জমিদারদের ব্যবহৃত নান্দনিক স্মৃতিচিহ্নে অনন্য ময়মনসিংহ জাদুঘর

শশী লজ ঘুরে দেখে পা বাড়ালাম কাচারি মোড়ের দিকে। ঠিক মোড়েই একটা মসজিদ আছে। মসজিদের পাশের এক দোকানে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম, মসজিদ ধরে খানিক সামনে এগিয়ে গেলেই ময়মনসিংহ জাদুঘরটি পেয়ে যাবো। অগত্যা আমরা হাঁটতে শুরু করলাম।

কাচারি মোড়। সোর্স: লেখিকা

মিনিট পাঁচেক হাঁটার পর আরোও একটি চত্বর পেলাম। এই চত্বরের নাম “স্মৃতি অম্লান”। চত্বরের কাছাকাছি আসতেই শিহান লোকজনকে জিজ্ঞেস করতে গেল জাদুঘর সম্পর্কে, আর আমি চত্বরটি ঘুরে ফিরে দেখতে লাগলাম। খুবই নান্দনিক এই চত্বরটি মুক্তিযুদ্ধে নিহত শহীদদের সম্মানে বানানো হয়েছে। স্থপতি হাসান মাহদীর বানানো এই ভাস্কর্যটির সামনে লেখা আছে, “এই স্মৃতিস্তম্ভটি সকল শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে নির্মিত। এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব আমার-আপনার-সকলের।”
কিন্তু কীসের রক্ষণাবেক্ষণ? স্মৃতিস্তম্ভের গায়ে “বাসায় গিয়ে পড়ানো হয়”, “বাসা বদলানোর জন্য ভ্যান ভাড়া দেওয়া হয়”, নির্বাচনী প্রচারণার পোস্টার সাঁটানো। দেখেই মন খারাপ হয়ে গেল। আমরা বাঙালিরা কী সৌন্দর্য বুঝি না? যদি বুঝিই, তাহলে সব সৌন্দর্যময় জিনিস নষ্ট কেন করি? স্মৃতি স্তম্ভটির গায়ে সাত বীরশ্রেষ্ঠের প্রতিকৃতি আছে।
চত্বরের নাম “স্মৃতি অম্লান”। সোর্স: লেখিকা

শিহান এসে বললো, ‘চত্বরের ওপাশেই জাদুঘর। চলো।’ জাদুঘরের সম্মুখদ্বার দিয়ে প্রবেশ করতেই, হলদে রঙের ছোটখাটো বাড়িটি চোখে পড়লো। দেখেই মনে হলো এটি অনেক পুরোনো। সত্যিই তাই। ১৯৬৯ সালে স্থাপিত এই জাদুঘরটির তখনকার নাম ছিলো মোমেনশাহী জাদুঘর।
স্মৃতি স্তম্ভটির গায়ে সাত বীরশ্রেষ্ঠের প্রতিকৃতি আছে। সোর্স: লেখিকা

প্রাচীনকাল থেকে ময়মনসিংহ বিভিন্ন কারণে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়ে আসছে। অনেক জমিদার ছিলেন এ অঞ্চলে। কালের পরিক্রমায় তাদের অনেক দুর্লভ ঐতিহাসিক নিদর্শন ইতোমধ্যে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে গিয়েছে। তাই এ ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে সংরক্ষণের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় ময়মনসিংহ জাদুঘর। এখানে সংরক্ষিত আছে ময়মনসিংহের বিভিন্ন জমিদারবাড়ির প্রত্নসম্পদ।
গৌরীপুর জমিদার বাড়ি থেকে সংগৃহীত জিনিসপত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে- কাঠের পার্টিশন, সোফাসেট, শ্বেত পাথরের তৈরি টেবিল, কালো পাথরের তৈরি টেবিল টপ, ফুলদানি রাখার স্ট্যান্ড, কাঠের তৈরি বাড়ির মডেল ইত্যাদি। কাঠের এসব আসবাবপত্র খুবই নান্দনিক। সূক্ষ্ম কারুকাজগুলো দেখে যে কেউ মুগ্ধ হবে।
মোমেনশাহী জাদুঘরের সম্মুখদিক। সোর্স: লেখিকা

মুক্তাগাছা জমিদার বাড়ি থেকে সংগৃহীত জিনিসপত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে লোহার বল্লম, বলছিড়া, রামদা, খক্ষ, গণ্ডারের চামড়া, বন্য গরুর শিং ও চীন দেশের পাহাড়ি বাড়ির মডেল। গণ্ডারের চামড়া জিনিসটা যে কত মোটা, লোকে কেন গালি দেওয়ার জন্য এই শব্দ দুটো ব্যবহার করে এখানে এলে চাক্ষুষ দেখা যাবে। আঠারোবাড়ি জমিদার বাড়ি থেকে পাওয়া কিছু নিদর্শন আছে এই জাদুঘরে। এছাড়াও রয়েছে অন্যান্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। এসব নিদর্শনের বেশিরভাগই ১৮০০-১৯০০ শতকের।
এছাড়াও জাদুঘরে সংরক্ষিত উল্লেখযোগ্য নিদর্শনগুলোর মধ্যে রয়েছে হাতির মাথা, মহিষের সিং, কাঠের শোকেস, হাতির দাঁতের নকশি করা সোফা সেট, মার্বেল পাথরের গোল টেবিল, শ্বেত পাথরের টেবিল, মোমবাতি ঝাড়, হুকা, শ্বেত পাথর, কালো পাথরের ৫টি মূর্তি, লোহার সিন্ধুক, গন্ডারের চামড়া, বল্লম, খড়গ, রামদা, মা-ছেলের শ্বেতশুভ্র মূর্তি প্রভৃতি। জাদুঘরে সংরক্ষিত নিদর্শনের ৮০ ভাগ মুক্তাগাছার জমিদারদের বাকি ২০ ভাগ গৌরীপুর ও আঠারবাড়ির জমিদারসহ অন্যান্য জায়গার।
সামনে ছিমছাম ছোট বাগান। সোর্স: লেখিকা

