যদুনাথ রায়ের জমিদার বাড়ির আদ্যোপান্ত

মুন্সীগঞ্জে আমাদের ভ্রমণ পরিকল্পনায় সবশেষে রাখা হয়েছিল ভাগ্যকূল জমিদার বাড়ি। এই জমিদার বাড়ি খুঁজতে গিয়ে আমাদের নাজেহাল অবস্থা। হেনুর পরামর্শ মতে শ্রীনগর বাজার থেকে অটো রিজার্ভ করে স্যার জগদীশ চন্দ্র বোস কমপ্লেক্স আর ভাগ্যকূল জমিদার বাড়ি যাওয়া যাবে। রিজার্ভ অটোতে যাওয়া-আসায় ২০০ টাকা ভাড়া নেবে।

এই পরিকল্পনা মোতাবেক আমরা সিরাজদিখান থেকে ভাগ্যকূল জমিদার বাড়ি পর্যন্ত অটো রিজার্ভ করতে চাইলাম। কিন্তু কোনো অটোই ভাগ্যকূল জমিদার বাড়ি যেতে চাইলো না। শেষ পর্যন্ত শ্রীনগর বাজার পর্যন্তই যাওয়া ঠিক হলো। শ্রীনগর বাজার থেকে অটো বদলানোর জন্য হেঁটে দীর্ঘ জ্যাম পেরোতে হলো। কিন্তু ভাগ্যকূল জমিদার বাড়ি যাওয়া-আসায় ভাড়া চায় ৫০০ টাকা! আমাদের তো মাথায় হাত! বলে কী? পরে শুধু যাওয়ার ভাড়া ঠিক হলো ১৮০ টাকা।

কাছারি ঘর; Source: মাদিহা মৌ

আমি আগে থেকেই জানতাম, বান্দুরার কোকিলপেয়ারি, উকিল বাড়ি, তেলিবাড়ি, জজবাড়ি ভাগ্যকুলের জমিদারদেরই বাড়ি। যদুনাথ সাহার ছিল পাঁচ ছেলেমেয়ে। এদেরকে পৃথক পৃথক বাড়ি নির্মাণ করে দেন জমিদার যদুনাথ, যেগুলো বান্দুরা’র কোকিলপেয়ারি জমিদার বাড়ী, উকিল বাড়ী, জজ বাড়ী নামে পরিচিতি পেয়েছে। কিন্তু এটা জানতাম না যে বালাসুরের দুই জায়গায় জমিদার বাড়ি আছে। অটোচালক আমাদের বালাসুরের র‍্যাব কার্যালয়ে নামিয়ে দিলো। র‍্যাব কার্যালয় দেখেই যেন ভয় ধরে গেলো। মেইন গেট দিয়ে আলতো পায়ে এগুচ্ছি, ডান পাশ থেকে প্রশ্ন করলো, ‘আপনারা কাকে চাচ্ছেন?’ পাশে তাকিয়ে একটা ছাউনি দেখতে পেলাম, প্রবেশ চৌকি।

দুই-তিন জন র‍্যাব সদস্য বসে আছেন। তাদের কাছে এগিয়ে গিয়ে আমাদের আগমনের উদ্দেশ্য বললাম। তারা বললেন, এখানে জমিদার বাড়ি ছিল ঠিকই। কিন্তু এখন সব নষ্ট হয়ে গেছে। আশেপাশে তাকিয়ে কয়েকটা ভাঙা মঠ চোখে পড়লো। আমাদের বিমর্ষতা দেখে তাদের হয়তো দয়া হলো। পুকুরের পাড় পর্যন্ত যাওয়ার অনুমতি পেলাম। কিন্তু সামনে তেমন কিছুই নেই। অগত্যা এখান থেকে বেরিয়ে পড়লাম।

শ্রী শ্রী সার্বজনীন দুর্গামন্দির; Source: মাদিহা মৌ

হাঁটতে হাঁটতে বালাসুর বাজারে এসে লোকজনকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম, এতিমখানা রোডে যেতে হবে। ১০ টাকা করে অটো ভাড়া। অবশেষে আমরা জমিদার বাড়ি খুঁজে পেলাম।

নিজেদের সময়ে ভাগ্যকুলের জমিদাররা উপমহাদেশে প্রসিদ্ধ ছিলেন। জমিদারদের মধ্যে হরলাল রায়, রাজা শ্রীনাথ রায় ও প্রিয়নাথ রায়ের নাম উল্লেখযোগ্য। ব্রিটিশদের তোয়াজ করে চলতেন বলে রাজা উপাধি পেয়েছিলেন তারা। তাদের মতো ধনী বাঙালি পরিবার সে সময়ে কমই ছিল। এটা মোটামুটি সব জমিদারদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কিন্তু চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, জমিদারদের প্রায় সবাই উচ্চ শিক্ষিত ছিলেন। ঢাকা, কলকাতা এমনকি ইংল্যান্ডে তারা পড়াশোনা করেছেন।

