এত বেড়াই কীভাবে? আমার কি অনেক টাকা!

আমি এত ঘন ঘন আর এত এত বৈচিত্রে ভরপুর জায়গায় যে যাই, আমার কি অনেক টাকা-পয়সা? নাকি আমি অনেক বড়লোক! এই প্রশ্ন অনেকের এবং অনেকদিন থেকেই। কিন্তু কাউকে কখনো এসবের কৈফিয়ত দেবার মতো প্রয়োজন বোধ করিনি। কারণ আমাকে নিয়ে কে কী ভাবলো, কে, কী সমালোচনা করলো তাতে আমার কিছুই এসে যায় না। কারণ আমার অন্য প্রয়োজনে কোনোদিন তো কেউ এসে সাহায্য করে যায়নি। তাহলে আপনাকে কেন আমি আমার কৈফিয়ত দিতে যাব?

আমি শুধু আমার নিজের কাছে কৈফিয়ত দিতে প্রস্তুত। যদি কৈফিয়ত দেবার মতো কিছু কখনো করি। তবে সব সময় চেষ্টা করি, এমন কিছু না করতে যাতে নিজের কাছে নিজের কোনো কৈফিয়তের মুখোমুখি হতে না হয়। জীবন-যাপনটা সেভাবেই করার চেষ্টা করি সব সময়। আমার মতে, নিজের কাছে নিজের স্বচ্ছতাটাই সবচেয়ে আগে ও বেশী দরকারি মনে হয়। অন্য কে, কী ভাবলো সেটা কখনোই মুখ্য বা বিবেচ্য নয়, ছিল না আর কোনোদিন হবেও না।

নিঝুম দ্বীপ। ছবিঃ লেখক

তবুও আজকাল, ঘরে, বাইরে, নানা রকম আত্মীয়-বন্ধু-সহকর্মীদের জিজ্ঞাসায় সহ্য সীমার বাইরে চলে যাওয়াতে এই লেখাটা লিখতে বাধ্য হয়েছি। কদিন আগে, গতমাসে ডুয়ার্স ঘুরে আসার পরে, আগামীকাল আবার যখনই আসানসোল যাবার জন্য তৈরি হলাম তখনই নানা জায়গা থেকে এই প্রশ্ন ছুটে আসতে লাগলো। আমার কি অনেক টাকা? আমি কি বড়লোক যে এত এত দেশের বাইরে ঘুরতে যাই?

নাহ, আমি প্রায় দিন আনি আর দিন খাই ধরনের কর্মজীবী। বড়লোক তো দূরের কথা, আল্লাহর ইচ্ছায় আমার কোনো সেভিংস পর্যন্ত নেই। তাহলে কীভাবে আর কোন ভরসায় আমি এত এত বেড়াতে যাবার সাহস নয়, দুঃসাহস দেখাই! তবে চলুন, আমি কীভাবে এত বেড়াতে যাই, আর কোথায়ই বা এত টাকা পাই, সেই কৈফিয়ত দেই কিছুটা।

মানালির পথে। ছবিঃ লেখক

একজনকে জিজ্ঞসা করলাম, ‘আচ্ছা আপনি প্রতিমাসে স্যালারি পেয়ে সংসারের নিয়মিত খরচ বাদে, নিজের ভালো লাগার জন্য কি কোনো খরচ করেন?’

তার উত্তর নাহ, তেমন বাড়তি টাকা থাকে না খরচের জন্য যে নিজের ভালো লাগার জন্য আলাদা কোনো খরচ করবো। তেমন বিলাসিতার সুযোগ নেই ভাই।

তাকেই আবার জিজ্ঞাসা করলাম, আচ্ছা আপনি কি বাসা বা অফিসের বাইরে কিছু খাওয়া-দাওয়া করেন? এই ধরেন, চা, সিগারেট, হালকা নাস্তা এমন ধরনের কোনো খরচ?

