সুন্দরবন ভ্রমণ: বাঁদরের কামড় খাওয়ার গল্প

যারা চিকিৎসাবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেন তাদের তৃতীয় বর্ষে একটি বিষয় পড়াশোনা করতে হয়। বিষয়টির নাম কম্যুনিটি মেডিসিন। এটি প্রত্যেক ছাত্রের জীবনে ছোটখাটো একটি বিভীষিকা বটে। তবে যখন তৃতীয় বর্ষ শেষ হয়ে আসে তখন এটিই তাদের মুখে হাসি ফোটায়। কারণ এই একমাত্র বিষয় যা তাদের পকেটে কিছু নগদপ্রাপ্তির আগমন ঘটায়। অবশ্য এমনিতে নয়, কারণ এর জন্য লোকালয়ে গিয়ে গিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে হয়। ও ভালো কথা, নগদ প্রাপ্তির সাথে একটি শিক্ষা সফরেরও ব্যাপার স্যাপার থাকে।
তো পকেটে যখন কিছু টাকা পয়সা এলো, সে যত কমই হোক না কেন, আমি খুশি না হয়ে পারলাম না। কিন্তু এই টাকা যে সুন্দরবনের করমজলে শিক্ষা সফরে গিয়ে বাঁদরের কামড় খেয়ে তার চিকিৎসায় গচ্চা যাবে, তা কে জানতো! কী মশাই, আগ্রহ জাগছে বুঝি? তাহলে শুরু করি করমজল যাত্রার গল্পটা, নাকি?

পশুর নদে মাছ ধরা; ছবি: লেখক

কম্যুনিটি মেডিসিন ডিপার্টমেন্ট থেকে ঠিক হলো, আমরা সবাই মিলে করমজলে শিক্ষাসফরে যাব। নির্ধারিত দিনে দুইটি বাস ভর্তি হয়ে আমরা রওনা হলাম। তারপর মংলায় পৌঁছে আমরা নাস্তা করে নিলাম। তারপর সেখান থেকে আগে থেকে ভাড়া করে রাখা ট্রলারে উঠে বসলাম।
পশুর নদী বেশ গভীর। তার নাব্যতা বর্তমান। তাই বেশ ঢেউ হচ্ছে নদীতে। ইঞ্জিনের শক্তি সেই ঢেউকে অতিক্রম করে এগিয়ে যাচ্ছে লক্ষ্যের দিকে। কিন্তু ঝাঁকুনিকে এড়ানোর উপায় তার নেই। অনেকগুলো নৌকা নদীর বুকে মাছ ধরে বেড়াচ্ছে। আস্তে আস্তে আমরা পৌঁছে গেলাম করমজলে। আমি চিৎকার করে উঠলাম। আমার সাতক্ষীরার বন্ধু সরকার বংশের উজ্জ্বল সন্তান মাধবেন্দু সরকার অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল।
আমি তাকে বললাম, ঐ দেখ গোলপাতা।
নদীর বুকে; ছবি: অমিতাভ অরণ্য

গোলপাতা দেখে এত অবাক হওয়ার কী আছে, তার মাথায় ঢুকল না। তবে আমার দলে আমি যে একা, তা নয়। ব্যাচমেটদের অনেকেই জীবনে এই প্রথম গোলপাতা গাছ দেখছে। ঠিক করমজলে নামতেই একটি গোলপাতা ঝাড় আছে। অনেকেই সেখানে গিয়ে গোলগাছ নিজ হাতে ছুঁয়ে দেখে চক্ষুকর্ণের বিবাদভঞ্জন করল।
আমিও এগিয়ে গিয়ে গোলপাতা গাছের সাথে প্রথম মোলাকাতের মুহূর্ত ক্যামেরা বন্দী করে নিলাম। টিকেটের ঝামেলা শেষ হলে আমরা ভেতরের দিকে এগিয়ে গেলাম। আর তখনই দেখা হয়ে গেলো সুন্দরবনের সবচেয়ে সংখ্যাগুরু বাসিন্দা শ্রীমান বাঁদরের সাথে। আমি ওদের দিকে ভালো করে তাকিয়ে নিজের দিকে তাকালাম। কই, একদম মিল নেই তো। মায়ের কাছ থেকে সারা জীবন শুনে আসছি, আমি নাকি আস্ত একটা বাঁদর। আজকে বুঝলাম, সেটি একদম মিথ্যা কথা!
ঢোকার মুখে স্বাগতম জানালো সে; ছবি: লেখক

