এ যেন স্বপ্নের ঘর!

একবার ভাবুন তো, আপনার যদি এমন একটা ঘর বা বাড়ি হতো, জলের উপরে পাথরের ঘর। ভাঙবে না, ডুববে না, ভেসে যাবে না, উড়ে যাবে না, ক্ষয়ে যাবে না। অনন্তকাল ধরে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকবে। যে ঘরের রঙিন পাথরের ছোট্ট সিঁড়ি দিয়ে চলে যাওয়া যাবে লেকের ঘাটে। যেখানে চাইলেই ঢেউ ছোঁয়া যায় ঘাটে বসে। পাশেই একা একা আপন মনে ঢেউয়ের আলতো দোলায় দুলে চলেছে ঘাটে বাঁধা ছোট্ট এক আদুরে রঙিন নৌকা।

মৃদু বাতাসে যে দুলে ওঠে ক্ষণে ক্ষণে, খুশিতে, হাসিতে, নেচে ওঠে আনন্দে। ইচ্ছা হলেই ভেসে যাওয়া যাবে যে নৌকায় করে। যে ঘরের উপরে মেঘ আছে ছাদ হয়ে, ছায়া হয়ে, চারপাশে পাহারা দিয়ে পাহাড় দাঁড়িয়ে, অরণ্য আছে অভয় হয়ে, রঙিন ফুল আছে হাসি হয়ে, সূর্য আছে উষ্ণ আদর হয়ে, লেকের জলে বৃষ্টি ঝরে গান হয়ে, বরফ জমে অপার্থিব সুখ নিয়ে, কুয়াশা জড়ায় শীতের চাদর হয়ে, পাতা ঝরে গুনগুনিয়ে।  

পাহাড়ের পথ থেকে অপূর্ব লেকের হাতছানি। ছবিঃ লেখক

কেমন হতো? নিশ্চিতভাবেই এমন কোনো ঘর বা বাড়ি পেলে আপনি আমি সুখের উচ্ছ্বাসে পাগল হয়ে যাবো। হয়তো সুখের অসুখে মরেই যাবো! এটা অলীক স্বপ্ন হওয়াই ছিল বাস্তবসম্মত আর এটা একটা সুখের কল্পনা হওয়াই ছিল সঠিক। আমি নৈনিতালের লেকের পাড়ের ছোট রাস্তা ধরে খুব ধীরে ধীরে হেঁটে সামনে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। কিছুদূর এগিয়ে যাওয়ার পরে লেকের প্রায় মধ্যেই, অনেকটা জলের উপরেই ছোট্ট একটা পার্ক দেখে সেখানে একটু বসলাম অলসভাবে।

আর ঠিক সেই সময় লেকের জলের উপরে ঘাঁটে বেঁধে রাখা রঙিন নৌকার আলতো করে দুলে ওঠা, চারপাশের পাহাড়, উপরের কয়েক খণ্ড সাদা মেঘ, আর সেই সাথে জানুয়ারির শুরুতে এখানে বরফ পড়ে যে অপার্থিব পরিবেশের তৈরি হয় সেইসব নিয়ে এমন সুখের আর অসম্ভব একটা স্বপ্ন সাজিয়েছিলাম মনে মনে।

লেকের পাড়ে ছোট্ট পার্ক। ছবিঃ লেখক

কয়েক মিনিট বসে আবার উঠে লেকের প্রায় শেষ প্রান্তে চলে এসেছি। এটা লেকের পূর্ব পাশ। পাহাড় আর পাহাড়ের কোলে বসে ওপাশ থেকে হেসে ওঠা সূর্যের আলো ছড়ানো দেখেই সেটাই মনে হলো। এই পাশটা নৈনিতালের পুরনো শহর খুব সম্ভবত। কারণ আমরা যেখানে আছি সেখানের অধিকাংশ হোটেল, বাড়িঘর, দোকানপাট বেশ ঝকঝকে, চকচকে আর সাজানো-গোছানো। কিন্তু লেকের শেষ প্রান্তে যে স্থাপনাগুলো দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়ের গায়ে গায়ে সেগুলো অতটা চকচকে আর ঝকঝকে নয়।

বরং কিছুটা রঙ হারানো, একটু ভাঙাচোরা, সংস্কারহীন আর কিছুটা অবহেলিত বলেই মনে হলো আমার কাছে। এখানে একটি লোকাল বাস স্ট্যান্ডও আছে বেশ বোঝা গেল। এপাশ থেকে পুরো লেকের একটা ভিউ পাওয়া যায়, যেটা ওপাশ থেকে ততটা দৃষ্টি সুখের নয়, কিন্তু এপাশ থেকে দারুণ।

লেকের দুই প্রান্ত। ছবিঃ লেখক

সেখানে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে, একটু এদিক সেদিক তাকিয়ে লেকের অন্য পাড়ে যাবার পায়ে হাঁটা পথে পা বাড়ালাম। কয়েক মিনিট হাঁটলেই শহুরে পথ, বাড়ি ঘরে জড়ানো পাহাড়, দুই একটি গাড়ি চলে যাওয়ার শব্দ সব দূরে সরে গিয়ে শুধু লেক আর পাহাড়ের নীরবতা পাওয়া যায়। এখানে পাহাড়ের গায়ে শুধু পায়ে হাঁটা একটি পাথুরে পথ আর সেই পথের সাথেই ছুঁয়ে ছুঁয়ে আছে নৈনিলেক। একবারে শীতল পরশ বুলিয়ে দেয় ক্ষণে ক্ষণে।

