ধলাই ও পিয়াইনের স্বচ্ছ জলে ডুবোখেলায় প্রকৃতিকন্যা জাফলং

সিলেটে চা বাগানের পর সবচেয়ে পুরনো ভ্রমণস্থল হলো জাফলং। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি এই জাফলংয়ের ওপারে খাসিয়া জৈন্তা পাহাড়, এপারে জাফলংয়ের বুক চিরে বয়ে গেছে দুই নদী। ধলাই ও পিয়াইন। এ নদী দুটি অনন্যতা এনে দিয়েছে জাফলংকে। ধলাই ও পিয়াইনের স্বচ্ছ জলে দল বেঁধে ঘুরে বেড়ায় নানা জাতের ছোট মাছ। দুই নদীর পানির নিচ থেকে ডুব দিয়ে হাজার হাজার শ্রমিকের পাথর উত্তোলনের দৃশ্যও মুগ্ধ করে পর্যটকদের।

নদীর পানিতে নারী-পুরুষের এই ‘ডুবোখেলা’ দেখা যায় ভোর থেকে সন্ধ্যা অবধি। পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে চলছে ঝর্ণা, আর নদীর বুকে স্তরে স্তরে সাজানো নানা রঙের নুড়ি পাথর। দূর থেকে তাকালে মনে হবে আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়। পাহাড়ের গায়ে নরম তুলার মতো ভেসে বেড়াচ্ছে মেঘরাশি। প্রকৃতির এক অপরূপ সৌন্দর্য জাফলং। প্রকৃতি যেন নিজ হাতে সাজিয়েছে ভারতের সীমান্ত ঘেঁষা দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এই জনপদকে।

পিয়াইন নদী। সোর্স: পেজ জাফলং

ঋতু- বৈচিত্র্যের সঙ্গে জাফলংও তার রূপ বদলায়। সৌন্দর্যে আসে বৈচিত্র্য। বর্ষায় গেলে এখানে দেখা যাবে ওপারের পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝরনাধারা। সবুজের বুকে নেমে আসা ঝর্ণাধারায় সূর্যের আলোর ঝিলিক ও পাহাড়ে ভেসে বেড়ানো মেঘমালা মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে পর্যটকদের।

আবার শীতে অন্য রূপে হাজির হয় জাফলং। চারদিকে তখন সবুজের সমারোহ, পাহাড় চূড়ায় গহিন অরণ্য। ফলে শীত এবং বর্ষা সব সময়ই বেড়ানোর জন্য উপযুক্ত স্থান হতে পারে জাফলং। এরকমটা ভেবেই ডিপার্টমেন্টের ট্যুর নির্ধারণ করলাম সিলেটে।

যাওয়ার আগে সীমান্তের ওপারে ডাউকি নদীর ওপরে দুই পাহাড়ের মাঝখানে ঝুলন্ত সেতু, আর সেতুর ওপার থেকে বয়ে আসা জলপ্রপাতের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে ঠিক করেছিলাম, এবারে জাফলং ঘুরবোই। পাহাড়, পানি, পান, পাথর, ঝর্ণা সব মিলিয়ে জাফলং। কিন্তু
‘প্রচন্ড শীত সিলেটে! ভারি ভারি শীতের কাপড় নিয়ে যেও … !’

‘কুয়াশার জন্য তো দুই হাত দূরের জিনিস দেখা যায় না! এত রিস্ক নিয়ে কি যাওয়া উচিৎ?’

‘আরেহ শীতে তো সব ঝর্না শুকিয়ে গেছে … কী দেখতে যাবি?’

পাথরের উপর জলের প্রবাহ। সোর্স: ticketshala.com

যাওয়ার আগেই এসব কথাবার্তা শুনে শুনে মন গেছে ভেঙে। এত শখ করে গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে সবাইকে রাজি করিয়েছি সিলেট যাবার জন্য, শুরুতেই এসব শুনলে কারই বা ভালো লাগবে?

