উত্তরার কাঁচকুড়ায় একবেলা

ত্রি-নদীর কোল জুড়ে ভাসমান শহর চাঁদপুরে আমার বাড়ি। ডাকাতিয়ার পানিতে দাপিয়ে ছোট থেকে বড় হয়েছি। তাই নদীর সন্ধান পেলেই যে দেখার জন্য ছুটে যাব, সেরকম কোনো মনোভাব নেই আমার মধ্যে। উত্তরার কাছে কাঁচকুড়ায় এরকম একটা নদী আছে বা সেখানে নৌকায় করে ঘুরে বেড়ানো যায়, এসব শুনেও যে খুব আগ্রহী হয়ে উঠেছি- তা নয়। কারণ, নদী থাকুক আর যাই থাকুক, ওখানে তো চাঁদপুরের তিন মোহনার মতো অসম্ভব গরমে নিমেষেই ক্লান্তি দূর করার জন্য উড়িয়ে ফেলে দেওয়ার মতো, নিদেনপক্ষে স্নিগ্ধ হাওয়ার ঝাপটা থাকবে না। শহুরে নদী কি আর গ্রামের মতো প্রাণবন্ত হয়? কিছুটা নাক সিটকেই আমরা গিয়েছিলাম ওখানে, কেবলমাত্র উত্তরাতে ঘোরার জায়গা নেই বলে।

রাস্তার পাশেই একটা নান্দনিক সুন্দর বাড়ি। সোর্স: লেখিকা

উত্তরা দক্ষিণখান ইউনিয়নের কাঁচকুড়া রোডে প্রায়ই নাটকের শ্যুটিং হয়। পাশাপাশি ইউনিয়ন উত্তরখানেও শ্যুটিং হয়। শ্যুটিংয়ের জায়গাগুলোতে হয়তো অনেকেই গিয়েছেন। বাজার থেকে মিনিট দশেকের দূরত্বের নদীর ঘাটে খুব বেশি ভ্রমণপ্রিয় মানুষের পা পড়েনি। এয়ারপোর্ট থেকে তিনবারে অটো বদলে এলাম কাঁচকুড়া। সরাসরি অটো খুব বেশি পাওয়া যায় না। থাকলেও সময় লাগে বেশি। তাই ভেঙে ভেঙে এলে সময় সাশ্রয় হবে। রাস্তা কেমন, সে ব্যাপারে পরে বলছি।
ইট বিছানো রাস্তার দুই ধারে কাঁচকুড়ার সৌন্দর্য। সোর্স: লেখিকা

কাঁচকুড়া বাজারের কাছাকাছি জায়গায় রাস্তার পাশেই একটা নান্দনিক সুন্দর বাড়ি দেখতে পেলাম। বাড়ির সামনে চারপাশে বাঁধানো একটা পুকুরও আছে। অটোওয়ালাকে অনুরোধ করে নামলাম ওখানটায়। হাতে খুব বেশি সময় ছিল না, তাই ভালোভাবে ঘুরে দেখা হয়নি বাড়িটা। তবে যতটুকু দেখেছি, মনে হলো কোনো সরকারী উর্ধ্বপদস্থ কর্মকর্তার বাস ভবন। পরে কখনো এলে এই বাড়িটা ঘুরে দেখবো।
ঘাটে যাওয়ার মুখেই পড়বে বাঁশের তৈরি এই মাঁচাটি। সোর্স: লেখিকা

কাঁচকুড়া নদীর কাছাকাছি এসে আমার নাক সিঁটকানো ভাবটা উবে গেল। এক ঝলক বাতাসের ঝাপটা যেন শাড়ির আঁচল উড়িয়ে নিয়ে যাবে। বর্ষাকাল বলে পানি অনেক। দূরে তীর দেখা যায়। ঘাটে নৌকা বাঁধা থাকে। ইঞ্জিন চালিত নৌকা থেকে শুরু করে খেয়া নৌকা, এমনকি ছোট খাট লঞ্চও আছে। পাঁচ টাকা ভাড়ায় এপার থেকে ট্রলার নৌকা ভর্তি করে ওপারে যাচ্ছে, ওপার থেকে আসছে। নদীর ওপারেই হরদিবাজার। ওখান ভাদুন গ্রামের শুরু। নৌকা ভাড়া করে ঘোরা যায় চাইলে। খেয়া নৌকা ঘন্টায় ৩০০ টাকা চাইবে। তবে দামাদামি করে ১৫০-২০০ টাকায় ঠিক করা যাবে।
ভেলে মাছ ধরছে জেলে। সোর্স: লেখিকা

