রূপগঞ্জের নোয়াপাড়ার জামদানি পল্লীর গল্পকথন

জামদানি শব্দটি মূলত ফারসি শব্দ। জাম হচ্ছে পারস্য দেশীয় এক শ্রেণীর উৎকৃষ্ট সুরা, আর দানি হচ্ছে বাটি বা পেয়ালা। অর্থাৎ উৎকৃষ্ট সুরা ধারণকারী পাত্র। এ শাড়ি যারা তৈরি করেন তাদের তাঁতি না বলে জামদানিশিল্পী বলাই ভালো। জামদানিশিল্পীদের সংখ্যা দিনকে দিন কমে যাচ্ছে। বর্তমানে ৬০ হাজার লোক এ শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। অথচ আড়াই দশক আগেও এ সংখ্যা ছিল দেড় লাখ। পরিবারের সংখ্যার বিচার বর্তমানে তা দেড় হাজার।

বরাবো বাসস্ট্যান্ডে নামলেই চোখে পড়বে এই সাইনবোর্ড। সোর্স: লেখিকা

বাদশাহি আমলে জামদানি পরতেন রাজা-বাদশাহ-জমিদার পরিবারের নারীরা। আর এখন পরেন ধনী ও অভিজাত রমণীরা। জামদানির বর্তমান মালিক গরবিনী রমণীরা অনেকেই জানেন না তাদের পরিধেয় সেই শাড়িটির ভাঁজে ভাঁজে রয়েছে কত দুঃখ, বেদনা আর বঞ্চনার ইতিহাস। ইংরেজ আমলে আঙুল কেটে দেওয়া থেকে শুরু করে হাল আমলে লুণ্ঠনের ঘটনাও ঘটেছে। এর পরও ঢাকাই এ জামদানি শিল্প টিকে আছে মাথা উঁচু করে।
একেকটা শাড়ির পেছনে লুকিয়ে আছে একেকজন জামদানিশিল্পীর জীবন্ত ইতিহাস। প্রতিটি সুতার ফাঁকে ফাঁকে রয়েছে তাদের ঘাম, কষ্ট, বেদনার কাহিনী। এই অসহায়-অশিক্ষিত দরিদ্র শিল্পীদের জীবনের কথা লোকচক্ষুর অন্তরালেই থেকে যায়। যারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে শাড়িগুলো তৈরি করে তাদের মা-বোন-বউদের ভাগ্যে এক চিলতে সস্তা শাড়িও জোটে না। তারা দিনের পর দিন স্বপ্ন দেখেন এ শিল্প একদিন সমৃদ্ধ হবে। দূর হবে তাদের নিত্যদিনের অভাব-অনটন।
জামদানি শাড়ি। সোর্স: লেখিকা

শীতলক্ষ্যার পাড়ের মসলিন জমানা এখন নষ্টালজিয়ার আকর। ফিনফিনে মসলিন আজ ইতিহাস। শীতলক্ষ্যা পাড়ের বাতাসের অবাক যাদুর পরশেই তৈরি হয়েছে বিশ্ব মাতানো এ জামদানি কাপড়। শীতলক্ষ্যার পানি, আবহাওয়া ও জলবায়ুর অদ্ভুত রসায়নই বিস্ময়কর কাপড় তৈরির অনুঘটক হয়েছে। ঈদকে সামনে রেখে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার তারাব পৌরসভার নোয়াপাড়া জামদানি পল্লীতে জামদানি তাঁতিদের কর্মব্যস্ততা বেড়ে গেছে।
এখানকার রোদের তেজে সুতায় আসে আলাদা ঔজ্জ্বল্য, যা পাওয়া যায় না পৃথিবীর অন্য কোথাও। আবহাওয়া এখানে তাঁতিদের মধ্যে তৈরি করেছে উদ্দীপনা, কর্মস্পৃহা। বিশ্ব দরবারে স্বতন্ত্র মহিমায় সমুজ্জ্বল অভিজাত তাঁতবস্ত্র এই জামদানি। এ শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছে এ দেশের সংস্কৃতি ও কৃষ্টি। বিশ্ব মাত করা মসলিন শাড়ির সংস্করণ অধুনা এ জামদানি। নারীর সৌন্দর্যসুধাকে বিমোহিত করে তুলতে জামদানির অপরিহার্যতা বিশেষ স্মরণীয়।
জামদানি সালোয়ার কামিজ। সোর্স: লেখিকা

