তিন ঘণ্টার নাইকির গল্প!

তিন ঘণ্টার নাইকি!

হুম, এক জোড়া নাইকি, তিন ঘণ্টার নাইকি, মানে এক জোড়া বিখ্যাত নাইকি ব্র্যান্ডের জুতোর আয়ু ছিল মাত্র তিন ঘণ্টা!

পাগলের প্রলাপ বকছেন না তো!

কেন বলুন তো?

এই যে বললেন, তিন ঘণ্টার নাইকি!

নাইকির আনন্দ! ছবিঃ সংগ্রহ

তো?

তো আবার কী? তিন ঘণ্টার কোনো নাইকি হয় নাকি? এত বড় আর বিখ্যাত একটা ব্র্যান্ড নিয়ে এভাবে বললে মানুষ তো পাগলই বলবে নাকি?

হ্যাঁ সেটা ঠিক, কিন্তু আমাদের এই গল্পে এক জোড়া নাইকির বয়স ছিল মাত্র তিন ঘণ্টা! সত্যি।

কী বলছেন?

জ্বী ভাই, ঠিক আর সত্যি-ই বলছি, চলুন কষ্ট করে পড়ে দেখুন আমাদের সেই আজন্ম আফসোসের আর অনন্ত হাসির কিন্তু মন কেমন করা সেই তিন ঘণ্টার নাইকির গল্প… 

নাইকি! ছবিঃ সংগ্রহ

তখনো বান্দরবান যাইনি। ২০০৯ সালের শেষ দিকে। সহকর্মীরা মিলে ঠিক করলাম এবার তবে একটু পাহাড় দেখে আসি, চল বান্দরবান যাই। খরচও খুব কম। এই ধর কক্সবাজারের তুলনায় চারের এক ভাগ! সমুদ্র আর জঙ্গল তো অনেক দেখেছি। বান্দরবান, পাহাড় আর অল্প ভ্রমণ খরচের কথা শুনে সবাই রাজী হয়ে গেল।

সব মোটামুটি ঠিকঠাক। যাবার দিনক্ষণ ঘনিয়ে এলো। প্রস্তুতিও প্রায় শেষ। যেদিন বান্দরবান রওনা হব, ঠিক তার আগের দিন অফিসে বসে কে কী নিয়েছে না নিয়েছে আর কী কী নিতে হবে এইসব আলোচনার মাঝে মনে পড়লো- আরে আমার তো পাহাড়ে যাবার জুতো নেই! সবার মোটামুটি আছে। মনটা একটুখানি বিষণ্ণ হলো। সবাই বোঝালো যে, পাহাড়ে জুতো না হলেও চলেও। স্যান্ডেলেই চলে যাবে।

করুণ সেই স্মৃতি! ছবিঃ সংগ্রহ

সেদিনকার মতো অফিস শেষ। গাড়িতে করে বাসায় ফিরছি, কিন্তু মনের ভেতরে খচখচ করছে আমার কোনো পাহাড়ে যাবার জুতো সেই। কী করি? অত টাকাও তো নেই যে, তক্ষুনি এক জোড়া জুতো কিনবো। তখনো স্যালারি যা পাই তা দিয়ে মাসই শেষ করতে পারি না তার আবার ভ্রমণ বাসনা। তার উপর আবার পাহাড়ে যাবার ইচ্ছা। সেও না হয় হলো, কিন্তু নতুন জুতো কেনার অসম্ভব ইচ্ছাও জেগেছে মনে! কী অবাস্তব চিন্তা ভাবনা। 

তার পরেও মনের মধ্যে একটা কেমন কেমন উদাসিনতা আর মন খারাপের ধুসর কালো মেঘেদের আনাগোনা। সবাই জুতো পরে যাবে আর আমি স্যান্ডেল? মান-ইজ্জতেরও একটা ব্যাপার আছে। কিন্তু এই মান-ইজ্জত যে সারা জীবনের মান-ইজ্জতের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে সে কী জানতাম! তাই গাড়িতে করে বাসায় ফেরার পথে মিরপুরের ফল পট্টিতে ঝুড়ি বোঝাই নানা রকমের জুতার পসরা দেখে আগেই নেমে পড়লাম মিরপুর ১০ নম্বর গোল চত্বরে।  

এখানে দেখি, ওখানে দেখি। পছন্দ হয় তো, টাকায় হয় না। আর টাকায় হয় তো মনে ধরে না। ক্ষীণ রুচির গরীবদের সারা জীবনের দোটানা! আর তাই মনোকষ্ট নিয়ে বাসায় ফিরে যাওয়াই মনস্থির করলাম। বাসার পথে ফিরছি আর পিছন ফিরে চাইছি। হায়! জুতা ছাড়াই বান্দরবান যেতে হবে। সেই মনো বেদনা নিয়ে হাঁটছি…

