রূপসী বাংলার খোঁজে প্রকৃতির কোলে

বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ
খুঁজিতে যাই না আর-

জীবনানন্দ দাশ বাংলার রূপ দেখেছিলেন। কিন্তু আপনি আমি যারা শহুরে মানুষ তাদের অতটা সময় কই? তথাকথিত আধুনিক আমাদের সাথে গ্রামীণ বাংলার পরিচয় সামান্যই। যান্ত্রিক সভ্যতায় আমরা ক্রমশ ডুবে যাচ্ছি। ভুলে যাচ্ছি সোঁদা মাটির গন্ধ, কমলি লতার ঘ্রাণ, কলকা সুন্দা, হিজল আর ভাঁটফুলের সৌন্দর্য থেকে বঞ্চিত আমাদের চোখ। আমরা হয়ে উঠেছি ক্রমশ যান্ত্রিক মানুষ! হারিয়ে যাচ্ছে শেকড়ের সাথে আমাদের সম্পর্ক। যেটুকু আছে, তা দিন দিন আরো হালকা হচ্ছে। অবস্থাদৃষ্টে এমন দাঁড়িয়েছে যে, শহুরে কিন্ডারগার্টেনে পড়া অনেকেই সন্দিহান, ধান গাছের তক্তায় পালঙ্ক ভালো হয় নাকি আলমারি?

গ্রামের খাল। সোর্সঃ অমিতাভ অরণ্য

কিন্তু সে সব কথা থাক, আমরা বরং আসল কথায় আসি। যে জন্য এতো কথার অবতারণা, সেটা এতক্ষণে হয়তো নিয়মিত পাঠকেরা বুঝে ফেলেছেন। আজ আমরা ঘুরতে যাবো সেই ফেলে আসা, হারিয়ে ফেলা রূপসী বাঙলার বুকে। আমাদের লক্ষ্য যে গ্রাম তার নাম মির্জাপুর- নড়াইল জেলার একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম। গ্রামের মধ্যদিয়ে চলে গেছে পাকা পিচ ঢালা রাস্তা। আমরা যাচ্ছি গ্রামের পূর্বদিকে, ওদিকে খাল-বিল আর ধানক্ষেত। রাস্তার দুপাশেই বিস্তৃত সেই বিল। আগে রাস্তার দুপাশে বাড়িঘর কিছুই ছিল না। সমস্তটুকুই ছিল বিরান এলাকা। কিন্তু ক্রমাগত জনসংখ্যা বৃদ্ধির চাপে গ্রামের ভেতর থেকে অনেক পরিবার রাস্তার এখানে এসে ঘর বেঁধেছে। ফলে সেই নিরবচ্ছিন্নতা এখন ঢাকা পড়েছে কয়েকটি বাচ্চা ছেলেমেয়ের কিচিমিচি শব্দে।

শীতের শেষ হয়েছে বেশ কিছুদিন- বর্ষা চলে এসেছে প্রায়। শীতের শুরুতেই বিলের চেহারা পাল্টে যায়। জুন-জুলাই থেকে শীতের আগ পর্যন্ত বিলের চেহারা অন্য রকম থাকে, জল থইথই দিগন্তে ভাসতে থাকে অগণিত শাপলা ফুল আর ঘাসবন। তার ফাঁকে ফাঁকে জলের নীচে খেলা করে রূপালি মাছেরা আর জলের উপরে অসংখ্য পানকৌড়ি আর শামুক-খোলা পাখি। তারপর যেই শীতের আমেজে ঢেকে যায় চারিধার, তখন বিলের জলও আস্তে আস্তে কমে আসে। কৃষকেরা মাথায় গামছা বেঁধে আর কোমরে লুঙ্গিটাকে মালকোঁচা মেরে হাতে কাচি নিয়ে নেমে পড়ে হাঁটুজলে। ঘাসের জঙ্গল আর শাপলার দঙ্গল পরিষ্কার করে বের করে আনে তাদের জীবিকার সহায়- জমিকে।

সমস্ত বিল থেকে কয়েকদিনের জন্য উধাও হয়ে যায় সবটুকু সবুজ। শুধু বাকি থাকে বিলের মধ্যে থাকা গভীর পুকুর আর সরু খালগুলো। এই পুকুরগুলোকে আঞ্চলিক ভাষায় ‘আপা’ বলা হয়। বিলের জল যখন কমে যায়, তখন মাছগুলো হুড়মুড় করে ঢোকে সেই ‘আপা’গুলোতে। শীতের শেষে এগুলো ছেঁচে মাছ ধরা হয়। সে যাই হোক, বিলের রুক্ষ রূপ বেশিদিন থাকে না। কয়েকদিনের মধ্যেই সেগুলো তৈরি হয়ে যায় ধানের শিশু গাছগুলোকে রোপণ করার জন্য। তারপর সমস্ত বিল হয়ে ওঠে একচ্ছত্র সবুজে। এক অদ্ভুত ঘ্রাণে ম ম করে সমস্ত বিল।

ধানক্ষেত; সোর্সঃ অমিতাভ অরণ্য

তারপর সেগুলো থেকে বেরোয় ধানের শিষ- তার আগায় দুলতে থাকে কৃষকের স্বপ্ন। এখন সেই সময়। চারপাশে হাত দুয়েক লম্বা ধানক্ষেত। আমরা পাকা রাস্তা থেকে ছোট একটি রাস্তায় নেমে এলাম। খালের পাশ দিয়ে রাস্তাটি ঢুকে গেছে বিলের ভেতর দিকে। সেদিকে যেতেই চোখে পড়লো একটি দুটি বাচ্চা ছেলেমেয়ে গামছা দিয়ে খালের অল্প জলে মাছ ধরছে। চেহারায় বলে দিচ্ছে এরা দুই ভাইবোনই হবে। আমি একটু এগিয়ে গেলাম তাদের দিকে।