লেকের এই পাশটা ঠিক আমাদের হোটেলের উল্টো পাশ। মল রোড, নানা রকম হোটেল, মোটেল আর স্থাপনার কোলাহল নেই এখানে। নেই কোনো রকম আর্টিফিশিয়াল ব্যাপার। এই পাশটা একেবারে নীরব, নির্জন, প্রাচীন আর প্রকৃতিতে ভরপুর। লেকের জল ছুঁয়ে ছুঁয়ে, পাহাড়ের পিঠ কেটে বানানো শুধু পায়ে চলার একটি পথ।

পায়ে হাঁটা পাহাড়ি লেকের পথ। ছবিঃ লেখক

এখানে স্থানীয়রা আসে মর্নিং ওয়াকের জন্য। আর যারা আমার মতো দূরদেশ থেকে এসেছে তারা নীরবে, নির্জনে আর একান্তে পাহাড়, লেক সবুজের একাত্মতা উপভোগ করতে। মন প্রাণ ভরে, নিজের মতো করে। আমি দ্বিতীয় দলের মধ্যে পড়েছি। একা একা, একান্তে, নীরব, নির্জন এই সবুজ পাহাড়, স্বচ্ছ জলের টলটলে লেক, ঘন অরণ্যের গা ছমছমে অনুভূতি উপভোগ করছিলাম আর মাঝে মাঝেই রোদের উষ্ণতা উপভোগ করছিলাম নিজের মতো করেই।

এভাবে হাঁটছি, থামছি, ছবি তুলছি আর সামনে এগিয়ে চলেছি। সামনে এগিয়ে যেতে যেতে ঠিক যখন লেকের একদম মাঝখানে গেলাম, আমি থমকে গেলাম, অবাক চোখে দূরে তাকিয়ে দেখে নির্বাক আর নিস্তব্ধ হয়ে গেলাম! গায়ে চিমটি দিয়ে বুঝতে হলো যে আমি স্বপ্ন, কল্পনার মাঝেই হেঁটে চলেছি নাকি সত্যি সত্যিই হাঁটছি আর চোখে সামনে যা দেখছি সেটা সত্যি সত্যিই দেখছি?

দূর থেকে চোখে পড়া স্বপ্নের সেই ঘর! ছবিঃ লেখক

কারণ? কারণ ঠিক একটু আগে, লেকের অপর পাশে লেকের উপরে প্রায় ঝুলে থাকা পার্কে বসে যা যা কল্পনা করেছি, যেভাবে স্বপ্ন সাজিয়েছি, যেভাবে নিজের খুশিতে ঘর বানিয়েছি ঠিক অবিকল সেই রকম একটি ছোট্ট পাথরের বাড়ি বা ঘর যে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়ের ঝুলে থাকা অংশে প্রায় লেকের জলের মাঝেই! একি ভাবা যায়? একি সত্যি? একি বাস্তব? এই জিজ্ঞাসাগুলো মনের মধ্যে জেগে উঠেছে। আর কেনই বা এমন হবে না? যতটা সামনে এগিয়ে যাচ্ছি, ততই যে পুরো কল্পনার সবটুকু একটু একটু করে বাস্তবে চোখের সামনে চলে আসছে!

লেকের অপর পাড়ে বর্ণীল বাড়িঘর। ছবিঃ সংগ্রহ

পাহাড়ের গায়ে, লেকের জলের উপরে একটি পাথুরে বাড়ি ঠাঁয় দাঁড়িয়ে। বাড়ির সাথেই ছোট্ট সরু পাথরের ঘাট। ঘাঁটে বাঁধা একটি রঙিন নৌকা আলতো বাতাসে একটু একটু করে দুলে উঠছে, দোল খাচ্ছে আপন মনে, আর কোমল ঢেউয়ের দোলায়। উপরে একখণ্ড মেঘ আছে ছাদ আর ছায়া হয়ে, চারপাশে পাহাড় আছে পাহারা হয়ে, পাহাড়ের অরণ্য আছে অভয় হয়ে, অরণ্যে ফুল ফুটে আছে আনন্দ হয়ে, কুয়াশার চাদর আছে, কনকনে শীত আছে আর মিষ্টি রোদের উষ্ণ আদর আছে সেই ঘরের সবটুকু জুড়ে।

সবই তো আছে যা যা চেয়েছিলাম। আর যেটুকু বাকি আছে সেটাও পাওয়া যাবে এখানে যখন বরফ পড়বে কয়েকদিন পরে। অপার্থিব হয়ে উঠবে এই ঘর, এই বাড়ি, এই লেক, এই পাহাড়, এই অরণ্য আর এই নির্জন পাহাড়ি পথ।  

শীতের স্বর্গীয় নৈনিতাল। ছবিঃ সংগ্রহ

আর বরফে জড়ানো এই লেকের পাড়ে রাতে যখন চাঁদ উঠবে, জ্যোৎস্না ছড়াবে, তখন এই ঘর, এই বাড়ি, এই লেক, এই নৌকা, এই অরণ্য যেন স্বর্গীয় হয়ে উঠবে! এক টুকরো স্বর্গ যেন এসে যাবে এই পৃথিবীর বুকে। নৈনিতালের লেকের ওপারে, স্বপ্ন আর কল্পনার রঙ দিয়ে সাজানো এক স্বপ্নের বাড়িতে বা ঘরে।

ঢাকা থেকে কলকাতা হয়ে ট্রেন বা প্লেনে কাঠগোদাম গিয়ে, এক ঘণ্টার বাস বা কার জার্নি করে নৈনিতালে পৌঁছান যাবে।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

নীল আকাশ, রঙিন পাহাড় আর ঝলমলে লেকের মান-অভিমান!

পদ্মহেম ধাম: সাঁইজির বারামখানা