শিয়া সম্প্রদায়ের তাজিয়াখানা হোসেনি দালান ভ্রমণ

ইতিহাস ও ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ রাজধানী ঢাকা। এ নগরে এখনো হারানো দিনের কিছু অপূর্ব স্থাপনা চোখে পড়ে। হোসেনি দালান এগুলোরই একটি। রাজধানী ঢাকার একটি দর্শনীয় স্থান হিসেবেও হোসেনি দালানের গুরুত্ব রয়েছে। হোসেনি দালান পুরান ঢাকায় অবস্থিত শিয়া সম্প্রদায়ের একটি ইমারত এবং কবরস্থান। বিকল্প উচ্চারণ হুস্নী দালান এবং ইমারতের গায়ে শিলালিপিতে ফারসী ভাষায় লিখিত কবিতা অনুসারে উচ্চারণ হোসায়নি দালান। এটি মোঘল শাসনামলে সপ্তদশ শতকে নির্মিত হয়।

গেট দিয়ে ঢুকতেই পিচঢালা রাস্তার পাশে এই কবরস্থানটি চোখে পড়বে। সোর্স: লেখিকা

স্বচ্ছ পানির একটি পুকুরের পাড়ে দৃষ্টিনন্দন একটি স্থাপনা। পুকুরে স্থাপনাটির ছায়া পড়ে অনন্য রূপ নিয়েছে। ব্রিটিশ লাইব্রেরির ওয়েবসাইটে পুরান ঢাকার অসাধারণ এই ছবি আছে। ঢাকা নিয়ে যাঁদের আগ্রহ, তাঁরা দেখলেই বুঝবেন, এটি হোসেনি দালান বা ইমামবাড়ার ছবি। ১৯০৪ সালে তোলা এই ছবির আলোকচিত্রী ফ্রিজ ক্যাপ, যিনি সেই সময়ের ঢাকার অনেক ছবি তুলেছিলেন। প্রায় ৩৫০ বছরের পুরনো স্থাপনাটি মোঘল ঐতিহ্যের নিদর্শন। ৬১ হিজরির ১০ মহররম (৬৮০ খ্রিষ্টাব্দের ১০ অক্টোবর) ইরাকের কারবালার যুদ্ধে হোসেনের শহীদত্বকে স্মরণ করার জন্য শিয়া সম্প্রদায় এটি নির্মাণ করেছিল।
শিয়া বংশোদ্ভূত ব্যক্তিদের সারিবাঁধা কবর। সোর্স: লেখিকা

মোঘল সম্রাট শাহজাহানের আমলে এটি নির্মিত হয়। দালানটি নির্মাণের সময়কাল অস্পষ্ট। এর নির্মাণকাল নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মত পার্থক্য আছে। ইমামবাড়ার দেয়ালের শিলালিপি থেকে জানা যায়, শাহ সুজার সুবেদারির সময় তাঁর এক নৌ-সেনাপতি মীর মুরাদ এটি হিজরী ১০৫২ সনে (১৬৪২ খ্রিস্টাব্দ) সৈয়দ মীর মোরাদ কর্তৃক নির্মিত হয়। তিনি প্রথমে তাজিয়া কোণা নির্মাণ করেন। ইমামবাড়া তারই পরিবর্ধিত আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া তাঁর ‘বাংলাদেশের প্রত্নসম্পদ’ বইয়ে ভবনের দেয়ালে লাগানো শিলালিপির কথা উল্লেখ করেছেন। প্রত্নতাত্ত্বিকরা পরীক্ষার পর দেখেছেন ওই শিলালিপিটি নকল নয়। শিলালিপিতে উল্লেখ রয়েছে নির্মাতা হিসেবে মীর মুরাদের নাম। ঐতিহাসিক এম হাসান দানীও বলেছেন, ‘মীর মুরাদই এখানে প্রথম ছোট আকারের একটি ইমামবাড়া স্থাপন করেছিলেন।
প্রচলিত লোককাহিনি অনুসারে, শাহ সুজার সুবেদারির সময় তাঁর এক নৌ-সেনাপতি মীর মুরাদ একদিন স্বপ্নে আল হোসেনকে একটি ‘তাজিয়াখানা’ নির্মাণ করতে দেখে এটি নির্মাণে উৎসাহিত হন। তিনিই এই ইমারতের নাম রাখেন হোসেনি দালান। এ বিষয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ইমারতের গায়ের একটি শিলালিপি থেকে জানা যায়, ১৬৪২ সালে শাহ সুজার সেনাপতি মীর মুরাদ এটি নির্মাণ করেন। জানা যায়, মীর মুরাদ ইন্তেকাল করেন ১৭১৮ সালে। অনেকের মতে, তার ইন্তেকালের ৭৫ বছর আগে কী করে তিনি এ ভবন নির্মাণ করেন তা এক বিরাট বিস্ময়।
পুকুরের পাড়ে দৃষ্টিনন্দন একটি স্থাপনা। পুকুরে স্থাপনাটির ছায়া পড়ে অনন্য রূপ নিয়েছে। যদিও পুকুরের পানি এখন আর স্বচ্ছ নয়। সোর্স: লেখিকা

কেউ কেউ মনে করে, মীর মুরাদ এটি নির্মাণ করেননি। ধারণা করা হয়, ঢাকার নায়েব-ই-নাজিম নবাব জসরত খানের আমলে (১৭৯৬-১৮২৩) বর্তমান স্থানে একটি ইমারত নির্মাণ করা হয়। এ ইমারতটি ১৮৯৭ সালের প্রবল ভূমিকম্পে ধ্বংস হয়। একই স্থানে ঢাকার নবাব আহসান উল্লাহ বর্তমান ইমারতটি নির্মাণ করেন।
হোসেনি দালান এলাকায় ঢাকার কয়েকজন নায়েব-ই-নাজিম এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের কবর রয়েছে। পরে এটি ভেঙে যায় এবং নায়েব-নাজিমরা নতুন করে তা নির্মাণ করেন।
পুকুর ঘাট। সোর্স: লেখিকা