না লাগুক। কারোর কথার তোয়াক্কা না করে নতুন কিছু দেখার প্রত্যাশা নিয়ে আমরা রওনা করলাম মাজারের শহরে।

রাতের জার্নি। যাত্রার শুরুতে কয়েক ঘণ্টা হইহুল্লোড় করলেও কিছুক্ষণের মাঝেই ঝিমিয়ে পড়লো পুরো বাস। থিতিয়ে গেল উত্তেজনা। ফিসফিসিয়ে দুই-চারজন আরো গল্প গুজব করলেও রাত বাড়তেই নীরব হয়ে গেল সব। শীত বলে কথা! বছরের প্রথম হাড়-চামড়া কাঁপানো শীতে নির্জীব হয়ে গেছে সবার উত্তেজনা।

তাই বলে সবাই যে ঘুমিয়ে পড়লো, তা নয়। ব্যবস্থাপনায় থাকা বড় ভাইয়েরা ঘুমাতে পারেনি মোটেও। এমনকি কেউ কেউ দাঁড়িয়ে ছিল সারা পথে।

স্বচ্ছ জল। সোর্স: পেজ জাফলং

রাত দুটোয় ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ভাঙা রাস্তার জ্যামে বাস দাঁড়িয়ে রইল ঝাড়া তিন ঘণ্টা। সবাই মিলে গল্প গুজব গান করে বিরক্তিকর সময়গুলো কেটে গেল।

তারও ঘন্টাখানেক পর ফিকে হয়ে গেল রাতের অন্ধকার। কুয়াশাচ্ছন্ন প্রকৃতি দেখতে দেখতে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা। হঠাৎই ডান পাশে তাকিয়ে দেখি, কুয়াশার চাদর ভেদ করে টকটকে লাল সূর্য উঁকি দিয়েছে দূর দিগন্তে। তখন আমরা হবিগঞ্জে। দুপাশে বিস্তীর্ণ ফসলী জমি।

কোনোটায় ধানের ‘নাড়া’ ( জ্বালানী হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ধানক্ষেত থেকে শুধু ধান কেটে নিয়ে বাকিটা জমিতেই রেখে দিলে কাণ্ডগুলো আরো বড় আর শক্ত হয়। এগুলোকে গ্রামে নাড়া বলে), কোনোটা খালি। সবচেয়ে বেশি ছিল শিম ক্ষেত। যতদূর চোখ যায় কেবল শিম ক্ষেতই ছিল। দেশের সবচেয়ে বেশি ফসলী জমি সম্ভবত উত্তর-পূর্ব বঙ্গেই।

ক্লাস সেভেন থেকে শুনে আসছি, অসম্ভব সুন্দর জায়গা জাফলং। তখন নতুন একজন স্যার এসেছিলেন স্কুলে। তাঁর কথা শুনেই জাফলংয়ের প্রতি আগ্রহটা জন্মেছিল।
সিলেট পৌঁছেই নাশতা খেয়ে রওনা করলাম বহু প্রতীক্ষিত জায়গা জাফলংয়ের দিকে। অসম্ভব বাজে রাস্তার বালিতে ডুবে ঝাঁকুনি খেতে খেতে নাজেহাল অবস্থা হলেও মজা করতে ছাড়িনি। পুরো রাস্তা গানের কলি গেয়েই কেটে গেছে।

নীল পাহাড়। সোর্স: পেজ জাফলং

দু’পাশের দৃশ্য ছিল দেখার মতো। তিনটা ব্রিজ পেরিয়েছিলাম, তিনটা তিন নদী নাকি একটা নদীই, জানা নেই আমার। নদীগুলোর নামও জানি না। তবে শেষ নদীর ব্রিজটা পেরুবার সময় পাশে ফিরে তাকিয়ে দেখি ছবির মতো সুন্দর নদীটা। গাঢ় নীল রঙের পানি বইছে। এটা সারি নদী। নদীর দুপাশের পাড়ে বড় বড় কাঠের নৌকা তুলে রাখা। ঠিক সাগর সৈকতের মতো।

কিছুক্ষণ পর রাস্তার এক পাশে পাহাড় দেখা গেল। প্রায় মাইলখানেক কিংবা তারচেয়েও বেশি জায়গা জুড়ে একটা পাহাড়ই। সামনে আরেকটা পাহাড় ছিল। সেটা উচ্চতায় কিছুটা কম অন্য পাহাড়টা থেকে। উঁচু পাহাড়টার খুবই অদ্ভুত একটা বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করলাম। খুব অল্প কিছু জায়গা ছাড়া এই বিস্তীর্ণ বিশাল জায়গা জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়টার চূড়া একদমই সমতল। মাইলখানেকের বেশি লম্বা একটা পাহাড়ের চূড়া কী করে এতটা সমতল হয়, সেটা ভেবে অবাক হয়ে যাই আমি। ঠিক করলাম, সুযোগ হলে অবশ্যই পাহাড়টায় চড়ে দেখব।

