জায়ারমেকভেসাট : শিশুরাই চালায় যে রেলস্টেশন

Gyermekvasút, Budapest

‘রেলওয়ে সার্ভিস’ শব্দটা মাথায় আসলে প্রথমেই আপনি কী ভাবেন? দাড়ি-মোচ ওয়ালা কিছু লোক সার্ভিসের জন্য রয়েছেন। ট্রেন ছাড়ার সময় থেকে শুরু করে খাবার দেয়া, কোনো যাত্রীর সুবিধা-অসুবিধার দিকে খেয়াল রাখা, টিকিট দেয়া, টিকিট চেক সবই করছেন এই মানুষেরা। কিন্তু ধরুন এই কাজগুলোই বড়রা না করে করছে অল্প বয়সী শিশু, তখন কি সেই দৃশ্য দেখে আপনি একটু থমকে যাবেন না?

কীভাবে এই শিশুরা ট্রেনের যাবতীয় কাজ সামাল দিচ্ছে? ভাবনাটা আপনার কাছেই রাখুন। এবার বিস্ময়ের গল্পটা শুনুন। এই শিশুরা যে শুধু সার্ভিস দিচ্ছে তাই নয়, বেশ ভালোভাবেই দিচ্ছে। বড়দের চেয়ে কোনো অংশেই তারা কম নয়!

image source: brilio.net

শিশুদের রেলে সার্ভিস দেয়ার এই জায়গাটি পূর্ব ইউরোপের দেশ হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টে। সেখানকার এক পাহাড়ি এলাকার নাম বুদা-হিলস। সে সবুজ পাহাড়ের বুক চিরে তৈরি হয়েছে মাত্র ১১ কিলোমিটার দীর্ঘ জায়ারমেকভেসাট (Gyermekvasut) নামের একটি ছোট্ট রেলওয়ে। নামটি একটু অদ্ভুত শোনাচ্ছে? কারণ এটি বলা হচ্ছে হাঙ্গেরিয়ান ভাষায়। এই শব্দটির ইংরেজি অর্থ হচ্ছে ‘দ্য চিলড্রেনস রেলওয়ে’। আর বাংলায় বললে বলতে হয় ‘শিশুদের রেলওয়ে’।

image source: welovebudapest.com

এই রেলওয়েতে চলে সাদা, নীল আর লাল রঙের ট্রেন। শিশুদের পোশাকটাও এই রঙেরই। ট্রেনগুলোতে রয়েছে সাধারণ আর প্রথম শ্রেণীর দুই ধরনের বগি। প্রথম শ্রেণীর বগির সিটগুলো সবুজ ভেলভেটে মোড়ানো। আর সাধারণ শ্রেণীতে বসার জন্য রয়েছে কাঠের তৈরি সুন্দর বেঞ্চ। প্রতিটি বগিই বেশ সুন্দর করে অলংকরণ করা। রেলওয়েতে সাতটি স্টপেজ আছে। প্রতিটিই বেশ আকর্ষণীয়ভাবে সাজানো। এই ট্রেনগুলোই দেখাশোনা করে ছোট ছোট কিছু শিশু। যাদের সবার বয়স ১০-১৪ বয়সের মাঝে। এরা সবাই স্কুল পড়ুয়া।

image source: kabarpenumpang

এই রেলওয়ে সার্ভিসে যুক্ত সকল শিশুকে নিয়োগ দেওয়া হয় তাদের মেধার উপর ভিত্তি করে। নিয়োগের পর তাদেরকে চার মাসের একটি ট্রেনিং দেওয়া হয়। এরপর রেলওয়ে ম্যানেজমেন্টের সকল কাজ প্রমাণের জন্য তাদের পরীক্ষায় বসতে হয়। আর এর পরেই মেলে এক বছরের লাইসেন্স। শিশুরা চাইলে রাতের কাজ ভাগ করে নিতে পারে যেন পরদিন আবার স্কুলে জয়েন করতে সমস্যা না হয়। এখানে কাজ করে স্কুল মিস করতে চাইলে সে অনুমতিও নেয়া আছে তাদের।

image source: kaskus

শিশুদের এই রেলওয়েকে অনেক সময় ‘দ্য গ্রেটেস্ট চাইল্ড টয় ট্রেন অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ও ডাকা হয়। তবে একে কিন্তু মোটেও খেলনা ট্রেন ভেবে ভুল করবেন না! কারণ অন্যান্য ট্রেনগুলোর মতোই এটি পরিচালনার জন্য মানা হয় কঠিন সকল নিয়ম। হাঙ্গেরির অন্যান্য সকল রেলের নিয়মের চাইতে কোনো অংশেই এটি কম নয়। এ রেলওয়েতেও যাত্রীরা নিয়মিত যাওয়া-আসা করে। শুধু তাদের ট্রেনে ওঠা-নামার মধ্যেই তো সব কাজ সীমাবদ্ধ নয়।

