জয়পুর স্টেশনেই দুঃখ দূর

sdr

এটাই আমাদের এখন পর্যন্ত একমাত্র ভ্রমণ যে ভ্রমণ শুরুর আগের দিন পর্যন্ত আমরা কেউই নিশ্চিত ছিলাম না যে আসলেই কি আমরা কোথাও যেতে পারছি কি পারছি না। তাই কোনো স্পট বা কোনো বাহনেরই টিকেট আমাদের ঠিক করা ছিল না। এমনকি দিল্লী যেতে যেতে ট্রেনে বসেও কয়েক দফা আলাপ আলোচনা করেও কোনো কিছু ঠিক করতে পারিনি। তাই দিল্লী গিয়ে স্টেশনে নেমে নৈনিতাল, ভিমতাল, কৌশানী হয়ে আবার দিল্লী ফেরার কার ঠিক করে স্টেশনে গেলাম জয়পুর যাওয়ার কোনো ট্রেনের টিকেট পাওয়া যায় কিনা খোঁজ নিতে।

একটু সময় ক্ষেপন করে পাসপোর্ট সহ ফরম পূরণ করে টিকেট মাস্টারের কাছে গিয়ে একটু অনুরোধ করতেই দিল্লী থেকে জয়পুর আর জয়পুর থেকে দিল্লী যাওয়ার রিটার্ন টিকেট করে ফেললাম স্লিপার ক্লাস শ্রেণীতে। কারণ এসি সিট একদমই নেই। মাত্র একদিনের জন্য জয়পুর যাওয়া। রাতের ট্রেনে দিল্লী থেকে সকালে জয়পুর পৌঁছে সারাদিন ঘুরে আবার পরের রাতে দিল্লী ফেরার ট্রেন ধরতে হবে। এর বেশি সময় আমাদের হাতে একদমই ছিল না। যদিও আমরা সবাই-ই জানতাম যে মাত্র এক দিনের জন্য জয়পুর যাওয়া আর কোনো হোটেলের রিসেপশনে ঢুকে ফিরে আসা আমাদের কাছে একই রকম মনে হয়।

ঝকঝকে জয়পুর স্টেশন। ছবিঃ লেখক

তো আমাদের মূল ট্যুর একদিন আগেই শেষ করে আগ্রা যোগ করা হলো। আগ্রা থেকে সন্ধ্যায় দিল্লী ফিরেই জয়পুরের ট্রেন ধরতে ছুটতে হলো ওল্ড দিল্লী রেল স্টেশনে, জয়পুরের ট্রেন ধরতে। ওল্ড দিল্লী থেকে জয়পুর যাওয়ার ট্রেন ছিল রাত ১০:৩০ এর ইয়োগা এক্সপ্রেস। যে ট্রেনটি হরিদ্বার থেকে আহমেদাবাদ যায় দিল্লী আর জয়পুর হয়ে। তো সেই ইয়োগা এক্সপ্রেস ট্রেন নির্ধারিত সময়ের চেয়ে প্রায় ৩০ মিনিট পরে স্টেশনে এসে দাঁড়ালে আমরা আমাদের নির্ধারিত কামরার নির্ধারিত স্লিপার ক্লাস সিটে উঠে পড়লাম বেশ সানন্দেই।

কিন্তু ওঠা পর্যন্তই আনন্দ ছিল। ট্রেন ছাড়ার পরে ধীরে ধীরে আনন্দ বিষাদে রূপ নিয়ে সবাইকে দারুণ কষ্ট উপহার দিতে শুরু করলো। কারণ রাতের হিম হিম শীতের ছোবলে সবাই কাতর হয়ে পড়েছিলাম। আমাদের গরম কাপড় ছিল পর্যাপ্ত কিন্তু কেউই সেগুলোর যথাযথ ব্যবহার করতে পারিনি সঠিক সময়ে। আর তাছাড়া আর একটা ব্যাপার খেয়াল করলাম। ভারতে যারা নন এসি স্লিপার ক্লাসে শীতের সময় যাতায়াত করে তাদের প্রত্যেকের কাছে একটি করে কম্বল থাকেই থাকে। যেটা আমাদের কারো অভিজ্ঞতাতেই ছিলোনা। তাই মধ্য রাত থেকেই সবাই ঘুমের পরিবর্তে একই জায়গায় জড়সড় হয়ে একে অন্যের উষ্ণতা নিয়ে একটু শীত থেকে বাঁচার চেষ্টা করছিলাম।