মেঘালয়। সোর্স: পেজ জাফলং

কড়া রোদে জাফলং পৌঁছে মনটা খারাপ হয়ে গেল। ঘোলা পানিতে মজুরেরা বড় বড় পাথর তুলছে, আবার সেগুলো ট্রাক ভর্তি করে নিয়ে যাচ্ছে শহরে। এই ট্রাকের যাওয়া আসার কারণেই রাস্তার এমন দুরবস্থা।

এই তাহলে জাফলং! ছবিতে তো এরকম দেখিনি! শীতকাল বলে এরকম? কিন্তু এমন নিরস একটা জায়গা কী করে এত বিখ্যাত হয়?

আব্দুর রাজ্জাক এসে বলল, ‘দোস্ত, চল নৌকা ভাড়া করে জিরো পয়েন্ট ঘুরে আসি। ওটাই মেইন জায়গা।’

লাফিয়ে উঠলাম। নিশ্চয়ই যাব।

গেলাম। নৌকা থেকে নেমে প্রখর রোদ আর অসম্ভব সৌন্দর্য দেখে চোখ ধাঁধিয়ে গেল। দুপাশে দুই পাহাড়ের মাঝে গিরিখাত। আর গিরিখাতের উপরে দুই পাহাড়ের সংযোগ হিসেবে একটা ঝুলন্ত ব্রিজ। ছবিতে তো এই জায়গাটাই দেখেছিলাম! ছবিতে অবশ্য এই গিরিখাত দিয়ে বিশাল জলপ্রপাতের পানি পড়ছিল। এখন শুকনো মৌসুম বলেই হয়তো পানি নেই।

একপাশের পাহাড়ে একটা বিশাল বড় কালো পাথর ঝুলে আছে। পাহাড়ের গায়ের অনেকটাই বাইরে পাথরটা। কী করে যে আটকে আছে ওটা, আল্লাহ জানেন! পাহাড়ের গায়ে কতগুলো অদ্ভুত সুন্দর ঘরবাড়ি। পাহাড় কেটে বানানো রাস্তায় গাড়ি চলছে অনায়াসে। দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছে পাহাড়ের গাছপালা ভেদ করে গাড়িগুলো চলছে।

ব্রিজ। সোর্স: পেজ জাফলং

বন্ধুদের বললাম, ‘দোস্ত, পানি তো তেমন বেশি না, চল ওই ঝুলন্ত ব্রিজটায় যাই। এপাশের পাহাড়টায় তো সাদা সিঁড়ি দেখা যাচ্ছে। ওগুলো পেরিয়ে যাওয়া যাবে সহজেই।’

ওরাও রাজি হলো। বলল, ‘স্যারদের পারমিশন নিতে হবে।’

স্যারেরা ইতোমধ্যেই পানি পেরিয়ে পাথরের দ্বীপে গিয়ে উঠেছে। জুতা খুলে স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ পানিতে নেমে পড়লাম আমরা। অসম্ভব ঠাণ্ডা পানি। আর পায়ের নিচে মাটি নয়, অগুনিত ছোট বড় পাথর। এই জাফলং থেকে প্রতিদিন টনে টনে পাথর তুলে লরিতে করে শহরে পাঠানো হয়। তবুও এখানকার পাথর শেষ হবার খবর নেই। তাহলে কি পাথরের জীবন আছে? তুষার বলল, ‘হু, পাথরের জীবন আছে। পাথর থেকে পাথরের জন্ম হয়। আর এগুলো বড়ও হয়। মানুষের স্পর্শে পাথর মরে যায়।’

জানি না, কতটুকু সত্যি। তবে অসম্ভবও নয়। নইলে এই পাথরের রহস্য কী?

বড় পাথরে পা রেখেই পিচ্ছিল পাথরে পা ফসকে গেল শিউলীর। শুধু বড় পাথরগুলোই পিচ্ছিল। কিন্তু ছোট পাথরগুলোতে পা ফেললে খুব খোঁচা লাগে। কিন্তু কী আর করার? পাথরের তীক্ষ্ণ খোঁচা উপেক্ষা করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি। কিন্তু পানির প্রচণ্ড স্রোতে ব্যালেন্স রাখতে পারলাম না কিছুতেই। তবে পড়ার আগেই ধরে ফেলল তুষার। ওর আর সাইফুল্লাহর হাত ধরেই প্রবল পানির স্রোত পেরিয়ে পাথরের দ্বীপে পৌঁছে গেলাম।

সোর্স: পেজ জাফলং

স্যারদের গিয়ে ব্রিজে যাবার কথা বলতেই স্যার বলল, ‘ওটা তো মেঘালয়! ইন্ডিয়া! বিএসএফের গুলি খেতে চাও?’

