কালাপোখারির অস্থিরতায়: সান্দাকফুর পথে

আচ্ছা এমন হয়েছে আপনাদের কখনো, অনেক অনেক আকাঙ্ক্ষার, অনেক অপেক্ষার, অনেক সাধনার আর ভীষণ ভালোবাসার কোনো কিছুকে দীর্ঘ অপেক্ষার পরে আপনি পেতে চলেছেন, দেখতে পাবেন প্রথম বারের মতো, স্পর্শ করতে পারবেন নিজের ইচ্ছামতো, অনুভব করতে পারবেন যেভাবে খুশি সেভাবে? সে জিনিসটা প্রায় আপনার হাত ছোঁয়া দূরত্বে, দেখতে পাচ্ছেন কিন্তু ছুঁতে বা নিজের মতো করে কাছে পাচ্ছেন না এখনো। আর একটি বেলা অপেক্ষা করতে হবে তার কাছে যেতে, পাশে পেতে আর ছুঁয়ে দেখতে, তবে কেমন অস্থির একটা অনুভূতি হবে ভেবে দেখুন তো?

সান্দাকফুর চূড়া, কালাপোখারি থেকে। ছবিঃ adventuresindbad.com

আমারও ঠিক এমন একটা অস্থির অনুভূতি তৈরি হয়েছিল টুমলিং থেকে কালাপোখারি পৌঁছে। সেখানে গিয়ে দূরের সান্দাকফুর চূড়া দেখে, ইচ্ছে হচ্ছিল এক ছুটে, দৌড়ে চলে যাই সান্দাকফুর চূড়ায়। কিন্তু না, চাইলেই তো পাহাড়ের চূড়া আপনার, আমার হাতের মুঠোয় এসে ধরা দেবে না। পাহাড় যদি নিজ থেকে আপনার কাছে ধরা না দেয়, তবে জোর করে তাকে পাওয়া যায় না কিছুতেই। সেই অপচেষ্টা করতে নেই। তাহলেই সর্বনাশ হয়ে যেতে পারে চিরস্থায়ী কোনো।
তাই প্রায় হাতের মুঠোয় থাকা চার বছরের লালিত স্বপ্ন সান্দাকফুর চূড়া চোখের সামনে থাকা সত্ত্বেও আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছিল একটি দিনের প্রায় অর্ধেক আর একটি পুরো রাত। উচ্চতা, ঠাণ্ডা আর হুহু বাতাসের সাথে মানিয়ে নেবার জন্য। এটাই নিয়ম, এটাই প্যাশন আর এটাই চূড়ান্ত সফলতা পাবার প্রশিক্ষণ।
ভয়, আশঙ্কা, আতঙ্ক আর চূড়ান্ত রোমাঞ্চকর টুমলিং থেকে কালাপোখারি পথ পেরিয়ে যখন কালাপোখারিতে সেদিনের মতো থামতে হবে, বিশ্রাম নিতে হবে আর পরের দিনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে, তখনই আপনার মাঝে উপরের অস্থির অনুভূতি তৈরি হবে। হবেই যদি আপনি প্রথমবারের মতো, বহুদিনের লালিত স্বপ্ন পূরণের জন্য সান্দাকফু গিয়ে থাকেন।
কালাপোখারি। ছবিঃ d3hne3c382ip58.cloudfront.net

