এবার ঘরে ফিরে সংসারি হয়ে যাবো!

ভুজবাসার মোটা তাবুর মুখে বিছানায় শুয়ে শুয়ে রোদের আদর গায়ে মাখতে মাখতে একটু পরে ১৪ কিলোমিটার দুর্ধর্ষ পাহাড়ি পথে ট্রেক করতে হবে, সেই কষ্টের কথা ভেবে আর পাথুরে পথে চলতে চলতে দারুণ কষ্টে নিজের সাথে নিজে এই প্রতিজ্ঞা করছিলাম মনে মনে। কারণ আমি মোটেই সংসারী নই। সবার ভাবনা আমি আসলে কোথায় যাই এতবার করে, কদিন পরে পরেই? আমার কেন সংসারে কোনো মন নেই? নাকি আমি অন্য কোথাও আকর্ষিত!     

কারণ বাবা-মা আর ছেলে-ছেলের মা সহ একটা পরিপূর্ণ সংসারের সবকিছুর দায়িত্ব আমার উপরে থাকার পরেও আমি সংসারে এতটুকু মনোযোগী নই বলে আমার জন্য ঘরে বাইরে সবার দেয়া এই অপবাদ বা আশীর্বাদ! যে যেভাবে নেয় আরকি। অবশ্য প্রায় প্রতি তিন-চারমাস পর পর কয়েক দিনের জন্য ঘরের বাইরে শুধু নয়, দেশের বাইরে গেলে এই অপবাদ বা আশীর্বাদ কপালে জুটে যাওয়া খুব কঠিন কিছু নয় আদৌ।

তাবুর ভিতরে রোদের আরাম বিছানা। ছবিঃ লেখক

রোদমাখা উষ্ণ বিছানার আরাম ছেড়ে কিছুতেই ইচ্ছা করছিল না উঠে আবারো পিঠে ভারি ব্যাগপ্যাক নিয়ে দীর্ঘ পাহাড়ি পথ ট্রেক করতে। ইচ্ছা করছিল একটা দিন চুপচাপ এখানে শুয়ে, বসে, হেঁটে, গড়িয়ে কাটিয়ে দেই। গঙ্গার তীরে, ধূসর পাহাড়ের বুকে, সাদা পাহাড়ের শীতলতায়, চাঁদের আলোয় রূপালী রাতের মায়ায়, সোনা ছড়ানো সকালের আকর্ষণে আর ভুজবাসার মিশ্র অনুভূতিতে।

হয়তো থেকেই যেতাম একটি দিন। কিন্তু শুধুমাত্র খাওয়া দাওয়া নিয়ে ভীষণ রকম সমস্যা হচ্ছিল বলে সেটা আর করতে ইচ্ছে হয়নি। গত চারদিন হলো শুধু রুটি, চা, চকলেট, আপেল আর বিস্কিট ছাড়া কিছুই খাওয়া যায়নি, খেতে পারিনি আর এখানে এর বেশী কিছু পাওয়াও যায় না। ভাত-মাছ বা মাংসের হাহাকারে পড়ে গেছি আর সেই সাথে আছে চারদিন পরিবারের সাথে একদম যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। এটাও একটা বিশেষ উদ্বেগের কারণ। তাই দারুণ অনিচ্ছা আর অলসতা সত্ত্বেও উঠতেই হলো।

ট্রেকারদের ফেরা। ছবিঃ লেখক

আবারো খেজুর, বিস্কিট, পানি আর চা দিয়ে হালকা নাস্তা করে ভুজবাসা থেকে বিদায় নিয়ে প্রায় সমতল পাহাড়ি ভ্যালী থেকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মাঝারী পাহাড়ের চূড়ায় ওঠা শুরু করলাম। যেখান থেকে মুল ট্রেইল শুরু হয়েছে গাঙ্গোত্রি যাবার, আর আসার সময় মূল ট্রেইল শেষ হয়েছিল।

দারুণ একটা ব্যাপার, একই চূড়া আর একই পাহাড়ের ট্রেইল, কখনো সেটা ট্রেকের শেষ, যা অপার আনন্দে মনপ্রাণ ভরে দেয় আর কখনো সেই একই ট্রেইল হয়ে যায় ট্রেকের শুরু, যা মনপ্রাণ প্রায় বিষিয়ে দেয়। কী অদ্ভুত আর অবাক করা প্রকৃতির নিয়ম। একই জায়গা, একই পাহাড়, একই ট্রেইল আর একই ট্রেক কিন্তু কখনো সুখের, আনন্দের আর কখনো কষ্টের, মেজাজ খারাপের।

কিন্তু এসব নিয়ে ভেবে কোনো লাভ তো নেই-ই বরং লস অনেক আছে। এসব নিয়ে ভাবলে বরং অলসতা, হতাশা আর মানসিক ভার আরও বেড়ে গিয়ে পথ চলতে নানা রকম প্রতিবন্ধকতা দেখা দিতে পারে স্বাভাবিকভাবেই। তাই সমতল থেকে পাহাড়ের ট্রেইলে উঠে আর না থেমেই যতটা পারা যায় দ্রুত পথ চলতে শুরু করলাম, যতক্ষণ পর্যন্ত না পাহাড়ের চড়াই সামনে আসে। আর নিজের জন্য নিজের লক্ষ্য ঠিক করলাম দেড় থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যে চিরবাসায় পৌঁছে যেতে হবে।

