কৈবল্যধাম মন্দিরের জন্ম বৃত্তান্ত

নোয়াখালী থেকে চট্টগ্রামগামী যে বাস ধরেছিলাম, সেটা আমাকে দুই ঘণ্টায় কৈবল্যধাম পৌঁছে দিল। বন্ধু নিলয়কে এ কথা জানাতেই, সে হাঁচড়ে পাঁচড়ে, শার্টের উল্টাপাল্টা বোতাম লাগিয়ে আমাদের নিতে এলো। ভাবতেই পারেনি, এত জলদি পৌঁছাতে পারবো। সকাল ন’টায় আমরা চট্টগ্রাম শহর ঘুরে বেড়ানোর জন্য পা বাড়ালাম। যেহেতু সবচেয়ে কাছে কৈবল্যধাম, তাই সেদিকেই গেলাম সবার আগে।
কৈবল্যধাম মন্দিরের ইতিহাস খুব বিস্তৃত। পাহাড়ের উপরে বানানো এই চমৎকার মন্দিরটির গড়ে ওঠার গল্পটিও দারুণ।

মন্দিরে ওঠার সিঁড়ি। সোর্স: লেখিকা

শ্রী শ্রী ঠাকুর রাম চন্দ্র দেব তার নরলীলা শেষ করার পূর্বে একটা আশ্রম প্রতিষ্ঠা করার কথা ভাবছিলেন। তখন তিনি তার ইচ্ছার কথা ভক্তদের জানালে তারা ঠাকুরের আশ্রম করার জন্য বিভিন্ন জায়গার সন্ধান দেন। সেগুলো ঠাকুরের পছন্দ হয়নি। সবশেষে একটি পাহাড় দেখাবার জন্য নিয়ে যাওয়া হলো ঠাকুরকে।
বহুদিন লোকজনের বাস না থাকায় পাহাড়টি জঙ্গলে ভর্তি ছিল। ঠাকুর পাহাড়টি দেখতে যাবেন শুনে শ্রদ্ধেয় বিধুভূষণ বসু লোকজনের মাধ্যমে জঙ্গল পরিষ্কার করালেন। একদিন বিকালবেলা সেই পাহাড় দেখতে যাওয়া হলো। বড় রাস্তা হতে পাহাড়টির নিকটে গাড়ি পৌঁছানোর মতো কোনো ভাল রাস্তা না থাকায় ঠাকুরকেও পাহাড়ে হেঁটে যেতে হলো। ঠাকুর পাহাড়টিতে পাঁচ-ছয় পা উঠে চারপাশ ঘুরে দেখলেন। তারপর পাহাড়ের তলদেশে একটি বটবৃক্ষের মূলে বসলেন। এই বটবৃক্ষকেই “কৈবল্যশক্তি” অভিহিত করা হয়। গুরুভ্রাতাদের সবাই চারদিক ঘুরে ঘুরে দেখছিলেন। অনেক রকমের গাছ থাকায় ঐ স্থানটিকে অলকানন্দার তীরে নন্দন কানঙ্কেই মনে করিয়ে দিচ্ছিল। আশেপাশে আরও অনেক ছোট-বড় পাহাড় দেখা যাচ্ছিল।
নাট মন্দির। সোর্স: লেখিকা

পাহাড়টির পাশ দিয়েই রেল লাইন। এখান থেকে অনেক দূরে সমুদ্রও দেখা যাচ্ছিল। পাহাড় ও সমুদ্রের মধ্যবর্তী স্থানে ছিল সবুজ মাঠ ও ছোট ছোট গ্রাম। প্রকৃতির সকল রকম সৌন্দর্যের বস্তুই ঐখানে বিরাজ করছিল। পাহাড়ের তলদেশে আবদুল নামে একজন মুসলমান ভদ্রলোক সপরিবারে বাস করতেন। আবদুল সেখানে এলে ঠাকুর তাঁকে এমনভাবে আলিঙ্গণ করলেন, মনে হলো আবদুল তাঁর বহু দিনের পরিচিত। ঠাকুর আবদুলকে বললেন, “এই স্থানেই আশ্রম প্রতিষ্ঠিত হইবে, আশ্রমের সমস্ত কায্যে আপনি ভক্তদের সাহায্য করিবেন, এই আশ্রমের ভালমন্দের দিকে লক্ষ্য রাখিবেন।” আবদুল নতমস্তকে ঠাকুরের আদেশে সম্মতি জ্ঞাপন করলেন।
অবশেষে আশ্রমের জন্য এই স্থানটি শ্রী শ্রী ঠাকুরের পছন্দ হয়েছে জেনে সবাই খুব খুশি। পরদিন শ্রী শ্রী ঠাকুর চট্টগ্রাম থেকে চাঁদপুরে ফিরে আসেন। এর আট-দশ দিন পরেই সংবাদ পেলেন শ্রদ্ধেয় বিধুভূষণ বসু আশ্রমের নির্মাণকার্য শুরু করেছেন।
কৈবল্য মন্দির। সোর্স: লেখিকা

