প্রাসাদের সাম্রাজ্য ইস্তানবুলের দর্শনীয় যত স্থান

ইউরোপ আর এশিয়ার মাঝে অবস্থিত বহু বছরের প্রাচীন মহানগরী ইস্তানবুল বিশ্বের সেরা কিছু মহানগরীর মধ্যে অন্যতম। খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ অব্দে স্থাপিত বাইজেন্টিয়াম কলোনি কনস্টানটিনোপোলের বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের মূল কেন্দ্রভূমি রূপে আত্মপ্রকাশ করে। অটোমান জয়ের পর দারুণ অাভিজাত্যের প্রতীক এই কলোনিকে সাম্রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দু বানিয়ে দেয়া হয়। টার্কিশ রিপাবলিক গঠিত হওয়ার পর এই কেন্দ্রবিন্দু শহরটির নামকরণ করা হয় ইস্তানবুল। সেই প্রথম থেকেই ঐতিহ্য আর আভিজাত্য ধরে রাখা এই নগরীর প্রতিটি গলিতে পাওয়া যাবে একই সাথে প্রাচীনত্ব আর আধুনিকতার স্বাদ। ইস্তানবুলে আছে এমন কিছু ভাস্কর্য আর স্থাপত্য যা একজন ভাস্কর্যবিমুখী পর্যটককেও বাধ্য করবে সময় নিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে। আমাদের আজকের আয়োজন ইস্তানবুলের তেমনি কিছু স্থান নিয়ে যা আপনার ইস্তানবুল ভ্রমণকে করবে সহজ এবং সাবলীল।

আয়া সোফিয়া

৫৩৬ অব্দের কাহিনী। বাইজেন্টাইন সম্রাট জাস্টিনিয়ানের নেতৃত্বে একটি গির্জা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। গির্জার নাম আয়া সোফিয়া। আয়া সোফিয়া যখন বানানো শেষ হলো, প্রথমবার সম্রাট জাস্টিনিয়ান ভেতরে ঢুকে কেঁদে দিয়েছিলেন আর চিৎকার করে বলেছিলেন, “ঈশ্বরের জয়জয়কার! কারণ এমন একটা স্থাপনার দায়িত্বে তিনি আমাকে বেছে নিয়েছিলেন। ও ঈশ্বর! আমি আপনার কাজ শেষ করেছি”।

আয়া সোফিয়া, ছবিঃ i.pinimg.com

বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের আভিজাত্য এবং শক্তি বিষয়ক বিশ্বকে দেয়া উদ্ধত বিবৃতি ছিল আয়া সোফিয়া। পরবর্তীতে অটোমানের সৈন্যরা বাইজেন্টাইন জয়ের পর আয়া সোফিয়াকে রূপান্তরিত করে মসজিদে। তখনকার দিনে বিশ্বের অফিশিয়াল কেন্দ্র ধরা হতো আয়া সোফিয়াকে। বিংশ শতাব্দির দিকে এটি পরিণত হয় জাদুঘরে। বিশাল পরিবর্তনের পরেও অক্ষত রয়ে গেছে আয়া সোফিয়া আর তার নিত্য সৌন্দর্য।

টপকাপি প্রাসাদ

পঞ্চদশ শতাব্দির দিকে অটোমান সম্রাট “মেহমেত দ্য কনকোয়েরার” প্রথম নির্মাণ করে টপকাপি প্রাসাদ যা উনবিংশ শতাব্দি পর্যন্ত অটোমান সাম্রাজ্যের রাজ্য পরিচালনার মূল প্রাসাদ হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

টপকাপি প্রাসাদ, ছবিঃ wtg-global.net

বিশাল এই প্রাসাদের পুরোটাই জুড়ে আছে ইসলামিক চিত্রকর্ম, টাইলসের উপর হাতে আঁকা নানা রঙের মিশ্রণ, নিজেদের মধ্যে সংযুক্ত প্রতিটি সাজানো ঘর আর ঘরের বাইরে রণসজ্জিত দেয়াল আর পিলার। এখানকার বিভিন্ন আকর্ষণের মধ্যে রয়েছে হারেম (যেখানে সম্রাটের উপস্ত্রী আর বাচ্চারা সময় কাটাতেন), সেকেন্ড কোর্ট যেখান থেকে হেঁটে চলে যাওয়া যায় প্রাসাদের বিশাল রান্নাঘরে। আরো আছে ইমপেরিয়াল কাউন্সিল চেম্বারের অন্দরমহলের কারুকার্য, তৃতীয় কোর্ট যেখানে আছে সুলতানের ব্যক্তিগত কয়েকটি রুম।

