছে চারিধারে। আর সাথে যদি সফেদ সাদা চাদর জড়িয়ে থাকা কাঞ্চনজঙ্ঘা থাকে তাহলে তো আর কথাই নেই। এভাবে দূরের হিমকন্যাকে সাথে নিয়ে একটু একটু করে এগিয়ে চলেছি আমরা।

দার্জেলিংয়ে দুই দিন আমাদের সাথে ছিলেন এই দাদা।

দার্জেলিং থেকে বের হতে দুপুর হয়ে গিয়েছে আমাদের। জীপের জন্য বেশ কিছু সময় অপেক্ষা করতে হয়। ৪,০০০ রুপি দিয়ে জীপ ঠিক করি কালিম্পং হয়ে রিশপ। সেকারণেই হয় তো জীপ ড্রাইভার আমাদেরকে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল রিশপে। পাহাড়ি বাঁকের আড়ালে আস্তে আস্তে ঢাকা পড়তে থাকে শহুরে দালানকোঠা। নিরিবিলি ঝকঝকা তকতকা রাস্তা আর দুপাশে সবুজের সমারোহের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যায় জীপ। মাঝে মাঝে রাস্তার দু’পাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে পাইন বনের সারি। আরও কিছুটা পথ যেতেই যেদিকেই চোখ যায় শুধু পাহাড় আর পাহাড়। দূরে সূর্যের কিরণ গায়ে মেখে হাসছে হিমকন্যা।

তিস্তার নদীর মিলন স্থান; ছবি- সাইমুন ইসলাম

রাস্তার পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে তিস্তা। এই সেই তিস্তা নদী, যা ভারতের উত্তরবঙ্গ আর সিকিমের বর্ডার লাইন হিসেবে আছে। এক মুহূর্তের জন্য হলেও তিস্তার টলটলে পানি দেখে ঝাঁপিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে। পাহাড়ের অনেকটা নিচ দিয়ে বয়ে চলেছে এই নদী। তাই আপাতত আর ঝাঁপ দেওয়া হয়নি তিস্তায়। রাস্তার পাশে একটা ভিউ পয়েন্ট দেখে জীপ থামাই। ভিউ পয়েন্টের নাম লাভার মিট ভিউ পয়েন্ট। এই পয়েন্টে তিস্তা সহ আরও দুই একটি নদী মিলিত হয়েছে। সেখান থেকেই তিস্তার রূপ অবলোকন করি। বেশ কিছু ছবি তুলে আর হাল্কা নাস্তা সেরে আবার জীপে চেপে বসি।

লাভার ভিউ পয়েন্টের রাস্তায়; ছবি- সাইমুন ইসলাম

সর্পিল রাস্তা আর ঘন সবুজে মোড়ানো পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছে যাই কালিম্পং। কালিম্পংয়ে যখন পৌঁছাই ততক্ষণে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেছে। পাহাড়ের কোলে সাজানো গোছানো ছিমছাম একটি শহর কালিম্পং। এখানকার মানুষের জীবন যাত্রাও বেশ উন্নত। মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে ট্রাফিক পুলিশ। বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে এখানকার ড্রাইভারদের প্রত্যেকেই ট্রাফিক নিয়ম মেনে গাড়ি চালায়। এরই মাঝে প্রকৃতি তার আপন লীলায় ব্যস্ত। নীল আকাশের মাঝে মেঘ আর কুয়াশার খেলা অবিরত।

রঙিন ফুলের গাছ কালিম্পং শহরকে দিয়েছে অন্যরকম এক রূপ। বলা যায়, প্রায় প্রত্যেক বাড়িতে বাহারি রকম ফুলের টব। ঝকঝকা তকতকা বাড়ির আঙ্গিনা। বেশ সৌখিন হিসেবে পরিচিত এখানকার মানুষ। তাছাড়া বিভিন্ন রকম এডভেঞ্চারাস এক্টিভিটির জন্য পরিচিত ছোট এই শহর। প্যারাগ্লাইডিংয়ের মাধ্যমে উপর থেকে দেখতে পারেন পুরো কালিম্পং শহরকে। হাতে যেহেতু পর্যাপ্ত সময় ছিল না আমাদের, তাই পাখির ডানায় ভেসে দেখা হয়নি কালিম্পং শহরকে।

তিস্তার পাশ দিয়ে কালিম্পংয়ের পথে।

সন্ধ্যা ঘনাতে আর খুব বেশি দেরি নেই। তাই ড্রাইভার তাড়া দিতে থাকে আমাদের। কেননা পাহাড়ি রাত অন্ধকারে বেশ ভয়ংকর। আর তাছাড়া রিশপে যাওয়ার রাস্তা বেশ একটা ভালো ছিল না। ভাঙাচোরা রাস্তার মধ্যে দিয়ে যেতে হয় রিশপে। প্রবল ঝাঁকিতে জীবন যায় যায় অবস্থা। আমার এক পাশে জয়’দা আর অন্য পাশে সাইমুন। দুইজন দুইপাশ থেকে বাড়ি খেয়ে এসে পড়ে আমার উপর। মাঝখানে আমি চ্যাপটা হয়ে যাই। ওদের দোষ আসলে দেওয়া যায় না। রাস্তার যে এই বেহাল দশা তা কি আর আমরা জানতাম!

