জল ও জঙ্গলের কাব্যে বৃত্তের সাথে একটি পুরো দিন

শামসুন্নাহার আপু বললেন, ‘বৃত্ত’র সাথে জল ও জঙ্গলের কাব্যে যাচ্ছি। আপনিও চলেন।’
সময় মিলিয়ে দেখলাম, সেদিন স্কুল বন্ধ। যাওয়াই তো যায়! ঠিক করলাম, যাবো।

ভোর সাতটায় শাহবাগ থেকে বাস ছাড়বে। আমাকে তাই বাসা থেকে বেরুতে হলো ছয়টায়। সাতটা বাজার বিশ মিনিট আগেই পৌঁছে গেলাম শাহবাগে। গিয়ে আলাপ হলো বৃত্তের জিয়ন ভাইয়ের সাথে। শামসুন্নাহার আপু, আব্দুল্লাহ ভাই ওরা উঠবে কুড়িল থেকে।

শাপলা পাতা। সোর্স: শামসুন্নাহার

যথা সময়ে যাত্রা শুরু হলেও সম্ভাব্য সময়ে পৌঁছাতে পারলাম না। তিনশো ফিট পেরিয়ে পুবাইল যাওয়ার পথে তীব্র জ্যামে পড়লাম। বন্ধের দিন বলেই হয়তো। সম্ভাব্য সময় দূরে থাক, রিসোর্টে গিয়ে নেমেছি বেলা এগারোটার পর। খিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে। ঢুকতেই ঠাণ্ডা লেবুর শরবত দিয়ে অভ্যর্থনা জানালো রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ। শুকনো গলা ভেজাতে দারুণ কাজে দিল পানীয়টি। নাস্তা খাবার আগে এক চক্কর ঘুরে এলাম।

পুরো জায়গাটিতে প্রথমেই যেটা চোখে পড়বে, তা হলো অনেকদূর পর্যন্ত বিস্তৃত জলাশয়। শরতের নীল আকাশে সাদা মেঘ ঘুরে বেড়াচ্ছে পেজা পেজা তুলোর মতো। সেই আকাশটার প্রতিফলিত ছবি দেখা যাচ্ছে স্থির জলাশয়টিতে। আমার দৃষ্টিসীমার সবচেয়ে কাছে যে জিনিসটি নজর কাড়লো, সেটা হচ্ছে পানির উপর বাঁশের মাচায় একটা কুঁড়েঘর। ওটা পেরিয়ে সামনে কিছু নৌকা বাঁধা। আমি, শান্তাপু, কামরুন্নাহার – তিনজনেই ওখানে গেলাম আগে। ওখানে দাঁড়িয়ে ক্যামেরার চোখে প্রকৃতির রূপ অবলোকন করলাম।

 নৌকা। সোর্স: শামসুন্নাহার

নাস্তার জন্য ডাক পড়লো। পাটখড়ির কুঁড়েঘর আছে বেশ কয়েকটা। তার মধ্যে দুটোকে টেবিল চেয়ার পেতে সাজানো হয়েছে খাবার ঘর হিসেবে। একপাশে ব্যুফে পদ্ধতিতে সার বেঁধে ধোয়া প্লেট, চালের গুঁড়োর রুটি, চিতই পিঠা, ঝোল ঝোল করে রান্না করা মুরগির মাংস, কয়েক রকমের ভর্তা আর ফিরনি রাখা আছে। যার যতটুকু দরকার, নিয়ে টেবিল-চেয়ারে বসে পড়ছে বৃত্তের সাথে আসা ভ্রমণপিয়াসুরা। জিয়ন ভাই গম্ভীর মুখে বললেন, ‘পেট ভরে খেয়ে নিন’।

চমৎকার স্বাদ খাবারের। নাস্তা খেয়ে উঠতে না উঠতেই বৃত্তের জিয়ন ভাই একটা কুঁড়ে দেখিয়ে দিয়ে বললেন, ‘ওখানে চা-কফি বানানো আছে, যার যত খুশি ততবার নিয়ে পান করতে পারেন।’

কফি নিয়ে পানির ধারের দোলনায় কিছুক্ষণ দোল খেলাম। পাটখড়ির কুঁড়েঘর, বেতের পাখা, মাচান ঘরে যেখানে সেখানে বিছানা পেতে রাখা, সোফা পেতে রাখা তারপর বাঁশের মাচায় দাঁড়িয়ে থাকা একটা কটেজে পা ঝুলিয়ে বসে পড়লাম। পায়ের নিচ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে স্বচ্ছ জল। স্বচ্ছতা ছাপিয়ে নিচের শেওলা আর জলজ উদ্ভিদগুলো দেখতে পাচ্ছি।