সাদা নাইকি কালো কষ্ট! ছবিঃ সংগ্রহ

হাঁটতে হাঁটতেই চোখ পড়ে গেল ১০ নম্বর গোল চত্বরে ঝুড়িতে সাজিয়ে রাখা চকচকে, ঝকঝকে নাইকি-অ্যাডিডাস-পুমা সহ আরও বেশ কিছু ব্র‍্যান্ডের নামের দিকে। না, কোনো ব্র্যান্ডের শো রুমের কথা বলছি না, বলছি এইসব নানা রকম বিখ্যাত ব্র্যান্ডের জুতোর সমাহার নিয়ে বসে থাকা ঝুড়িওয়ালাদের কথা! আহা দেখি না একটু! এই দেখাটাই যে কাল হবে অনন্তকালের জন্য সেকি তখন জানতাম? আর তাই সেই আক্ষেপে আজও পুড়তে হয় প্রতিনিয়ত, সেই সাথে সহকর্মীদের টিপ্পনী অবিরত।  

ঘটনা হলো, ঝুড়ির ভেতরে সাজিয়ে রাখা জুতোগুলোকে দেখে আর দামের সাথে নিজের সাধ্যের কথা ভেবে বেশ লোভে পড়ে গেলাম। আর তাই কিনে নিলাম এক জোড়া নাইকি, দাম মাত্র ৩০০ টাকা! আহা সে কী খুশি, খুশিতে নিজের কাছে নিজেই ডগমগ অবস্থা। বাসায় গিয়েই জুতো পরে আয়নায় নিজের কুৎসিত কালো পায়ে ধবধবে সাদা নাইকির কেডস দেখে নিজের কাছেই নিজেই লজ্জায় বেগুনী হয়ে গেলাম! কালো মানুষ আর যাই হোক, লজ্জায় লাল হতে পারে না কিছুতেই। তাই আমি লজ্জা পেলে নিজেকে বেগুনী বানিয়ে ফেলি!

নাইকি পায়ের আনন্দ! ছবিঃ সংগ্রহ

সে যাই হোক, পরদিন ব্যাপক ভাব নিয়ে ব্যাগ গুছিয়ে আর পায়ে নাইকি গলিয়ে অফিসে গেলাম। সাদা, ঝকঝকে জুতা। মুহূর্তেই আমার নাইকি পরে আসার খবর ছড়িয়ে পড়লো পুরো অফিসে। সহকর্মীরা অনেকেই সেটা নিয়ে ক্ষ্যাপাতে চলে এলেন দল বেঁধে! আরে তুই নাইকি কিনেছিস! তুই তো অন্য লেভেলের লোক! তোর সাথে তো যাওয়া যাবে না রে! আরও অনেক রকম ঠেস দেয়া কথাবার্তা! সেগুলো হজম করতেই হলো, শুধু নাইকির জন্য। তবে দামটা তখনো কেউ জানে না।  

অফিসে এসে বেশ দাম বেড়ে গিয়েছিল সেদিন! তবে খুবই অল্প সময়ের জন্যই। কারণ অফিস রুম থেকে বাথরুমে যেতে যেতেই সেই নাইকির তলা থেকে সোলা বেরোতে লাগলো! গাম দিয়ে লাগানো নাইকির তলা খুলে ফোম বেরিয়ে যেতে লাগলো! কী বিব্রত অবস্থা! তবে তখন পর্যন্ত কেউ কিছু জানে না, সেটাই স্বস্তির বিষয়! কিন্তু না সেই স্বস্তিও বেশিক্ষণ রইল না। কারণ এক সহকর্মী কোনোভাবে দেখে ফেলেছিল যে নাইকির তলা থেকে ফোম আর সোলা বেরিয়ে পড়ছে প্রতি ধাপে ধাপে।

আহা নাইকি! ছবিঃ সংগ্রহ

এবার সেই সকল সহকর্মীরা আবারো এলো দল বেঁধে এবং জুতার দাম জানতে চাইলো। দাম বলাতে সবাই হাসিতে চৌচির হয়ে গেল। আর পরবর্তী দুই ঘণ্টার মধ্যে সেই নাইকি আর নাইকি রইলো না। উপরের ফিতা গুলো ছাড়া বাকি সবই ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল প্রতিটি ধাপে ধাপে! পুরো অফিসের করিডোর আর ওয়াশরুম জুতোর ফোম আর সোলায় পরিপূর্ণ হয়ে গেল।

সেসব কোনো আক্ষেপ নয়, কোনো কষ্ট নয়, কোনো মন খারাপের ব্যাপার নয়, যতটা আক্ষেপ হলো রাতে জুতো কিনে সকালেই জুতোর সমাধিতেও নয়। নয় জুতো না পরে বান্দরবানে যাওয়াতেও। মূল আক্ষেপ সহকর্মীদের কাছে অনন্ত হাস্যকর আর নিদারুণ সুখের গল্পের উপকরণ হওয়ায়!

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কলকাতা ও ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে ঘোরাঘুরি

গোমুখ অভিযান: এটাই গোমুখ? হতেই পারে না…