পাইন বনের মধ্যে দিয়ে লাভার পথে ঘাটে

লাভা থেকে ৫/৬ কিলোমিটার দূরে রিশপের অবস্থান। লাভা হয়ে রিশপে প্রবেশ করতে হয়। কিন্তু আমরা লাভা হয়ে রিশপে ঢুকছি কিনা সেটা বলতে পারছি না। রিশপে যখন ঢুকেছি তখন বেশ রাত হয়ে গেয়েছিল আমাদের। তাই ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি যে ড্রাইভার মহাশয় আমাদের কোথা দিয়ে নিয়ে গিয়েছে।

সুনাখারি রিসোর্টে বসে জানতে পারলাম পায়ে হাঁটা পথ ধরে ঘণ্টা দুই গেলে লাভায় পৌঁছে যাওয়া যায়। তো সেই মতে প্ল্যান হয়। সকালে টিফিন দাড়া দেখে আমরা লাভার উদ্দেশ্যে যাত্রা আরম্ভ করি।

জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলেছি; ছবি- সাইমুন ইসলাম

টিফিন দাড়ার চূড়া থেকে যখন নামছি সূর্য তখন মাথার উপর উত্তাপ ছড়াচ্ছে। চূড়া থেকে নেমে হাতের বাম পাশ বরাবর হাঁটা শুরু করি। জঙ্গলের নীরবতা ভেঙে পায়ে হাঁটা রাস্তা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি সামনের দিকে। সাথে কোনো গাইড না থাকায় বেশ খানিকটা শঙ্কায় ছিলাম। “এই বুঝি পথ ভুল হয়” এই ভয় তাড়া করে ফিরছিল। ভয় তাড়ানোর জন্য নিজেকে সান্ত্বনা দিছিলাম এই ভেবে যে, রিসোর্টের দিদি বলছে লাভা যাওয়ার পথ একটাই।

ডানে-বামে না তাকিয়ে বরাবর গেলেই চলবে। পথ ভুল হবার সুযোগ নেই এখানে।
ঘন জঙ্গলের ঘুম ভাঙিয়ে আমরা ছয়জন এগিয়ে চলেছি। জানা অজানা পাখির কিচিরমিচির শব্দ জেগে উঠেছে জঙ্গলের চারিধার। জংলি ফুলের সুবাস ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে চারিপাশে। নানা বর্ণের, নানা রঙয়ের ফুলের ছড়াছড়ি। এসকল ফুলের ছবি ফ্রেম বন্দি করতে পিছিয়ে পড়ল বিপু’দা আর সাইমুন। বাকিরা ধীর পায়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে।

ধীর পায়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে; ছবি- বিপু বিধান

টিফিন দাড়া থেকে লাভা যাওয়ার পথ তেমন খাঁড়া না থাকলেও প্রত্যেকের সাথে দুটো করে ব্যাগ থাকায় অল্পদূর যেতেই হাঁপিয়ে উঠি। সামনেই একটা ফাঁকা জায়গা দেখে একটু জিরিয়ে নেই। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হওয়ার পথে। বেশ বুঝতে পারি পেট কিছু চাইছে। হালকা স্ন্যাক্স আর চকলেট দিয়ে আপাতত পেটকে শান্ত করি। এরপর আবার কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যের দিকে হাঁটতে থাকি।

পাইন বন; ছবি- সাইমুন ইসলাম

শুনেছি পৃথিবীর সুন্দরতম গাছের মধ্যে পাইন অন্যতম। শীত প্রধান দেশে মূলত এই গাছ বেশি দেখা যায়। আকাশ ছুঁতে চাওয়া পাইন গাছ ঐসকল অঞ্চলের সৌন্দর্য বাড়িয়েছে বহুগুণে। আর এই পথের বেশ খানিকটা পথ জুড়ে আছে পাইন গাছ। সারি সারি পাইন হাজার বছর ধরে আগলে রাখছে জন-মানবহীন এই পথকে। সূর্যের আলোও যেন ঢুকতে কষ্ট হচ্ছে নিশ্ছিদ্র পাইন গাছের ফাঁক ফোঁকর দিয়ে।

আকাশ চুম্বী পাইন বনে থমকে যাওয়া পথিক; ছবি- সাইমুন ইসলাম

অপরূপ এই পাইন বনের কাছে যেতেই এক মূহুর্তের জন্য থমকে যেতে হয়। দম বন্ধ করা প্রকৃতির এই সৃষ্টি থেকে চোখ সরানো দায়। আলো আধারির খেলায় মত্ত পাইনের সারি। মাঝে মাঝে নীরবতা ভেঙে ডেকে উঠছে সুরেলা কণ্ঠে কোনো পাখি।