আব্দুর রাজ্জাক ফিসফিসিয়ে বলল, ‘চল গুলি খেয়েই আসি! গুলি খেতে কেমন তাও জানা হবে, আর এত সুন্দর জায়গাটাও দেখা হবে … ‘

ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও যাওয়া হলো না ওখানে। নিজেরা এলে ট্রাই করে দেখা যেত। কিন্তু স্যারদের সামনে তো আর বিএসএফের শুটিং প্র্যাকটিসের ডামি হতে পারি না! কিছুক্ষণ ফটোসেশন চললো। ছেলেরা চট করে কাপড় বদলে মজা করে গোসল করে নিল। আমরা মেয়েরা ওদের দিকে একবার অসহায় দৃষ্টিতে চেয়ে ফিরে চললাম তীরে। আমাদের ভাড়া নৌকা চলে এসেছে।

দুপুরে খেয়ে নিলাম জাফলংয়েই। খাওয়ার পর কিছুক্ষণ আশেপাশের দোকানগুলো ঘুরে কেনাকাটা করলাম কিছু। কেউ কেউ ওয়াচ টাওয়ারে উঠে লাল মাটির পাহাড় আর কুমোরপাড়া দেখে নিল। আসার সময় যে দুটো পাহাড় দেখতে দেখতে আসছিলাম, তার মধ্যে ছোট পাহাড়টা ছিল লাল মাটির পাহাড়।

ফিরতি পথ ধরলাম আমরা। সবাই তখন ক্লান্ত। তবুও পথে নেমে প্রথমে শাহ পরাণ পরে শাহ জালালের মাজার দেখে নিলাম। শাহ জালালের মাজারে হাজারে হাজারে কবুতর দেখলাম এখানে সেখানে। পুকুরে বিশাল বড় বড় মাগুর মাছও দেখলাম অনেকগুলো। এরচেয়ে বড় বড় মাগুর নাকি আছে এই পুকুরে। ওগুলো পানির নিচেই থাকে। উপরে ভাসে না। মাজার ঘুরে শেষ করে ছেলেরা এশার নামাজ পড়ে নিল এখানেই। তারপর আমরা ফিরে গেলাম হোটেলে।

সোর্স: bbarta24.com

সিলেটে আমাদের প্রথম দিনের ঘুোরাঘুরি শেষে যখন ফিরলাম, তখন সবাই প্রচণ্ড ক্লান্ত, ঘুমে ঢুলছে। আমরা তো রুমে ঢুকে কোনোরকম ফ্রেশ হয়েই বিছানায় সটান হয়ে শুয়ে পড়েছি, কিন্তু ম্যানেজমেন্টের দায়িত্বে থাকা তোফায়েল ভাই, সাইফুল্লাহ আর হীরা ভাই তখনো জেগে। দেখে নিচ্ছেন সবাই ঠিকঠাক মতো ঘর পেয়েছে কিনা। থাকতে অসুবিধা হচ্ছে কিনা।

সিলেট ট্যুরের এই ট্রিপে এই ভাইদের জন্য খুব খারাপ লেগেছে আমার। বাসে সবাই যখন আরামে বসে বসে এসেছি, এরা দাঁড়িয়ে থেকে সময় কাটিয়েছেন। প্রতিবার খাওয়ার সময় আমরা যখন গাপুসগুপুস করে খাবার গিলেছি, তখন এরা দৌড়াদৌড়ি করে দেখেছেন, সবাই খাচ্ছে কিনা। তারা খেয়েছেন সবার শেষে। দিনশেষে ক্লান্ত হয়ে নাক ডাকিয়ে যখন ঘুমিয়েছি, তখনো তারা নিজেদের রুম পর্যন্ত যেতে পারেননি। তাদের কাছে সেজন্য আমরা খুবই কৃতজ্ঞ।

ফিচার ইমেজ: ticketshala.com

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চাঁদপুরের রূপসা জমিদার বাড়ির কথকতা

চা বাগানের শহরের আনাচেকানাচে ইতিউতি পদচারণ