কীভাবে করবেন মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট?

অনেকেরই ধারণা দালাল ছাড়া পাসপোর্ট হয় না। আসলে ব্যাপারটা পুরোটাই উল্টো। আপনি একটু সচেতন হলেই দালাল ছাড়াই নিজে নিজে মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট করে নিতে পারবেন। বিভিন্ন কারণে মানুষকে দেশের বাইরে যেতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে ঘোরাঘুরি, চাকুরী, চিকিৎসা, পড়ালেখা। জরুরী পাসপোর্ট করলেও সেটা হাতে পেতে পনের দিন সময় লাগে। পাসপোর্ট প্রস্তুত না থাকলে আপনার জীবনের কোনো বড় সুযোগ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই পাসপোর্ট করে রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ।

দেশে মোট ৬২টি পাসপোর্ট অফিস আছে, যেখান থেকে পাসপোর্ট করতে পারবেন: ছবি সরকারি পাসপোর্ট সাইট থেকে নেয়া

মেশিন রিডেবল পাসপোর্টের আবেদন আপনি চাইলে অনলাইনে করতে পারেন এবং টাকাও অনলাইনে জমা দিতে পারেন। এছাড়া ফরম ডাউনলোড করে/সংগ্রহ করে পূরণ করে হাতে লিখেও জমা দিতে পারেন। তবে আপনার যদি টাইপ করার ব্যাপারে সমস্যা না থাকে, তবে অনলাইনে করাটাই ভালো হবে আমি মনে করি। এর কারণ হচ্ছে অনলাইনে নিজেরটা আপনি শতভাগ নির্ভুল করে পূরণ করতে পারবেন। আর অফলাইনে করলে পাসপোর্ট অফিসের লোকজন আপনার পূরণকৃত ফরম অনলাইন করে দেবে, যে কারণে সেখানে আপনাকে বেশিক্ষণ থাকতে হবে এবং ভুল হবার সমস্যা উড়িয়ে দেয়া যায় না। আর মেশিন রিডেবল পাসপোর্টে একবার ভুল হলে সে ভুল সংশোধন করা যায় না। পাসপোর্ট করার সময় তাই অত্যন্ত সতর্কভাবে করতে হবে। বিশেষত নামের বানান, পিতা-মাতার নাম, জন্মতারিখ যাতে কোনোভাবেই ভুল না হয়।
অফলাইন পদ্ধতি:
অফলাইনে এই লিংক থেকে ফরম ডাউনলোড করে নেবেন। মনে রাখবেন, ফরম অবশ্যই উভয় পিঠে প্রিন্ট করে নিতে হবে। হাতে লিখে সঠিকভাবে ফরম পূরণ করে সেই ফরম নিকটস্থ পাসপোর্ট অফিসে জমা দেবেন। দেশে সর্বমোট ৬২টি পাসপোর্ট অফিস আছে, যার তালিকা পাওয়া যাবে এই লিংকে। এছাড়া ফরমে ফি নির্ধারিত সোনালী ব্যাংকে জমা দিতে পারবেন। মনে রাখবেন, সোনালী ব্যাংকে টাকা জমে দিলে রশিদ নাম্বার হাতে লিখে দিবে (উপরে বাম কোণে)। দুই কপি আবেদনপত্র পূরণ করে প্রথম ফরমের সাথে রশিদ আঠা দিয়ে লাগাবেন। এছাড়া দুইকপি পাসপোর্ট সাইজ ছবি লাগবে, যেটা আঠা দিয়ে আবেদনপত্রের সাথে সংযুক্ত করবেন।
পাসপোর্টে সত্যায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যাকে দিয়ে সত্যায়িত করবেন খেয়াল রাখবেন যাতে ছবিতে সত্যায়িত করার সময় অর্ধেকটা সত্যায়িত ছবির উপরে করা হয় আর বাকি অর্ধেক ফরমে করে। যারা নিয়মিত সত্যায়িত করে থাকেন তারা বিষয়টি জানবেন। ছবি ছাড়াও ফরমের আরও একটি জায়গায় প্রত্যয়ন করার দরকার পড়ে, যেখানে সত্যায়নকারীর সিলমোহরে মোবাইল নাম্বার দেয়া না থাকলে নাম্বারটি হাতে লিখে দিবেন। যারা সত্যায়িত করতে পারবে: পাসপোর্টের আবেদনপত্র ও ছবি প্রত্যায়ন ও সত্যায়ন করতে পারবেন – সংসদ সদস্য, সিটি কর্পোরেশনের মেয়র, ডেপুটি মেয়র ও কাউন্সিলরগণ, গেজেটেড কর্মকর্তা, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র ও পৌর কাউন্সিলরগণ, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, বেসরকারি কলেজের অধ্যক্ষ, বেসরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, জাতীয় দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক, নোটারী পাবলিক ও আধাসরকারি/স্বায়ত্তশাসিত/রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার জাতীয় বেতন স্কেলের ৭ম ও তদুর্ধ্ব গ্রেডের কর্মকর্তাগণ।
ছবি তোলার জন্য রঙিন কাপড় পরিধান করে যেতে হবে: ছবি সরকারি পাসপোর্ট সাইট থেকে নেয়া