যাই হোক, বাঁদর সম্প্রদায়ের কিছু ছবি তুলে আমরা আরো ভেতরের দিকে এগিয়ে গেলাম। ওরা এখানকার স্থায়ী বাসিন্দা। পরেও পাওয়া যাবে। আগে বাকি জায়গাগুলো দেখে আসি। প্রথমেই চোখে পড়লো সুন্দরবনের বিরাট একটি ম্যাপ আর একটি বাঘের কঙ্কাল। সুন্দরবনের কোথায় কী আছে তা এখানে চিহ্নিত করা আছে।
আমরা সেখান থেকে নির্দেশ নিয়ে এগিয়ে গেলাম সামনের দিকে। সেখানে কাঠের ট্রেইল চলে গেছে বনের গহীনে। এর নাম ‘মাংকি ট্রেইল’ মানে বাঁদরের রাস্তা। শ্রীমানেরা সেই রাস্তার দুপাশে ভিড় জমিয়ে নামকরণের সার্থকতা ফুটিয়ে তুলেছে। খুব যে শান্তশিষ্ট তা কিন্তু একদমই নয়। কয়েকজন তো এগিয়ে এসে টুরিস্টদের কাছ থেকে জুসের বোতলও ছিনিয়ে নিল। আমার ক্যামেরার দিকে তাদের একজন নজর দিতেই আমি তাদের দিকে একটা ভয় ধরানো ঝাড়ি দিলাম। আমার দিকে বিদ্বেষপূর্ণভাবে তাকিয়ে থেকে চলে গেল। মনে হলো সে বলছে, দাঁড়া তোকে দেখে নেব।
জুসের বোতল হাতে; ছবি: লেখক

ট্রেইলের দুই ধারে ঘন বন। সেখানে বাইন, কেওড়া আর সুন্দরী গাছের সারি। ট্রেইল ধরে আমরা এক চক্কর দিয়ে এলাম। যাত্রাপথে মন কেড়ে নিলো হাজারো লাল কাঁকড়ার দল। সেই সাথে চোখে পড়লো মস্ত গুই সাপ। তাছাড়া আছে ওয়াচ টাওয়ার। এখান থেকে সুন্দরবনকে উপর থেকে দেখা যায়। সে এক নয়নাভিরাম দৃশ্য।
আমরা এবার এগিয়ে গেলাম কুমির প্রজনন কেন্দ্রের দিকে। করমজল দেশের একমাত্র কৃত্রিম কুমির প্রজনন কেন্দ্র। ২০০২ সালে সুন্দরবনের করমজলে কেন্দ্রটি স্থাপন করা হয়। এরপর থেকে এখানে চলছে নিবিড় গবেষণা। বর্তমানে প্রজনন কেন্দ্রটিতে ছোট বড় মিলিয়ে ৮৪টি লবণ পানির কুমির রয়েছে। এর মধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক বড় কুমির রয়েছে ৭টি।
পেডলার ক্রাব; ছবি: লেখক

