গোমুখ অভিযান: এটাই গোমুখ? হতেই পারে না…

শিবলিঙ্গ ও পাহাড় চূড়া থেকে নেমে প্রায় দুই কিলোমিটার সমতলে ট্রেক করে এসে সকালের প্রথম বিশ্রাম নিতে চারপাশে পাহাড় দিয়ে ঘেরা একটা শুষ্ক, পাথরময় ভ্যালীতে বসলাম যে যার মতো পাথরে পাথরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। কিছু হালকা খাবার, খেজুর, পানি খেয়ে চকলেট আর চুইংগাম মুখে দিয়ে পথ চলা শুরু হলো নতুন করে। সামনে নাকি আর মাত্র দেড় কিলোমিটার। তার পরেই সেই কাঙ্ক্ষিত গোমুখের দর্শন। যা দেখতে সেই সুদূর ৩,০০০ কিলোমিটারের বেশী পথ পাড়ি দিয়ে এসেছি চারদিন ধরে।

আরও প্রায় এক কিলোমিটার যাওয়ার পথে পাথর দিয়ে বানানো একটা ছোট্ট উপাসনা স্থান চোখে পড়লো। যেখানে সবাই যে যার মতো করে শ্রদ্ধা নিবেদন করছে। ওদের গাইডের কাছে জানলাম গোমুখ পৌঁছে গেছি প্রায়। একটু নেমে গেলেই নিচে গোমুখ! কেন যেন এই কথা শোনা মাত্রই সন্দেহ হলো। কারণ ভাগীরথী পিক এখনো বেশ কিছুটা দূরে দেখা যাচ্ছে। এত কাছে তো গোমুখ হবার কথা নয়? আর এখানে তো কোনো গ্লেসিয়ারও নেই। তাহলে এখানেই গোমুখ কীভাবে হলো? এই প্রশ্ন মাথায় নিয়েই নিচে নেমে গেলাম পাথুরে পথ আর সেই সাময়িক উপাসনার জায়গা ছেড়ে।

আর্জেন্টাইন ট্রেকার্স টিমের এগিয়ে চলা। ছবিঃ লেখক

নিচে নদীর তীরে গিয়ে, এক বালুময় চরের মতো চারপাশে বড় বড় পাথর বেষ্টিত, যেখানে পাথরের মধ্য থেকে ভীষণ জোরে গর্জন করে গঙ্গার একটি ধারা বয়ে চলেছে সেটাই নাকি গোমুখ! এখানেই নাকি গ্লেসিয়ার ছিল যা বৈরি আবহাওয়া, দূষণ আর ধ্বসের কারণে এখান থেকে দুই থেকে তিন কিলোমিটার দূরে সরে গেছে!

কিন্তু আমি কিছুতেই সেটা মানতে পারছিলাম না। একটা বিশাল বরফের পাহাড় কীভাবে চার কিলোমিটার দূরে সরে যায়? এটা কি আদৌ সম্ভব? আর্জেন্টাইন ট্রেকাররা মানলো কি মানলো না সেটা বুঝতে পারিনি। তবে ওরা সেই জায়গা থেকে আর সামনে এগিয়ে যেতে চাইলো না। অনেকেই ভীষণ ভীষণ ক্লান্ত আর কয়েকজন বেশ বয়স্ক বলে অন্যরাও না এগিয়ে সেখানেই বসে বসে গঙ্গার প্রবাহ দেখতে লাগলো। কারণ সামনে ভীষণ দুর্গম পথ। পাহাড়ের গায়ে কোনো পথ বা ট্রেক রুট নেই। আছে পাথর, ঝুরো মাটি, আর মাটি বা পাথরের পাহাড় দাঁড়িয়ে। সামনে এগোতে হলে এরই মাঝ দিয়ে, ঝুঁকি নিয়ে, নিজের মতো করে পথ তৈরি করে এগোতে হবে। তাহলে উপায়?

মিথ্যে গোমুখে! ছবিঃ অ্যালিনা

কিন্তু আমার মনের মধ্যে ছটফট করছে। একা একা কী করি? সেই মিথ্যে গোমুখের কয়েকটা ছবি তুলে একা একাই সামনের দিকে এগোতে থাকলাম পাথরে পাথরে স্তুপ হয়ে থাকা, নড়বড়ে পাথরের পথ ধরে ধরে। যেখানে আসলে কোনো পথ নেই। আমি যে পথে হাঁটছি সেটাই তখন পথ। একবার পাথর বেয়ে বেয়ে অনেকটা নিচে নেমে আবার পাথর বেয়ে বেয়ে অনেকটা উঁচুতে উঠে এগোতে হচ্ছে।

এভাবে অচেনা পথে, পাথরের পর পাথরে ডিঙিয়ে, প্রায় এক ঘণ্টা এগিয়ে গেলাম। এরপর যে জায়গায় গিয়ে দাঁড়ালাম সেটা থেকে বেশ কিছুটা দূরে গোমুখের মতো একটা মুখ ঠিক দেখা যাচ্ছে বলে মনে হলো। কিন্তু সামনে আর এগোনোর মতো কোনো জায়গা খুঁজে পাচ্ছি না। এতক্ষণ তবু নড়বড়ে পাথরের উপর দিয়ে পাহাড়ের নিচ দিয়ে হেঁটে হেঁটে এতদূর এসেছি, কিন্তু এখন?