হ্যাঁ, তা তো করতেই হয় ভাই, না হলে চলবে কীভাবে বলেন? জীবনে আর কয়দিনই বাঁচবো, একটু চা, সিগারেট ছাড়া কি চলে বলেন?

কয়টা সিগারেট লাগে প্রতিদিন?

ধরেন ৭-১০টা সারাদিনে।

বাহ চমৎকার! কত দাম পড়ে সিগারেটের?

ধরেন গড়ে ১০ টাকা করে হলে মাসে প্রায় ৩,০০০ টাকা কম-বেশী।

ওয়াও এক্সিলেনট ভাই।

কেন ভাই, কী হলো?

পরে বলছি দাঁড়ান। চা বা হালকা নাস্তায় মাসে কত লাগে ভাই?

তা ধরেন এখানেও ৪-৫ হাজার তো লাগেই।

আচ্ছা, আচ্ছা বেশ তো, খুব ভালো। তাহলে মাসে কত হলো আপনার সংসার খরচের বাইরের খরচ, প্রায় ৭-৮ হাজার টাকা! 

ভাই হাসেন কেন। বলছি দাঁড়ান।

এরপর আরেক কলিগ অফিসে নতুন ড্রেস পরে এলেন। সবাই তাকে ধরেছেন খাওয়াতে হবে। সে নিমরাজি, মাঝখান থেকে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, কত পড়ল ভাই নতুন পোশাক?

এই তো ভাই মোটামুটি ৫,০০০ এর মতো।

অসাধারণ ভাই অসাধারণ।

কেন ভাই?

দাঁড়ান পরে বলছি।

এক আপা নতুন ড্রেস পরে এলেন, দাম জিজ্ঞাসা করলাম কত?

তিনি বললেন ৭,০০০ টাকা।

একজনকে চিনি, যাকে সকল সামাজিক অনুষ্ঠানেই যেতে হয় প্রতিমাসে নয়, প্রায় প্রতি সপ্তাহেই। যেখানে তার অনুষ্ঠান প্রতি যাওয়া-আসা আর উপহার বাবদ খরচ আছে ৪-৫ হাজার টাকা। মাসে অন্তত ১০-১৫ হাজার টাকা!

বান্দরবানের অরণ্যে। ছবিঃ লেখক

আহা, আহা…

সেদিন একজন বস লেভেলের বড় ভাই, একটা অনুষ্ঠানে পরবে ৩০,০০০ টাকা দিয়ে নতুন স্যুট কিনেছেন! দেখে আর শুনে আমার মূর্ছা যাবার জোগাড়! হায়রে, আমার সব পোশাক মিলেও এই দাম হবে না।

এক আপা আছেন, যার বাসায় প্রতিমাসে নয় প্রতি সপ্তাহেই অন্তত ১০-১২ জন অতিথি থাকেই। তাকেও নানা জায়গায় যেতে হয় সামাজিকতা রক্ষার্থে। তার স্যালারির সিংভাগ এইসব সামাজিকতাতেই চলে যায়। করতেই হয়। আর তিনি এটা করে তৃপ্তিও পান।

একজনকে দেখলাম সেদিন কয়েকমাসের স্যালারির টাকা জমিয়ে নতুন গহনা বানিয়েছে। ইশ, কী আনন্দ আকাশে বাতাসে! আমার নয়, যে গহনা বানিয়েছে তার।

আমার বউয়ের এক কলিগের গল্প শুনি, তিন বা চারমাস পর পর একটা করে এফডিআর করে। আমার বউয়ের আক্ষেপ আমি কেন একটু সংসারী হই না? কেন আমার একটা ডিপিএস পর্যন্ত নেই!