মিহি জমিনে সূক্ষ্ম নকশাদার কাজ- এই হলো জামদানির মূল বৈশিষ্ট্য। অনেকের মতে বেনারসি শাড়ির প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেই এক সময় জামদানি শাড়ির প্রচলন হয়েছিল। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, জামদানির আবির্ভাব হয় মসলিন শাড়ির পাশাপাশি, মসলিন শাড়ির তাঁতিরাই শুরু করেন জামদানি শাড়ি বোনা। এভাবেই একদিন দেখা গেল বিয়ের অনুষ্ঠানে জামদানি শাড়ি বেনারসির পাশাপাশি জায়গা করে নিয়েছে!
মোট চার ধরনের জামদানি শাড়ি তৈরি হতে দেখা যায়। এগুলো হলো ফুলসিল্ক, হাফসিল্ক, ফুলকটন ও নাইলন।
জামদানি সালোয়ার কামিজ। সোর্স: লেখিকা

জামদানির হাট বা আড়ং বলতে এক সময় রূপগঞ্জকেই বোঝানো হতো। সে সময় রূপগঞ্জের নোয়াপাড়ায় বসে জামদানির হাট। ডেমরার শীতলক্ষ্যা নদীর তীরের বিসিক শিল্প নগরীতেও হাট এলাকা রয়েছে। জামদানির তাঁতি ও তাঁতের অবস্থান রূপসী, ডেমরা তারাবো রূপগঞ্জ হয়ে একবারে নরসিংদী পর্যন্ত বিস্তৃত।
রমজান শুরু হয়েছে। ঈদের বাজারও জমজমাট হয়ে উঠেছে। অন্যান্য কাপড়ের পাশাপাশি শাড়িও বিক্রি হচ্ছে দেদার। জামদানি হাটের কথা শুনে গিয়েছিলাম নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের নোয়াপাড়ায়। তখন জানতাম না, হাট কখন বসে কিংবা কত সময়ের জন্য বসে। গিয়ে এক জামদানিশিল্পীর কাছ থেকে জানতে পারলাম, রূপগঞ্জে হাট বসে সপ্তাহের বুধবার আর শুক্রবার। হাট বসে ভোর চারটায়। ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। হাটটি বসে মূলত পাইকারদের জন্য।
ডেমরা মধ্যবাজারে বসে জামদানির হাট। সোর্স: শারাফাত জামিল

দূর-দূরান্তের ও স্থানীয় জামদানির ব্যবসায়িরা রাত তিনটার পর থেকেই হাটে অবস্থান নিতে থাকেন। ফজরের নামাজের পরপরই রূপগঞ্জ ডেমরা ও তারাবোর জামদানী তাঁতিরা সারা সপ্তাহের তৈরি করা একটা দুটো শাড়ি নিয়ে হাটে আসা শুরু করেন। পাশাপাশি সাধারণ ক্রেতারাও হাটে চলে আসেন সেই সাত সকালে।
স্থানীয় জামদানি ব্যবসায়ি ও তাঁতিরা জানালেন প্রতি হাটবারে এখানে ৬ থেকে ৮ হাজার শাড়ি বিক্রি হয়!
জামদানির হাট। সোর্স: banglatribune.com