নীল মসজিদ (ব্লু মস্ক)

সুলতান আহমেতের ইস্তানবুলকে দেয়া এক বিশেষ উপহার হলো ব্লু মস্ক বা নীল মসজিদ। ১৬০৯ থেকে ১৬১৬ পর্যন্ত স্থাপিত ইস্তানবুলের এই ব্লু মস্ক ইসলামিক বিশ্বে ব্যাপক উন্মাদনা সৃষ্টি করে। উন্মাদনা সৃষ্টির কারণ ছিল এর স্থাপত্যশৈলী।

ব্লু মস্ক, ছবিঃ lucidpractice.com

মক্কার বিশিষ্ট মসজিদের মতো নীল মসজিদেরও ছয়টি মিনার ছিল। পরে অবশ্য মক্কার মসজিদ সাতটি মিনারের সমন্বয়ে আত্মপ্রকাশ করে। নীল মসজিদ নামটি এমনি এমনি আসেনি, পুরো মসজিদ জুড়ে আছে দশ হাজারেরও বেশি নীল ইজনিক টাইলস। অন্দরমহল আর বাইরের কারুকার্য মিলিয়ে অটোমান স্থাপত্যশিল্পে নীল মসজিদ একটি দারুণ সৃষ্টি। আয়া সোফিয়া আর নীল মসজিদের মাঝে পার্থক্য সৃষ্টিকারী একটি বিশাল বাগান রয়েছে। বিকেলের দিকে এখানে আসলে সূর্যাস্তের সাথে আজানের ধ্বনি তৈরী করে অপার্থিবতা।

ব্যাসিলিকা সিস্টার্ণ

ইস্তানবুলের আশ্চর্য কিছু পর্যটন স্থানগুলোর মধ্যে ব্যাসিলিকা সিস্টার্ণ অন্যতম। এটি মাটির নিচে বড় একটি হলরুমের মতো প্রাসাদ বিশেষ। পাতালে মোট ১২টি সারিতে গুণে গুণে ৩৩৬টি কলামের উপর দাঁড়িয়ে আছে ব্যাসিলিকা সিস্টার্ণ।

ব্যাসিলিকা সিস্টার্ণ, ছবিঃ i.ytimg.com

বাইজেন্টাইন আমলে ইমপেরিয়াল পানি সরবরাহের কাজে ব্যবহৃত হতো জায়গাটি। কনস্ট্যানটাইন দ্য গ্রেট এই জায়গার স্থাপনার কাজ শুরু করলেও ষষ্ঠ শতাব্দিতে শেষ করেন সম্রাট জাস্টিনিয়ান। এখানকার মূল আকর্ষণ হলো এই ৩৩৬টি কলাম। উত্তর-পশ্চিম কোণার কলামগুলো সবচেয়ে সুন্দর, তাদের তলা মেডুসা পাথরে বানানো। ঘুরে বেড়ানোর জন্য খুব সুন্দর পরিবেশ তৈরী করা আছে এখানে যেখানে প্রতিটি কলামের প্রতিচ্ছবি চারদিকের পানিতে পড়ে আর আলোকসজ্জায় অপার্থিবতা কাজ করে।

হিপ্পোড্রোম

ইস্তানবুলের প্রাচীনতম স্থাপনাগুলোর একটি হলো হিপ্পোড্রোম। ২০৩ অব্দে সেপ্টিমিয়াস সেভেরাস এই স্থাপনার কাজ শুরু করেন এবং ৩৩০ অব্দে কনস্টেনটাইন দ্য গ্রেট এর কাজ শেষ করেন। বাইজেন্টাইন সর্বসাধারণের মিলনায়তন ছিল এই হিপ্পোড্রোম। দারুণ সব খেলা, ঘোড়দৌড় আর দুর্দান্ত সব লড়াইয়ের ভেন্যু ছিল হিপ্পোড্রোম।