ফরম সঠিকভাবে পূরণ করা হলে পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে লাইনে দাঁড়াবেন, একজন কর্মকর্তা আপনার আবেদনপত্র প্রাথমিকভাবে দেখে দিবে ঠিক আছে কিনা, ঠিক থাকলে আপনাকে নির্ধারিত রুমে পাঠাবে যেখানে একজন সহকারী/উপপরিচালক স্বাক্ষর করে দিলে আপনি ফরম অনলাইন করার জন্য নির্ধারিত রুমে যাবেন। অনলাইন হবার কাজ শেষ হবার পর ছবি তুলতে ও হাতের ছাপ দিতে নির্ধারিত কক্ষে যাবেন। ছবি তোলার জন্য অবশ্যই রঙিন কাপড় পরিধান করতে হবে, সাদা কাপড় পরা থাকলে ছবি তোলা হবে না, আপনাকে আরেকদিন যেতে হবে। ছবি তোলা ও হাতের ছাপ নেবার পর পরই আপনার কাজ শেষ হয়ে যাবে। আপনাকে দেয়া রিসিপ্টে ভালোভাবে সবকটি তথ্য যাচাই বাছাই করে দেখবেন কোনো ভুল আছে কিনা, থাকলে তখনই সংশোধন করে ফেলতে পারবেন।
এভাবে পাসপোর্ট জমা দেবার কাজ শেষ হয়ে যাবার পর পাসপোর্ট অফিসের ওয়েবসাইটে আপনি আপনার পাসপোর্ট আবেদনের বর্তমান অবস্থা জানতে পারবেন। পাসপোর্ট আবেদন পত্র জমা দেবার কয়েক দিনের মধ্যেই আপনার বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানায় পুলিশ ভেরিফিকেশন হবে। সন্তোষজনক রিপোর্ট পেলে আপনার পাসপোর্ট ছাপানোর কাজ শুরু হয়ে যাবে। পাসপোর্ট প্রিন্ট হয়ে অফিসে চলে আসলে আপনার মোবাইলে এসএমএস আসবে, অনলাইনেও দেখতে পারবেন। তখন পাসপোর্ট নিয়ে আসবেন। পাসপোর্ট হাতে পাওয়া মাত্র সব তথ্য নির্ভুল আছে কিনা চেক করে নিবেন।
রিসিপ্ট প্রিন্ট হবার পর দেখে নিবেন কোন ভুল আছে কিনা-ছবি সরকারি পাসপোর্ট অফিস থেকে নেয়া

