৩,০০০ টাকায় ভারত ভ্রমণ! (ঢাকা-শিলিগুড়ি-মিরিক-শিলিগুড়ি-ঢাকা)

নান্দনিক মিরিক। ছবিঃ weekendthrill.com

অবাক হচ্ছেন উপরের শিরোনাম দেখে?

হ্যাঁ হবারই কথা, স্বাভাবিকভাবেই। আসলে হয়েছে কি ভ্রমণে কে, কীভাবে, কোন খাতে কত টাকা খরচ করবে সেটা কিন্তু একান্তই তার বা তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার।

এই যে, এখন যে ভ্রমণের গল্পটি সংক্ষেপে বলবো সেই গল্পতেও খরচ ৩,০০০ টাকার পরিবর্তে ৩০,০০০ টাকাও করা সম্ভব! হ্যাঁ, আসলেই সম্ভব। শুধু দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য হলেই, সাথে একটু বেশী আরাম-আয়েশ আর এটা-সেটা করলে তো হবেই, তাই না?

যাই হোক ফালতু কথা না বলে এবার সরাসরি চলে যাই মূল গল্পে, কীভাবে মাত্র ৩,০০০ টাকায় ঘুরে এলাম ভারতের শিলিগুড়ি আর মিরিক? চলুন শুনি।

বেশ কয়েকদিন থেকে কোথাও যাবো যাবো করছিলাম। প্রায় তিন মাস হলো কোথাও যাই না। আর যে কোনো ভ্রমণে আমার প্রথম পছন্দ হলো পাহাড়। সুযোগ পেলেই পাহাড়ে যেতে চাই সব সময়। কিন্তু বান্দরবানের যেসব জায়গায় আগে গিয়েছি সেসব জায়গায় আর যেতে চাই না। আর যেসব জায়গায় যেতে চাই, সেসব জায়গায় যাবার অনুমোদন নেই। তার উপর আজকাল নাকি বান্দরবানে গাইডের অনেক খরচ। আমি ফালতু গাইডের খরচে একদম রাজী নই, তার উপর নেই তেমন অর্থের সংস্থান বা ভ্রমণ সঙ্গী। তাহলে কোথায় যাওয়া যায়?

মিরিক লেক। ছবিঃ static.bengali.news18.com

যেখানে পাহাড় আছে, মেঘ আছে, ঝর্ণা আছে, সবুজের সমুদ্র আছে? আর খরচটাও হবে নিতান্ত কম। অনেক খুঁজে দেখলাম একমাত্র মিরিক গেলেই অনেক অল্প খরচে আমার চাওয়ার সবকিছুই পেতে পারি। আর সময়টাও তেমন একটা লাগবে না, ভ্রমণ সঙ্গী না হলেও চলবে। একা একাই না হয় প্রথমবারের মতো একটা বিদেশ ভ্রমণ দেয়ার অভিজ্ঞতা অর্জন করে নেই! আর ভিসা যেহেতু আছেই বাংলাবান্ধা/ফুলবাড়ি সীমান্ত নিয়ে, তবে আর দেরি কেন? সেই ভাবনা থেকে ছুট দিলাম এক বৃহস্পতিবার রাতে নাবিল পরিবহনে পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা।

এবারের এই ভ্রমণের মূল উদেশ্যই ছিল, কত কম খরচে আর কম সময়ে ভারতের একটা নান্দনিক জায়গা (মিরিক) উপভোগ করে আসা যায়? আর নতুন যে পোর্ট দিয়ে (বাংলাবান্ধা-ফুলবাড়ি) যাবো সেটার সুবিধা-অসুবিধা কী আর কেমন? তাই এই সংক্ষিপ্ত ভ্রমণের একান্ত আয়োজন।

শুরু হলো যাত্রা, ঢাকা থেকে রাত ১০টায় নাবিল পরিবহনে ৬৫০ টাকায় পঞ্চগড় পৌঁছালাম সকাল ৭টায়। পঞ্চগড় থেকে ৫০ টাকা ভাড়া দিয়ে লোকাল বাসে বাংলাবান্ধা সকাল ৯:৩০টায়। মাঝে ৩০-৪০ মিনিট লোকাল বাসের সিস্টেম লস। ৫২০ টাকা ট্র্যাভেল ট্যাক্স দিয়ে। ইমিগ্রেশন এবং কাস্টমস এর বৈতরণী পেরিয়ে ১১টায় ফুলবাড়ি বাস স্ট্যান্ড।

মিরিকের মায়াবী মেঘ। ছবিঃ লেখক

উল্লেখ্য দুই পারের দুই সীমান্তে কিছু টাকার সিস্টেম লস হয়েছে, সেটা চাইলেই এড়ানো যেত, কিন্তু যেহেতু প্রথমবার একা একা অন্য কোনো দেশে ভ্রমণ করতে যাচ্ছি, আবার একা একাই ফিরতে হবে এই পোর্ট দিয়ে এবং আর তেমন কোনো যাত্রী ছিল না, তাই কোনো রকম ঝামেলায় না গিয়ে অল্প কিছু টাকার বিনিময়ে নির্ঝঞ্ঝাট থাকতে চেয়েছি। তাই সেই অযৌক্তিক খরচকে ভ্রমণের অন্তর্ভুক্ত করা হলো না। কারণ এই খরচ, ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন হয়ে থাকে।

