ইদ্রাকপুর দুর্গ: ত্রিভুজ জলদুর্গের তৃতীয় স্থাপনা

শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিম তীরে নারায়ণগঞ্জ জেলার বন্দরে অবস্থিত একটি মোঘল জলদুর্গ ইদ্রাকপুর। নদীপথে ঢাকার সাথে সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ নদীপথগুলোর নিরাপত্তা বিধানের জন্য মোঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে সেনাপতি ও বাংলার সুবেদার মীর জুমলা “ট্রায়াঙ্গল ওয়াটার ফোর্ট” বা “ত্রিভুজ জলদুর্গ” নির্মাণ করেছিলেন। ১৬৫০ সালের কিছু আগে-পরে নির্মিত হয়েছিল এই সব দুর্গ। এই তিনটি জলদুর্গের সবচেয়ে বড়টি হচ্ছে মুন্সীগঞ্জের ইদ্রাকপুর কেল্লা। অপর দুটি হচ্ছে নারায়ণগঞ্জের সোনাকান্দা ও হাজীগঞ্জ জলদুর্গ।

source: মাদিহা মৌ

মুন্সীগঞ্জ জেলা সদরে ইদ্রাকপুর কেল্লা অবস্থিত। আগের দিন মুন্সীগঞ্জের অন্যান্য উপজেলায় ঘুরলেও সদরে যাওয়া হয়নি। শুনেছি মুন্সীগঞ্জ সদরে নদীপথে লঞ্চেই যাওয়া যায়। চাঁদপুরের লঞ্চগুলো যে মুন্সীগঞ্জ এলে একটু ধীরগতিতে চালায়, সে আগেই খেয়াল করেছিলাম। তাই ঠিক করলাম লঞ্চেই মুন্সীগঞ্জ যাবো।

কী উপলক্ষে যেন টানা তিনদিন ছুটি পড়ে গিয়েছে। তাই লঞ্চগুলোতে উপচে পড়া ভিড়। তারই মধ্যে কষ্টেসৃষ্টে একটা ঘণ্টা লঞ্চের ডেকে দাঁড়িয়ে মুন্সীগঞ্জ পৌঁছালাম। আর একটু হলেই লঞ্চ আমাদের চাঁদপুর নিয়ে যাচ্ছিলো, সময়মতো মুন্সীগঞ্জ নামার জায়গাটা খুঁজে পাইনি বলে। শেষ মুহূর্তে রক্ষা পেলাম। ছোট একটা ঘাট। নেমে এক কাপ চা খেয়ে রিকশা ঠিক করলাম ইদ্রাকপুর দুর্গে যাওয়ার জন্য। কিন্তু আমাদের কপালে সেদিন সত্যিই শনির দশা লেগেছে।

source: মাদিহা মৌ

স্থাপনাটি থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে ইদ্রাকপুর নামে একটি এলাকাও রয়েছে। আমরা তো আর সেটা জানি না। রিকশাচালকও ইদ্রাকপুর দুর্গ না বুঝে শুধু ইদ্রাকপুর বুঝেই আমাদের রিকশায় তুলেছে। মিনিট দশেকের মধ্যেই ইদ্রাকপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের কাছে এনে রিকশা থামিয়ে ফেললো। আমরা বললাম, ‘আমরা তো ইদ্রাকপুর দুর্গে যাবো।’

উনি কিছু না বলেই সামনে এগোতে শুরু করলেন। কিছুক্ষণ পর মনে হলো, লোকটা ইদ্রাকপুর দুর্গ চিনতে পারছে না। আন্দাজেই রিকশা চালাচ্ছে। বললাম, ‘চাচা আপনি না চিনতে পারলে কাউকে জিজ্ঞেস করে নিন।’

source: মাদিহা মৌ

একজন পথচারীকে জিজ্ঞেস করায় তিনি বলে দিলেন কীভাবে যেতে হবে। আরো আধা কিলোমিটার সামনে গিয়ে পাওয়া গেলো কাঙ্ক্ষিত দুর্গ। এখানে বলে রাখা ভালো যে মুন্সীগঞ্জ এসে ইদ্রাকপুর দুর্গে যেতে হলে বলতে হবে, ‘কেল্লায় যাবো।‘ ইদ্রাকপুর বললেও ঝামেলায় পড়বেন, ইদ্রাকপুর দুর্গ বললেও। দুর্গ বললে সাধারণ মানুষ বোঝে না।

মগ জলদস্যু ও পর্তুগীজদের আক্রমণ হতে ঢাকাকে রক্ষা করার জন্য এই দূর্গটি নির্মিত হয়েছিলো। উচ্চ প্রাচীর বেষ্টিত এই গোলাকার দূর্গটি এলাকায় এস.ডি.ও কুঠি নামেও পরিচিত। সেই সময়কালে দুর্গের শীত-তাপ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সারিবদ্ধভাবে হাড়ি রেখে কেল্লার উপরের অংশে কুঠিরের মেঝে তৈরি করা হয়েছিল। এর পাদদেশে ভূগর্ভস্থ একটি কুঠুরি আছে। আছে কুঠুরিতে নামার সিঁড়ি। সিঁড়িটি নাকি একটি গোপন সুড়ঙ্গপথের অংশ, যার মধ্য দিয়ে দুর্গে অবস্থানকারীরা কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে নিরাপদ আশ্রয়স্থলে সরে যেতে পারতো।

