ছুটির দিনে ঘুরে আসুন জিন্দা ঐকতান পার্কে

গত বছরের এসএসসি ব্যাচ এসে জানালো, তাদের অনেক দিনের শখ মাদিহা ম্যামকে নিয়ে কোথাও বেড়াতে যাবে। ম্যাম যদি রাজি হয়, তাহলে তারা খুবই খুশি হবে। আবার ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টাও করলো এই বলে যে, তারা তো চলেই যাবে স্কুল ছেড়ে। ওদের এই ইচ্ছে যদি পূরণ না করি, তাহলে ওদের মনে কষ্ট থেকে যাবে। আমি বললাম, ‘স্যারের সাথে কথা বলে জানাচ্ছি।’

ওরা এরপর কয়েকবারে এসে আমার সম্মতি আদায় করেই ছাড়লো। জিজ্ঞেস করলাম, কই যেতে চায়? সেটাও নাকি আমারই সিলেক্ট করে দিতে হবে। আমি সাজেস্ট করলাম, জিন্দা পার্ক। ওরা এই নামই শোনেনি। আমি বললাম, যেহেতু নারায়ণগঞ্জেই আছি, এখান থেকে জিন্দা পার্কটা কাছেই হবে। ওরাও এক বাক্যে রাজি।

সাঁকো; source : মেহজাবিন

জিন্দাপার্কে খাবার নিয়ে ঢোকার জন্য ২৫ টাকা করে চার্জ দেওয়া লাগে, তাই গাউছিয়ার একটা রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাবার খেয়ে জিন্দা পার্কের দিকে পা বাড়ালাম।

গাড়ি আমাদের জিন্দা পার্কে ঢোকার গলিতে নামিয়ে দিলো। ঢুকতেই মনে হলো, শান্তিময় একটা জায়গায় এসে ঢুকেছি। কোনোমতে একটা গাড়ি ঢুকতে পারবে, এমন রাস্তা। দুইধারে গাছের সারি। অনেক গাছ, অনেক জাতের গাছ।

গাছ বৈঠকখানা; source : মেহজাবিন

১০০ টাকা করে টিকিট করে ঢুকে পড়লাম জিন্দা ঐকতান পার্কে। ২৫০ জাতের ১০ হাজারেরও বেশি গাছ আছে এখানে। রয়েছে বিশাল শালবন বিহার। যেদিকেই তাকাই সবুজের ছায়াঘেরা উদ্যান।

ঢুকতেই একপাশে ঘাসের বিছানায় ছোট্ট চারকোনা জলাধার। তার উপরে নকল কাঠের গোলাকার ব্রিজ। তার সামনেই একটা মসজিদ। আরেকটু সামনেই মঠ জাতীয় কিছু একটা। রাস্তার অন্যপাশে খোলা মাঠ। আরো কিছু আছে হয়তো। আমরা একপাশ থেকে দেখতে দেখতে যাচ্ছি।

পাঠাগার; source : মাদিহা

একটুখানি বন পেরিয়ে একটা কৃত্রিম লেক দেখতে পেলাম। ওখানে অনেক মানুষ, কেউ র‍্যাকেট খেলছে, কেউ চাদর বিছিয়ে বসে গল্প করছে। লেকের মাঝখানে এক চিলতে কৃত্রিম দ্বীপ। কাঠের পাটাতন আর প্লাস্টিকের ড্রাম দিয়ে ভাসমান ব্রিজ বানানো হয়েছে। ব্রিজ দিয়ে যাওয়া যায়। বেশি লোক একসাথে ব্রিজে উঠলে ভীষণভাবে দুলে ওঠে।

দ্বীপটা দারুণ। পানিতে পা ডুবিয়ে ঘাসের উপর বসে থাকা যায়। এরকম মোট পাঁচটি লেক আছে জিন্দা পার্কে। ইচ্ছা হলে লেকের পানিতে কিছুক্ষণ ভেসেও বেড়ানো যায়। তার জন্য কয়েকটি নৌকা বাঁধা আছে ঘাটে। লেকে ভেসে বেড়ানোর পাশাপাশি উপভোগ করা যাবে প্রকৃতিকে।

কাছেই কয়েকটা গাছের ওপর টংঘর। একটু উঠে বসেও থাকা যায়। আমরাও তাই করলাম। নামার সময় কাঠের সিঁড়ি বেয়ে না নেমে লাফিয়ে নামলাম।
এই লেকটার ঠিক পাশেই লালমাটির রাস্তা। রাস্তার দুই ধারে গাছের সারি।