এক সহকর্মী আছেন, যিনি ব্র্যান্ডের কাপড়, জুতা ছাড়া পরেন না। যার পেছনে মাসে তার অন্তত ৫-৭ হাজার টাকা খরচ আছে।

বাহ চমৎকার তো! সবাই সুখী, নিজ নিজ জায়গা থেকে নিজের মতো করে ভালো লাগাকে উপভোগ করে। কেউ ব্র্যান্ডের কাপড় পরে, কেউ ৩০,০০০ টাকা দামী স্যুট পরে, কেউ প্রতিমাসে নতুন ড্রেস বানিয়ে, কেউ নতুন গহনা পরে, কেউ এফডিআর করে, কেউ জমি কিনে, কেউ ডিপিএস করে, কেউ সামাজিক অনুষ্ঠান গিয়ে উপভোগ করে, কেউ অতিথি আপ্যায়ন করে আর কেউ কেউ সাধ্যমত ফ্ল্যাট কিনে। এগুলো সবই তো আপনি আপনার ভালো লাগে দেখে করে থাকেন, এগুলো অবশ্যই ভালো কাজ, ভালো চিন্তা, পরিপক্ব ভাবনা, ভবিষ্যতের সঞ্চয়।

ওয়াহ, তাজ! ছবিঃ লেখক

কিন্তু আমার তো এসব ভালো লাগে না ভাই, আপা, আত্মীয়।

আমি কোনোদিন বাইরে এক টাকার চা কিনে খাইনি, কোনোদিন না। সেই টাকা আমি জমিয়ে রাখি পরের একটা ছোট্ট ভ্রমণের জন্য।

আমি কোনোদিন সিগারেটে একটা টান দিয়ে দেখিনি, কেমন লাগে। তার মানে আমার সেই টাকাটা বেঁচে গিয়েছে।

আমি কোনোদিন নিজ থেকে মিরপুর-২ আর ১০ এর ঝুড়ি-বস্তা-কার্টুন ছাড়া কোনো কাপড় কিনিনি, যার সর্বোচ্চ মূল্য ছিল ৩০০ টাকা!

আমি কোনোদিন কোনো হোটেলে বসে একটা মোগলাই তো দূরের কথা, একটা পুরী পর্যন্ত খাই না, তাহলে আমার সেই টাকাটা বেঁচে গেল না?

আমি এতটাই অসামাজিক যে কোনোদিন কোনো অনুষ্ঠানে যাই না, তার মানে আমার সেই সামাজিকতার উপহার আর যাওয়া-আসার সিএনজি ভাড়া বেঁচে গেল না?

আমার প্রতি ভর্তি পরীক্ষার পরে অফিসিয়ালি যে সম্মানীটা পাই, সেটা শুধুমাত্র আমার ভালো লাগা ভ্রমণের জন্যই খরচ করি, আর অন্য কোনো খাতে নয়।

তাহলে এই যে আমি কোনো বাড়তি খরচ করি না, চা, সিগারেট, পুরী, সিঙ্গারা, মোগলাই, বন্ধুদের আড্ডা, সামাজিকতা, ব্র্যান্ডের কাপড় কেনা, স্যুট বানানো, দামী জুতা পরা, ব্র্যান্ডের ঘড়ি পরা, দামী পারফিউম ব্যবহার করা থেকে নিজেকে সংযত রাখি, বিনিময়ে এইসব খরচের অনেক কম খরচে যে একটু বেড়াতে যাই, কখনো পাহাড়ে, কখনো সমুদ্রে, কখনো অরণ্যে, কখনো নদীতে, কখনো বরফে সেটাই আপনাদের চোখে পড়ে, বড় হয়ে ধরা দেয়, বাজে খরচ মনে হয়, অপচয় মনে করেন!

সেন্ট মারটিন। ছবিঃ লেখক

কী অদ্ভুত তাই না? আপনার ভালো লাগাটা আপনি আপনার মতো করে প্রতিনিয়ত ঠিক ঠিক মেটাচ্ছেন, আর আমার ভালো লাগাটা তিন-চার মাসে একবার মেটাতে গেলেই আপনাদের গায়ে লাগে, চোখে পড়ে, অসামাজিক মনে হয়, অর্থের অপচয় হিসেবে ধরা দেয়! কতটা অদ্ভুত হিসেব আপনাদের একটু ভেবে দেখুন তো?

