জাফলং ভ্রমণ: পাহাড় আর নীল জলের মায়ায় একদিন

বাংলার রূপ আমি দেখিয়াছি,

পৃথিবীর রূপ তাই দেখিতে যাই না আর…

জীবনানন্দ দাশ বাংলার সত্যিকারের রূপ দেখেছিলেন, তাই তিনি রূপসী বাংলার কবি নামেই চির স্মরণীয় হয়ে আছেন বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে, বাঙালির বুকে। কবি খ্যাতির প্রত্যাশা আমার নেই, কিন্তু অন্য লোভটি ঠিকই আছে। যে রূপে জীবনানন্দ মজেছিলেন, সেই রূপস্রোতে অবগাহন করার। তাই এবার রওনা হলাম সিলেটের পথে। পাহাড় দেখবো, পাহাড়ি বন দেখবো, চা বাগান আর মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত দেখব। কিন্তু সে সবের আগে যাব জাফলংয়ে।
সেই মোতাবেক সিলেটে শহরের বুকে পদার্পণ করতে না করতেই আমরা ছুটলাম জাফলংয়ের পানে। সিলেট থেকে একেবারে কম দূরে নয় জাফলং। শহর থেকে ৬২ কিলোমিটার উত্তর দক্ষিণে সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলায় ডাউকি নদীর অববাহিকায় রূপসী জাফলং। সেই রূপের হাতছানিতে আমাদের ছুটে চলা। আমরা ক্রমশ লোকালয় পেরিয়ে এলাম। তখন শীত শেষ হতে চলেছে। রাস্তা থেকে যতদূর চোখ যায় হাওড়গুলো প্রায় জলশূন্য। সেই হাওরের এদিক ওদিক তাকাতেই উজ্জ্বল গোলাপি আর বেগুনীর মাঝামাঝি একটি রঙ চোখে এসে ধাক্কা মারল।

পিউম ফুলজা; ছবি: অমিতাভ অরণ্য

অদ্ভুত সুন্দর রঙে ছেয়ে গেছে আশপাশ। সেই বিরান ভূমিতে ঘাস লতাপাতার ফাঁকে, রাস্তার দুপাশে, পতিত জমিতে আর ছোট জলাশয়ের কান্দায় সবখানে লেগেছে উজ্জ্বল গোলাপি-বেগুনি ছোপ। ওগুলো পিউম ফুল, আশ্চর্য। যে ফুল দেখেছি ঢাকার নার্সারিতে সেই ফুল এই হাওড়ে। তাও এমন অগুনতি। আরো অবাক হওয়ার ব্যাপার, এটি আমাদের দেশীয় উদ্ভিদ নয় একেবারে।
পিউম দক্ষিণ আমেরিকার দুল। এই ফুলের আদি নিবাস আর্জেন্টিনা, প্যারাগুয়ে, উরুগুয়ে এবং দক্ষিণ-পূর্ব ব্রাজিল। অবশ্য তার বর্ণিল সৌন্দর্যের জন্য উষ্ণমণ্ডলীয় এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে আস্তে আস্তে। সেই পিউম ফুল কোনো এক আশ্চর্য মন্ত্রবলে এই হাওড়ে এসে নিজের জায়গা করে নিয়েছে। রঙিন করে তুলেছে বাংলার হাওড় বাঁওড়ের পতিত জমি রাস্তার দুপাশ।
সিলেট থেকে তামাবিল পর্যন্ত রাস্তা মোটামুটি ভালো, তারপরে শুরু হলো ঝাঁকুনি। এদিকে রাস্তায় সর্বদা পাথর ভর্তি ট্রাক চলাচল করে। এগুলো আসছে সেই জাফলং থেকেই। ভারী বোঝার ট্রাকগুলো ভাঙা রাস্তার ভাঙনকে আরো একটু বেগবানই করে শুধু। আরো খানিকটা এগিয়ে যেতেই দুপাশে পাথর ভাঙার মেশিনের ঘড়ঘড় শব্দ আমাদের সঙ্গ দেওয়া শুরু করলো। লক্ষ লক্ষ পাথরের সমবেত সঙ্গীতে সঙ্গত করতে করতে আমাদের বাসও যেন ঝাঁকুনি দেওয়া আরম্ভ করলো। যেন সংগীত করছে। অবশেষে আমরা পৌঁছে গেলাম জাফলংয়ে।
উপর থেকে জাফলং অববাহিকা; ছবি: অমিতাভ অরণ্য