ভাগ্যকুলে জমিদারদের সাতটি হিস্যার সন্ধান পাওয়া যায়। গুরুন্ন প্রসাদের দুই পুত্র মথুরামোহন রায় এবং প্রিয় মোহন রায় এর উত্তরপুরুষ ভাগ্যকুলের বর্তমানের ওয়াপদায় বসতি স্থাপন করেন। এই পরিবারেই জন্মেছিলেন বিখ্যাত ক্রিকেটার পংকজ রায়।

শ্রী শ্রী রাজলক্ষ্মী নারায়ণ জিও মন্দির; Source: মাদিহা মৌ

হরিপ্রসাদ রায় ১৮২৯ সালে ওলাওঠাতে মৃত্যুবরণ করলে গুরুন্ন প্রসাদ রায় ভ্রাতার বংশ রক্ষার্থে তার কনিষ্ঠ পুত্র হরলাল রায়কে ১৮৩০ সালে পৌষ্যপুত্র প্রদান করেন। তীক্ষ্ণ বিষয়বুদ্ধি থাকায় হরলাল ব্যবসা বাণিজ্যে বেশ উন্নতি করেন। কলকাতায় বহু বাড়ি ক্রয় ও নির্মাণ করেন। তিনি দাতা হিসাবে সুপরিচিত ছিলেন। কিন্তু মাত্র ২৬ বৎসর বয়সে বসন্ত রোগে নিঃসন্তান অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। স্ত্রী মাণিক্যময়ী নিজের ৬ বছর বয়সী ছোটভাই হরেন্দ্রলালকে পৌষ্যপুত্র হিসাবে গ্রহণ করেন।

হরেন্দ্রলাল রায় দানশীল জমিদার ছিলেন। ভাগ্যকুল হরেন্দ্রলাল উচ্চ বিদ্যালয়, মুন্সীগঞ্জ হরেন্দ্রলাল পাবলিক লাইব্রেরি, ভাগ্যকুল উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র, মুন্সীগঞ্জ হরেন্দ্রলাল কলেজসহ অসংখ্য প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন। দানশীল ও রাজভক্তির জন্য সরকার ১৯১৪ সালে তাকে রায়বাহাদুর উপাধি দ্বারা ভূষিত করেন। তিনি পঁয়ত্রিশ হাজার টাকার ওয়ারবন্ড ক্রয় করে এবং নিজের স্টীমার দিয়ে অসহযোগ আন্দোলনের সময় সরকারকে সহযোগিতা করেছিলেন। তিনি ব্রিটিশ ইন্ডিয়া এ্যাসোসিয়েশন, বেঙ্গল ল্যান্ড হোল্ডর এ্যাসোসিয়েশন, ইস্ট বেঙ্গল ল্যান্ড হোল্ডার এ্যাসোসিয়েশন, নর্থব্রুক হল, কলকাতা কন্সটিটিউশনাল ক্লাবের সদস্য ছিলেন। তিনি বেঙ্গল জমিদার সমিতির সহসভাপতি ও মিডফোর্ট হাসপাতালের লাইফ গভর্নর ছিলেন। ১৯৫১ সালে ৭৮ বৎসর বয়সে স্ত্রী ও তিনপুত্রের মৃত্যুর শোকে শোকাহত অবস্থায় হরেন্দ্রলাল মৃত্যুবরণ করেন।

যদুনাথ রায়ের বাড়ি; Source: মাদিহা মৌ

গঙ্গাপ্রসাদ রায়ের চতুর্থ পুত্র প্রেমচাঁদ রায়ের তিনপুত্র ছিলেন অত্যন্ত প্রভাবশালী জমিদার। এদের মধ্যে শ্রীনাথ রায় এবং জানকী নাথ রায় ইংরেজ সরকার কর্তৃক রাজা উপাধি দ্বারা ভূষিত হন। রাজা শ্রীনাথ রায় ছিলেন ভাগ্যকুলের জমিদারদের মধ্যে সর্বশেষ্ঠ। তিনি ১৮৪১ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি প্রথমে ঢাকা ও পরে কলকাতার প্রেসিডেন্সী কলেজে শিক্ষা লাভ করেন। রাজা শ্রীনাথ রায়, রাজা জানকীনাথ রায় ও রায় সীতানাথ রায় যৌথভাবে পূর্ব বেঙ্গল চক্ষু চিকিৎসালয়, সীতাকুণ্ড ওয়াটার ওয়ার্কস ও অন্যান্য বহু জনহিতকর প্রতিষ্ঠানের সৃষ্টি করেন। কলকাতা ও ঢাকার একটি স্টীমার সার্ভিসও তাদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। রাজভক্তি ও বহু জনহিতকর কাজের জন্য ১৮৯১ সালে রাজা উপাধিতে ভূষিত হন। রাজা সীতানাথ রায়ের দুই পুত্র যদুনাথ রায় এবং প্রিয়নাথ রায়।