মাচান। সোর্স: শামসুন্নাহার

বেলাই বিলের প্রতি আমার ভালোবাসা আরোও বছরখানেক আগে থেকে। সেই বেলাই বিলকে কেন্দ্র করে তৈরি করা হয়েছে জল জঙ্গলের কাব্য। বিশাল আকৃতির রিসোর্টটির স্থলভাগ পঁচাত্তর বিঘা জমির উপর। সাথে আছে বিস্তৃত বেলাই বিল। তাই এটাকে কোনো রিসোর্ট বলে মনে হয় না। মনে হয়, গ্রামের কোনো জমিদারের বাড়িতে ঢুকেছি।

বৃত্তের সাথে এত বড় একটা দল আসা সত্ত্বেও নিভৃতে সময় কাটানো যাবে জল ও জঙ্গলের কাব্যে। জলের ওপরের মাচায় বানানো এক কুঁড়েঘরের আরামদায়ক বিছানায় শুয়ে থাকতে থাকতে আমার মনে হচ্ছিল, ‘এত সুন্দর জায়গা! এক্ষুনি মনে হয়, গল্পের কোনো জ্বীন এসে কান ধরে বের করে দেবে!’

তা দেয়নি। বরং আমিই এত আরাম করে শুয়ে থাকতে পারছিলাম না। উঠে একদম কর্ণারের একটা কুঁড়েঘরের কাছে গেলাম। অনেকগুলো কুঁড়েঘর রয়েছে পুরো এলাকায়। এটা সবচেয়ে সুন্দর। আর সবচেয়ে নিরিবিলিও। খুশিতে লাফ দিতে গিয়েও থেমে যেতে হয়েছে, কারণ একজন লোক এসে আমাদের বললো, এই দিকের কুঁড়েগুলো অন্যদের জন্য বুক করা।

তখন বুঝতে পারলাম, এখানে বেড়াতে আসা সবাই সবগুলো কুঁড়েঘর ব্যবহার করতে পারে না। যে দল যে কুঁড়েঘরগুলো বুকিং দেয়, তারা সেগুলোই ব্যবহার করতে পারে। এই কুঁড়েঘরগুলোর আলাদা নাম আছে। নামগুলো আমার মনে ঠিক নেই। তবে, বেশ কাব্যিক নাম ছিল, এটা বলতে পারি।

কুঁড়েঘর। সোর্স: শামসুন্নাহার

চা-ঘরের পাশেই একটা ঢেঁকি। ঢেঁকিতে চাল গুঁড়ো করা হচ্ছে। কোনো রান্নার কাজে ব্যবহৃত হবে। সকালে এই ঢেঁকিতেই চাল গুঁড়ো করে, তা দিয়ে রুটি আর চিতই পিঠা তৈরি বানিয়েছিল। এর এক পাশে বিশাল এক রান্নাঘর। বিশালাকৃতির মাটির চুলোয় বড় বড় ডেকচি-কড়াই চাপিয়ে রান্না হচ্ছে। রান্না করছেন পুরুষেরা। আর মহিলারা কুটাবাঁছা করে সব উপকরণ তৈরি করছেন।

পানির কাছাকাছি এসে সম্ভবত বেশিক্ষণ শুকনো থাকা যায় না। আমাদের দলের সাথে আসা বেশ কয়েকজন ইতোমধ্যেই পানিতে নেমে গেছে। আমরা তো ভেজার প্ল্যান নিয়ে আসিনি। তাই বলে কি তীরে বসে আফসোস করবো? মোটেও না। সার বাঁধা নৌকা আছে কী করতে? ইঞ্জিনের নৌকায় না গিয়ে বৈঠা-লগি দিয়ে বেয়ে চলা মাঝিকে ডেকে নিলাম। একটু দূরে দ্বীপমতোন একটা জায়গা আছে, ওখানে যাব।

মাঝি আসতে আসতে কী যে হলো শান্তাপুর! উনি তার মা সহ নেমে গেলেন পানিতে। আমরা হাসতে হাসতে নৌকায় চড়ে ছইয়ের উপর উঠে বসলাম। রোদে পুড়তে পুড়তে তাদের আগেই ওপারে পৌঁছে গেলাম। এখানে আব্দুল্লাহ ভাইও আছেন। পাড়ে নেমে একটা চৌকিতে বসতে না বসতেই শান্তাপু আর আন্টি এলো। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে পরিবারের চারজনকেই পানিতে আবিষ্কার করলাম।