পাঠাগারের ভিতরে; source : মেহজাবিন

পার্কটি কিন্তু বেশ বড়। পুরোটা মিলে ৫০ একর। হাঁটতে হাঁটতে অন্য আরেকটি লেকের পাশে বহু আকাঙ্ক্ষিত পাঠাগারটি খুঁজে পেলাম। চমৎকার স্থাপত্যশৈলীতে বানানো পাঠাগারটি ছবিতে দেখেই মুগ্ধ হয়েছিলাম। সামনাসামনি দেখেও ভালো লেগেছে। এখনো বই সংগ্রহ করেনি, তাই তালাবদ্ধ। ভাবছি, এটা চালু হলে কী দারুণ একটা ব্যাপারই না হবে! চাই কি এর পাশের লেকের সিঁড়িতে বসেও বই পড়া যাবে। এখানে একটু সংযুক্তি করি, আমরা যখন গিয়েছিলাম, তখন পাঠাগারে ঢোকা যেত না। এখন চাইলে যে কেউ প্রবেশ করতে পারবে। প্রবেশমূল্য ১০ টাকা।

পুরোটা ঘুরে দেখতে গেলে খিদে পাবেই। খাবারের ব্যবস্থাও রয়েছে পার্কে। খিদে লাগলে, মহুয়া স্ন্যাকস অ্যান্ড মহুয়া ফুডস রেস্টুরেন্টে খাওয়া যাবে। রাতে থাকার ব্যবস্থাও নাকি আছে। মহুয়া গেস্ট হাউসে রাত কাটানো যাবে। ছায়াঘেরা পার্কটায় হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিলাম, রাতে কী সুনসান নীরব আর অন্ধকারই না হবে জায়গাটা! থাকা গেলে দারুণ থ্রিলিং হতো! 

ঐতিহ্য; source : মাদিহা

একটা লেকের উপর বাঁশের সাঁকো দেখে খুব ইচ্ছে হলো, পাড়ি দিই। কিন্তু মানুষের ভিড়ে ইচ্ছেটা পূরণ হলো না। ছুটির দিনে বেড়াতে যাওয়ার শাস্তি।

ঘুরে একধারে গিয়ে দেখি কতগুলো মাটির ঘর। মনে হলো, এগুলোই কি সেই গেস্ট হাউজ। উঁকিঝুঁকি দিয়ে দেখে, গেস্ট হাউজ বলে মনে হলো না। আবার দুইজন মহিলাকে মাটির চুলায় রাঁধতেও দেখলাম।

বাংলো বাড়ি; source : মাদিহা

ওখান থেকে একটু হেঁটে সামনে গিয়ে দেখি, দ্বিতল একটা ভবন। কী সুন্দর করে বানানো। সিঁড়ি বেয়ে ছাদে দোতলায় উঠে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। এমন একটা ছাদ পেলে আর কিচ্ছু চাইতাম না। একটু খেয়াল করে রুমগুলোর দরজায় তাকিয়ে দেখি, ক্লাস এইট, ক্লাস নাইন লেখা। তালা দেওয়া দরজার ফোকরে উঁকি দিয়ে দেখি, ভেতরে কী সুন্দর চেয়ার টেবিল! এটা সত্যিই একটা স্কুল! এত সুন্দর স্কুল কি বাংলাদেশের আর কোথাও আছে? পার্কের কেয়ার টেকার গোছের একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘স্কুলটা কি সত্যিই চলে, নাকি জাস্ট ফর শো?’

উনি বললো স্কুল নাকি সত্যিই রানিং। এলাকার ছেলে মেয়েরা পড়াশোনা করে। যদিও খরচ একটু বেশি।

স্কুলের দোতলায়। আমি যেখানে হেলান দিয়ে আছি, ওটা একটা ক্লাসের দেয়াল; source : মাদিহা

স্কুল থেকে বেরিয়ে অনেকটা পথ হেঁটে দেখি হরেকরকম জিনিসের দোকান। কুটির শিল্পের জিনিসপত্রই বেশি।

ফেরার সময় সেই প্রথম লেকটার পাশ ঘুরে লাল মাটির রাস্তাটা পেরিয়ে বাগানের মধ্য দিয়ে বের হলাম। এখানটাতেও জায়গায় জায়গায় বসার জায়গা আছে। হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত লাগলে, বসে বিশ্রাম নিয়ে আবার হেঁটেছি।