ইতিহাসবিদ জেমস টেলর তাঁর বইয়ে উল্লেখ করেন, ১৮৩২ সালেও আদি ইমামবাড়া টিকে ছিল। ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে দুই দফায় ইমামবাড়ার সংস্কার হয়। ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে ভবনটি প্রায় বিধ্বস্ত হয়। পরে খাজা আহসান উল্লাহ লক্ষাধিক টাকা ব্যয় করে তা পুনঃনির্মাণ ও সংস্কার করেন। ১৯৯৫ সালে একবার এবং পরবর্তীতে ২০১১ তে পুনর্বার দক্ষিণের পুকুরটির সংস্কার করা হয়। ২০১১ খ্রিস্টাব্দে হোসেনী দালান ইমামবাড়ার সংস্কারসাধন ও সৌন্দর্যবর্ধন করা হয়।
একটি উঁচু মঞ্চের ওপর ভবনটি নির্মিত। সোর্স: লেখিকা

হোসেনী দালানের দক্ষিণাংশে রয়েছে একটি বর্গাকৃতির পুকুর। এর উত্তরাংশে শিয়া বংশোদ্ভূত ব্যক্তিদের কবরস্থান অবস্থিত। দালানটি সাদা বর্ণের এবং এর বহিরাংশে নীল বর্ণের ক্যালিগ্রাফি বা লিপিচিত্রের কারূকাজ রয়েছে। একটি উঁচু মঞ্চের ওপর ভবনটি নির্মিত। মসজিদের অভ্যন্তরেও সুদৃশ্য নকশা বিদ্যমান।
বহিরাংশে নীল বর্ণের ক্যালিগ্রাফি বা লিপিচিত্রের কারূকাজ রয়েছে। সোর্স: লেখিকা

ইরান সরকারের উদ্যাগে ২০১১ খ্রিস্টাব্দে হোসেনী দালানের ব্যাপক সংস্কার সাধন করা হয়। ইরান সরকার এতে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করে। ইরানের স্থপতিবিদ ও শিল্পীরা এতে অংশগ্রহণ করেন। ফলে ইরানের ধর্মীয় স্থাপনার বাহ্যিক রূপ ও নান্দনিকতা এ সংস্কার কাজে প্রতিফলিত হয়েছে। সংস্কারের আগে ভেতরে রং-বেরঙের নকশা করা কাঁচের মাধ্যমে যে সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল, তা পরিবর্তন করে বিভিন্ন আয়াত ও মুদ্রা লিখিত নীল রঙের টাইলস লাগানো হয়েছে।
একইভাবে এর পূর্বদিকের ফটকে এবং উত্তর দিকের চৌকোনা থামগুলোয় আয়াত ও সুরা লিখিত নীল রঙের টাইলস লাগানো হয়েছে। টাইলসগুলো ইরান থেকে আমদানি করা এবং এতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ইরানের ধর্মীয় শিল্পকলা ক্যালিগ্রাফি। ইরানের বেশ কিছু ধর্মীয় স্থাপনায় এ ধরনের টাইলস রয়েছে বলে জানা যায়। হোসেনি দালানের সামনেই রয়েছে হোসেনি দালান মসজিদ।
রাস্তার ওপাশে হোসেনি দালান মসজিদ। সোর্স: লেখিকা

শিয়া সম্প্রদায়ের কাছে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পবিত্র স্থান। প্রতি বছর এখান থেকে মহররমের মিছিল বের করা হয়। মহররমের ১ থেকে ১০ তারিখে হোসেনি দালান ঢাকা শহরের মূল আকর্ষণে পরিণত হয়। শিয়া সম্প্রদায়ের লোকেরা এখানে সমবেত হন। আশুরার দিনে (১০ মহররম) এই স্থান থেকে বিশাল একটি তাজিয়া মিছিল বের করা হয়।
২০১৫ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ অক্টোবর দিবাগত রাতে অর্থাৎ ২৪ অক্টোবর রাত দুইটার দিকে আশুরা উপলক্ষে তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতির সময় হোসেনি দালান এলাকায় বোমা হামলা হয়। এতে ১ জন নিহত এবং শতাধিক ব্যক্তি আহত হন। এটি বাংলাদেশে তাজিয়া মিছিলের উপর হওয়া প্রথম হামলা।
মসজিদের অভ্যন্তরেও সুদৃশ্য নকশা বিদ্যমান। সোর্স: লেখিকা

কীভাবে যাবেন:

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের দক্ষিণ দিকে এর অবস্থান। কেউ চাইলে পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের কাছাকাছি এই হোসেনি দালানে ঘুরে আসতে পারেন। ঢাকা মেডিকেল থেকে হেঁটেই যাওয়া যায়। একটু সামনে গেলেই রাস্তার নাম পাওয়া যাবে, “হোসেনি দালান রাস্তা”। ওটা ধরে দশ মিনিট হাঁটলেই পাওয়া যাবে এই নিদর্শনটি। আর রিকশায় গেলে ২০ টাকা রিকশা ভাড়া।
http://m.dailynayadiganta.com/?/detail/news

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

১৪০ দিনে ৭ মহাদেশের ৩২টি দেশ ভ্রমণ: দুর্দান্ত এক জাহাজ ভ্রমণের হাতছানি

তেরো পুকুর আর ইমারতে ফেনীর দাগনভূঞায় প্রতাপপুর জমিদার বাড়ি