এটি একটি খুব বড় জাদুঘর নয়। তাই যদি একজন ভ্রমণকারী এই জাদুঘর পরিদর্শন করার জন্য প্রায় এক ঘণ্টা সময় ব্যয় করতে পারেন তবে তিনি প্রত্যেকটি গ্যালারি এবং প্রদর্শনীর পুরো দৃশ্যটি উপভোগ করতে পারেন। আমরা সময় নিয়ে প্রত্যেকটি জিনিস খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলাম। আধুনিক ঝকঝকে আর আলোকসজ্জায় সাজানো জাদুঘরের চেয়ে এই পুরোনো জাদুঘর, এর নোনা ধরা দেয়াল আর তার চেয়ে পুরনো নিদর্শনগুলো দেখতে বেশ ভালো লাগছিল।
আগে জাদুঘর পরিদর্শনের জন্য টিকিটের মূল্য ছিল ১০ টাকা। এখন ১৫ টাকা করা হয়েছে। টিকিটের গায়ে ১০ টাকাই লেখা ছিল। ওটা কেটে পরে ১৫ টাকা লেখা হয়েছিল। শিহান এটা নিয়ে একটু গজগজ করেছিল এই বলে যে, ‘এটা যে ন্যায্য, তা তো বোঝার উপায় নেই। গায়ে লেখা দামই নেওয়া উচিৎ।’ তার অভিযোগ ধোপে টিকলো না।
টিকিটের গায়ে ১০ টাকাই লেখা ছিল। ওটা কেটে পরে ১৫ টাকা লেখা হয়েছে।

রাজস্ব বিভাগে ৪ জন এবং মাস্টার রোলে ৪ জন স্টাফ এই জাদুঘর পরিচালনা করে থাকেন। ভাবলাম, পরিচালকদের সাথে কথা বলে দেখি। জাদুঘরের ভিতরে তো ছবি তোলা নিষেধ। তাদের কাছে কোনো তথ্য পাওয়া যায় কি না। কিন্তু এই ব্যাপারে জানতে চাওয়ায়, মাস্টার রোলে থাকা মহিলাটি বললেন যে, ‘এসব তথ্য কাউকে দেওয়া নিষেধ। ডিসির অনুমতি আনতে হবে তথ্য নিতে হলে।’
উনার কথা শুনে আমি ফিক করে হেসে ফেললাম। থাক বাবা, আমার চোখে দেখায় যা মনে রাখতে পারবো, তাই-ই লিখব। এর মধ্যে ডিসিকে টেনে এনে কী লাভ!
পাশ থেকে হলদে রঙের ছোটখাটো জাদুঘরটি। সোর্স: লেখিকা

কীভাবে যাবেন:

এই জাদুঘর প্রধান শহরের (ব্রহ্মপুত্র নদ) কাছাকাছি অবস্থিত। শহরে থাকা কোনো ভিজিটর একটি রিক্সা ব্যবহার করে অথবা একটি রিক্সা ব্যবহার করে এই এলাকাটি সহজেই পরিদর্শন করতে পারে। এটি ময়মনসিংহ শহরের কচারী এলাকা এবং নিকটবর্তী পৌরসভা ভবন থেকে সহজেই পৌঁছানো যায়।

কীভাবে পৌঁছাবেন:

ময়মনসিংহ শহর ঢাকার প্রায় ১২০ কিলোমিটার (৭৫ মাইল) দূরে অবস্থিত। ময়মনসিংহে কোনো এয়ারপোর্ট নেই। বাসযোগে ময়মনসিংহ থেকে ঢাকা বিমানবন্দর প্রায় ১১০ কিলোমিটার (৪ ঘণ্টার ড্রাইভ) ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ পর্যন্ত কয়েকটি বাস সার্ভিস রয়েছে ঢাকার মহাখালী বাস স্টেশন (ঢাকা বিমানবন্দরের ১০ কিলোমিটার দক্ষিণ) থেকে ময়মনসিংহের মশকান্দা বাস স্টেশন থেকে বাস ছাড়বে।
ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ পর্যন্ত কয়েকটি ট্রেন চালু রয়েছে। ময়মনসিংহে পৌঁছাতে প্রায় তিন ঘণ্টা সময় লাগে। আপনি ঢাকা বিমানবন্দর থেকে উঠতে পারেন অথবা আপনি কমলাপুর রেল স্টেশন থেকেও যেতে পারেন।
তথ্যসূত্র:

TieLabs HomePage


ফিচার ইমেজ: মাদিহা

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কুয়েট: রুপসৌন্দর্যে অনন্য এক বিশ্ববিদ্যালয়ের গল্প

শিলং, চেরাপুঞ্জি এবং সোনাংপেডেং ভ্রমণ (২৪ জুলাই)