বাংলাদেশের পিয়াইন নদীর অববাহিকায় ভারতের মেঘালয় প্রদেশের গা ঘেঁষে খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশে জাফলং অবস্থিত। সীমান্তের ওপারে ভারতের ডাউকি অঞ্চল। আসামের ওম নদী থেকে উৎপন্ন হয়ে ডাউকি নদী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। ওম নদী আবার উৎপন্ন হয়েছে আসামের জৈন্তা পাহাড় থেকে। এই ডাউকি নদীই বাংলাদেশে পিয়াইন নদী নামে পরিচিত। এই পিয়াইন বা ডাউকি নদীর অববাহিকায় গড়ে উঠেছে জাফলং।
একপাশে পাহাড় অন্যপাশে নদী- এই দুয়ের সম্মিলনী এই স্থানকে দিয়েছে অপূর্ব এক ব্যঞ্জনা। ফলে ভ্রমণ পিয়াসু বাংলাদেশিদের কাছে এটি হয়ে উঠেছে অতি প্রিয় পর্যটন ক্ষেত্রে। এখানে পাললিক শিলার সন্ধান পাওয়া গিয়েছে, তাই বাংলাদেশ সরকার কয়েকবার ভূতাত্ত্বিক জরিপ সম্পন্ন করেছে। এখানে কঠিন শিলার নুড়ি পাথর পাওয়া যায়, যা সংগ্রহ করার উপর নির্ভর করে অনেকের জীবিকা। এই পাথর চলে যাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। মজবুত করতে দালান কোঠার গঠনকে।
পাথরবাহী নৌকা; ছবি: অমিতাভ অরণ্য

এই কাজ গতি পায় বর্ষার কল্যাণে। পাহাড়ি নদী স্বভাবতই খরস্রোতা। বর্ষাকালে এই স্রোত তীব্র রূপ ধারণ করে। সেই স্রোতে শিলং মালভূমির পাহাড় থেকে ভেসে আছে বড় বড় পাথরের খণ্ড। আর ছোট ছোট নুড়ি পাথর তো রয়েছেই। এগুলো জমা হয় জাফলংয়ে ডাউকি নদীর গর্ভে। স্থানীয় মানুষেরা সেই পাথর কুড়িয়ে নেয়। এই পাথর সংগ্রহ করেই চলে তাদের জীবিকা।
আমরা এগিয়ে যেতেই দেখা পেলাম তাদের। সকাল হতেই বাচ্চা শিশু সবাই লেগে পড়েছে কাজে। কেউ বা শুকনো মাটিতে বসে এক প্রস্থ কাজের পরে খাবার খেয়ে নিচ্ছে। অতি সামান্য সে আয়োজন- সাদা ভাত, টমেটোর চাটনি। অথচ তাদের আগ্রহভরে প্রতি মুঠো ভাত মুখে পুরে দেওয়া দেখলে বোঝা যায়, এদের জীবন এখনও ক্ষুধার চক্রে বন্দী। যে জাফলং আমাদের কাছে সৌন্দর্যের অপার হাতছানি, সেই জাফলংই এদের কাছে দু’মুঠো ক্ষুধার অন্নের কৃপণ যোগানদাতা।
এখানকার পানি নীল, স্বচ্ছ আর পরিষ্কার। সেই পানির বুকে ভাসার লোভ সামলানো চাট্টিখানি কথা নয়। আমরাও জলের এই টান অগ্রাহ্য করতে পারলাম না। একটি নৌকার মাঝির সাথে আমরা দরদাম করে উঠে পড়লাম। তারপর ভেসে পড়লাম সম্মুখে।
নৌকার ঝাঁক; ছবি: অমিতাভ অরণ্য

এখন শীতকাল, তাই ডাউকি অগভীর, মৃদু শান্ত। অথচ বর্ষা আসলেই এর রূপ পালটে যায়। তখন এখানে জল থইথই অবস্থা। সেই প্রবল জলস্রোত বহুদূর থেকে ভাসিয়ে আনে শত শত টন ওজনের প্রকাণ্ড পাথরের বোল্ডার।
আশপাশ দিয়ে ইঞ্জিন চালিত নৌকাগুলো ভটভট আওয়াজ তুলে এদিক ওদিক চলে যাচ্ছে। ওগুলো শৌখিন পর্যটকদের জন্য। আরেক ধরনের নৌকা আছে- সরু লম্বা আর গভীর খোল বিশিষ্ট। ওগুলো কাজের নৌকা। স্থানীয়দের জীবিকা অর্জনের সহায়। নৌকা ভর্তি করে নুড়ি পাথর বয়ে নিয়ে যাচ্ছে মজনের মোকামে। আর একটু এগোতে একটি রহস্য পরিষ্কার হলো।
আসার সময় সারা পথ যত দোকান দেখেছি সেখানে একটি বস্তুর প্রাচুর্য আমাকে অবাক করেছি। তারজালি দিয়ে বানানো এক ধরনের চালুনির মতো বস্তু। দেখেই বুঝেছিলাম, গৃহস্থলী কাজের জন্য এগুলো বড্ড বেমানান। কিন্তু তাহলে কোন কাজে ব্যবহৃত হয়? সে উত্তর তখন পাইনি। এখন পেলাম। এগুলো দিয়ে নুড়ি পাথরের চেয়ে সূক্ষ্ম কুচি পাথর কণা তুলে আনা হয়।
ডাউকি ব্রিজ থেকে বেশ দূরে নদীর মাঝখানে একটি চরের মতো জায়গায় মাঝি নৌকা থামালেন। আশেপাশে বিজেবি’র কড়া প্রহরা। মাঝি আমাদের ওপাশের চমৎকার পাহাড়গুলো দেখিয়ে সতর্ক করে দিলেন, আমরা যেন ওখানে না যাই। ওগুলো নাকি আমাদের নয়। ওটা নাকি বিদেশ- ওটা ইন্ডিয়া। আমাদের ভীষণ মন খারাপ হলো। এর কোনো মানে হয়? স্যার সিরিল রেডক্লিফের উপর এত মেজাজ খারাপ হলো বলার মতো নয়। তার খামখেয়ালী কলমের দাগে পাহাড়গুলো পরদেশ হয়ে গেল?
জলের তলায় বালির মেলা; ছবি: অচিন্ত্য আসিফ