সময় তখন ১১:৪০ মিনিট। দেড়টার মধ্যে চিরবাসা পৌঁছাতে পারলেও আমি খুশি। সেখানে একটা ২০ বা ৩০ মিনিটের ব্রেক নিয়ে আবারো একটা দ্রুত গতির ট্রেক শুরু করতে পারবো। সেভাবেই ব্যাগপ্যাকটাকে বুকের সাথে আঁটসাঁট করে বেঁধে নিয়ে একটু হালকা করেই পা চালাতে লাগলাম।

তাবুতে ফিরে সবার বিশ্রাম। ছবিঃ লেখক

ভুজবাসা থেকে চিরবাসা পর্যন্ত ছয় কিলোমিটার ঠিক দুই ঘণ্টায় ট্রেক করেছিলাম। তবে এই ফেরার পথে আগের দিনের একটা রোমাঞ্চকর জায়গায় নিজেকে চ্যালেঞ্জ জানাতে ভুলিনি। আগের দিন নদীর উপরে ভাঙা ঝুলন্ত সেতু না পেরিয়ে পাহাড়ে গায়ে গায়ে বানানো ট্রেইল দিয়ে, অনেক কষ্টের কিন্তু কম ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের চূড়ায় উঠে তারপর আবার নেমে নদী পেরিয়ে অন্য পাহাড়ে গিয়েছিলাম। আর আজ ফেরার সময় পাহাড়ের চূড়ায় না উঠে দুই পাহাড়ের নদীর পাড়ে অনেকটা ভেঙে গিয়ে প্রায় ঝুলে থাকা কাঠের নড়বড়ে সেতু পেরিয়েছিলাম মনের আনন্দেই।

যদিও দারুণ ঝুঁকি ছিল, ছিল স্লিপ কেটে পড়ে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটার আশংকা, ছিল পাথরের উপরে ভুল স্টেপে নদীতে গড়িয়ে পড়ার আশংকাও। তবুও সেসবকে মাথায় না রেখেই এই চ্যালেঞ্জটা নিয়েছিলাম। এবং সত্যি বলতে কী, নদীর উপরের পাথর আর ঝুলন্ত নড়বড়ে সেতু পেরিয়ে আসার যে রোমাঞ্চ সেটা অতুলনীয় ছিল নিঃসন্দেহে। তবে নদী পেরিয়ে আসার সময় তেমন কিছু মনে না হলেও, পার হয়ে নিরাপদে এপারে এসে যখন সেই নড়বড়ে ঝুলে থাকা কাঠের সেতু আর নদীর উপরের কিছু অংশের পানির স্রোতে নড়ে ওঠা পাথরের দিকে তাকালাম তখন ভয়ে হিম হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি আনন্দে উষ্ণও হয়ে উঠেছিলাম মুহূর্তেই।

ভুজবাসা থেকে শিবলিঙ্গ। ছবিঃ লেখক

ভয় আর আনন্দের এই অদ্ভুত সংমিশ্রণের কারণে পরের খুবই ঝুঁকিপূর্ণ, পাথর গড়িয়ে পড়ার ভয়ানক জায়গাটাকে এবার তেমন কিছু মনেই হয়নি। একদম বীরদর্পে পেরিয়ে এসেছিলাম সেই পথ। আর যে পথ ঘেরা দিয়ে রাখা লোহার রেলিং দিয়ে, যেখানে মাত্র একজন মানুষকে খুব ধীরে ধীরে পার হতে হয় পাহাড়ের বুকের মাঝ দিয়ে সরু করে বানানো ট্রেইল দিয়ে, সেই পথেও কোনো ভয় আর আতঙ্ক কেন যেন গ্রাস করেনি।

বেশ স্বচ্ছন্দ্যে আর আনন্দেই পেরিয়েছিলাম সেই গায়ে কাটা ধরে যাওয়া ভয়াবহ পাহাড়ি ট্রেইল, যার নিচের দিকে তাকালে হাজার ফুটের বেশী গভীর গিরিখাত, নিচে প্রমত্তা গঙ্গার ভয়াবহ স্রোত, বড় বড় পাথরের রাক্ষুসে বোল্ডার।

বিদায় ভুজবাসা। ছবিঃ লেখক

এই প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ পথই পাড়ি দিয়ে নিরাপদে ওপারে গিয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছি, ভয়ে আর আনন্দে শিহরিত হয়েছি, কাঁপা কাঁপা হাতে দুই একটি ছবি তুলেছি, তারপর আবার পথ চলতে শুরু করেছি। আর আমার নিজের কাছে নিজের নির্ধারণ করা সময় দুই ঘণ্টার আগেই ভুজবাসা থেকে চিরবাসা পৌঁছেছি। এটা একটা দারুণ প্রাপ্তি আর অনুপ্রেরণা ছিল নিজের কাছেই নিজের জন্য, চিরবাসা থেকে পরের ৮ কিলোমিটার খাড়া পাহাড়ের ট্রেইলে দ্রুত ট্রেক করার জন্য।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ঝালকাঠিতে বাংলার সুয়েজখাল গাবখান চ্যানেল ও গাবখান ব্রিজের কথকতা

রাত্রিকালীন ফটোগ্রাফি এবং কিছু ধারণা