দুই বোন লাইফ জ্যাকেট পরে নিয়েছে, ওদিকে মা আর ছেলে এমনিতেই সাঁতরে বেড়াচ্ছে। তবে এর মধ্যেই শান্তা আপু বেচারা কয়েকবার নাকানি চুবানি খেয়ে নিয়েছে আবদুল্লাহ ভাইয়ার হাতে। সেই দৃশ্য মনে পড়লেই পেট ফেটে হাসি আসছে আমার।

বেলাই বিল।  সোর্স: শামসুন্নাহার

নৌকায় ঘুরে আবার ফিরে এলাম মূল ভূমিতে। শান্তাপুরা গোসল করতে বাথরুমে ঢুকলো। আর আমি একটা খালি কটেজ খুঁজে পেলাম। এসময়ে খালি কটেজ পাওয়া যেন আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মতো। তপ্ত দুপুরে এখানে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম। আমাদের ঠিক সামনে থেকেই বেলাই বিল নামক বিপুল জলাধারটির শুরু। পাড়ে কিছু শাকের মাচান আছে। ওখান থেকে এক মহিলা শাক তুলতে এসেছে।

আন্টি ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এই শাক কোন কাজে লাগবে?’ জবাবে উনি হেসে বললেন, আমাদের জন্য পাতুরি বানানোর কাজে লাগবে এই শাকপাতা। উনার কথা শুনে খিদে যেন মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। অপেক্ষা করতে লাগলাম, দুপুরের খাবারের ডাক পড়ার।

ওহ হ্যাঁ, একফাঁকে ঢাক আর দোতারার তালে তালে গায়েনের গলায় লোকসংগীত আর পালাগানও শুনেছি। কিছুক্ষণ গল্পগুজব চললো। তারপরে এলো খাবারের ডাক। কাছে গিয়ে দেখি, সে এক এলাহি কাণ্ড! দুপুরের খাবারে আছে প্রায় রকমের দেশি খাবারের পদ। এবারেও ব্যুফে। যা ভালো লাগে, যত খুশি নিয়ে খাও।

পানির উপর বাঁশের মাচায় একটা কুঁড়েঘর। সোর্স: শামসুন্নাহার

দুপুরের খাবার খেলাম সবুজ ঘাসের গালিচায় বসে। খেয়ে, কোনোরকমে হাতটা ধুয়ে সেখানেই শুয়ে পড়লো শান্তা পরিবার। আমি জিয়ন ভাইকে বলে কয়ে এই রিসোর্টের সত্ত্বাধিকারী কামাল সাহেবের সাথে আলাপ করিয়ে দেবার জন্য রাজি করাতে পারলাম। কিছুক্ষণ আগেই জিয়ন ভাই কথায় কথায় বলে ফেলেছিল, রিসোর্টের মালিক এখানে এসেছেন, আর তাঁর সাথে জিয়ন ভাইয়ের বেশ ভালো সম্পর্ক।

আহ! আমাকে আর পায় কে! খুশিতে ঢগমগ হয়ে সত্ত্বাধিকারীর সাথে কথা বলতে গেলাম। সফেদ চুল দাঁড়ির অধিকারী সুখী একজন সফল মানুষের অবয়ব দেখতে পেলাম কাছে গিয়ে। অনেকে বলে, এই রিসোর্টটি নাকি উনার স্বপ্নসাধ ছিল। অথচ নিভৃতচারী এই মানুষটি বললেন তার ঠিক উল্টো কথা। জল জঙ্গলের কাব্য ঠিক প্ল্যান প্রোগ্রাম করে বানানো কোনো রিসোর্ট নয়। বন্ধুদের সাথে আড্ডায় হাসতে হাসতে এরকম কিছু একটা বানানোর প্রসঙ্গ আসার পর তিনি ব্যাপারটাকে সিরিয়াসলি নেন এবং নিজের জেদটাকে বজায় রেখে ব্যাপারটিকে সত্যি আকারে রূপ দেন।

সবগুলো কুঁড়েতেই বিছানা রয়েছে। সোর্স: শামসুন্নাহার

নিভৃতচারী বিমান বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ফ্লাইট লেফটেন্যান্টের এই বাড়িটিকে স্থানীয়রা সঙ্গত কারণেই পাইলট বাড়ি নামে চেনেন। ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এ রিসোর্টটির শুরুটা বাণিজ্যিকভাবে হয়নি। প্রথমে এটি নিজের বসবাসের জায়গা হিসেবে তৈরি করলেও, কিছুদিন যেতে না যেতেই এই শিল্পমনা মানুষটি বুঝতে পারলেন, এটার রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বহন করা তারপক্ষে প্রায় অসম্ভব। তাই রিসোর্টের নিজের স্বার্থে, এর খরচ যোগাতে বাণিজ্যিকভাবে উন্মুক্ত করে দেওয়া হলো। এই চিন্তার জন্য কামাল সাহেবকে ধন্যবাদ দেওয়াই উচিৎ।