স্কুল; source : মাদিহা

এই পথেই ফেরার সময় আরেকটা সুন্দর বাড়ি দেখলাম। বাংলো বাড়ি টাইপ। ওটার সামনে যেতেই একজন বললো, এখানে টুরিস্টদের ঢোকা নিষেধ। এটা মালিক পক্ষের জন্য বরাদ্দ। পাশেই একটা গরুর খামার দেখলাম।

ক্লান্ত হয়ে বেরিয়ে যাওয়ার আগে আরো কয়েকটি বাড়ি দেখলাম। বাড়িগুলো কিসের কী, বুঝলাম না। ওদের উচিৎ ছিল, বাড়িগুলোর সামনে বর্ণনা লিখে দেওয়া। তাহলে আমার মতো কৌতূহলী মানুষজন নিজেদের কৌতূহল মেটাতে পারতো।

গাছবাড়ির নাম ডাহুক; source : মাদিহা

এবারে পার্কটির ইতিহাস কপচাই একটু। প্রায় চল্লিশ বছর আগে, ১৯৭৯ সালে রূপগঞ্জ পূর্বাচল উপশহরে ঢাকা ইস্টার্ন বাইপাস সড়কঘেঁষে জিন্দা ঐকতান পার্ক গড়ে তুলেন অগ্রপথিক পল্লী সমিতির সদস্যরা। চমকপ্রদ ব্যাপার হচ্ছে, এত স্বয়ংসম্পূর্ণ ও ভীষণ আলাদা রকমের পার্কটি কোনো সরকারি উদ্যাগের ফসল নয়। আবার কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নির্মাণও নয় জিন্দা পার্ক। পার্কটি তৈরি হয়েছে এলাকাবাসীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং তাদের প্রাণান্ত অংশগ্রহনের মাধ্যমে।

এলাকার ৫,০০০ সদস্য নিয়ে “অগ্রপথিক পল্লী সমিতি” ১৯৮০ সালে যাত্রা শুরু করে। দীর্ঘ ৩৫ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল এই পার্কটি। এ রকম মহাউদ্দেশ্য, এত লোকের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং ত্যাগ স্বীকারের উদাহারণ সত্যিই খুব কম দেখা যায়। পার্কটির নাম খুবই অদ্ভুত হওয়ায় জিজ্ঞেস করলাম, এর রহস্য কী। জানালো, গ্রামটির নাম জিন্দা গ্রাম। সেই অনুযায়ী পার্কের নাম জিন্দা পার্ক। পার্কের নাম কিন্তু ঐকতান পার্ক। কিন্তু এটি জিন্দাপার্ক নামেই পরিচিত। বর্তমানে জিন্দা গ্রামটিকেও একটি আদর্শ গ্রাম বলা হয়।

কীভাবে যাবেন

আমি ভেবেছিলাম, যেহেতু নারায়ণগঞ্জ, তাহলে খুব বেশি দূরে নয় জায়গাটি। আদতে তা নয়। ঢাকাবাসীদের গুলিস্তান হয়ে যেতে বেশ ভোগান্তি পোহাতে হবে। তারচেয়ে কুড়িল বিশ্বরোড থেকে কাছেই। বিশ্বরোড থেকে বিআরটিসি বাসে সরাসরি কাঞ্চনব্রিজে চলে আসা যায়।

হরেকরকম জিনিসের দোকান; source : মাদিহা

সতর্কতা

জিন্দা পার্কে গিয়েও মানুষজন ইচ্ছেমতো নোংরা করছে। গাছের বাকলে ইট সিমেন্টের চেয়ারগুলোয় নিজেদের নাম লিখে এসেছে। ১০০ টাকা টিকিট কেটে হয়তো ভেবেই নিয়েছে নিজেদের সম্পত্তি। হোক না এটা একটা পার্ক, তবুও কি এটাকে নোংরা করার অধিকার আছে আমাদের? আমাদের টুরিস্ট স্পটগুলো পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব আমাদের নিজেদের। আসুন, ঘোরাঘুরির সাথে সাথে সুরুচির পরিচয় দিই।

কারণ, মন সুন্দর যার, সেই তো দেশ পরিষ্কার রাখে।

Feature Image : মেহজাবিন

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শান্তিনিকেতনের বর্ণিল বাড়ি অথবা ফুলের স্বর্গ

বিশ্বের ১০ টি বিস্ময়কর মরুভূমি!