অনলাইন পদ্ধতি:
অনলাইন আবেদনও অনেকাংশে মিল আছে। তবে ফরম আপনি অনলাইনে পূরণ করতে পারবেন এই লিংকে গিয়ে। ফরম পূরণের আগেই চাইলে টাকা জমা দিয়ে আসতে পারেন, অথবা ফরম পূরণের সময় একসাথেই টাকা দিতে পারেন। অনলাইনে আবেদনপত্র পূরণের বিস্তারিত নিয়ামবলী দেখতে পারেন এই লিংকে। অনলাইনে আবেদনপত্র পূরণ করলে সেটি পিডিএফ আকারে সংরক্ষণ করতে পারবেন, পরবর্তীতে প্রিন্ট নিয়ে জমা দিয়ে আসলেই হবে। যথারীতি উভয় পৃষ্ঠায় প্রিন্ট করবেন ও সত্যায়িত করবেন। এরপর পাসপোর্ট অফিসে জমা দিয়ে আসবেন। অনলাইনে কোনো ভুল থাকলে “সাবমিট” অপশন ক্লিক করার আগে পর্যন্ত সেটা সংশোধন করা যায়। যদি সংশোধন করতে না পারেন, তার আগেই ফরম সাবমিট করে দেন, পাসপোর্ট অফিসে ছবি তোলার সময় সেটা সংশোধন করে নিতে পারবেন। অফলাইনের মতো অনলাইনের প্রায় সব কিছু এক হলেও পাসপোর্ট অফিসে আপনার সময় কম লাগবে।
আবেদন করতে পারবেন অনলাইনেও। ছবি- লেখক

অনলাইন আবেদনের ফি সোনালী ব্যাংক ছাড়াও আরও পাঁচটি ব্যাংকের মাধ্যমে জমা দেয়া যায়। তবে জমা দিতে গেলে নিজের জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্ম সনদের ফটোকপি নিতে ভুলবেন না। এ পাঁচটি ব্যাংক হচ্ছে:
১. ট্রাস্ট ব্যাংক
২. ঢাকা ব্যাংক
৩. ব্যাংক এশিয়া
৪. ওয়ান ব্যাংক
৫. প্রিমিয়ার ব্যাংক
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র:
পাসপোর্টের ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয় পত্র থাকলে সুবিধা হয়, অন্য কোনো কিছু সাধারণত দেখতে চায় না। জাতীয় পরিচয়পত্রে কোনো ভুল থাকলে বা সেটি না থাকলে জন্মসনদ ব্যবহার করে পাসপোর্ট করা যাবে। এছাড়া দু’কপি ছবি লাগবে যেটা উপরে আলোচনা করা হয়েছে। বাচ্চার ক্ষেত্রে বাচ্চার ছবি ছাড়াও বাবা ও মায়ের ছবি সংযুক্ত করতে হবে। এছাড়া একটি থ্রিআর সাইজের ছবিও নিতে হবে যেটা থেকে বাচ্চার ছবি তোলা হবে। নামের বানানের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করবেন, আপনার নামের বানান যেভাবে সব জায়গায় ব্যবহার করছেন সেটিই ব্যবহার করবেন।
এছাড়া সরকারি চাকুরিজীবি হলে জিও এর প্রয়োজন পড়বে।
পাসপোর্ট ফি:
সাধারণ পাসপোর্টের জন্য আবেদন করলে সাধারণত এক মাসের মধ্যেই পাওয়া যায়। ফি লাগবে ৩,৪৫০ টাকা। আর জরুরী আবেদন করলে পুলিশ ভেরিফিকেশন সাপেক্ষে ১৫ দিনের মধ্যে পাসপোর্ট পাওয়া যায়। ফি লাগে ৬,৯০০ টাকা।
বিস্তারিত নিয়ামবলী পাসপোর্ট অফিসের সাইটেও দেখতে পারেন।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: বর্তমানে পাসপোর্টে বেশ জট লেগে আছে, জরুরী পাসপোর্ট করতে দিলেও ১ মাস সময় লাগছে। আর সাধারণ দিলে ২ মাসেরও বেশি সময় লাগছে। তবে এ অবস্থা সাময়িক, আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই এটা কাটিয়ে উঠবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
ফিচার ইমেজ: বাংলাদেশ এম্বেসী , বেইজিং এর সাইট থেকে নেয়া

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কেরানীর বিদেশ ভ্রমণ ও ভিসার জটিলতা

উয়ারী-বটেশ্বর; ভারতীয় উপমহাদেশের দ্বিতীয় নগর সভ্যতা