ঠাকুর এই আশ্রমকে “কৈবল্যধাম” নামে অভিহিত করলেন। ঠাকুরের আদেশে ১৩৩৭ সালের ১০ই শ্রাবণ, শুক্রবার এই আশ্রম প্রতিষ্ঠিত হয়। কৈবল্যনাথের চিত্রপট প্রতিষ্ঠা করে উৎসব করা হয়। তখন গোটা পাহাড় কীর্তনোৎসবে মুখরিত হয়েছিল।
পাহাড়ের উপরে শ্রী মহেদ্রনাথ ঘোষালের বেড়াশূন্য চৌচালা টিনের ঘরটিকে শ্রদ্ধেয় বিধুভূষণ বসু মেরামত করালেন। রান্নাঘর তৈরি, নলকূপ খনন সহ চারদিক পরিষ্কার করে পাহাড়ের উপর উঠবার সরু রাস্তাটিরও সংস্কার করালেন। ১০ই শ্রাবণ আশ্রম প্রতিষ্ঠা, হাতে সময় খুব কম। সুতরাং মন্দির বা অন্য কোনো ঘর তৈরি করা সম্ভব নয়। একমাত্র শ্রদ্ধেয় বিধুভূষণ বসুর আপ্রাণ চেষ্টায় ঐভাবে ১০ই শ্রাবণ আশ্রম প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়েছিল।
শ্রী শ্রী ঠাকুরের আদেশে হরিপদ বন্দ্যোপাধ্যায় কৈবল্যধামের প্রথম মোহন্ত পদে অধিষ্ঠিত হন। এই উৎসব উপলক্ষেই তিনি প্রথমে আশ্রমে আসেন।
মোমবা, আগরবাতি জ্বালানোর জায়গা। সোর্স: লেখিকা

শ্রী শ্রী ঠাকুর আশ্রমে প্রবেশ করেন কিছুদিন পরে। ঠাকুরের আশ্রম প্রবেশের পূর্ব পর্যন্ত আশ্রমের যাবতীয় খরচ বিধুভূষণ বসু প্রায় একাই বহন করেছিলেন।
কোথায় ঠাকুর-মন্দির হবে, কোথায় পুরুষ ও মহিলা ভক্তগণের আলাদা আলাদা থাকার জায়গা হবে, কোথায় নলকূপ খনন করা হবে, সবই শ্রী শ্রী ঠাকুর বিধুভূষণ বসুকে দেখিয়ে দিয়েছিলেন।
ধাপে ধাপে নেমে গেছে সিঁড়ি। সোর্স: লেখিকা

১৫ই ফাল্গুন ঠাকুর আশ্রমে প্রবেশ করবেন। ১৫ই ফাল্গুনের ২/৩ দিন আগে থেকেই লোক সমাগম শুরু হয়েছিল। ঠাকুর নোয়াখালি থেকে রওনা হলেন। ট্রেন থেকে কৈবল্যধাম দেখেই ঠাকুর যেন ভাবাবিষ্ট হয়ে পড়লেন। পাহাড়তলী ষ্টেশনে ট্রেনটি পৌঁছালে শ্রদ্ধেয় গুরুভ্রাতারা প্রায় সবাই ট্রেন থেকে নেমে কৈবল্যধাম চলে গেলেন। ঠাকুরকে বিধুভূষণ বসু নিজের বাসায় নিয়ে গেলেন। পরে বিধুভূষণ বসুর নিয়োজিত বড় মোটর গাড়িতে চড়ে ঠাকুর বিধুভূষণ বসু ও অন্যান্য ভক্তকে সঙ্গে নিয়ে কৈবল্যধামের পাদদেশে এলেন। উদ্দাম কীর্তন, শঙ্খধ্বনি ও উলুধ্বনি দিয়ে উপস্থিত সবাই ঠাকুরকে অভ্যর্থনা জানালো।
নিবাস। সোর্স: লেখিকা