তবে বন্ধুদের হৈ হুল্লোড়ে আর মন ভালো করে দেওয়া অদ্ভুত নীলের জলের স্পর্শে মন ভালো হয়ে গেলো। এখানে জল স্বচ্ছ আর অগভীর। হাঁটু থেকে কোমর সমান। ঝপ করে জলের ভেতর আচমকা কখন লাফিয়ে পড়লাম, নিজেও জানি না। পায়ের নিচে মাটি নয় অন্য রকম কিছুর ছোঁয়া পেলাম। দক্ষিণবঙ্গের পলিমাটিতে পরিপূর্ণ নদী খালের যারা মানুষ, তাদের কাছে এ নতুন অভিজ্ঞতা।
গুড়ো গুড়ো পাথরকুচির নুড়ির মতো আকারের পাথর টুকরো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কোনোটা সাদা, কোনোটা কালচে, কোনো ফ্যাকাসে লাল, কোনটা বা সবুজাভ। কোথাও বা প্রকাণ্ড আকারের দুয়েকটি পাথর উঁকি দিচ্ছে জলের বুক থেকে।
ফটোগ্রাফাররাও খদ্দের বাগিয়ে নিয়ে ভালো মন্দ আর উদ্ভট পোজে ছবি তুলে যাচ্ছে অকাতরে। উৎসাহী টুরিস্টের পকেট ফাঁকা করে নিজের পকেট ভরছে- পর্যটনের মৌসুমে কামিয়ে নিচ্ছে দু-চার পয়সা।
ফেরার পথে; ছবি: অমিতাভ অরণ্য

এপারে অস্থায়ী দোকান বসেছে। আমরা সেদিকে গেলাম। ঝালমুড়ি থেকে শুরু করে কসমেটিক্স, মিনারেল ওয়াটার দেদারসে বিকোচ্ছে। রয়েছে খাবারের ব্যবস্থা। আমরা একটু এদিকে চলে এলাম। সেখানে পাথরের উপর নকশা করে প্রিয়জনের নাম লিখিয়ে নেওয়া যায়। অনেকেই পছন্দ এবং সাধ্যমত পাথর বেছে নিয়ে তার বুকে প্রিয়জনের নাম চিরস্থায়ী করে নিচ্ছে। মৌলিক চাহিদার পরের চাহিদা এটি। মানুষ চায় তার নাম অক্ষয় হয়ে থাকুক প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে। সেই ইচ্ছারই বহিঃপ্রকাশ এটি।
আকাশের দিকে তাকালাম। সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়েছে। আজকের মতো ফিরে যেতে হবে সিলেটে। কিন্তু মন বলছে, জাফলং আবার আসব তোমাকে দেখতে।

কিভাবে যাবেন?

সিলেট শহর থেকে জাফলংয়ের দূরত্ব ৬০ কি.মি আর যেতে লাগবে ২ ঘণ্টা। রাস্তাটা মোটামুটি ভালো। অন্যসব রাস্তা ভয়াবহ রকমের খারাপ। অবশ্য ভালো পথ শুধুমাত্র তামাবিল পর্যন্তই, এরপর বলতে গেলে রাস্তাই নাই।
সিলেটের কদমতলী বাসস্ট্যান্ড, শিশুপার্ক, সোবহানীঘাট- এই তিনটি জায়গা থেকে জাফলং যাওয়ায় বাস ছাড়ে। ভাড়া ৬০ টাকা।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

স্বরূপকাঠীর সন্ধ্যা নদীতে ও খালে বিলে ভ্রমণ

মেঘ পাহাড়ের দেশ সাজেক (ভিডিও)