কারণ আপনি তখন অবস্থান করবেন ঠিক ১০ হাজার ফুট উচ্চতার কালাপোখারি গ্রামে। এটি মূলত নেপালি একটি গ্রাম। কিন্তু নেপালের কোনো কোনো সুযোগ সুবিধা এখানে নেই, পাওয়া যায় না, সেটা সম্ভব নয় দূরত্ব আর দুর্গমতার জন্য। এখানে যা কিছু আছে, যা কিছু সুযোগ সুবিধা বা নিয়ন্ত্রণ সবকিছু ভারতের আর ভারতীয়। কারণ এখান থেকে ভারতের সবকিছু কাছে, সহজলভ্য আর নিজেদের সাধ্যের মধ্যে। যে কারণে নেপালি হয়েও ওরা ভারতীয় প্রায়। ভারতের সবকিছুই এখানে চলে, খাবার থেকে শুরু করে অর্থ কড়ি পর্যন্ত।
কালাপোখারি থেকে সান্দাকফু ৬ কিলোমিটার পাহাড়ি পথ। উচ্চতা ১২,০০০ ফুট। যেতে সময় লাগবে ট্রেকের অভ্যস্ততা ভেদে ২ থেকে ৪ ঘণ্টা। যে যত দ্রুত পাহাড়ের পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নিয়ে চূড়ায় পৌঁছাতে পারে। তবে দু ঘণ্টার নিচে আর চার ঘণ্টার বেশি সাধারণত লাগে না। প্রফেশনাল ট্রেকারদের কথা আলাদা।
সান্দাকফুর পথ। ছবিঃ 90bikes90days.org

কালাপোখারি গিয়ে আপনি অদ্ভুত আর অস্থির সময় পার করবেন। কারণ এখানে আপনি একদিন থাকবেন পাহাড়ের উচ্চতা, ভারি আর ঠাণ্ডা ঝড়ো বাতাসে, যে কোনো সময় বৃষ্টি- এসবের সাথে মানিয়ে নিতে হবে। পাশাপাশি পরবর্তী দিন ১২ হাজার ফুট উচ্চতার প্রায় মাইনাস তাপমাত্রার সান্দাকফুর চূড়ায় নিজেকে মানিয়ে নিতে হবে। যেখানে একটু এদিক ওদিক হলেই বড় ধরনের যে কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত অসম্ভব কিছু নয়! তাই আপনি চাইলেই সান্দাকফুর চূড়ায় পৌঁছে যেতে পারবেন না সময় থাকলেও।
তবে যে সময়টুকু আপনি এখানে থাকবেন সেটা এক অন্য রকম অনুভূতি দেবে আপনাকে। কারণ কালাপোখারি এমন একটা উচ্চতায় আর এমন একটা অবস্থানে অবস্থিত যেখান থেকে আপনার মাড়িয়ে আসা পথ- টুমলিং, টংলু, গভীর আর রোমাঞ্চকর অরণ্য, মাথার সিঁথির মতো সবুজ পাহাড়ি পথ সবকিছু আপনার চোখের সামনে একটু নিচের দিকে তাকালেই। আর অন্যদিকে সান্দাকফুর চূড়া, সান্দাকফু থেকে ফালুট যাবার অপার্থিব ট্রেক রুট, আর ক্ষণে ক্ষণে মেঘেদের উঁকিঝুঁকির মাঝে কাঞ্চনজঙ্ঘার লুকোচুরি খেলা।

কালাপোখারিতে প্রবেশের মুখেই চোখে পড়ে একটি ছোট্ট লেক। ওরা যেটাকে বিধাতার বিশেষ আশীর্বাদ হিসেবে মনে করে। যে লেকের হিম ঠাণ্ডা জলেও ফুটে থাকে নানা রঙের পদ্ম ফুল! ভেসে চলে পাহাড়, পাহাড়ি লেকের আলতো ঢেউয়ে। যেখানে প্রতিচ্ছবি পড়ে নীল আকাশ আর দূরের বরফ মোড়া পাহাড় চূড়ার, যেখানে শেষ বিকেলে আর সোনালি সকালে রঙের ঢেউ ওঠে প্রতি মুহূর্তে। সে এক অপার্থিব দৃশ্য।
কালাপোখারির অস্থির সময়গুলো এভাবেই কেটে যাবে কিছুটা অগোচরেই চারদিকের রূপ দেখে দেখে। এখানে আর একটি বিশেষ মুহূর্ত হলো বৃষ্টির সময়। যখন বৃষ্টি নামে তখন এখানে স্বর্গীয় একটা রূপ তৈরি হয়। কারণ পুরো পাহাড়ের সবটুকু জুড়ে কখনো বৃষ্টি ঝরে না, আমি অন্তত দেখিনি। এখানে হয়তো কালাপোখারিতে ভীষণ বৃষ্টি, কিন্তু নিচের টুমলিংয়ে কোনো বৃষ্টি নেই, ঝলমলে রোদ! আবার হয়তো সান্দাকফুর চূড়ায় ঝকঝকে নীল আকাশের মাঝে উঁকি দিয়ে যাচ্ছে বরফ চূড়ায় মুদ্রিত কাঞ্চনজঙ্ঘা!
অপূর্ব প্রকৃতি। ছবিঃ maroonmigrates.com