স্টেশনের প্রবেশদ্বার। ছবিঃ লেখক

তবুও বাঁচা গেল যে, এই জার্নিটা খুব বেশি সময়ের ছিল না। রাত ১১টা থেকে ভোর ৪:৩০ পর্যন্ত। কিন্তু সেই রাত থেকেই সবার দারুণ মন খারাপ, না ঘুমোতে পেরে মেজাজ খারাপ, একের সাথে অন্যের খিটমিট লেগে যাচ্ছে প্রায়। শীতের রাত জেগে থাকার স্বাভাবিক অবসন্নতায়। সবার এই রকম মানসিক অবস্থা দেখে আমার মধ্যে দারুণ অপরাধবোধ হচ্ছিল যে, কেন ওদেরকে এই শীতে স্লিপার ক্লাস ট্রেনে এখানে নিয়ে এলাম। যদিও এর পিছনেও যুক্তি ছিল। দুই রাতের হোটেল খরচ বাঁচাতে। যেটা কার ভাড়াতে বেশী দিতে হয়েছে সেটা কিছুটা পুষিয়ে নিতে।

প্রায় গভীর রাতে জয়পুর স্টেশনে নামলাম। সবার মুখ থমথমে। আমি অস্বস্তিতে আছি সেই নিয়ে। তারপরেও এসেই যখন পড়েছি দেখা যাক কী করা যায়। যদি কারো ইচ্ছা না হয় কোথাও না গিয়ে নাহয় কোনো একটা রুম নিয়েই বিশ্রাম নেওয়া যাবে। এমন ভাবনা ভেবে আর সবাইকে এমন করে আশ্বস্ত করে এলিভেটর দিয়ে লাগেজ নিয়ে চার নাম্বার প্লাটফর্ম থেকে ১ নাম্বার প্লাটফর্মে যাচ্ছি। সেখানে গিয়ে পুলিশের সাহায্যে জেনে নিলাম রেস্ট রুম কোন দিকে। এক নাম্বার প্লাটফর্মের ভেতরেই সব শ্রেণীর যাত্রীদের জন্য রয়েছে আলাদা আলাদা রেস্ট রুম বা ওয়েটিং রুম। সুতরাং আমরা রেস্ট রুম খুঁজে বের করতে স্টেশনের ভিতরে চলে গেলাম। একটু এগোতেই স্টেশনের আকার আর আয়োজন দেখে আমাদের প্রত্যেকেই অবাক হতে শুরু করলাম।

স্টিয়ারিং রুমের করিডোর। ছবিঃ লেখক

এসি ক্লাস যাত্রীদের জন্য রয়েছে এসি ওয়েটিং রুম। নন এসি শ্রেণীর যাত্রীদের জন্যও তাই আর প্রথম শ্রেণীর যাত্রীদের জন্য রয়েছে এক্সিকিউটিভ লাউঞ্জ। যেটা নির্ধারিত সময়ের জন্য নির্ধারিত পরিমাণ পেমেন্ট করে যে কেউই ব্যবহার করতে পারে। এই এক্সিকিটিভ লাউঞ্জে ঢুকে আর বিশাল ঝকঝকে স্টেশন দেখে নিমেষেই সবার সারারাত নির্ঘুম কাটানোর মন খারাপ আর কষ্ট দূর হয়ে গেল। তবুও ওদেরকে আর একটু আরাম করে ঘুমিয়ে নিতে চলে গেলাম দ্বিতীয় তলায়। যেখানে ট্রেন টিকেট থাকলে আর রুম ফাঁকা থাকা সাপেক্ষে বেশ অল্প দামেই নির্ধারিত সময়ের জন্য আরামদায়ক রুম নিয়ে আয়েশ করা যায়, ফ্রেশ হওয়া যায় আর চাইলে ঘুমিয়েও নেয়া যায়। আর এই স্টেশনের নান্দনিকতা? সেটা নিয়ে বলতে হবে আলাদা একটা গল্প, নইলে ঠিক বলা হবে না আর আমিও বলে তৃপ্তি পাবো না।