ছোট একটি ‘খালুই’ ঝুলছে ছোট ছেলেটির কোমর থেকে। আমি জিজ্ঞাস করলাম, কী মাছ পেয়েছিস রে? আমার দিকে খালুইটি তুলে ধরল। ছোট ছোট মাছে প্রায় ভর্তি হয়ে গেছে। হরেক রকম মাছ- পুঁটি, চান্দা, চুঁচড়ো, জিয়া, মলা, টাকি, চিংড়ি। খালের পাড়ে অনেকগুলো বাড়ি, সম্প্রতি তৈরি হয়েছে। সেই বাড়ির মেয়েরা বাসনকোসন নিয়ে খাল পাড়ে বসে পরিষ্কার করছে। ছোট খালটিই তাদের দৈনন্দিন প্রয়োজন মিটিয়ে চলেছে। এ যেন কবিগুরুর সেই কবিতা আমার সামনে মূর্তিমান হয়ে উঠেছে।

আমাদের ছোটো নদী চলে বাঁকে বাঁকে
বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে।
………………………………
কিচিমিচি করে সেথা শালিকের ঝাঁক,
রাতে ওঠে থেকে থেকে শেয়ালের হাঁক।
……………………………………
তীরে তীরে ছেলে মেয়ে নাহিবার কালে
গামছায় জল ভরে গায়ে তারা ঢালে।
সকালে বিকালে কভু নাওয়া হলে পরে
আঁচলে ছাঁকিয়া তারা ছোট মাছ ধরে।
বালি দিয়ে মাজে থালা, ঘটিগুলি মাজে,
বধূরা কাপড় কেঁচে যায় গৃহ কাজে।

ঘাস নিয়ে বাড়ি ফিরছে গৃহস্ত; সোর্সঃ অমিতাভ অরণ্য

আমি আরো ভেতরে এগোলাম। এদিকে আর বাড়িঘর নেই। এমনকি রাস্তাও শেষ হয়ে এসেছে। এদিকে শুধু ফসলের ক্ষেত। চাষিরা যে পথে এগিয়ে গিয়েছে সে পথে ঘাস লতাপাতার মধ্যে দিয়ে সরু পথ হয়ে গেছে। এ পথ ক্ষণস্থায়ী। বর্ষার জল আসতেই মিলিয়ে যাবে। আমি সেই পথেই হেঁটে চলেছি। বিকেল হয়ে এসেছে।

সূর্যের তেজ নেই- বরং একটি স্নিগ্ধ আলো আলগোছে ছড়িয়ে আছে চরাচরে। সবুজ রঙয়ের উপর যেন একটি হলদে ছোপ পড়েছে। খালের পাড়ে কলমির দল মৃদু বাতাসে দুলছে। মাঝে মাঝে সেই ঝোপের মধ্যে দু একটি বেগুনী ফুল স্নিগ্ধ সৌরভ বিলাচ্ছে। ছোট নৌকায় মাছ ধরার ফাঁদ নিয়ে তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছেন এক লোক। সারারাত ধরে ওগুলো বিলের জলে অপেক্ষা করবে কোনো অসচেতন মাছ তার মধ্যে ঢুকে পড়বে এই সময়ের জন্য।

মাছ ধরার লক্ষ্যে- সোর্সঃ অমিতাভ অরণ্য

একজন বৃদ্ধকে চোখে পড়লো উলটো দিক থেকে আসতে। একপাল ছাগলকে দিনের শেষে বাড়ির দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তিনি। এহেন নির্জন বিলে আমাকে দেখে বোধহয় কিছুটা আশ্চর্যই হলেন। একটি যুবক ছেলে একা একা এই বিলে কী করতে পারে তার মাথায় ঢোকেনি সম্ভবত! আমার দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকাতে তাকাতে পাশ কাটিয়ে গেলেন।

আমি হাসলাম মনে মনে। গেয়ো যোগী যেমন ভিখ পায় না, তেমনি এই গ্রামীণ সৌন্দর্য যারা ছোট থেকেই এখানে মানুষ হয়েছে তাদের দৃষ্টিগোচর হয় না। আমি খাল পাড়ের ঘাসের উপর বসলাম। সন্ধ্যা নেমে আসছে। সমস্ত পাখিরা ফিরে আসছে নিজের ঠিকানায়। তাদের পানে তাকিয়ে মনে মনে বললাম, শহর নয়, এই গ্রামই আমার একান্ত পরম ঠিকানা।

এই গ্রামই আমাদের ঠিকানা; সোর্সঃ দিপক বিশ্বাস

কীভাবে যাবেন:

মির্জাপুর গ্রামটি নড়াইল জেলার সদর থানায় অবস্থিত। নড়াইল জেলার মুচি পোল ভাড়ায় মোটরসাইকেল পাওয়া যায়। ভাড়া নেবে ১০০ টাকার মতো। নড়াইল শহরে থাকার মতো অল্প কিছু হোটেল আছে। আর সমস্ত নড়াইল জুড়ে রয়েছে ঘুরে দেখার মতো অসংখ্য জায়গা।

Feature Image: Amitav Aronno

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সুখের শহর শিমলা…

ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত সৈনিকদের স্মৃতি রক্ষার্থে নির্মিত যুদ্ধ সমাধি