জঙলি ফুলের সমাহার পুরো পথ জুড়ে; ছবি- বিপু বিধান

বনের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মাসুদ ভাইকে বলছিলাম যে দার্জেলিংয়ে শাড়ি পরবো বলে সাথে করে একটা শাড়ি নিয়ে এসে ছিলাম। কিন্তু এত বেশি ঠাণ্ডা ছিল যে শাড়ি পরার দুঃসাহস করিনি আর। কথাগুলো বলে বুঝতে পারি পাগলের সাঁকো নাড়িয়ে দেওয়ার মতো পাপ আমি করে ফেলেছি। এখন আর আমার রক্ষা নেই। মাসুদ ভাই আর বিপু’দা বলতে লাগল, ‘জীবনে কী আছে আর? আফসোস রেখে লাভ নাই। আজ এই পাইন বনে শাড়ি পরে ছবি তুলে ফেল’।

একমূহুর্ত দেরি না করে বাকিরাও বলতে শুরু করল কী আছে আর জীবনে। খুব ভালো করে বুঝতে পারলাম যে এখান থেকে ছাড়া পাওয়ার কোনো উপায় নাই। তাই অগত্যা, জিন্সের উপর দিয়ে শাড়ি পরে নিতেই হয়।

নাটকের খন্ডাংশ; ছবি- বিপু বিধান

ভেবেছিলাম, শাড়ি পরাতেই বোধহয় সীমাবদ্ধ থাকবে কিন্তু সে গুঁড়ে বালি। নাটক এখনও ঢের বাকি। ঠাণ্ডায় কাঁপতে কাঁপতে পাইন বনের মধ্যে নিয়ে দাঁড় করিয়ে দিল। বিভিন্ন রঙে বিভিন্ন ঢংয়ে আমার ছবি তুলতে থাকলে। যথারীতি আমার পোজ এবং এক্সপ্রেশন নিয়ে হতাশ হতে থাকলেন মাসুদ ভাই। অন্যদিকে, বিপু’দা বিহাইন্ড দ্যা সিনের কার্যকলাপ ফ্রেম বন্দি করছেন। তাই কীভাবে আমার হাস্যোজ্জ্বল এক্সপ্রেশন আনা যায় সেই চেষ্টায় রত হলেন জয়’দা, সৌরভ ভাই আর সাইমুন।

জীবনে এই প্রথম ভালোবাসার মানুষগুলোর জন্য বনে বাদাড়ে গিনিপিগ হয়েছি। এবং তওবা করেছি যে জীবনে আর এই বাদর ভাইগুলোর কাছে আফসোস করবো না। না হলে আমায় আবার শুনতে হবে, ‘জীবন তো একটাই’।

নান্দনিকতার ছোঁয়া লাভার কটেজগুলোতেও; ছবি- সাইমুন ইসলাম

নানা আঙ্গিকে নানা ভঙ্গীতে ছবি তোলা শেষ হলে আবার হাঁটা শুরু। আরও ১৫/২০ মিনিট হাঁটতেই পৌঁছে যাই ইট বিছানো রাস্তায়। সেখান থেকে হাতের বামে মোড় নিয়ে কিছুদূর হাঁটলেই লাভা। পাকা রাস্তার দু’ধারে নান্দনিক কারুকার্য সম্পূর্ণ কটেজ চোখে পড়বে। হরেক রকম ফুলে সাজানো গোছানো কটেজের বারান্দা আর আঙ্গিনা। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার ছোঁয়া লেগে আছে। আর চারদিকে সুনসান নীরবতা ঘিরে আছে। ছোট এই শহরে রুচিশীলতার পরিচয় পাওয়া যাবে পদে পদে।

মেঘে ঢাকা লাভা; ছবি- সাইমুন ইসলাম

শিলিগুড়ি যাওয়ার জন্য সবার আগে লাভা ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে যাই জীপ ঠিক করতে। ততক্ষণে বিকেল হয়ে গেছে। পেটের মধ্যে রাক্ষস ছোটাছুটি করছে। তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব জীপ ঠিক করে দ্রুত পায়ে একটা বাঙালি হোটেলে খেতে ঢুকি।

শেষ বেলায় খাবার পাবো কিনা সেটাও একটা সমস্যা হয়ে দেখা দেয়। দোকানে খোঁজ নিয়ে জানা গেল ডাল, বেগুন ভাজি, ডিম ভাজি ছাড়া আর কিছু নেই। আমাদের জন্য তখন এটাই পর্যাপ্ত ছিল। দ্রুত অর্ডার দিয়ে অপেক্ষা করতে থাকি।

লাভার মনেস্ট্রি; ছবি- সাইমুন ইসলাম

সবাই এত বেশি ক্ষুধার্ত ছিল যে খাবার আসতে দেরি কিন্তু খেতে দেরি নেই কারও। খাওয়া শেষ করে পাশের এক মিষ্টির দোকান থেকে মিষ্টি মুখ করে জীপে উঠে যাই। ক্লান্ত পরিশ্রান্ত শরীর নিয়ে শিলিগুড়ির পথে যাত্রা শুরু করি।

*** ফিচার ইমেজ- বিপু বিধান

( চলবে )

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সোনাগাজীতে বাংলাদেশের প্রথম বায়ুকল: মুহুরি প্রজেক্ট

ভ্রমণের সময় ক্যামেরা ও গিয়ার নির্বাচন সম্পর্কিত টিপস