ট্রেনের সিগনাল দেওয়া, স্টেশন মাস্টারের কাজ, টিকিট চেকিং, ট্রেনে ডিজেলের ব্যবহার সবকিছুর জন্যই লোক দরকার হয়। আর এই শিশুরা এ সকল কাজই করে যাচ্ছে নিখুঁত দক্ষতায়। এই কাজে নিযুক্ত প্রতিটি শিশুই নিজ কাজের প্রতি যথেষ্ট যত্নশীল। সকল কাজ শিশুরা করলেও ট্রেন চালানোর জন্য নিয়োগ দেওয়া হয় প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিকেই। এছাড়াও প্রাপ্তবয়স্ক রয়েছেন তত্ত্বাবধায়ক ইঞ্জিনিয়ার। আর তাছাড়া শিশুরা তাদের কাজ ঠিকমত করতে পারছে কিনা সেটাও নিয়মিত তদারকি করে প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিরা।

image source: travel.tribunenews.com

বছরের পুরোটা সময়ই এই জায়ারমেকভেসাট রেলওয়ে চালু থাকে। তবে সেপ্টেম্বর-এপ্রিল মাসের সোমবারগুলোতে এখানে রেল চলাচল বন্ধ থাকে। গ্রীষ্মের সময় সকাল ৯টা-বিকাল ৭টা পর্যন্ত এবং শীতের সময় সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৭টা পর্যন্ত ট্রেন চালু থাকে। পুরো জায়ারমেকভেসাট রেললাইন ঘুরে আসতে একটি ট্রেনের সময় লাগে ৪০-৫০ মিনিট। ট্রেনের টিকিটের দাম রাখা হয় কয়েকশ’ ফরেন্ট (হাঙ্গেরির মুদ্রা) বা ২-৩ ডলার।

খরচ আদতে কারও কাছে কম বা বেশি যাই মনে হোক না কেন, অর্থের ব্যাপারটি পাশে রাখলে অভিযাত্রীরা বিনোদিত হন অনেক বেশি। এই ট্রেনে চড়লেই আপনি ঘুরে আসতে পারেন বুদাপেস্টের সর্বোচ্চ বিন্দু এলিজাবেথ লুকআউট থেকে যেখান থেকে আপনি দেখতে পাবেন পুরো বুদাপেস্ট শহরকে। এই রেলওয়েতে ট্রেনে উঠে পুরো রুটটাই যেমন আপনি দেখে আসতে পারেন তেমনি চাইলেই মাঝপথে রোমাঞ্চকর অভিযানের আশায় নেমেও পড়তে পারেন সবুজে ঘেরা পাহাড়ের বুকে।

নয়নাভিরাম এই রেলস্টেশনের গল্পটা প্রায় ৭০ বছরের পুরনো। চিলড্রেন’স রেলওয়েকে কখনো কখনো বলা হয় অগ্রগামী রেলওয়ে নামেও। এটা আসলে কিছু তরুণ মিলে শুরু করেছিল যাদের উদ্দেশ্য ছিল শিশু-কিশোরদের রেলওয়ের কাজ বিষয়ে জানানো এবং শেখানো। ১৯৪৮ সালে হাঙ্গেরি যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রণে ছিল তখন এই রেলওয়ের নির্মাণকাজ শুরু হয়। আর শেষ হয় ১৯৫০ সালে। প্রথমটি চালু হয় মস্কোর গোর্কি পার্কে, ১৯৩২ সালে।

আর আরেকটি যেটি এখন বুদাপেস্টের জায়ারমেকভেসাট সেটি চালু হয় ১৯৪৮ সালে। পরবর্তীতে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলে সেখানে প্রায় ৫০টির বেশি রেলওয়ের খোঁজ পাওয়া যায় যার বেশিরভাগই দেশের পূর্ব পাশে পড়ে। বেশিরভাগ রেলওয়েগুলোই এখন ঐতিহাসিকভাবে পর্যটকদের আকর্ষণ করার জন্য ব্যবহার করা হয়। বুদাপেস্টের পাশাপাশি, উদাহরণ হিসেবে এখনও রয়ে গেছে মিনসক, ড্রেসডেন, বার্লিন, বেলারুস, তিলিসি আর আরও কিছু শহর।

image source: detik travel

ট্রেনে ভ্রমণের পাশাপাশি এই রেলস্টেশনে আরও আছে জাদুঘর। সেখানে আছে হাঙ্গেরিতে কমিউনিস্ট শাসনের চিহ্ন বয়ে বেড়ানো কমিউনিস্ট আমলের পুরনো জিনিসপত্র, যন্ত্রপাতি, লোহালক্কড়সহ নানা জিনিস।

image source: ttnotes.com

আকর্ষণীয় জায়গা দেখে গেলেন আর এরপর শুধু জায়গাটারই গল্প সবার কাছে বলবেন এমনটা কিন্তু হতে দেবে না এই ছোট ছোট শিশুরাই। রেলওয়েতে ট্রেন আসলে কচিকণ্ঠে যখন পুরো প্লাটফর্ম জেগে ওঠে, হাতের রঙিন পতাকাটা নেড়ে যখন কোনো শিশু গম্ভীর মুখে ট্রেন আসার হুইসেল দেয়, টিকিট কাউন্টারে যখন শিশুরাই বড়দের মতো করে যাত্রীদের টিকিট দেয়, অথবা সব ছাপিয়ে শিশুরাই যখন টিকিট চেকার হয়- সকল দৃশ্যই হয়ে ওঠে মনোমুগ্ধকর। এই দৃশ্যগুলোর জন্যই আপনি ভুলতে পারবেন না এদের। এরা আপনাকে তাদের কথা ভুলতে দেবে না।

image source: librarius.hu

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ইন্ডিয়ান ভিসা আবেদন সম্পর্কিত সকল খুঁটিনাটি

নড়াইল নলামারা পদ্মবিল ভ্রমণ: প্রথম পর্ব