তিন দিন ধরে চলল মহোৎসব। প্রসাদ বিতরণের সময় অসংখ্য লোক উপস্থিত হলো। তখন কৈবল্যধামের স্থান খুবই সঙ্কীর্ণ ছিল। প্রসাদ পাবার জন্য লোকের এত আগ্রহ আর কেউ কখনো দেখেনি। একবার কলার পাতা বিছানোর পর আর উঠাতে হলো না। একই পাতাতে প্রত্যেকদিন রাত বারোটা পর্যন্ত সবাই প্রসাদ গ্রহণ করেছিলেন। দেশে অনেক মহোৎসব হয়েছে, কিন্তু আর কোনো দিন ঐভাবে একই পাতায় বার বার প্রসাদ নিতে দেখা যায়নি। সমস্ত দিন ধরিয়া প্রসাদ বিতরণ করা হয়েছিল।
শ্রী শ্রী ঠাকুর মাত্র তিন দিন তিন রাত্রি স্থূলভাবে কৈবল্যধামে বাস করেছিলেন। তিন দিন পেরুনোর পর সকালে তিনি চট্টগ্রামে বিধুভূষণ বসুর বাসায় চলে যান।
কৈবল্যশক্তি নামের বটগাছ। সোর্স: লেখিকা

চাঁদপুরে ফিরে আসবার পরে ঠাকুর বলেছেন, আর কোনোদিন স্থুল শরীরে কৈবল্যধামে যাবেন না। এই সংবাদে সকলে খুবই দুঃখিত হইলেন। গুরুভ্রাতাদের একান্ত ইচ্ছা, ঠাকুর নানাস্থানে না ঘুরে কৈবল্যধামে বাস করিবেন এবং সবাই সময়মত তাঁহার শ্রীচরণ দর্শন করতে পারবেন। জবাবে ঠাকুর বলেছেন, তিনি আগে যেমন বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়াতেন, এখনও সেভাবে ঘুরে বেড়াবেন। আর কোনো দিন শ্রীশ্রী ঠাকুর ঐ কৈবল্যধামে প্রবেশ করেননি।
গয়াঘর। সোর্স: লেখিকা

একদিন ঠাকুর চাঁদপুরে শ্রদ্ধেয় গুরুভ্রাতা শ্রী রোহিণীকুমার মজুমদারের ঘরে বসে আছেন। শ্রদ্ধেয় গুরুভ্রাতা কৈবল্যধাম সম্বন্ধে নানা গল্প করতে করতে ঠাকুরকে বললেন, ‘কৈবল্যধামে কোনো ঝর্ণা নেই, পুরীতে ইভেন্স যোগোদ্যানে একটি সুন্দর ঝর্ণা আছে।’
এটা শুনে ঠাকুর একটি সুন্দর গল্প বললেন। গল্পটি এরকম-
এক মহাপুরুষ তাঁর শিষ্যবৃন্দসহ ঘুরে ঘুরে একটি পাহাড়ের উপর বিশ্রাম করছিলেন। শিষ্যগণ জলপিপাসায় কাতর হয়ে চারদিকে জল অন্বেষণ করলো। কোথাও জলের খোঁজ না পেয়ে পিপাসার্ত শিষ্যগণ গুরুদেবকে জানালো যে, তারা পিপাসায় কাতর, কিন্তু জল পাওয়া যাচ্ছে না। গুরুদেব বললেন, “নিকটেই জল আছে, খুঁজিলেই পাইবে।” শিষ্যগণ আবার জলের সন্ধান করে ব্যর্থ হয়ে পুনরায় তাহার গুরুদেবকে এই সংবাদ জানালো।
কিন্তু গুরুদেব আর কোনো কথাই বললেন না। উপায় না দেখে শিষ্যগণ হতাশ মনে গুরুদেবের পাশে বসে রহিল। তারা যেখানে বসেছিলেন, মনে হলো যেন তার নিচেই কুল কুল ধ্বনিতে জল চলাচলের শব্দ হচ্ছে। চারপাশে ভালোভাবে তাকিয়ে তারা দেখতে পেল, খুব কাছেই একটি প্রস্তর খণ্ডের তলদেশ থেকে জলের ফোয়ারা বের হচ্ছে। শিষ্যগণ পরম আনন্দে সেই জল পান করলো।
কৈবল্যকুণ্ড। সোর্স: লেখিকা