এরপর ফুলবাড়ি থেকে লোকাল বাসে ১০ রুপী দিয়ে শিলিগুড়ি, সেখান থেকে শেয়ার জীপে করে ১০০ রুপীতে পাহাড়ি আঁকাবাঁকা, মেঘে ঢাকা, চা বাগানের নান্দনিকতায় ঘেরা, গভীর অরণ্য ভেদ করে ছুটে চলা মিরিক ১২:৩০টায়।

পরের চার ঘণ্টা, মানে ৪:৩০ পর্যন্ত মিরিকের লেক, নান্দনিক সুইস কটেজ, সবচেয়ে উঁচু চূড়া, হেলিপ্যাড, মেঘ-কুয়াশা-নীল আকাশ, একটু দূরেই পাহাড়ে পাহাড়ে নেপালি গ্রাম, কারশিয়াং দার্জিলিংয়ের পাহাড়, আকাশ পরিস্কার আর মেঘ মুক্ত থাকলে, সাথে যদি থাকে ভাগ্যের পরশ তো দূরে দাঁড়িয়ে থাকা বরফে মোড়া রঙিন কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখা পাওয়া… সারাদিনের অল্প ভ্রমণে আর কী চাই?

অভূতপূর্ব মিরিক। ছবিঃ adarbepari.com

এরপর বিকেল ৪:৩০ এর শেষ শেয়ার জীপের ছাদে উঠে (নিচে সিট না পাওয়ায়) ৭০ রুপীতে শিলিগুড়ি। শিলিগুড়ি ফিরে ৪০০ রুপীতে একটি রুম নিলাম (যথেষ্ট ভালো) ফ্রি ওয়াই-ফাই সহ। ব্যাগ রেখে ফ্রেশ হয়ে, ব্যক্তিগত কাজে বেরিয়ে পড়লাম। কাজকর্ম সেরে, ১২০ রুপীতে আচ্ছামতো মাটন বিরিয়ানি খেয়ে, আর সেহেরীর জন্য ১০ রুপীর জিলাপি নিয়ে রুমে ফিরে, নেটে বুদ হয়ে যাওয়া।

ক্লান্তির কাছে পরাজিত হয়ে, ঘুমের কাছে নিজেকে বিসর্জন দিয়ে দেয়া। সকালের ঝুম বৃষ্টিতে একবার ঘুমে হারিয়ে, নেটে ডুবে থেকে বেলা ১২:৩০টায় রুম ছেড়ে, ব্যাগ হোটেলের রিসেপসনে রেখে বেরিয়ে পড়া। বিকেল তিনটা পর্যন্ত ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে হোটেলে ফিরে একটু ফ্রেশ হয়ে, কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে, হোটেলের সাথে লাগোয়া রাস্তা থেকেই ফুলবাড়ির অটোতে ওঠা! ভাড়া সেই ১০ রুপী আর সময় ১৫-২০ মিনিট!

আবারও ইমিগ্রেশন এন্ড কাস্টমস এর আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ৪টায় বাংলাবান্ধা। লোকাল বাস বা ভাগ্যক্রমে পেয়ে যাওয়া মাইক্রোতে করে ৬০ টাকায় পঞ্চগড়! আর ফেরার সময় ৬০০ টাকায় ঢাকায় (অবশ্য ফেরার সময় ইফতারি আর রাতের খাবার এক ভ্রমণপ্রিয় বন্ধুর বাড়িতে আন্তরিক আতিথেয়তায় হয়ে গিয়েছিল)। এই খরচটা নিজে করলেই খরচটা ৩,০০০ এ গিয়ে ঠেকবে।

আর ঢাকায় ফিরে সকল বন্ধু ও সহকর্মীকে মাত্র ৩,০০০ টাকায় ভারত ঘুরে আসার অবিশ্বাস্য কীর্তির অহমিকা দেখানো!

এই হলো আমার সম্প্রতি মাত্র ৩,০০০ টাকায় ভারত (ঢাকা-শিলিগুড়ি-মিরিক-শিলিগুড়ি-ঢাকা) ঘুরে আসার সংক্ষিপ্ত গল্প।

মিরিক। ছবিঃ encrypted-tbn0.gstatic.com

সবার ভ্রমণ সুন্দর, সুখময়, স্বল্প খরচের আর উপভোগ্য হোক।

তবে এই ভ্রমণটা ছিল রমজানের মধ্যে, যে কারণে আমার একচুয়াল খরচ হয়েছিল ২,৫০০ টাকা। যেহেতু সকাল আর দুপুরের খাবার খেতে হয়নি। সুতরাং নরমাল সময়ে গেলে আর সব বেলার খাবার খেলেও জনপ্রতি এই খরচ ৩,৫০০-৪,০০০ এর মধ্যেই রাখা যাবে নিশ্চিন্তে। 

Loading...

One Comment

Leave a Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আমাদের ঈদ? সে এক অন্য রকম অভিজ্ঞতা

এক নজরে একটি জেলা: পাবনার প্রকৃতি ও প্রকৃত মানুষের জন্মস্থান