ফুল ও ফোয়ারার জয়পুর আমের গার্ডেন

জয়পুরে সারাদিন ঘুরে দেখার জন্য প্রায় ১০টি স্পটের মধ্যে দুই তিনটি আমরা আগেই বাদ দিয়ে দিয়েছিলাম। কারণ তেমন কোনো স্থাপনায় আমাদের কারোই কোনো আগ্রহ ছিল না। সেই স্থাপনার সাথে আমের গার্ডেনকেও যুক্ত করতে চাইছিলাম একবার। নাহ, গার্ডেন দেখে আর কী হবে? কিন্তু কেন যেন সেটা আর ড্রাইভারকে বলা হয়ে ওঠেনি সেই সময়।

ভাগ্যিস, ভাগ্যিস, ভাগ্যিস গার্ডেনকেও তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়নি! তাহলে কী দারুণ মায়াময়, মিহি আর ঝরঝরে একটা নীরব, নির্মল ঝকঝকে বর্ণীল দুপুর প্রিয়জনের সাথে কাটানো থেকে নিজেদেরকে বঞ্চিত করতাম। কি আক্ষেপেই না যেন পুড়তাম পরে।

ফুল, ফোয়ারা আর আমাদের আদরের তুই। ছবিঃ লেখক

আমরা জয়পুরের জলমহল থেকে ফেরার পথে আমের গার্ডেনে গিয়েছিলাম। গার্ডেনে ঢোকার আগে বেশ বড় আর উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা দেয়া ছিল যে কারণে বাইরে থেকে বোঝার কোনো উপায় ছিল না ভেতরে কী আছে বা নেই। যে কারণে গেটের সামনে গিয়েও দোটানায় ছিলাম টিকেট কেটে ভেতরে ঢোকা ঠিক হবে কি হবে না?

কিন্তু মাত্র ২৫ রুপী যেহেতু টিকেট, না হয় অযথা ফালতু খরচ হিসেবে ধরে নিয়ে একটু ঢুকেই দেখি না। বেশ ২৫ রুপী করে টিকেট কেটে গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকে গেলাম। নাহ গেটের ভিতরে ঢুকেও বিশেষ আকর্ষণের তেমন কিছু নজরে এলো না। মনে মনে বললাম যাক বাবা ২৫ রুপী করে তিন জনের ৭৫ রুপীর উপর দিয়েই গেছে!

সামনে কয়েকটি ফুল গাছ, সেখানে লাল, সাদা ফুল ফুটে আছে আর কয়েকটি ফোয়ারা দিয়ে পানি ছিটিয়ে দেয়া হচ্ছে গাছে, ফুলে আর সবুজ ঘাসের গালিচায়। আর আছে চারপাশে হলুদ আর লাল রঙের ছোট ছোট কয়েকটি প্রাচীন স্থাপনা। যাক ঢুকেই যেহেতু পড়েছি, কিছু সময় কাটিয়েই যাই এই মনোভাব নিয়েই সামনের দিকে এগোতে লাগলাম। কিন্তু কেন আর কীভাবে ঠিক বুঝতে পারছিলাম না, কোনো একটা অজানা অচেনা আকর্ষণ আমাদের সবাইকে চুম্বকের মতো সামনের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। বিশেষ করে বাগানের বাইরে শীতের দিনেও দারুণ গরমের মধ্যেও বাগানের ভেতরে যত এগিয়ে যাচ্ছিলাম একটা হিম শীতল ঠাণ্ডা সুখানুভূতি আমাদের আবেশে আঁকড়ে ধরছিল যেন।

অপূর্ব ফোয়ারার আকর্ষণ। ছবিঃ লেখক

আর যতই সামনে এগোতে থাকি ততই আর পিছনে ফিরতে কেন যেন ইচ্ছে করছিল না অদ্ভুতভাবেই। বাগানের অর্ধেকেরও কম জায়গায় যাওয়ার পরে মনে হলো এই শীতের বাতাস আর মিঠে রোদের মাধুরী মেশানো সবুজ গালিচায় একটু না হয় বসি। বেশ সবাই পায়ের জুতো খুলে সবুজ ঘাসের মিহি গালিচায় বসে পড়লাম। আর তখন বসে বসেই চারপাশটা ভালো করে খেয়াল করলাম। পুরো বাগানের দেয়ালের তিনপাশ জুড়েই রুক্ষ রাজস্থানি পাহাড়ে ঘেরা, যেখানে হলুদ আর ধুসর পাহাড়ের মাঝে মাঝে অল্প কিছু সবুজের ছড়ানো ছিটানো অগোছালো অবস্থান। যে রুক্ষ পাহাড় সারির মাঝেই এই সবুজ ঘাসের আচ্ছাদনে ঢাকা বর্ণীল এক বাগান, আমের গার্ডেন।