ভাইরে, আপুরে, আত্মীয়রে… আপনি টাকা জমান, বাড়ি কিনুন, জমি কিনুন, নিজের ফ্ল্যাটে উঠুন, গহনা বানান, ডিপিএস করুন, এফডিআর করুন, ব্র্যান্ডের কাপড়, জুতা, ঘড়ি পরুন সেটা আপনার ভালো লাগা। আর আমি বা আমার মতো কিছুটা ভবঘুরে যারা, তারা নাহয় পাহাড়ে, জঙ্গলে, নদীতে, সমুদ্রে, বরফে, মাঠে-ঘাটে বা কোনো নির্জনে ভালো লাগা খুঁজে পাই বা নেই, তাতে দোষটা কোথায় বলতে পারেন?

এটা কেন বোঝেন না একবারও, কেন এটা ভেবে দেখেন না, যে এদের আর কোনো শখ নেই, ফালতু খরচ নেই, অযথা অপচয় নেই, কোনো বিলাসিতা নেই, কোনো চাহিদা নেই। এরা সবকিছুই সহজভাবে নেয়, নিতে পারে, নিয়ে থাকে।

বিনিময়ে নিজের অনেক কষ্টে জমানো অল্প অর্থে একটু পাহাড়ে, সমুদ্রে, অরণ্যে, বরফে বা কোনো নির্জন প্রান্তরে কিছুটা সময় কাটাতে ভালোবাসে। এখানেই এরা এদের আনন্দ, ভালো লাগা, কর্মস্পৃহা, প্রশান্তি আর সকল অনুপ্রেরণা খুঁজে পায়।

পরী মহল, কাশ্মীর। ছবিঃ লেখক

প্লিজ সামালোচনা করার আগে একবার নিজের দিকে তাকান, নিজের খরচ, চাহিদা, ভালো লাগাগুলোর কথা একবার ভাবুন, তারপর না হয় আমার মতো তিন-চার মাস পরে পরে ২,০০০, ৩,০০০, ৫,০০০, ৮,০০০, ১০,০০০ টাকা খরচের কথা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেবেন! যেটা আপনার প্রতিমাসের খরচের চেয়েও কম!

একটু ইতিবাচকভাবে ভাবুন না সবাই, কেন শুধু শুধু পিছনে লাগতে চান? আমি তো আপনার কোনো ক্ষতি করিনি, তাহলে আপনি কেন আমার পিছনে লাগতে চান? আপনিও ভালো থাকুন আর আমাকে বা আমার মতো মানুষগুলোকেও ভালো থাকতে দিন দয়া করে।

সবাইকে ধন্যবাদ, সবাইক যার যার মতো করে সুখে, আনন্দে আর ভালো থাকুক, সেই প্রত্যাশায়।

Loading...

6 Comments

Leave a Reply
    • আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ ভাই। দুঃখিত দেশের বাইরে থাকায় রিপ্লাই দিতে দেরি হল। ভালো থাকবেন

    • আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ ভাই। দুঃখিত দেশের বাইরে থাকায় রিপ্লাই দিতে দেরি হল। ভালো থাকবেন।

  1. সজল জাহিদ ভাই, শুভেচ্ছা নিবেন। অসম্ভব সুন্দর লেখনী। বেশি জায়গায় ঘুরতে যেতে পারিনি, ২-৪ মাস টাকা জমিয়ে চেষ্টা করি নিজের কিছু সময় দিতে। কিন্তু এর পরেও এই ধরনের বেশ কিছু মন্তব্য হজম করতে হয়েছে। ধন্যবাদ সুন্দর গোছানো এবং মার্জিত ভাষায় একটা জবাবের জন্য।

    • অনেক ধন্যবাদ ভাই। দুঃখিত দেশের বাইরে থাকায় রিপ্লাই দিতে দেরি হল। ভালো থাকবেন।

Leave a Reply to সজল জাহিদ Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শ্রীমঙ্গলের শিহরণ!

লাওস ভ্রমণ: কোথায় থাকবেন, কেন থাকবেন