সুনাখারি রিসোর্ট

এক-দেড় ঘণ্টা ধরে যত ঝাঁকি তত নেকি গুনতে গুণতে পৌঁছে যাই রিশপে। তখন মনে হয় সন্ধ্যা ৭টা বাজে। চারিদিকে চাঁদের মোহনীয় আলো। রিশপে আগে থেকে বুক করা ছিল হোটেল। সুনাখারি রিসোর্ট নামে একটি হোটেল। এত রেখে কেন এই রিসোর্ট বুক করলাম সে গল্প অন্য কখনো বলবো। চাঁদের হাল্কা আলোয় দেখে যা বুঝলাম খুব সুনসান জায়গায় এই রিসোর্ট। জনসাধারণের ভিড় বাট্টা নেই বললেই চলে। পুরো রিসোর্টকে হরেক রঙের ফুল দিয়ে নিপুণ হাতে সাজিয়ে রেখেছে রিসোর্ট মালিক। রুচিশীলতার পরিচয় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে রিসোর্টের চারিধারে।

সুনাখারি রিসোর্টের সব থেকে উপরের রুম।

সুনাখারি রিসোর্টের সব থেকে উপরের রুমগুলো দেওয়া হয়েছে আমাদের। পাশাপাশি তিনটি রুম। আমাদের রুমের ঠিক নিচে আরও বেশ কয়েকটি রুম আছে। সেই সময় আমরা ছাড়া উপরের দিকে কেউ নেই। ক্লান্ত পরিশ্রান্ত শরীর নিয়ে রুমে ঢুকি। ফ্রেশ হয়ে নিতেই কে কী খাবে তা জানিয়ে দেওয়া হয়। দুপুর থেকে পেটে তেমন কিছু পড়েনি। ক্ষুধায় পেট চোঁ চোঁ করছে। সাথে করে আনা বাটার আর পাউরুটি দিয়ে পেটকে কিছুক্ষণের জন্য বশে আনা হয়।

চুপচাপ খেয়ে যাচ্ছি; ছবি- বিপু বিধান

এরপর এটা সেটা নিয়ে গল্প গুজব করতে করতে সাড়ে নয়টা বেজে যায়। এরই মধ্যে খাবারের ডাক আসলো। নিচে গিয়ে হাত ধুয়ে বসে পড়ি। ডিম ভাজি, বেগুন ভাজি, পাপড় ভাজা, সবজি, ডাল আর চিলি চিকেন দিয়ে ভরপেট খেয়ে নেই। প্রত্যেকে এত বেশি ক্ষুধার্ত ছিল যে খাওয়ার সময় কেউ আর কথা বলল না। বিশেষ করে চিলি চিকেনটা ছিল অসম্ভব টেস্টি। খাওয়া শেষ হলে রিসোর্টের নিচের দিকটায় যাই। সেখানে সম্ভবত কেউ বারবিকিউ করেছে। আগুনের আঁচটা এখনও আছে। খাওয়ার পর শীত বেশি লাগছিল। তাই সবাই মিলে গোল হয়ে আগুন পোহাচ্ছিলাম।

সুনাখারি রিসোর্ট থেকে চাঁদনি রাতে; ছবি- বিপু বিধান

চাঁদনী রাত গায়ে মেখে বেশ কিছুক্ষণ বাইরে বসে রইলাম ঠাণ্ডা উপেক্ষা করে। একটু পর পর ফুলের মিষ্টি ঘ্রাণ নাকে লাগছে। অদ্ভুত মোহনিয়তায় ভুগছিলাম। বার বার মনে হচ্ছিল, ইশ! একটা জীবন যদি এভাবেই কাটিয়ে দেওয়া যেত!

*** ফিচার ইমেজ- সাইমুন ইসলাম

(চলবে)

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ঈদগড়ের হাসি ছড়ানো বাউকুল

হিম হিম শীতের হিমেল হাওয়ায় হিমাচল রিসোর্টে একদিন