খোলা চোখে সিঁড়িটি ছিল ভূগর্ভস্থ একটি গোপন কক্ষে নামার পথ। আর কক্ষটি ছিল অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ রাখার গুদামঘর। দুর্গের উঁচু প্রাচীরের প্রত্যেক কোণায় একটি বৃত্তাকার বেষ্টনী আছে। দুর্গের ভেতর থেকে শত্রুর প্রতি গোলা নিক্ষেপের জন্য প্রাচীরের মধ্যে অসংখ্য চারকোণা ফোঁকর রয়েছে।

source: মাদিহা মৌ

দুর্গের প্রবেশদ্বার একটিই। দরজাটির উত্তর দিকে অবস্থিত। মূল প্রাচীরের পূর্ব দেয়ালের মাঝামাঝি অংশে ৩৩ মিটার ব্যাসের একটি গোলাকার উঁচু মঞ্চ রয়েছে। দূর থেকে শত্রুর চলাচল পর্যবেক্ষণের জন্য প্রায় প্রতি দুর্গে এই ব্যবস্থা ছিল। দুর্গের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সুদৃঢ় করার জন্য এই মঞ্চকে ঘিরে আরো একটি অতিরিক্ত প্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছিলো, যা মূল দেয়ালের সাথে মিলিত হয়েছে।

জলদুর্গ বলার কারণ, কেল্লাটির কাছাকাছিই রয়েছে ইছামতী, ধলেশ্বরী, মেঘনা, শীতলক্ষা- এই চারটি নদী। মূলত নির্মাণকালে এটি একদম ইছামতী নদীর তীরেই ছিল। সাড়ে তিনশ বছরে সেই ইছামতীর গতিপথ পাল্টে গেছে।

source: মাদিহা মৌ

১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহের সময় মোঘলদের পতন হলে ইদ্রাকপুর দুর্গটি ইংরেজদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। পরবর্তী সময়ে এ দুর্গকে ঘিরেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে মুন্সীগঞ্জের বসতি। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সম্প্রতি ইদ্রাকপুর কেল্লা সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। দুর্গের ভেতরে জাদুঘর ও সংস্কৃতি কেন্দ্র স্থাপন করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

source: মাদিহা মৌ

আগেই বলেছিলাম না, আজ আমাদের শনির দশা চলছে? সত্যিই তাই। বেলা দুইটায় গিয়ে দেখি কেল্লার প্রবেশদ্বার বন্ধ। রীতিমতো হতাশা জেঁকে ধরেছে আমাদের। গেট বন্ধ পেয়ে আমরা বাইরেটাই ঘুরে ফিরে দেখে এসেছি। পরে জানতে পেরেছি, সাধারণত সব সময়ই খোলা থা‌কলেও, দুপুরের দিকে গার্ড তালা মে‌রে দুপুরের খাবার খেতে যায় । কখনো দুই তিন ঘণ্টা পর আসে, আবার কখনো কখনো আ‌সেও না। তাই ইদ্রাকপুর কেল্লাটি দেখতে হলে সকালে যেতে হবে।

source: মাদিহা মৌ

কীভাবে যাবেন

মুন্সীগঞ্জ সদরে পুরাতন কোর্ট অফিসের কাছেই দুর্গটির অবস্থান। ঢাকার গুলিস্তান থেকে “ঢাকা ট্রান্সপোর্ট” বা “দিঘীরপাড় ট্রান্সপোর্ট” এর মাধ্যমে মুন্সীগঞ্জ সদরের মুক্তারপুর আসা যায়। মুক্তারপুর থেকে অটো রিক্সায় প্রতিজনে ১০ টাকা লাগে। রিক্সায় আসতে চাইলে ২০-২৫ টাকায় ইদ্রাকপুরের কেল্লায় যাওয়া যায়।

ঢাকা থেকে মুন্সীগঞ্জ সদরে নদীপথেও যাওয়া যায়। চাঁদপুরগামী সব লঞ্চই মুন্সীগঞ্জ যাত্রী নামিয়ে যায়। ভাড়া পড়বে ৫০ টাকা। সময় লাগে এক ঘণ্টা থেকে সোয়া এক ঘণ্টা। ঘাট থেকে অটো রিক্সায় প্রতিজনে ১০ টাকা লাগে। রিক্সায় আসতে চাইলে ২০-২৫ টাকায় ইদ্রাকপুর কেল্লায় যাওয়া যায়।

Feature Image – মাদিহা মৌ

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

গোমুখ অভিযান: নন্দাদেবী এক্সপ্রেস, যে ট্রেনে সবাই ট্রেকার!

'পৃথিবীর ছাদ' তিব্বত