হাটে গেলেই যে কম দামে শাড়ি কিনতে পারবেন এমনটা ভাবার অবকাশ নেই। এ ধরনের হাটে দালাল বা এক শ্রেণির ফরিয়াদের পদচারণা বেশি, তাই সাবধানতা অবলম্বন জরুরি। এছাড়া জামদানি শাড়ি কিনতে হলে যথেষ্ট না হলেও কিছুটা অভিজ্ঞ হতেই হবে। আমি হাটবারে যাইনি, তাই-ই জামদানি পল্লিতে যাওয়া মাত্রই সবগুলো দোকান থেকে ডাকতে শুরু করলো। পরিচিত এক ছোটভাইয়ের রেফারেন্সে সেতু জামদানি পল্লিতে গেলাম। শাড়ি দেখে পছন্দও করলাম। ওরা শাড়ির দাম বললো, নরমালের চেয়ে একটু বেশি। তবে আমার জামদানি সম্পর্কে ধারণা থাকায় আমাকে ঠকতে হয়নি। ন্যায্য দামটা বলতেই দিতে রাজি হয়ে গেল।
আমার কেনা জামদানি শাড়ি। সোর্স: লেখিকা 

জামদানি শাড়ি ছাড়াও এখানে পাওয়া যায় জামদানি সালোয়ার কামিজ, ফতুয়া, পাঞ্জাবির কাপড়। ফতুয়া, ওয়ানপিস আর পাঞ্জাবির দাম পড়বে ৭০০-১,২০০ টাকা। সালোয়ার কামিজের দাম ১,৪০০ থেকে শুরু।
আমি যেখান থেকে জামদানী কিনেছি, ঐ জায়গায় নাম জামদানি প্রজেক্ট। ওইখানেই বানায়। এছাড়াও আশেপাশে কিছু গ্রামে তাঁত পল্লী, ৩০০ এর কাছাকাছি তাঁত আছে এ পল্লীতে, এখনও অনেকেই মহাজনি প্রথায় তাঁতিরা কাজ করে যাচ্ছে। তবে এখন প্রায় সকলেই মহাজন, যেই কাজ নেয় ভাগাভাগি করে অর্ডারটা বুঝে দেয়। পছন্দমতো ডিজাইনে বিভিন্ন সাইজের, ছোট বড় সব ধরনের জামদানি অর্ডার নেয়।
জামদানি তৈরির প্রক্রিয়া। সোর্স: নয়ন

৬০০ টাকা থেকে শুরু করে ৪০ হাজার টাকা দামেরও শাড়ি কিনতে পারবেন জামদানি পল্লিতে। ঘুরতে গিয়ে খুচরাও কিনে আনা যায় পছন্দমতো। ডিজাইন ও কাজ ভেদে কমদামের মধ্যে নিতে চাইলে ৬০০-১,০০০ টাকায়ও জামদানি পাওয়া যায়।
মুক্তবাজার অর্থনীতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, সিদ্ধান্ত প্রদানে সরকারের দীর্ঘসূত্রিতা, প্লট প্রদানে অনিয়ম, প্রকৃত জামদানি তাঁতিদের মধ্যে প্লট হস্তান্তর না করা ও ব্যাংক ঋণের অপ্রতুলতার কারণে জামদানি শিল্প বাধাগ্রস্ত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। জামদানিশিল্পীরা জামদানি তৈরি করলেও নিজেরা কখনোই পরতে পারেননি। তাঁতিরা বললেন, ‘কাপড় বুইন্যাই গেলাম, পরবার পারলাম না।’
জামদানি শাড়ি তৈরির প্রক্রিয়া। সোর্স: নয়ন

বাংলাদেশ থেকে ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, সৌদি আরব, লন্ডনসহ বিভিন্ন দেশে জামদানি শাড়ি রপ্তানি হচ্ছে। এ রপ্তানির সঙ্গে জড়িত শাড়ি ব্যবসায়ীরা। জামদানিশিল্পীদের কাছ থেকে তারা শাড়ি কিনে তা রপ্তানি করেন। ফলে বৈদেশিক মুদ্রা ওঠে এসব মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ীর ঘরে। শিল্পীরা স্বাদ পান না বৈদেশিক মুদ্রার। প্রতিবছর জামদানি শিল্প এলাকা থেকে ৫০-৬০ কোটি টাকার জামদানি শাড়ি রপ্তানি করা হয়। বাংলাদেশ ছাড়াও পাকিস্তানের ইসলামাবাদ, করাচি, লাহোর ও ইউরোপে প্রতিবছর বসে জামদানি মেলা।
জামদানি শাড়ি তৈরির কারখানা। সোর্স: নয়ন