পাথুরে পথে। ছবিঃ লেখক

এখন সামনে যাওয়ার দুটো উপায়। এক পাহাড়ের নিচে নেমে নদী পেরিয়ে যেদিকে গোমুখের মতো মুখ দেখা যাচ্ছে সেদিকে যেতে হবে অথবা পাহাড় নিজের মতো করে ক্লাইম্বিং করে পথ বানিয়ে এই পাহাড় ডিঙিয়ে, অন্য পাহাড়ের উপর দিয়ে গোমুখের কাছে যেতে হবে। একটা জায়গায় চুপ করে বসলাম। একটু পানি খেলাম। কী করবো ভাবছিলাম। নদী পার হওয়া অসম্ভব। কারণ নদী এখানে ভয়ঙ্কর রূপে বয়ে চলেছে। একবার ফসকে গেলেই মুহূর্তেই নিখোঁজ আর শুধু ভিজে গেলেও শীতেই মরে যেতে হবে মুহূর্তেই। তাই নদী পার হওয়ার পরিকল্পনা বাদ।

তবে কি পাহাড় চড়বো একা একা? কোনো রকম প্রশিক্ষণ নেই, কোনো ইকুইপমেন্ট নেই, কোনো রোপ নেই, কেউ নেই সাহায্য করার, কোনো বিপদ হলে এগিয়ে আসার বা পড়ে গেলে রেস্কিউ করার। এমন নানা রকম চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল প্রতি মুহূর্তে।

এই পাহাড়ের ওপারেই গ্লেসিয়ার। ছবিঃ লেখক

নাহ থাক না সব নেতিবাচক চিন্তা। এতদূর যেহেতু এসেছি দেখি না আর একটু চেষ্টা করে। এই জীবনে আর আসা হবে কিনা? আর সুযোগ এলেও একই রুটে আবার আসতে মন চাইবে কিনা কে জানে? তাই দেখি আর একবার নিজের মতো করে চেষ্টা করে, কতটা এগিয়ে যাওয়া যায়? এই ভাবনা ভেবেই, সকল নেতিবাচক ভাবনা আর সম্ভাবনা বাদ দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম।

এক পা, এক পা করে খাড়া পাহাড়ের মাঝে বেরিয়ে থাকা পাথর ধরে ধরে এগিয়ে যাচ্ছি। তবে মনে মনে ভয় যে পাচ্ছিলাম না, তা কিন্তু নয়। একদম একা, কোথাও কেউ নেই এই ভাবনাটাই সবচেয়ে বেশী মাথার মধ্যে ঘুরঘুর করছিল। তবুও এগিয়ে যাচ্ছিলাম ওসব ভুলে থেকেই।

ভাগীরথী গ্রুপ। ছবিঃ লেখক

একটা পাহাড়ের ঢাল থেকে সেই পাহাড়ের মাঝামাঝি চলে এসেছি খুব সাবধানে। এবার সামনে তেমন ধরে ধরে এগোনোর শক্ত পাথরও নেই, এমনকি নেই ভালো করে একটা পা ফেলার মতো সাহসী জায়গাও। তার উপরে পাহাড়ে হাঁটার কিছুটা অভিজ্ঞতা থাকলেও, পাহাড়ে চড়ার বা ক্লাইম্ব করার কোনো রকম অভিজ্ঞতাই আমার নেই। তবুও শেষ চেষ্টা করে দেখাতে আবারো পা বাড়ালাম। আর তখনই যা বোঝার বুঝে গেলাম বা বিধাতা আমাকে সেটা হাতে নাতে বুঝিয়ে দিলেন যে, এক দৌড়েই লক্ষ্যে পৌঁছানো যায় না। আর সেটাও যদি হয় এমন দুর্গম, দুর্লভ আর দুর্ধর্ষ কোনো লক্ষ্য, সেটাও একা একা, একদম একা…!

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

তিন ঘণ্টার নাইকির গল্প!

তুক অ/দামতুয়া ঝর্ণায় অভিযানে একদল অভিযাত্রী