ভাগ্যকুলের জমিদারদের নিকট রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহের কুঠিবাড়ি বিক্রি করেছিলেন। ভাগ্যকুলের জমিদারগণ শুধু শিক্ষানুরাগীই ছিলেন না, তারা প্রায় সকলেই ছিলেন উচ্চশিক্ষিত। ঢাকা, কলকাতা এবং ইংল্যান্ডে তারা পড়াশোনা করেছিলেন।

একই রকম দুটি ভবন; Source: মাদিহা মৌ

অটোচালক জানালেন, আরো অনেকগুলো জমিদার বাড়ি ছিল এখানে। বেশির ভাগই পদ্মায় ভেঙে গেছে। এর মধ্যে শ্রীনাথ রায় এবং জানকী নাথ রায়ের প্রাসাদও প্রায় ৩০ বছর পূর্বে পদ্মার গর্ভে বিলীন হয়েছে। এতিমখানা রোডে জমিদার যদুনাথ রায়ের বাড়িটিই যা টিকে আছে।

প্রবেশদ্বার; Source: মাদিহা মৌ

যদুনাথ রায় বর্তমানের বাড়িখাল ইউনিয়নের উত্তর বালাশুরে হুবহু একই ধরনের দুটি ত্রিতল ভবন নির্মাণ করেন। আমরা এই বাড়িগুলোই দেখতে পেলাম। ঠিক একই রকম দেখতে কারুকাজ সজ্জিত মুখোমুখি দুটি জরাজীর্ণ প্রাসাদ। ভবনটির চারদিকেই আটটি থাম বিশিষ্ট এই স্থাপত্যটি গ্রীক স্থাপত্যকলায় নির্মাণ করা হয়েছে। ভবনের ভেতরে নকশা-সাপ, ময়ূর, ফুল, পাখি সহ নানান নকশা রয়েছে। পুরো জমিদার বাড়ীর আঙ্গিনা জুড়ে ভবন, মাঝে উঠোন।

জমিদার বাড়িটির দরজা এবং জানালা একই মাপের, মানে উচ্চতার। একতলা থেকে দোতলায় যাওয়ার সিঁড়িটি কাঠের তৈরি। বাড়ির কিছু অংশে লোকজন থাকে, রোদে শুকাতে দেওয়া কাপড়চোপড় দেখতে পেলাম। কিছু অংশ পরিত্যক্ত জমিদার বাড়ীর সামনে রয়েছে “নবকুঠি”, এটি মূলত গদিঘর ছিল। এই জমিদার বাড়ীটি আনুমানিক ১৯২০ সালের দিকে নির্মাণ করা হয়।

মন্দিরের চূড়ার কারুকাজ; Source: মাদিহা মৌ

সুনসান নীরব জায়গাটিতে একসময় হৈহুল্লোড় চলতো। কাচারী ঘর, দূর্গা মন্দির, লক্ষী মন্দিরগুলো তারই প্রমাণ দেয়। এক সময় এ বাড়িতে পূর্ণিমা তিথীতে খুব ঘটা করে পালন হতো রাশ উৎসব। বাড়িটির চারপাশ এক সময় রাতের আঁধারে বিলের মাঝে আলোয় ঝলমল করত। এখনো নাট মন্দির ও দূর্গা মন্দিরগুলো এখনো অক্ষয় আছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়, নিয়মিত পূজা দেওয়া হয় ওতে।

বাড়ির সামনে বিশালাকৃতির দীঘি রয়েছে। আমরা দীঘির পানিতে হাতমুখ ধুয়ে নিলাম। এত ঠাণ্ডা পানি, শরীর জুড়িয়ে গেল।

মন্দিরের আলপনা; Source: মাদিহা মৌ

কীভাবে যাবেন

ঢাকা গুলিস্তান গোলাপ শাহ মাজারের পাশ থেকে দোহারের উদ্দেশে বাস ছাড়ে কিছুক্ষণ পর পর। বাস কন্টাক্টরকে বলে রাখবেন, বালাসুর চৌরাস্তা নামবো। ৬০ টাকা ভাড়া নেবে। এছাড়া পোস্তগোলা থেকেও যেতে পারেন বালাসুর। চৌরাস্তা থেকে এতিমখানা রোডে যাওয়ার অটো পাবেন। ভাড়া নেবে ১০ টাকা প্রতিজন। এতিমখানা রোডে গেলেই পেয়ে যাবেন যদুনাথ রায়ের জমিদার বাড়ি।

Feature Image: মাদিহা মৌ

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

গোমুখ অভিযান: শরতের পাহাড় ও হাতের মুঠোয় কল্পনা

গ্রামে শীত আসে বিশেষ রূপে