সেদিন যেমন তিনি রিসোর্টে ছিলেন বলে, খুশি হয়েছিলাম, ঠিক সেই পরিমাণে চুপসে গিয়ে ফেরত আসতে হয়েছে তাঁর সামনে থেকে। তিনি আসলে এখানে এসেছেন নিজের একান্ত কিছু মেহমান নিয়ে। তাই তাদের একা ছেড়ে দিতে হলো আমাকে। এই দিগন্ত বিস্তৃত জলাধারের পাশে এরকম একটা রিসোর্ট, আর জলের ধারেই যখন তখন শুয়ে পড়ার যে সুপ্ত ইচ্ছে, তা তিনি কী করে জানলেন? জানা হলো না। এই আক্ষেপ রয়ে যাবে, আজীবন।

জল জঙ্গলের কাব্যে গিয়ে তাই কারোর হতাশ হবার উপায় নেই। তবে একটা কথা মনে রাখতে হবে। এটি বর্ষা মৌসুমে নিজের সম্পূর্ণ রূপের পসরা সাজিয়ে নিয়ে বসে।

ঢেঁকিতে পাড় দিচ্ছেন দুজন। সোর্স: শামসুন্নাহার

বিকেলে তালের পিঠা আর কফি খেয়ে আমাদের রিসোর্ট যাপনের পরিসমাপ্তি হলো। তার আগে বৃত্তের সাথে আসা সবাই সবার সাথে পরিচিত হলো। সন্ধ্যা খোঁপায় গুঁজে আমরা ফিরতি পথ ধরলাম।

কীভাবে যাবেন

জল-জঙ্গলের কাব্য পুবাইল, ডেমুরপাড়াতে অবস্থিত। পুবাইল কলেজগেট থেকে জল-
জঙ্গলের কাব্য মাত্র ৩ কিলোমিটার। জয়দেবপুর রাজবাড়ির পাশ দিয়েও যাওয়া যায়। ঢাকা থেকে গেলে টঙ্গী স্টেশন রোড বা তিনশো ফিট দিয়ে যাওয়া যায়।

স্বচ্ছজল।  সোর্স: শামসুন্নাহার

এছাড়া মহাখালি থেকে নরসিংদি বা কালিগঞ্জগামী যে কোনো বাসে উঠুন। ১ ঘণ্টা পর পুবাইল কলেজ গেট এলাকায় নেমে পড়ুন। ভাড়া নেবে ৪০ টাকা। এরপর একটা ব্যাটারীচালিত রিক্সায় করে পাইলট বাড়ি। তবে অবশ্যই আগে বুকিং থাকতে হবে।

অথবা ঢাকার সায়েদাবাদ, গুলিস্তান, আজিমপুর, মহাখালী থেকে গাজীপুর পরিবহন, ঢাকা পরিবহন, ভিআইপি পরিবহন ও বলাকা পরিবহনে শিববাড়ী চলে যাবেন। ভাড়া ৭০ টাকা। শিববাড়ী থেকে অটোরিকশায় ভাদুন (ইছালি) জল জঙ্গলের কাব্য রিসোর্ট। ভাড়া ৮০-১০০ টাকা।

মাটির চুলায় রান্নাবান্না চলছে। সোর্স: শামসুন্নাহার

খরচ

আমাদের সারাদিনের জন্যে ১,৫০০ টাকা জনপ্রতি ধরা হয়েছে। এর সাথে নাস্তা, দুপুরের খাবার আর যতবার খুশি ততবার চা পানের অনুমতি। আর রাতে থাকতে হলে গুনতে হবে অতিরিক্ত আরোও পনেরশ টাকা। এখানে রাত্রি যাপনের জন্য জনপ্রতি নেওয়া হয় ৩,০০০ টাকা। নাস্তা, দুপুর ও রাতের খাবারসহ। ৫-১০ বছরের শিশু, কাজের লোক ও ড্রাইভার – ৬০০ টাকা জনপ্রতি

যোগাযোগ :
ফোন নম্বর – ০১৯১৯৭৮২২৪৫ (জনাব কামরুল)
অথবা ০১৯১৯৭৮২২৪৫

ফিচার ইমেজ: শামসুন্নাহার

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

গ্রীষ্মের দিনে শান্তির সন্ধানে: ভারতের ৭টি হিল স্টেশনে ট্রেন ভ্রমণ

ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের বিলাসী বিকেল