এর এই প্রথমই ভালো করে চোখ মেলে তাকিয়ে দেখলাম যে এটা শুধু ফুলের গাছ আর সবুজের আচ্ছাদনে ঘেরা কোনো সনাতনি বাগান নয়। এই বাগানের বিশেষত্ব হলো এর ফোয়ারাগুলো। বাগানের ফুল আর আর গাছ যতটা না চোখে পড়ছে, তার চেয়ে বেশী করে নজর কাড়ছে ফোয়ারাগুলো। যা শুধু বাগানের সামনে নয়, যেটা অন্যান্য বাগানের ক্ষেত্রেও থাকে। পুরো বাগানের সবটুকু জায়গা জুড়েই ফোয়ারারা তাদের জলকেলি করে চলেছে আপন মনে।

ছোট, বড়, মাঝারি, সামনে, পেছনে, ডানে-বামে চারদিকে যেদিকেই চোখ যায় নানা রঙের ফুল আর ফোয়ারায় চোখ আটকে থেকে যায়। যা দারুণ একটা সুখানুভূতি ছড়িয়ে দিচ্ছিল পুরো বাগান জুড়ে। একটা শীতল অনুভূতির সাথে ঠাণ্ডা জলের ছোঁয়া, সাথে সবুজ ঘাসের গালিচায় সবার শুয়ে বসে থাকা আর বর্ণীল ফুলগুলো বাগানের সবটুকু জুড়ে বিচরণ করে যাওয়া। দেখে আমরা যেন কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলাম বুঝতেই পারিনি কখন যে দুই ঘণ্টা কেটে গেছে!

মায়াভরা ফুলের আকর্ষণ। ছবিঃ লেখক

তবে কি বসেই থাকবো নাকি সারা বেলা? ছবি তুলবো না? এইবার সবার মোহ ভাঙলো। শুরু হলো ছবি তোলার তুমুল প্রতিযোগিতা। কারণ দুই একজনের কাছে জানতে পারলাম এখানে পুরনো বহু হিন্দি সিনেমার গানের শুটিং হয়েছে! ব্যস আর যায় কোথায়? কে কতটা ভাব নিয়ে, হেলেদুলে আর নায়িকা পোজ দিয়ে ছবি তুলতে পারে সেটার প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল মুহূর্তেই।

সবুজ ছোট ছোট পাতায় ভরা ছোট আর মাঝারি গাছে গাছে কি অদ্ভুত রকমের লাল রঙের মায়াবী ফুল ফুটে আছে কী আর বলব? তার কী আকর্ষণ! চোখ ফেরানো দায় সেদিক থেকে। যেন টুকটুকে লাল কোনো পরী সবুজ গাছের মাঝে নিজেকে সাজিয়ে রেখেছে। কোনো সবুজ গাছে আছে গোলাপি পুতুলের মতো নরম কোমল আর আদুরে ফুলের সমারোহ। আর কোনো কোনো গাছে একদম নিষ্পাপ, নিরীহ আর নিরহংকার ধবধবে সাদা রঙের স্নিগ্ধ ফুলের হাসি ছড়িয়ে ছিটিয়ে। আমরা এক একজন দারুণ সংকটে পড়ে গিয়েছিলাম কোনটা রেখে কোনটা দেখি, কাকে রেখে কার সাথে ছবি তুলি, কোন ফুলের পাশে আর সাথে বেশী সময় বসে থাকি।

রুক্ষ পাহাড়ে ঘেরা সবুজ ও বর্ণীল বাগান। ছবিঃ লেখক

এভাবে পুরো আমের গার্ডেনের সবটুকুতে আমরা হেঁটেছিলাম, বসেছিলাম, গড়িয়েছিলাম আর ফুল-ফোয়ারা ও সবুজ গাছ ও ঘাসের সাথে মিতালী করে পুরো একটা দুপুর কাটিয়েছিলাম দারুণ অলসতায়, আপন মনে, গান শুনে, পাখিদের কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে, ঝকঝকে নীল আকাশের নিচে ঝিরঝিরে শীতল বাতাস গায়ে মেখে। সবাই দারুণ আনন্দে, খুশি মনে আর ভীষণ তৃপ্ত হয়েছিল জয়পুরের ফুল আর ফোয়ারার এই দারুণ নান্দনিক বাগানে গিয়ে, বসে থেকে, ছবি তুলে আর নিজেদের মতো করে কিছুটা অবসর কাটাতে পেরে।

সবকিছু মিলে দারুণ একটা দুপুর কাটিয়েছিলাম সবাই মিলে। জয়পুরের…

বাগানের মাঝেই প্রাচীন প্রাসাদ। ছবিঃ লেখক

ফুল-ফোয়ারার আমের গার্ডেনে।

আমের গার্ডেন ভারতের রাজস্থান রাজ্যের, জয়পুরের একটি প্রাচীন বাগান। রেলস্টেশনে বা মূল শহর থেকে ৬/৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। অটো বা কারে করে এখানে যাওয়া যায়। ঢাকা থেকে যে কোনো উপায়ে কলকাতা আর কলকাতা থেকে প্লেন বা ট্রেনে সহজেই জয়পুর যাওয়া যায়।  

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

রিশপের টিফিন দাড়ার পথে পথে

হিমাচলের অপরূপ ছোট শহর মান্ডির পথে পথে