পাশেই রয়েছে উপরিভাগ উন্মুক্ত খাঁচায় চিত্রল হরিণ। তাদের নিয়ে কৌতূহলী টুরিস্টরা মজা করছে। যাই হোক, আমার নজর কেড়ে নিলো একদল বাঁদর। খাঁচায় আবদ্ধ নয়। মুক্ত বাঁদরের দল এসে হাজির হয়েছে খালের পাড়ে। কেউ কেউ গাছের ডালে আশ্রয় নিয়েছে। নতুন একদল পর্যটক এসেছে, ওরাই লক্ষ্য বাঁদরগুলোর।
এই বাঁদরগুলোর বৈশিষ্ট্য হলো, এদের সাথে পিচ্চি পিচ্চি অনেকগুলো বাচ্চা রয়েছে। তাদের কোনো কোনোটা মায়ের দুগ্ধ পান করছে। সে অনুপম দৃশ্য। আমি ভাবলাম এই সুযোগ ক্যামেরার সদ্ব্যবহারের। আমি ক্যামেরা তাক করে এগিয়ে গেলাম তাদের দিকে। ক্যামেরা তাক করে অনেকগুলো ক্লিক করলাম। এমন সময় চোখের কোণা দিয়ে লক্ষ্য করলাম বড়সড় একটি বাঁদর এগিয়ে আসছে আমার দিকে। তার লক্ষ্য আমার ক্যামেরা।
আমি ওটাকে হাত দিয়ে তাড়া দেওয়ার ভঙ্গি করলাম। কোথা থেকে কী হয়ে গেল বুঝতে পারলাম না, আমার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়লো ওটা। আমার বাহুতে বসিয়ে দিলো রাম কামড়!
সসন্তান বাঁদরেরা; ছবি: লেখক

কলেজে ফিরে এসে প্রফেসরের সাথে দেখা করলাম। স্যার আমাকে জিজ্ঞাস করলেন,
-র‍্যাবিড এনিম্যালসের (যাদের কামড়ে র‍্যাবিস হয়) নাম বলো তো।
আমি বললাম,
-কুকুর, বাদুড়, বিড়াল, নেকড়ে, বাঁদর প্রভৃতি।
-তাহলে তুমিই বলো, কী করতে হবে!
আমি আমার মানিব্যাগে হাত দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললাম।

কীভাবে যাবেন?

সুন্দরবনের করমজল ইকো ট্যুরিজম কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় মংলা পশুর নদীপথ। এছাড়া খুলনা থেকেও যাওয়া হয়। খুলনা নৌ টার্মিনাল থেকে পাওয়া যাবে কাঙ্ক্ষিত নৌকা। আর শীতের সময় এখান থেকে অনেকগুলো ট্যুর কোম্পানি টুরিস্টদের জন্য ভালো সুযোগ দিয়ে থাকে।

সুন্দরবনের মায়া; ছবি: ইশতিয়াক আহমেদ

মংলা থেকে যেতে চাইলে সে ক্ষেত্রে আপনি দেশের যে কোনো প্রান্ত থেকে সড়ক পথে আসতে পারবেন বাগেরহাটের মংলায়। মংলা থেকে ইঞ্জিন নৌকায় চড়ে যেতে হবে করমজল। দশ জনের উপযোগী একটি ইঞ্জিন নৌকার যাওয়া আসার ভাড়া পড়বে ৭০০ থেকে ১ হাজার ২শ’ টাকা।
এসব ইঞ্জিন নৌকাগুলো সাধারণত ছাড়ে মংলা ফেরি ঘাট থেকে। নদী পথে মংলা থেকে করমজলের দূরত্ব প্রায় ৮ কিলোমিটার আর খুলনা থেকে এই দূরত্ব বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ৬০ কি.মি.।

কোথায় থাকবেন?

করমজলে থাকার কোনো ব্যবস্থা নেই। সেক্ষেত্রে করমজল থেকে বেড়িয়ে রাতে এসে থাকতে হবে মংলায়। এখানে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের মোটেল পশুর (০৪৬৬২-৭৫১০০) ছাড়াও বেশ কয়েকটি সরকারি-বেসরকারি রেস্ট হাউস হোটেল-মোটেল রয়েছে।
ডাবল রুমের জন্য ভাড়া পড়বে ৮শ’ থেকে ২ হাজার টাকা (নন এসি/এসি)। আর ইকনোমিক বেড পাবেন ৬শ’ টাকায়। এছাড়াও মংলা শহরে সাধারণ মানের কিছু হোটেল আছে। এসব হোটেলে দেড়শ’ থেকে ৬শ’ টাকায় কক্ষ পাওয়া যাবে।
Feature Image: Amitav Aronno

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

গোড়ার মসজিদ: বারোবাজারের ৫০০ বছরের পুরনো এক অনন্য স্থাপত্য

গলাকাটা দীঘি ঢিবি মসজিদ: বারোবাজারে সুলতানী আমলের আশ্চর্য নিদর্শন