তখন কেমন অনুভূতি হতে পারে ভেবে দেখুন তো একবার? ঝুম বৃষ্টির মাঝে ছোট্ট টিনের চালের ঘরে বসে বৃষ্টির রিমঝিম গানের সাথে হাতে নিয়ে আছেন ধোঁয়া ওঠা গরম কফির মগ। সেখানে চুমুক দিচ্ছেন ধীরে ধীরে, চোখ রেখেছেন ছোট্ট কাঁচের জানালায়, যেখানে দূরের পাহাড়ে রোদ ঝলমলে সোনালি আলোর ঝিলিক, আর অন্যপাশে বরফ মোড়া পাহাড় চূড়ার কাছে আপনার অনেক দিনের স্বপ্নের সেই সান্দাকফু আর নীল আকাশের মাথায় জেগে থাকা কাঞ্চনজঙ্ঘা!
এসব একই সাথে পেয়ে আর দেখে আপনার অস্থিরতা আরও বেড়ে যাবে, সময় যেন কখনো থমকে যাবে কখন বৃষ্টি থেমে, রাত পোহাবে? কখন আপনি আপনার স্বপ্নের সেই সান্দাকফুর চূড়ায় পা ফেলবেন, ওড়াবেন বিজয়ের সেই সুখের পতাকা, নিজেকে নিয়ে যাবেন নিজের কাছেই এক অনন্য অর্জনের কাছে। যে অর্জন, যে অভিজ্ঞতা আর যে রোমাঞ্চ সারাজীবন আপনাকে সুখের স্রোতে ভাসিয়ে নেবে, কল্পনার কোমল মেঘে উড়িয়ে নেবে, শ্বেত শুভ্র পাহাড়ের মতো সবসময় স্মৃতির আকাশে জ্বলজ্বল করবে।
ফিচার ইমেজ- মাহমুদ ফারুক 

Loading...

One Comment

Leave a Reply
  1. কালাপোখারি একটি অদ্ভুত জায়গা। এখান থেকে না দেখা যায় কাঞ্চনঝঙ্গা না অন্যকিছু। কিন্ত সান্দাকফুর উপরে শেরপা চ্যালেট বিল্ডিং টা ঠিক ই দেখা যায় পরিষ্কার আবহাওয়ায়। এখানে যতবার গিয়েছি ততবার একই ধরণের অনুভূতি হয়েছে, সেটা হচ্ছে এখানে গেলে মনে হয় সময় থমকে গিয়েছে। এখানে সব কিছু স্থির। এখান থেকে আর কোথাও যাবার দরকার নেই। যদিও সান্দাকফু যাবার তারা থাকে কিন্ত তার পর ও ইচ্ছে হইয় স্রেফ কোন ঢালে বসেই এখানে সারা দিন পার করে দেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

পদ্মনাভ স্বামী মন্দির: যার ঐশ্বর্য পৃথিবীর সবকিছুকে ম্লান করে দেয়

হংকংয়ের শীর্ষ সব ভ্রমণস্থানের গল্প