শীতে এখানকার পানি একেবারেই কমে যায়। কারণ একসময় এটা নদীর গতিপথ ছিল কিন্তু এখন প্রায় মরা নদী বললেই চলে। বর্ষাকালে যা একটু প্রাণ ফিরে পায়। তাই নদীর রূপ অবলোকন এবং নৌকা ভ্রমণের জন্য বর্ষাকালেই যেতে হবে।
দিগন্ত বিস্তৃত অম্বুধি। সোর্স: লেখিকা

এখানে দিনের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রকম সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন। খুব সকালে গেলে পুরো বিল জুড়ে শুধু সাদা শাপলা দেখা যাবে, নৌকা ভাড়া করে ঘোরার সময় ইচ্ছামতো শাপলা তোলা যাবে। দুপুরে কাঠফাটা রোদেও প্রচণ্ড বাতাস থাকায় গরম বোঝাই যাবে না। বিকালে নদী তীরের অসম্ভব সুন্দর সূর্যাস্ত দেখা যাবে।
বাতাসের ঝাপটা যেন শাড়ির আঁচল উড়িয়ে নিয়ে যাবে। সোর্স: শিহান

বাঁশের একটা মাঁচা আছে এখানটায়। উঠে পা ঝুলিয়ে বসতে ইচ্ছে করেছিল। কিন্তু বাঁশের বেড়ি দিয়ে আটকানো ছিল। তাই ওঠা যায়নি। তাই বলে ছোট মাঁচাটায় গিয়ে বসবো না, তাই কী হয়? এই ছোট মাঁচাটিতে সম্ভবত নৌকা এসে ভেড়ে। ঘাট থেকে একটা ইট বিছানো সরু পথ এগিয়ে গেছে নদীর তীর ঘেঁষে। ওখানকার নদীতে একটা ‘ভেল’ পাতা আছে।
আমাদের এলাকায় জাল, বাঁশ দিয়ে বানানো এক ধরনের মাছ ধরার কৌশলকে বলে ‘ভেল’। এখানে কী বলে, জানি না। একজন লোক ভেলে মাছ তুলছিল। নৌকাঘাটে একটা ফাস্টফুডের দোকান আছে। তবে খাবারের দাম তুলনামূলক বেশি।

কীভাবে যাবেন:

ঢাকার যে কোনো জায়গা থেকে এয়ারপোর্ট। এয়ারপোর্টের হাজিক্যাম্প থেকে অটোতে কাঁচকুড়া বাজার। ভাড়া নেবে ৩০ টাকা। সরাসরি পাওয়া না গেলে প্রথমে দক্ষিণখান আসবেন। দক্ষিণখান থেকে কাঁচকুড়া বাজার। এখান থেকে ৫ টাকা ভাড়ায় বদলি অটোয় নদীর পাড়।

ট্রলার নৌকা ভাড়া করে ঘুরে বেড়ানো যায় চাইলেই। সোর্স: লেখিকা

সতর্কতা:

এবারে আসি রাস্তা প্রসঙ্গে। এই ইউনিয়নের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে ভাঙাচোরা সড়ক। এসব সড়কের পিচ তো উঠেছেই, ইট পর্যন্ত উঠে গেছে। উঁচু-নিচু এসব গর্তে রিকশায় চলাচল করা রীতিমতো বিপদজনক। যেকোনো সময় উল্টে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। অনেক দিন হয়ে গেলেও এসব সড়ক সংস্কারের ছোঁয়া পায়নি।
দক্ষিণখান বাজারে যাওয়ার সড়কটি চওড়ায় আরও বাড়ানো দরকার। বৃষ্টি হলেই পানি জমে যায়। এই পানি বের হওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। গাড়ির কাদাজলে ছিটে খেয়ে হাঁটতে হচ্ছে পথচারীদের। আর অটোয় বসে আমাদের কোমরের হাড় নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছিল, নাকি আমরা জামের ভর্তা হচ্ছিলাম, এই ব্যাপারে কিঞ্চিত দ্বিধা আছে। এত সুন্দর জায়গাটাতে তাই দ্বিতীয়বার যাওয়ার আগে চিন্তাভাবনা করে যেতে হবে।

নিজেদের ব্যবহৃত অপচনশীল বজ্র নিয়ে এসেছি সাথে করে। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সুন্দর দেশ গড়ে তোলার দায়িত্ব তো আমাদের সবারই, তাই না?

আরো একটি ব্যাপার না বললেই নয়। যেখানেই বেড়াতে যান না কেন, পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখুন। আপনার ব্যবহৃত প্লাস্টিক বর্জ্য যেখানে সেখানে ফেলে পরিবেশ দূষণ করবেন না।
ফিচার ইমেজ: মাদিহা মৌ

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

রাজা টংকনাথের রাজবাড়ির আত্মকথন

সবুজে সাজানো কাশ্মীরের গুলমার্গ ভ্রমণ