১৯৯৭ সাল থেকে জামদানি শিল্পে সংকটের সূচনা। নানা অনিয়মের কারণে ওই বছরই বন্ধ হয়ে যায় জামদানির রপ্তানি । ফলে ধ্বংসের মুখে এসে দাঁড়ায় এ শিল্প। সুতা, জরি, রঙ, কর্মচারীদের বেতন, খাওয়া-দাওয়ার খরচের পর লাভের মুখ দেখা যায় না। এ ছাড়া ভারতীয় শাড়ির দাম কম হওয়ায় বেশি দামে জামদানি শাড়ি কেউ কিনতে চায় না। মুক্তবাজার অর্থনীতির কারণে চাকচিক্যে ভরা ভারতীয় শাড়ির আমদানি বাড়ছে। বিদেশি শাড়ির প্রভাব, কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি আর ক্রেতাদের বিদেশমুখী মনোভাব- এ সবকিছুই জামদানি শাড়ির আজকের এ অবস্থার জন্য দায়ী। আর মুক্তবাজারই গিলে খাচ্ছে জামদানির ঐতিহ্যকে।
জামদানি শাড়ি তৈরির তাঁতযন্ত্র। সোর্স: নয়নবর্তমানে জামদানিশিল্পীদের দুঃসময় যাচ্ছে। পিঁপড়ায় খাচ্ছে তাদের লাভের গুড়। অসচ্ছল ও নিরীহ প্রকৃতির জামদানিশিল্পীদের অক্ষমতার সুযোগকে ষোল আনাই কাজে লাগাচ্ছে একশ্রেণীর দাদন ব্যবসায়ী, মহাজন। ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় ওই সব মহাজনের কাছে পণবন্দী হয়ে পড়েছেন জামদানিশিল্পী ও কারিগররা। রূপগঞ্জে জামদানি এলাকাগুলোতে ৬০-৭০ জন মহাজন রয়েছেন।
আশা করছি, স্বর্ণতুল্য সুতার কারুকাজসমৃদ্ধ মানসম্পন্ন রপ্তানি যোগ্য বউ-বরণীয় জামদানি শাড়ি তৈরির বিপুল সম্ভার রূগগঞ্জের নোয়াপাড়ার এ পল্লীকে করে তুলবে অতুলনীয়। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার লাগোয়া রূপগঞ্জের জামদানি পল্লিই হবে একমাত্র এলাকা, যা দেশ-বিদেশের ক্রেতাদের শুভাগমনে হয়ে উঠবে মুখরিত। এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে সরকারিভাবে উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ শিল্পকে স্বমহিমায় পুনঃপ্রতিষ্ঠ করতে হবে। আর বিকশিত করতে হবে উৎকর্ষ, মান ও বৈচিত্র্য।
জামদানি শাড়ি তৈরির প্রক্রিয়া। সোর্স: নয়ন

কীভাবে যাবেন:

গুলিস্থান থেকে সরাসরি বাস পাবেন রূপগঞ্জের। মেঘলায় ৫০-৬০ টাকা ভাড়া। বাস থেকে বরাবো নেমে ওখান থেকেই রিক্সায় করে জামদানি পল্লি। চাইলে হেঁটেই যাওয়া যায়। একদম কাছে।
বনশ্রী থেকেও আসা যায় লেগুনা, সিএনজি এবং বাসে করে। আর যারা ব্যক্তিগতভাবে যাবেন তারা বনশ্রী মেইন রোড দিয়ে ডেমরা স্টাফ কোয়াটার হাইওয়ে দিয়ে কাঁচপুর হয়ে রূপগঞ্জ যেতে পারবেন অনায়াসে।
তথ্যসূত্র : banglatribune.com
ফিচার ইমেজ: নয়ন

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শুভরাড়া খাঞ্জালী মসজিদ: ইতিহাস আর রূপকথা মিলেমিশে যেখানে একাকার

এক ট্রেইলে দুই ঝর্ণা: হামহাম ও সিতাপ ঝর্ণা