হিপ্পোড্রোম, tours4arabs.comছবিঃ

হাজার বছর পুরনো হিপ্পোড্রোম বহু ইতিহাসের সাক্ষী। এখন আর আগের হিপ্পোড্রোম নেই, তবে এর দক্ষিণভাগে গ্যালারি ওয়ালে আছে দেখার মতো কিছু ভাস্কর্য। উত্তর-পশ্চিম দিকে একটি ফোয়ারা আছে যেটি জার্মান সম্রাট দ্বিতীয় উইলিয়াম ১৮৯৮ সালে অটোমানের সম্রাটকে উপহার দিয়েছিলেন। দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে আছে বিখ্যাত তিনটি ভাস্কর্য, ২০ মিটার লম্বা ইজিপ্টিয়ান অবিলিস্ক, সারপেন্ট কলাম আর স্টোন অবিলিস্ক যেটা স্বর্ণ আর ব্রোঞ্জে মোড়ানো ছিল ক্রুসেডের সৈন্যরা চুরি করে নিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত।

গ্র্যান্ড বাজার

ইস্তানবুলের মসজিদ আর ভাস্কর্য ঘুরতে আসা প্রতিটি পর্যটকই যেখানটায় তাদের যাবতীয় কেনাকাটা করতে আসে সেটা হলো গ্র্যান্ড বাজার। শুধু কেনাকাটার জন্যই নয় বরং ঘুরতেও আসে পর্যটকরা। কেন এই বাজার এত বিখ্যাত? কারণ এটা হচ্ছে পৃথিবীর সর্বপ্রথম শপিং মল, যা শহরের চারভাগের একভাগ জুড়ে আছে।

গ্র্যান্ড বাজার, ছবিঃ lonelyplanet.com

নূরে ওসমানিয়েত মসজিদ আর বায়েজিদ মসজিদের মাঝখানে অবস্থিত মোটা দেয়ালে ঘেরা বিশাল এই বাজারের রয়েছে ১১টি প্রবেশপথ। অনেকটা গোলকধাঁধার আকারে গঠিত এই বাজারের প্রতিটি দোকানে আপনার জন্য অপেক্ষা করছে তুর্কিশ ছোট ছোট এন্টিক জিনিস, হাতের তৈরী শিল্প যা আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না। পর্যটকদের কেনাকাটায় যাতে সুবিধে হয় তাই প্রতিটি অংশ সাজানো হয়েছে জিনিসপত্রের ক্যাটাগরি অনুযায়ী।

সুলেমানিয়ে মসজিদ

পাহাড়ের উঁচুতে অবস্থিত সুলতান আহমেত জেলার সুলেমানিয়ে মসজিদ ইস্তানবুলের বহুল পরিচিত ল্যান্ডমার্কগুলোর মধ্যে একটি। ১৫৪৯ থেকে ১৫৭৫ সালে বানানো এই মসজিদের নকশা করেছিলেন বিখ্যাত অটোমান নকশাবীদ সিনান।

সুলেমানিয়ে মসজিদ, ছবিঃ www.worldfortravel.com

এর অন্দরমহলের সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন দিক হচ্ছে এর ৫৩ মিটার উঁচু গম্বুজ আর গম্বুজের নকশার একাত্মতা। মসজিদের বাইরে রয়েছে প্রশান্ত আর প্রশস্ত একটি বাগান যেখানে একটি অটোমান সিমেট্রিও রয়েছে। এই অটোমান সিমেট্রিতে আছে সুলতাম সুলেয়মান আর তাঁর স্ত্রী হাসেকি হারেম সুলতানের সমাধি।
ফিচার ইমেজ– europe.stripes.com

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

নওগাঁর অন্যতম আকর্ষণ আলতাদীঘি জাতীয় উদ্যান

হাজারি গুড়ের খোঁজে মানিকগঞ্জের ঝিটকায়