গুরুভ্রাতা শ্রীরোহিণীকুমার মজুমদার এই গল্প শোনার পরেও বোঝেননি যে, কৈবল্যধামেও ওরকম একটি ঝর্ণার উৎস বের হবে।
কিছুদিন পর কৈবল্যধাম থেকে সংবাদ এলো, কৈবল্যধামের পাহাড় থেকে একটি ঝর্ণা বের হয়েছে। ঠাকুর ঝর্ণাটিকে কামশ্রীকুণ্ড নামে অভিহিত করেছেন।
যেহেতু আশ্রমটি পাহাড়ের উপরে, সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলাম প্রথমে। উপরে উঠে একটা নাটমন্দির দেখতে পেলাম। এর সামনেই কৈবল্যনাথের ছবি সম্বলিত মন্দির। দুয়েকজন পূজারি পূজা করছে ওখানে। পাশে মোমবাতি আর আগরবাতি জ্বালানোর স্ট্যান্ড। বাম পাশ দিয়ে এক সারি সিঁড়ি নেমে গেছে নিচের দিকে। সিঁড়ির মাঝামাঝিতেই দৃষ্টি গোচর হলো কৈবল্যধামের যাত্রী নিবাসটি। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে দেখলাম, কৈবল্যশক্তি নামে খ্যাত সেই বটবৃক্ষ। গাছটি এত পুরোনো যে এর একেকটি ঝুড়ি সাধারণ বৃক্ষ জাতীয় গাছের মতো মোটা।
এত বড় গাছ, অথচ কোথাও লাল সূতো বাঁধা নেই। সাইনবোর্ডে লেখাও আছে, লাল সূতো বাঁধা নিষেধ। কামশ্রীকুণ্ড বা কৈবল্য কুণ্ড নামে যে পুকুরটি আছে, ওতে মানুষজনের গোসল করা নিষেধ। গয়াঘরে পূজার আয়োজন চলছে। সকাল বেলাটাতেই কেমন গরম পড়ছিল সেদিন। ওটুকু ঘুরতেই ঘেমে নেয়ে গিয়েছিলাম। সব দেখা শেষ করে পুকুরপাড়ে গিয়ে বসলাম। এক ঝলক ঠাণ্ডা বাতাসে শরীরটা জুড়িয়ে গেল। পুকুরঘাটের পাশেই অনেকখানি খালি জায়গা। সবুজ ঘাসে ছেয়ে আছে। ওখানটায় নাকি মৃতদেহের সৎকার করা হয়। পুকুরঘাটে বসে আড্ডা দেওয়া নিষেধ বলে এখানে আর বেশিক্ষণ বসলাম না।
হরগৌরী মন্দির। সোর্স: লেখিকা

কীভাবে যাবেন:

ঢাকা ট্রাঙ্ক রোড নামে সুপরিচিত ঢাকা-চট্টগ্রাম প্রধান সড়কের পাশে কৈবল্যধাম রেল স্টেশনের খুব কাছেই শ্রীশ্রীকৈবল্যধাম। হেঁটেই যাওয়া যায়।
তথ্যসূত্র :
http://www.kaibalyadham.org/?page_id=42

Loading...

One Comment

Leave a Reply
  1. কতবার গেলাম ছোট বেলা 🙂 ধন্যবাদ শৈশবের স্মৃতি মনে করিয়ে দেবার জন্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফুল প্রেমীদের জন্য বিশ্বের সুন্দর কয়েকটি বাগানের সন্ধান

রিশপ পাহাড়ের স্বর্গ উদ্যানে