এটাকে স্টিয়ারিং রুম বলা হয়। আমাদের সৌভাগ্য যে সেই সময়ের জন্য শুধুমাত্র একটি রুমই ফাঁকা ছিল। সকাল আটটা পর্যন্ত আমরা সেই স্টিয়ারিং রুম নিয়ে নিলাম, সবার অন্তত দুই ঘণ্টা ঘুম, ফ্রেশ হওয়া আর আরাম করে কিছুটা সময় বিশ্রাম নেয়ার জন্য। বিশাল স্টিয়ারিং রুমের তালা খুলেই সবাই অবাক। এত বড় রুম আমরা কেউই ভাবতে পারিনি। সাথে বিশাল চেঞ্জ রুম ছয়টি দারুণ আরামদায়ক সোফা, টেবিল, ড্রেসিং টেবিল আর রুমের সাথে লাগোয়া বেশ বড় ওয়াশ রুম। বিশাল রুমের ধবধবে সাদা চাদর বিছানো কিং সাইজের খাটে নিজেকে বিছিয়ে দিল যারা ভীষণ ক্লান্ত, বিষণ্ণ আর মন খারাপ করেছিল। কেউ কেউ নিজের মতো করে সময় নিয়ে আর আরাম করে চেঞ্জ করে নিল। কেউ আয়েশ করে ফ্রেশ হলো।

ঝকঝকে এক্সিকিউটিভ লাউঞ্জ। ছবিঃ লেখক

আর আমি চেঞ্জ করে, ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে গেলাম স্টেশনের আঙিনায়। হাঁটতে, চা-বিস্কিট খেতে, ঘুরে ঘুরে পুরো জয়পুর স্টেশনটা দেখতে। প্রায় এক ঘণ্টা নিজের মতো করে ঘুরে কাটিয়ে এসে সবাইকে জাগালাম আর জিজ্ঞাসা করলাম। তারা কি সারাদিন ঘুমিয়ে বা বিশ্রাম নিয়ে কাটাতে চায় নাকি ঘুরতে যেতে চায় কোথাও? সবাই এক বাক্যে জানালো তাদের ঘুম আর বিশ্রাম হয়ে গেছে। এখন ঘুরতে যেতে চায়। আরও যা জানালো তা আমাকে দারুণ তৃপ্তি দিয়েছিল, দিয়েছিল নিজের কাছেই নিজের অপরাধবোধ থেকে মুক্তি, দিয়েছিল ওদেরকে একদিনের জন্য হলেও জয়পুর নিয়ে আসার প্রাপ্তি।

কারণ সবাই এক বাক্যে স্বীকার করেছিল, এমন স্টেশন আর সেই স্টেশনের এমন আরামের আয়োজন দেখেই সবাই সবার দুঃখ ভুলে গেছে, কষ্ট দূর হয়ে গেছে, ক্ষোভ মিইয়ে গেছে। জয়পুর স্টেশনের একটু আরাম আর কিছুটা বিশ্রাম সবাইকে সারাদিন ঘুরে বেড়ানোর দারুণ অনুপ্রেরণা আর প্রেষণা দিয়েছে। তার মানে হলো……

নন কনফার্ম টিকেটের যাত্রীদের ওয়েটিং এরিয়া। ছবিঃ লেখক

জয়পুর স্টেশন, যেখানে নেমেই কষ্ট দূর!         

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চার শতকের পুরনো শমসের গাজীর দীঘি ও গুহা

ভ্রমণের আনন্দ নষ্ট হয় যে ভুলগুলোর কারণে